• ‘অথোরিটি’ ছাড়া দল হয় কি না?
    মাসুদ রানা

    প্রস্তাবনা
    ‘‘অথোরিটি ছাড়া দল হয় না’’ - এই রাজনৈতিক তত্ত্বায়ন ঘিরে একটি মতাদর্শিক বিতর্ক চলছে বাংলাদেশের একটি বামপন্থী দলের অভ্যন্তরে। বক্ষ্যমান প্রবন্ধটি সেই বিতর্ক সম্পর্কিত।

    গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক-সংস্কৃতি বিকাশের জন্য মতাদর্শিক বিতর্ক অপরিহার্য। সমাজ পরিবর্তনে দৃঢ়কল্প একটি রাজনৈতিক দলের জন্য অত্যাবশ্যকীয় রূপে যে গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতার প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়, তা নিশ্চিত করার পক্ষে তৃণমূল পর্যন্ত মতাদর্শিক বিতর্কের বিস্তৃতি অপরিহার্য। বামপন্থী দলটি এ-বিতর্কের অনুমোদন-দানের মধ্য দিয়ে তার অন্তর্গত শক্তির স্বাক্ষর রেখেছে।

    বামপন্থীদের মধ্যে জগত ও জীবন সম্পর্কে ‘সায়ীন্টিফিক এ্যাপ্রৌচ’ কথনে বহুল ব্যবহৃত হলেও তার যথার্থ উপলব্ধি প্রশ্ন সাপেক্ষ। ‘অথরিটি’র আলোচ্য বিতর্কে এ-প্রশ্নটি বিলক্ষণ করণীয়। কিন্তু তার আগে জানা দরকার বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি কী।

    বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি
    বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির কিছু ধাপ আছে, বৈশিষ্ট্য আছে। এগুলোর অনুসরণ ছাড়া শুধুমাত্র দাবী করলেই কোনো কিছু ‘বৈজ্ঞানিক’ বা ‘বিজ্ঞান সম্মত’ হয়ে যায় না। বিজ্ঞানের অমোঘ শক্তিতে আকর্ষিত ধার্মিকেরাও তাঁদের ‘পবিত্র’ গ্রন্থে বিধৃত বিবৃতিগুলোকে ‘সায়ীন্টিফিক’ বলে দাবি করেন। এতে তাঁদের মধ্যে প্রশান্তি এলেও তা বিজ্ঞানে গ্রহণীয় হয়ে ওঠে না। কারণ, এর মধ্যে অনেক সত্য থাকলেও, এদের পদ্ধতিসমূহ বৈজ্ঞানিক নয়।

    অবশ্য, তাতে ধার্মিকদের কিছু আসে-যায়-না। কারণ, তাঁরা তাঁদের বিশ্বাসের সমর্থনে ‘বিজ্ঞান’ ব্যবহার করেন। কিন্তু বামেরা যেহেতু বিজ্ঞানের ভিত্তিতে বিশ্বাস গড়ে তুলতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, তাই তাঁদের জন্য বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির উপলব্ধি ও প্রয়োগ করা অপরিহার্য।

    বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির দশবিন্দু-বৈশিষ্ট্য হচ্ছেঃ পর্যবেক্ষণ (Observation), সংজ্ঞা (Definition), বিবরণ (Description), প্রকল্প (Hypothesis), পরীক্ষা (Test), পরিমাপ (Measurement), বিশ্লেষণ (Analysis), সিদ্ধান্ত (Decision), যাচাই (Verification) ও সাধারণীকরণ (Generalisation)। এ-বৈশিষ্ট্যগুলো কয়েকটি ধাপে সংগঠিত।

    বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের প্রথম ধাপে একটি বস্তু, বিষয় বা ঘটনাকে পর্যবেক্ষণ করা হয় স্বাভাবিক বা বর্ধিত ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে - কখনও নিয়ন্ত্রিত বা কখনও স্বাভাবিক পরিবেশে।

    দ্বিতীয় ধাপে এই পর্যবেক্ষণকে বিবৃত করতে হয় পর্যবেক্ষিত বস্তু, বিষয় বা ঘটনার অন্তর্গত ‘ভ্যারিএবল’ বা চল্‌-সমূহের বস্তুনিষ্ঠ ‘ডেফিনিশন’ বা সংজ্ঞা দিয়ে।

    তৃতীয় ধাপে চল্‌-সমূহের মধ্যে সম্পর্ক নির্ণয় করে ঘটনার কার্য-কারণ কিংবা সহ-সংঘটন সম্পর্কে একটি ‘হাইপোথেসিস’ বা প্রকল্প প্রণয়ন করতে হয় দ্ব্যর্থহীন ও বস্তুনিষ্ঠভাবে।

    চতুর্থ ধাপে আসে পরীক্ষা, যেখানে ‘ইণ্ডিপেণ্ডেন্ট ভ্যারিএবল’ বা নিরপেক্ষ-চলের পরিবর্তনের ফলে ‘ডিপেণ্ডেন্ট ভেরিএবল’ বা সাপেক্ষ-চলে কী পরবর্তন আসে তা নিয়ন্ত্রিত পদ্ধতিতে পরিমাপ করে উপাত্ত সংগ্রহ করা হয়।

    পঞ্চম ধাপে আসে সংগৃহীত উপাত্তের বিশ্লেষণ এবং তা থেকে সিদ্ধান্ত নেয়া হয় পরীক্ষণীয় প্রকল্পের খণ্ডনকারী ‘নাল-হাইপোথেসিস’ বা নাস্তি-প্রকল্প গ্রহণ বা বর্জনের মাধ্যমে। এখানেই পরম সত্য ধারণার বিপরীতে বৈজ্ঞানিক আপেক্ষিক সত্য প্রতিষ্ঠিত হয় পরোক্ষভাবে - প্রস্তাবিত সত্যের বিপরীত প্রস্তাবকে অসত্য প্রমাণ করার মধ্য দিয়ে। এর জন্যেই বিজ্ঞানে পরম সত্য বলে কিছু নেই। কোনো কিছুকে পরম সত্য বলে মনে করা মানেই হচ্ছে তৎক্ষণাৎ বিজ্ঞানচ্যুত হয়ে মৌলবাদে পতিত হওয়া। মৌলবাদ যে কেবল ধর্ম-সম্পর্কিত, তা নয়।

    ষষ্ঠ ধাপে আসে গৃহীত সিদ্ধান্তের ভেরিফিকেশন বা যাচাই, যা করা হয় স্থান-কাল ভেদে পুনঃপরীক্ষা বা পরীক্ষার অনুকরণের মাধ্যমে। এই পুনঃপরীক্ষায় বা অনুকরণ-পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার মধ্য দিয়ে উপনীত হওয়া যায় সাধারণীকরণে। আর উত্তীর্ণ না হতে পারলে সত্যের বিবৃতিকে সীমিত রাখতে হবে শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে।

    সত্য অনুসন্ধানের উল্লিখিত সাধারণ ধাপ ও বৈশিষ্ট্যগুলো শুধুমাত্র প্রাকৃতিক বিজ্ঞান-সমূহে নয়, সামাজিক ও মনোবিজ্ঞান-সমূহের জন্যও প্রযোজ্য (শুধুমাত্র পরীক্ষণ পর্যায়ের ‘কন্ট্রৌল’ বা নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পদ্ধতিক ও কৌশলিক পার্থক্য ছাড়া)।

    ‘অথরিটি’র তত্ত্বায়নে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির সন্ধান
    ‘অথরিটি ছাড়া দল হয় না’ বিবৃতিটি একটি সাধারণীকৃত তত্ত্ব হিসেবে প্রস্তাব করেছে বাংলাদেশের বামপন্থী দলটি। দলের অভ্যন্তরে প্রচারিত একটি অসমাপ্ত খসড়া পুস্তিকায় বিশদ বর্ণনা দেয়া হয়েছে এই তত্ত্বায়নের পক্ষে। বিষয়টি এখনও ‘কনক্লুসিভ’ বা চূড়ান্ত না হলেও, হওয়ার পথে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে গৃহীত হলে এর শক্তিশালী অভিঘাতে কতিপয় নির্দিষ্ট পরিণতি অবশ্যম্ভাবী। বিষয়টির গাম্ভীর্য বিবেচনা করে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিকে একটি ‘ফ্রেইমওয়ার্ক’ বা কর্মকাঠামো ধরে নীচে আলোকপাত করা হলো উল্লিখিত তত্ত্বায়নে।

    ইতিহাস পর্যবেক্ষণ করেই ‘অথরিটি ছাড়া দল হয় না’ প্রস্তাবনা একটি পরীক্ষণীয় প্রকল্প হয়ে উঠে এসেছে পুস্তিকাটিতে। সুনির্দিষ্ট নিরপেক্ষ-চল্‌ ‘স্বার্থ’কে দুটো মাত্রায় নির্দেশ করা হয়েছে। এর একটি ‘ব্যক্তি-স্বার্থ’ এবং অন্যটি ‘যৌথ-স্বার্থ’। সাপেক্ষ-চল হিসেবে নির্দেশ করা হয়েছে ‘অথরিটি’কে। প্রকল্পের বিবরণে বলা হয়েছে, পুঁজিবাদী অর্থনীতি সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত মুনাফার তৈরী লিপ্সায় চালিত হয় বলে একটি পুঁজিবাদী রাজনৈতিক দলে অথরিটি গড়ে ওঠে ব্যক্তিগত প্রতিযোগিতা ও হার-জিতের মধ্য দিয়ে।

    বিপরীতে, উৎপাদনের উপকরণের উপর পুঁজিপতিদের ব্যক্তি-মালিকানার কারণে শ্রমিক শ্রেণী সমষ্টিগতভাবে তাদের শ্রমের প্রকৃত মূল্য হারায়, তাই তাঁদের স্বার্থ নিহিত প্রতিযোগিতার মধ্যে নয়, বরং নিজেদের সহযোগিতার মধ্যে। আর যেহেতু শ্রমিক শ্রেণীর দল ব্যক্তি-মালিকানা উৎখাত করে সামাজিক মালিকানার প্রতিষ্ঠা করতে চায়, তাই সে-দলের ‘অথরিটি’ গড়ে ওঠে যৌথ-স্বার্থকে ধারণ করে। তবে উভয় ক্ষেত্রেই নেতৃত্ব মূর্ত হয়ে ওঠে ব্যক্তির মধ্য দিয়ে।

    এ-প্ররকল্পের সমর্থনে রাশিয়া, চীন, ভারত-পাকিস্তান ও বাংলাদেশের রাজনৈতিক আন্দোলনে গড়ে ওঠা ‘অথরিটি’ পরীক্ষা করা হয়েছে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে। ঐতিহাসিক ‘এ্যাসেসমেন্ট’ বা পরিমাপের মাধ্যমে উপাত্ত সংগ্রহ করে বলা হয়েছেঃ

    ‘‘বুর্জোয়া বিপ্লবে যেমন এই ব্যক্তি নেতৃত্ব মূর্ত রূপ নিয়েছিল ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনে করমচাঁদ গান্ধী, মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ এবং পাকিস্তানী উপনিবেশিকতা বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনে শেখ মুজিবুর রহমানের মাধ্যমে। তেমনি রুশ বিপ্লবে কমরেড লেনিন এবং চীন বিপ্লবে মাও সেতুং এর মাধ্যমে। এই দুই নেতৃত্ব রূপে এক রকম দেখালেও এর প্রকৃতি সম্পূর্ণ ভিন্ন।’’

    যদিও কীভাবে দুই প্রকারের নেতৃত্ব ভিন্ন, তা প্রদর্শনমূলক কোনো পরিমাপ ও বিশ্লেষণ আমরা পাইনি, কিন্তু এক ধরণের প্রকরণমূলক উপাত্তের ভিত্তিতে দলটি সিদ্ধান্ত টেনেছে ‘‘কিন্তু ‘অথরিটি’ লাগছেই’’ বলে। আর সেখান থেকে সাধারণীকরণ করে বলা হয়েছেঃ

    ‘‘বুর্জোয়া পাতি-বুর্জোয়া দলই হোক আর সর্বহারা শ্রেণীর বিপ্লবী দলই হোক - শক্তিশালী কার্যকর দল গড়ে উঠতে হলে, ঐতিহাসিক বিশেষ কোনো কর্তব্য সম্পাদন করতে হলে কর্তৃত্বশালী নেতৃত্ব (অথরিটি - Authoritiy) ছাড়া তা সম্ভব হয় না।’’

    তত্ত্বায়ণের সীমাবদ্ধতা
    বামপন্থী দলটির তাত্ত্বিক প্রকল্পের সবচেয়ে বড়ো সীমাবদ্ধতা হলো ‘অথরিটি’র সংজ্ঞা-দানে ব্যর্থতা। বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান এগুতেই পারে না কোনো কিছুর ‘অপারেশন্যাল ডেফিনিশন’ বা বস্তুনিষ্ঠ ও পরিচালনযোগ্য সংজ্ঞায়ন ছাড়া। দলটির তাত্ত্বিক উপস্থাপনায় রাজনৈতিক দলের ‘অথরিটি’কে অপরিহার্য রূপে হাজির করলেও ‘অথরিটি’ বলতে কী বুঝায়, তার কোনো সংজ্ঞা দেয়া হয়নি কোথাও।

    বলাই বাহুল্য, বস্তুনিষ্ঠ সংজ্ঞা দান ছাড়া বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির অন্যান্য ধাপ ও বৈশিষ্ট্য যাই দেখানো যাক না কেনো, তা হবে অনেকটা ‘ফাউণ্ডেশন’ ছাড়া ‘বিল্ডিং’ বানানোর মতো।

    উপরের উদ্ধৃতিতে দেখা যাচ্ছে দলটি তার অস্তিত্ব, বিকাশ ও ঐতিহাসিক কর্তব্যের সাধণের জন্য শুধু ‘নেতৃত্ব’কে যথেষ্ট মনে করছে না। তাই ইংরেজিতে ‘অথরিটি’র ধারণা নিয়ে এসেছে। বাংলা ভাষায় রাজনৈতিক তত্ত্বায়ণে ব্যবহৃত ইংরেজি শব্দ ‘অথরিটি’ স্বভাবতঃই তাৎক্ষণিকভাবে সহজবোধ্য নয়। তাই বাংলায় এর অর্থ বুঝাতে ‘নেতৃত্ব’র পূর্বে ‘কর্তৃত্বশালী’ বিশেষণ যোগ করা হয়েছে।

    গণিতে ভাগফল ঠিক কি না বুঝার জন্য যেভাবে বিপরীত প্রক্রিয়া হিসেবে গুণের আশ্রয় নেয়া হয়, তেমনি একটি ভাষার অনুবাদ ঠিক হলো কি-না তা বুঝার জন্য পাল্টা-অনুবাদ করা হয়। এ-প্রক্রিয়ায় আমরা যদি বাংলা ‘কর্তৃত্বশালী নেতৃত্ব’কে ইংরেজিতে অনুবাদ করি, তাহলে পাই ‘অথরিটেটিভ লীডারশিপ’। কিন্তু ‘অথরিটি’ বলতে যা বুঝায়, তা এতে প্রকাশিত হচ্ছে না। সঙ্গত কারণেই, ‘অথরিটি’কে ‘কর্তৃত্বশালী নেতৃত্ব’ বলে বুঝাটাও ঠিক হবে না। তাছাড়া, সংজ্ঞানুসারে ‘নেতৃত্ব’র মধ্যে ‘কর্তৃত্ব’ অন্তর্ভূক্ত। তাই ‘কর্তৃত্বশালী নেতৃত্ব’ কথার কোনো বিশেষ অর্থ নেই।

    তবে ইংরেজিতে ‘অথরিটারিয়ান লীডারশিপ’ বলে একটি ধারণা আছে, যার বাংলা অর্থ হচ্ছে ‘কর্তৃত্ববাদী নেতৃত্ব’, যা অনেকটা স্বৈরতন্ত্রর সমার্থক। ধরে নেয়া যায়, ‘অথরিটি’র দ্বারা সেটি বুঝানো হচ্ছে না। সুতরাং ইংরেজি এই ‘অথরিটি’ শব্দটিকে ভালো করে বুঝা দরকার।

    ভাষান্তরিত ধারণা প্রায়শঃ তার মর্মবস্তু হারিয়ে হিতে বিপরীত হয়ে ওঠে। উদাহরণ হিসেবে বাংলাদেশে সেক্যুলারিজমের করুণ পরিণতির কথা উল্লেখ করা যায়। যেখানে সেক্যুলারিজমের প্রকৃত অর্থ হচ্ছে অতিপ্রাকৃত অস্তিত্বের অস্বীকৃতি, বাংলাদেশে এর অর্থ হয়ে উঠলো ‘ধর্ম-নিরপেক্ষতা’, যা ঠিক নয়। কিন্তু কেনো এটি হলো? হয়েছে এই কারণে যে, গড়ে ওঠার প্রেক্ষাপটটি ছিলো হিন্দু-মুসলিম ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে দ্বন্দ্ব-সংঘাতপূর্ণ। কিন্তু সঙ্কীর্ণ অর্থে ও ভ্রান্তভাবে বুঝার কারণে, শেখ মুজিবুর রহমান এক পা এগিয়ে এসে বললেন, ধর্ম-নিরপেক্ষতা মানে ধর্মহীনতা নয়’। তার এ-তত্ত্বায়ণ তাঁকে পাকিস্তানের অনুষ্ঠিত ইসলামিক সম্মেলনে ধর্ম-নিরপেক্ষ বাংলাদেশকে প্রতিনিধিত্ব করতে অনুমোদন দিয়েছিলো। আর এর শেষ পরিণতিতে আজ বাংলাদেশের সংবিধানে একদিকে ধর্ম-নিরপেক্ষতা ও অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় ধর্ম ইসলাম স্থান পেয়ে পরস্পরকে ব্যঙ্গ করছে।

    রাজনৈতিক তত্ত্বায়ণে ঠিক শব্দের ঠিক প্রয়োগ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আর এর জন্য প্রয়োজন শব্দের সঠিক অর্থোপলব্ধি। বাংলা অভিধানে ইংরেজি ‘অথরিটি’ শব্দটির চারটি অর্থ নির্দেশ করা হয়েছে যা নিম্নরূপঃ

    (১) হুকুম দেবার বা তামিল করাবার ক্ষমতা ও অধিকার; কর্তৃত্ব। উদাহরণঃ ‘‘He is intent on exercising his authority’’ (তিনি তাঁর কর্তৃত্ব/অধিকার/ক্ষমতা চর্চায় অভিনিবিষ্ট)।

    (২) প্রদত্ত অধিকার; অধিকারিত্ব। উদাহরণঃ ‘‘Do you have the authority to dismantle the warship?’’ (যুদ্ধজাহাজটি ভাঙ্গার অধিকার কি আপনার আছে?)।

    (৩) কর্তৃপক্ষ। উদাহরণঃ ‘‘Municipal authority’’ (পৌর-কর্তৃপক্ষ)।

    (৪) বিশেষ জ্ঞানের অধিকারী ব্যক্তি; প্রামাণ্য বিশেষজ্ঞ। উদাহরণঃ ‘He is a great authority on Shakespeare’’ (তিনি শেইক্সপীয়ারের উপর বিশেষ জ্ঞানের একজন মহান অধিকারী)।

    উপরের চারটি অর্থ বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, এদের প্রথম তিনটিই ‘নেতৃত্ব’ সম্পর্কিত ধারণার অন্তর্গত। অর্থাৎ, একটি দলের মধ্যে নেতৃত্ব হচ্ছে দলটির কর্তৃপক্ষ যার রয়েছে নির্দেশনা দেবার, কাজ করার ও করিয়ে নেবার অধিকার।

    কিন্তু ‘অথোরিটি’র চতুর্থ অর্থটি, অর্থাৎ ‘বিশেষ জ্ঞানের অধিকারী’ হওয়া, সেটি নেতৃত্বের জন্য একটি বাড়তি গুণ হলেও অত্যাবশ্যকীয় নয়। তাই, একটি দলের জন্যে ‘নেতৃত্ব’র অতিরিক্ত ‘অথোরিটি’র উদ্ভব প্রত্যাশা করলে, সেখানে ‘বিশেষ জ্ঞানের অধিকারী’ ব্যক্তির আবির্ভাব হওয়া আবশ্যক।

    আলোচিত বিতর্কে যে-বিষয়গুলো স্পষ্ট করা দরকার, তাহলো প্রথমতঃ ‘অথরিটি’ কাকে বলে ও তার বস্তুনিষ্ঠ সংজ্ঞা কী? দ্বিতীয়তঃ ‘নেতৃত্ব’র সাথে ‘অথরিটি’র পার্থক্য কী? তৃতীয়তঃ ‘নেতৃত্ব’র অতিরিক্ত ‘অথরিটি’র উদ্ভব প্রয়োজন কেনো?

    তবে ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, একটি দলের অভ্যন্তরে একজন নেতা যখন বিশেষ ও মৌলিক জ্ঞানের ধারক হয়ে, বিদ্যমান জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা দূর করে, আমূল পরিবর্তনের নতুন পথ প্রদর্শক হিসেবে বিকশিত হন, তখনই তিনি দার্শনিক নেতা বা ‘অথরিটি’ হিসেবে উদ্ভূত হন। তাৎপর্য্যপূর্ণ হচ্ছে যে, এ-রূপ দার্শনিক নেতা শুধু নিজের দলেরই নয়, তিনি তাঁর দল ও দেশের সীমানা অতিক্রম করে বহু দেশের বহু দলের পথ প্রদর্শক হয়ে ওঠেন।

    সম্ভবতঃ রাশিয়ার সৌশ্যাল ডেমোক্র্যাটিক লেবার পার্টির বলশেভিক অংশের নেতা ভ্লাদিমির ইলিচ উলিয়ানভ লেনিন সে-রকমেরই একজন অথরিটি হয়ে উঠেছিলেন। কারণ, তিনি কার্ল মার্ক্স ও ফ্রেডারিখ এঙ্গেলসের পর রাশিয়াতে তো বটেই, সারা বিশ্বের সাম্যবাদী আন্দোলনের পথ প্রদর্শক হিসেবে বিকশিত হয়েছিলেন। কোনো কমিটী বসে সিদ্ধান্ত নিয়ে তাঁকে অথরিটি নির্বাচিত করেনি। মনে রাখতে হবে, যার জন্ম হয়, সে গর্ভ যন্ত্রণায় কাঁদে না।

    শনিবার, ১ সেপ্টেম্বর ২০১২
    নিউবারী পার্ক
    এসেক্স, ইংল্যাণ্ড
    masudrana1@gmail.com

     

আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন