• ১৪ ফেব্রুয়ারীঃ ‘ভালোবাসা কারে কয়’?
    মাসুদ রানা

    আদিতে ‘ভ্যালেনটাইন্‌স ড্যে’ ছিলো আত্মত্যাগের মহিমা উদযাপনের দিবস। রৌমানদের হাতে খ্রিষ্টধর্ম প্রচারক সেইন্ট ভ্যালেন্টাইনের খুন হবার ঘটনাকে স্মরণ করা হতো ১৪ই ফেব্রুয়ারীতে।

    সেইন্ট ভ্যালেনটাইন নামের অন্ততঃ তিনজন খ্রিষ্টান যাজক রৌমানদের হাতে খুন হন মানুষের মুক্তির বাণী প্রচার করতে গিয়ে। তবে, তিনের মধ্যে প্রাধান্য পান ‘বিশপ অফ টেরনি’ সেইন্ট ভ্যালেন্টাইন। টেরনির বিশপ সেইন্ট ভ্যালেনটাইনের দেহ থেকে মাথা বিছিন্ন করে হত্যা করা হয় খ্রিষ্টোত্তর ২৭০ অব্দের ১৪ই ফেব্রুয়ারীতে।

    কালের পরিক্রমায় প্রসঙ্গ হারিয়েছে ভ্যালেন্টাইনের আত্মত্যাগ। প্রায় সতেরোশো বছর পর ১৯৬৯ সালে পৌপ পল খ্রিষ্টীয় পঞ্জিকা থেকে মুছে দেন সেইন্ট ভ্যালেন্টাইন দিবস। কারণ, ইতোমধ্যে ভ্যালেন্টাইন দিবস প্রেম ও প্রণয়ের দিবস হিসেবে পরিগণিত হয়েছে।

    ধারণা করা হয়, উর্বরতা প্রার্থনা করে খ্রিষ্টপূর্ব যুগ থেকে রৌমানদের পালিত ১৫ ফেব্রুয়ারীর লুপারক্যালিয়া নামের পৌত্তলিক উৎসবই গ্রাস করে নেয় প্রকৃত সেইন্ট ভ্যালেন্টাইন দিবসের মহিমা।

    মধ্যযুগের বিখ্যাত ইংরেজ কবি জেফ্রি শ্যসার সেইন্ট ভ্যালেন্টাইন দিবসকে পাখীদের মধ্যে প্রেম ও প্রণয়ের দিন হিসেবে তাঁর একটি কবিতায় উপস্থাপন করেন। তিনি বুঝালেন, সেইন্ট ভ্যালেন্টাইন দিবসে পাখীরা তাদের প্রত্যেকের প্রণয়-সাথী নির্বাচন করতে সমাবেশিত হয়। তাঁর বিখ্যাত ‘দ্য পার্লামেন্ট ফাউল’-এ কবি জেফ্রি শ্যসার লিখেনঃ

    For this was on seynt Volantynys day
    Whan euery bryd comyth there to chese his make.

    অর্থাৎ,

    সেথায় সেদিন সেইন্ট ভ্যালেন্টাইন তিথে
    প্রতিটি পাখী আসে তার সাথী চিনে নিতে।

    পরবর্তীতে উইলিয়াম শেইক্সপীয়ার তাঁর বিখ্যাত ‘হ্যামলেট’ নাটকে ভ্যালেন্টাইন দিবসকে সুনির্দিষ্ট ভাবে প্রণয়ের দিন হিসেবে চিহ্নিত করে ডেনমার্কের সুন্দরী অফেলিয়াকে দিয়ে গাওয়ালেনঃ

    To-morrow is Saint Valentine's day,
    All in the morning betime,
    And I a maid at your window,
    To be your Valentine.

    অর্থাৎ,

    আসছে-কাল সেইন্ট ভ্যালেন্টাইন দিবস,
    সকালে সমুদয় অনিন্দ্য সরস,
    আমি নারী রহি তব বাতায়ন পাশে
    ভ্যালেন্টাইন হতে তোমার সকাশে।

    বর্তমান খ্রিষ্টবিশ্ব আজ ভ্যালেনটাইনের আত্মত্যাগ বিস্মৃত হয়েছে। শহীদের রক্তে স্নাত ঐতিহাসিক ১৪ ফেব্রুয়ারী আজ হয়ে উঠেছে প্রেম-প্রকাশে গোলাপ-রঙ্গিন।

    আশ্চর্য্য ঐতিহাসিক মিল নিয়ে এই ১৪ই ফেব্রুয়ারী অবয়ব নিয়েছে বাংলাদেশে। আজ থেকে ২৯ বছর আগে ১৯৮৩ সালে স্বৈরশাসনে পিষ্ঠ ও অধিকার-বঞ্চিত মানুষের প্রতি অনুভূত ভালোবাসা-বোধে জীবন দিয়ে হলেও অন্যায় ও অসুন্দরের বিরুদ্ধে দাঁড়াবার তারুণ্য ও যৌবনের ফুল ফুটিয়ে সৃষ্টি হয়েছিলো ১৪ ফেব্রয়ারীর। যে ১৪ ফেব্রুয়ারী ছিলো স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে তারুণ্যের সর্বশ্রেষ্ঠ স্পর্ধিত দিবস, তাকে তারুণ্যেরই নামে তারুণ্য-বিরোধী সঙ্কীর্ণ ব্যক্তিগত ‘ভালোবাসা দিবস’ হিসেবে আজ পালন করা হচ্ছে অপরিসীম দায়িত্বহীনতা বোধে।

    ১৯৮৩ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র-ছাত্রী সংসদ ডাকসু-সহ  বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের সমন্বয়ে গঠিত কেন্দ্রীয় ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের নেতৃত্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্র-ছাত্রীরা সর্বজননীন শিক্ষা ও গণতান্ত্রিক অধিকারের দাবী জানিয়ে প্রগতির যাত্রা শুরু করেছিলো সরকারের শিক্ষা-ভবনের উদ্দেশ্যে। কিন্তু জেনারেলের এরশাদের সামরিক স্বৈরশাসন সেদিন ছাত্র-ছাত্রীদের প্রগতির মিছিলের সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিলো প্রতিক্রিয়ার এক অলঙ্ঘ্য ব্যারিকেইড।

    সে-দিনের তারুণ্য সেই ব্যারিকেইড উপেক্ষা করে উপচে-পড়া সমুদ্র-তরঙ্গের মতো ধাবিত হয়েছিলো সামনের দিকে। আর তখনই গর্জে উঠেছিলো স্বৈরশাসকের বন্দুক একপাশে কার্জন  হল আর অন্যপাশে শিশু একাডেমীকে প্রকম্পিত করে। বন্দুকের উত্তপ্ত সীসা কেড়ে নিয়েছিলো অন্ততঃ ৪টি তাজা প্রাণ - জাফর, জয়লান, দীপালি ও কাঞ্চন।

    সেদিনের ১৪ই ফেব্রুয়ারীতে ঝরা রক্তের কারণেই ছাত্র-আন্দোলনের অনুগামী হয়ে গড়ে উঠেছিলো সামরিক স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ঐক্য ও বৃহত্তর গণতান্ত্রিক আন্দোলন, যা সাত বছর ধরে বহু চড়াই উৎরাই পার হয়ে শেষ ১৯৯০-এ গণ-অভ্যূত্থানে পরিণতি লাভ করে।

    এমন একটি ঐতিহাসিক দিবসকে যাঁরা আজ খৃষ্টীয় বিশ্বের বিকৃত ভ্যালেন্টাইন দিবস হিসেবে পালন করছেন, তাঁরা জ্ঞাত বা অজ্ঞাতসারে বাংলাদেশের ইতিহাসের প্রতি, তারুণ্যের উদার ও বৃহত্তর ভালোবাসার প্রতি এবং সর্বপোরি শহীদদের আত্মত্যাগের প্রতি অসম্মান করছেন।

    আমরা যাঁরা ১৯৮৩ সালের সেই ১৪ ফেব্রুয়ারী সৃষ্টি করেছিলাম, তাঁদের সবাই আজও মরে যাইনি। আমি আহবান করবো তাঁদের কাছে নতুন প্রজন্মকে সেই বৃহত্তর ভালোবাসার কথা জানাতে, যেই ভালোবাসায় উদ্বুদ্ধ হয়ে আমরা বাংলাদেশের শিক্ষা ও মানবিক অধিকার বঞ্চিত মানুষের মুক্তির জন্য জীবন উৎসর্গ করতে তৈরী হয়েছিলাম আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠ গ্রহণ কালে।

    আমি বিশ্বাস করি জীবনের ধর্ম ভালোবাসা। কিন্তু সে-জীবনের স্তর-স্তরে ও পর্যায়ে-পর্যায়ে ভালোবাসার চরিত্র পরিবর্তিত হয়। জীবনের বোধ থেকে আমরা সম্ভবতঃ এই সত্য উপলব্ধি করতে পারি যে, একমাত্র তারুণ্যের ভালোবাসাই হচ্ছে সবচেয়ে অস্বার্থপর। অপরের জন্য আত্মোৎসর্গ করার মতো ভালাবাসা ধারণ করতে পারে একমাত্র তারুণ্যই। তারুণ্যে যদি এই ভিত্তি তৈরী না হয়, প্রৌঢ়ত্বে কিংবা বার্ধক্যে তা কেউ পেরেছে বলে ইতিহাসে আমার জানা নেই।

    আমরা যেনো ভালোবাসা-বিরোধী না হই, কিন্তু আমাদের ভালোবাসার অনুভূতি যেনো মানুষ, সমাজ, দেশ, পৃথিবীকে বাদ দিয়ে একান্ত ব্যক্তিগত প্রেমানুভূতিতে সঙ্কীর্ণ না হয়ে ওঠে। তাই ১৪ ফেব্রুয়ারীর চেতনাকে ভালোবাসায় উপ্ত করে একটি ‘প্রকৃত ভালোবাসা দিবস’ প্রবর্তিত হোক, যে ভালোবাসা আসবে তারুণ্যের দীপ্তি নিয়ে এবং এর আলোকে উদ্ভাসিত হবে স্বজন-স্বজাতি-স্বদেশ-পৃথিবী।

    ১৪ ফেব্রুয়ারী ২০১২
    নিউবারীপার্ক
    এসেক্স, ইংল্যাণ্ড
    masudrana1@gmail.com

পাঠকের প্রতিক্রিয়া

১৪ ফেব্রুয়ারি ৮৩, ভেবেছিলাম, সবাই ভুলে গেছে। আমরা ভুলে যাই খুব খুব করে, তাই। আর আমরা যারা কিছুটা জেগে; জানি কেমন করে আন্দোলনের ফসল চলে যায় তাদের ঘরে; যাদের বিরুদ্ধেই ছিল আমাদের গর্জন।
খুব ভাল লাগলো অন্য চোখে দেখা, আপনার লেখা।

আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন