• ‘এখানে মৃত্যু হানা দেয় বার বার’
    মাসুদ রানা

    আজ একটি ভারী রোববার। বেদনায় নীল, ক্ষুব্ধতায় লাল, তথাপি হতাশায় ধূসর রোববার। ইংল্যাণ্ডের খবরে আজ বলা হচ্ছে, গতকাল শনিবারে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার উপকণ্ঠে আশুলিয়াতে একটি পোশাক কারখানায় আগুনে পুড়ে মারা গিয়েছেন শতাধিক শ্রমিক। আগুনের হাত থেকে বাঁচতে মৃত্যু হতে পারে জেনেও জ্বলন্ত ভবনের উঁচু তলা থেকে লাফিয়ে পড়ে জীবন হারিয়েছেন প্রায় ডজন মানুষ। একই দিনে দেশটির বন্দর নগরী চট্টগ্রামের বদ্দারহাটে নির্মাণাধীন তথাকথিত উড়ালপুলের অংশ ভেঙ্গে পড়ে জীবন কেড়ে নিয়েছে ১৪ জন মানুষের।

    এই মৃত্যু কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগে সৃষ্ট নয়। এই মৃত্যু দেশটির নীতিহীন ব্যবস্থাপনায় মানুষের জীবনের মূল্যহীনতা থেকে সৃষ্ট। এর পেছনে আছে অনন্ত লোভ সম্বলিত মালিক শ্রেণীর নিয়ম না-মানার বেপরোয়া স্পর্ধা। কারখানার মালিক এবং উড়ালপুলের ঠিকাদার বিলিয়নপতি হয়েছেন সস্তায় ভাড়া-করা শ্রমিকের শ্রমে সৃষ্ট উৎপাদন ও নির্মাণ থেকে প্রাপ্ত উচ্চমূল্য নিজের পকেটস্থ করে।

    পোশাকে-আশাকে-দাবিতে এই মালিকেরা সভ্যতার দাবি করলেও এঁরা প্রচণ্ড অসভ্য। সভ্যতার সংজ্ঞা-উপলব্ধি তাঁদের কাছে সুদূর পরাহত। এঁরা বিত্ত-বলে বিশ্ব ঘুরে সভ্যতার ফলভোগ করেন, কিন্তু তার মর্ম বুঝতে পারেন না। সভ্যতার সূচক যেখানে সমাজ-সমষ্টিতে ব্যক্তি-মানুষের জীবনের মূল্য ও মর্যাদার প্রতিষ্ঠা, সেখানে তাঁরা ব্যক্তিগত মুনাফার লিপ্সায় সমষ্টি-জীবনকে দুর্বিসহ করে ও বিপদে ফেলে মূল্যহীন করে অসভ্যতার বিস্তার ঘটাচ্ছেন।

    বাংলাদেশে পোশাক কারখানায় আগুনে পুড়ে শ্রমিকের মৃত্যু নতুন নয়। নির্মাণ শিল্পে শ্রমিকের মৃত্যু নতুন নয়। সুকান্তের কবিতা থেকে শব্দ ধার করে বলতে পারিঃ ‘এখানে মৃত্যু হানা দেয় বার বার, লোকচক্ষুর আড়ালে এখানে জমেছে অন্ধকার।’

    এটি অসভ্যতার অন্ধকার। দুর্নীতি ও অনিয়মের অন্ধকার। এর ধারক হচ্ছেন মালিক শ্রেণী। আর মালিকদের পালক হচ্ছে রাষ্ট্র ও সরকার। আইনের রক্তচক্ষু এখানে অর্ধনিমিলিত। আইন রক্ষাকারী সেনা-সেপাইরা এখানে ভীরু নপুংসক। রাজনীতিকেরা এখানে দাসানুদাস। এর নামই হচ্ছে পুঁজিবাদ। অর্থাৎ, সবার উপরে পুঁজি ও মুনাফা এবং এর অধীনস্থ ও আজ্ঞাবহ সবকিছু।

    তাই, মুনাফার পরিমাণ বাড়াতে, পুঁজির শরীর বৃদ্ধি করতে গিয়ে মালিকেরা শ্রমিকদের নিরাপত্তার বিধি-বিধান অমান্য করেন। গতকাল আশুলিয়ায় তাজরীন ফ্যাশনের নয়-তলা ভবনের নিচতলায় আগুন লেগেছিলো। নির্গমনের পথ না পেয়ে শতাধিক শ্রমিক জীবন্ত দগ্ধ হয়েছেন। কেনো এমনটি হলো বা হতে পারলো, যা বার-বারই হয়ে আসছে? তার কারণ সবারই জানা। মালিকেরা শ্রমিকদের জন্য নিরাপদ শ্রমদানের উপযুক্ত স্থান সঙ্কুলান করেন না। কারণ, তাতে 'প্রোডাকশন কস্ট' বা উৎপাদন খরচ বেড়ে যায়। আর উৎপাদন খরচ বেড়ে গেলে লাভ কমে যায়। সুতরাং এর ভার বহন করবেন কে? ভার বহন করছেন শ্রমিকেরা। বার-বার আগুনে দগ্ধ হয়ে তাঁরা এই ভার বহন করে চলছেন। তারপরও তাঁরা নায্য মজুরি পান না। মানুষের মর্যাদা পান না। প্রতিবাদ করলে রাষ্ট্র এসে মালিকের পক্ষে গুলি চালায়। অমূল্য জীবন, মূল্য সৃষ্টিকরা শ্রমিকের জীবন রাস্তায় নিঃশেষিত হয়।

    এর কোনো প্রতিকার নেই। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাও এখানে ভোঁতা ও  সার্বভৌমত্ব রক্ষার আস্ফালন দুর্গন্ধময়। ধর্মবাদীরা বরাবরের মতোই মজলুমের বিপরীতে জুলুমের পক্ষে দালালী করছে, যেমনটি করেছে যুগে-যুগে ও একাত্তরে। শ্রমিক শ্রেণীর ‘মুক্তিকামী’ রাজনৈতিক দলের কমতি নেই, কিন্তু তাঁরা অথর্ব ও ক্লীব। মুখে বিপ্লবের বুলি আউড়ে বিপ্লবের স্বপ্ন দেখান তাঁরা, কিন্তু কারখানাতে শ্রমিকদের জীবন নিরাপদ করার মতো একটি কার্যকর সংগ্রাম গড়ে তোলার মুরোদ নেই তাঁদের। যাঁরা আঁধারে বিলীন বিপ্লবী, মাটির নিচ থেকে উঠে এসে যাঁরা শ্রেণী শত্রু খতমের নামে গ্রামে ত্রাস তৈরী করেন, তাঁদের কাছেও সম্ভবতঃ শ্রমিক-ঘাতক মালিক-শ্রেণী ‘শত্রু’ হিসেবে আবির্ভূত নন।

    সুকান্ত, তোমার দেখা সেই মৃত্যু এখনও বার-বার হানা দিয়ে চলেছে বাংলায়। কিন্তু ‘বার-বার’ মানে, আর কতো বার হানা দেবে? এই অন্ধকার জমতে জমতে আর কতো অন্ধকার হবে? তোমার কথিত ‘ভাঙ্গা ঘর ও ভাঙ্গা ভিটেতে জমেছে নির্জনতার কালো’, কারণ এখানে কোনো ‘জন’ বা প্রকৃত মানুষ নেই। যেনো সবাই অমানুষ। কিন্তু কে বলবে তোমার মতো উদ্বাত্ত কন্ঠে ‘হে মহামানব এখানে শুকনো পাতায় আগুন জ্বালো’?

    পাঁচ বছর কম এক শতাব্দী আগে এই নভেম্বর মাসেই শ্রমিক শ্রেণী রাষ্ট্র দখল করে মালিক শ্রেণীকে উচ্ছেদ করেছিলো রুশদেশে। তাই দেখে পৃথিবী উদ্বুদ্ধ হয়েছিলো। তুমি উদ্বুদ্ধ হয়েছিলে বাংলায়। আশা করেছিলে একজন মহামানবের আবির্ভাবের। কিন্তু সুকান্ত, তোমার বাংলায় সেই মহামানবের জন্ম এখনও পর্যন্ত হয়নি।

    তবুও তুমি বলতে পেরেছিলে, লিখতে পেরেছিলে, স্বপ্ন দেখতে পেরেছিলে। কিন্তু তোমার মতো আজ আর কাউকে বলতে শুনি নাঃ

    মৃত্যুর সমুদ্র শেষ; পালে লাগে উদ্দাম বাতাস
    মুক্তির শ্যামল তীর চোখে পড়ে, আন্দোলিত ঘাস।
    লেনিন ভূমিষ্ঠ রক্তে, ক্লীবতার কাছে নেই ঋণ,
    বিপ্লব স্পন্দিত বুকে, মনে হয় আমিই লেনিন।

    রোববার, ২৫ নভেম্বর ২০১২
    নিউবারী পার্ক
    এসেক্স, ইংল্যাণ্ড
    masudrana1@gmal.com

আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন