• ‘এ-মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ না’
    মাসুদ রানা

    মৃত্যুর হানা
    ২৪শে নভেম্বরের ভয়াল স্মৃতি মুছে যেতে না যেতেই, ২৪শে এপ্রিল এলো আবারও মৃত্যুর আঘাত নিয়ে। আবারও মৃত্যু শ্রমিকের! মৃত্যুর কারণ, আবারও সেই মালিকের লিপ্সা। আবারও মালিকের পক্ষাবলম্বন সরকারের। আবারও শোনা গেলো, শ্রমিক-স্বজনের হাহাকার। আবারও শোনা গেলো, মালিক-বান্ধব সরকার-প্রধানের মিথ্যাচার।

    ২৪শে নভেম্বর প্রায় দেড়শো শ্রমিকের প্রাণঘাতী তাজরিন ফ্যাশনের অগ্নিকাণ্ডের ব্যাপারে দেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পার্লামেণ্টে দাঁড়িয়ে দাবি করেছিলেন যে, মালিকদের ব্যবসায়িক ক্ষতি অর্থাৎ বিদেশী ক্রেতাদের বিমুখ করার জন্য এ-আগুন ষড়যন্ত্র করে লাগানো হয়েছে। তিনি বলেছিলেনঃ

    ‘এটা কোনো অ্যাকসিডেন্ট নয়, পরিকল্পিত ঘটনা। যখন বায়াররা আসে, কনট্রাক্ট সই করা হয়, তখনি এই ঘটনা ঘটানো হল।’

    স্পষ্টতঃ তিনি মালিকের পক্ষ অবলম্বন করলেন এবং শ্রমিক ও মালিক উভয়ের অভিন্ন শত্রু  হিসেবে কোনো একটি শক্তির প্রতি আঙ্গুল নির্দেশ করলেন।

    আজ ২৪শে এপ্রিলের রানা প্লাজার বিধ্বস্তির ফলে প্রায় প্রায় তিনশো শ্রমিকের মৃত্যুর পর আবারও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মালিকের সাফাই গাইলেন। এবার তিনি সরাসরি খোদ শ্রমিকদেরকেই তাঁদের মৃত্যুর কারণ বলে নির্দেশ করলেন। শেখ হাসিনা বললেনঃ

    ‘আমরা আগে থেকেই সচেতন ছিলাম। আমরা জানতাম বলে সব লোক সরিয়ে ফেলা হয়েছিল। কিন্তু মূল্যবান জিনিস সরিয়ে নিতে সকালে লোকজন সেখানে গিয়েছিলো।’

    অথচ বেঁচে-যাওয়া আহত শ্রমিকেরা বলছেন, গতকাল ভবনে ফাটল দেখা যাবার পর আজ তাঁরা কাজ করতে অস্বীকৃতি জানালে, মালিক পক্ষ শ্রমিকদেরকে কাজের জন্য ভবনে প্রবেশ করতে বাধ্য করে। কিন্তু শ্রমিকের কথা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে সত্য হিসেবে গণ্য হয়নি। সত্য হিসেবে বিবেচিত হয়েছে মালিকের কথা।

    ২৪শে নভেম্বরে তাজরিন ফ্যাশনের অগ্নিকাণ্ডের পর সহসা আমার অনুভূতিতে এসেছিলেন সুকান্ত ভট্টচার্য তাঁর বেদনাক্লিষ্ট উচ্চারণ নিয়েঃ

    এখানে মৃত্যু হানা দেয় বারবার;
    লোকচক্ষুর আড়ালে এখানে জমেছে অন্ধকার।
    এই যে আকাশ, দিগন্ত, মাঠ স্বপ্নে সবুজ মাটি
    নীরবে মৃত্যু গেড়েছে এখানে ঘাঁটি;

    এখানে মৃত্যু হানা দেয় বারবার’ শিরোনামে লিখেছিলাম আমার ‘নীল’ বেদনার কথা, ‘লাল’ ক্ষুব্ধতার কথা, ‘ধূরস’ হতাশার কথা। কিন্তু আজ ২৪শে এপ্রিলের রানা প্লাজায় মৃত্যুর বিভীষিকা লক্ষ্য করে আর প্রধানমন্ত্রীর মিথ্যাচার শুনে আমার অনুভূতিতে প্রবল চিৎকারে বলছেন নবারুণ ভট্টচার্যঃ

    ‘এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ না
    এই জল্লাদের উল্লাসমঞ্চ আমার দেশ না
    এই বিস্তীর্ণ শ্মশান আমার দেশ না
    এই রক্তস্নাত কসাইখানা আমার দেশ না।’

    মৃত্যু উপত্যকা
    বারবার শ্রমিকের মৃত্যু ও সরকারের মিথ্যাচারের ঘটনা থেকে এ-সত্যই বেরিয়ে আসে যে, শ্রেণী-বিভক্ত সমাজে সরকার কখনও সমগ্র জনগণের হয় না। ‘গভর্নমেন্ট ফর দ্য পিওপল, ফর দ্য পিওপল, বাই দ্য পিওপল’, এ-দাবি মিথ্যা। শ্রেণী-বিভক্ত সমাজে ও দেশে সরকার ও রাষ্ট্র মানেই হচ্ছে কোনো না কোনো শ্রেণীর সরকার ও রাষ্ট্র।

    বিয়াল্লিশ বছর আগে বাংলাদেশ নামে যে প্রজাতন্ত্রটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তার প্রতিষ্ঠা-কালীন প্রতিশ্রুতিতে - সংবিধানে, লিখিতভাবে -  বলা হয়েছিলো, এ-রাষ্ট্রের চার মূল স্তম্ভ হচ্ছে জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র, ও সমাজতন্ত্র। কিন্তু এ-প্রতিশ্রুতি ছিলো মিথ্যা।

    যুদ্ধের মধ্য দিয়ে দরিদ্র শ্রেণীর মধ্যে বিকশিত আকাঙ্খার সামনে মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে সদ্য স্বাধীন রাষ্ট্রটিকে উঠতি ধনিক-বণিক শ্রেণী কুক্ষিগত করেছিলো। তাই তিন বছরের মধ্যেই সংবিধানের চার স্তম্ভের চারটিকেই বিধ্বংসিত করেছিলেন উঠতি সে-ধনিক শ্রেণীর স্বার্থরক্ষাকারী সরকার।

    শুরু থেকেই লক্ষ্য করি, ‘জাতির পিতা’ হিসেবে পরিচিত শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালী জাতির ধর্মনিরপেক্ষ পরিচয়কে ভূলুন্ঠিত ও অপমানীত করে বাংলাদেশকে ইসলামিক পরিচয়ে বিশ্বের দরবার পরিচিত করিয়েছিলেন। এটি তিনি করেছিলেন ১৯৭৪ সালে পাকিস্তানে অনুষ্ঠিত ইসলামিক সম্মেলনে যোগ দিয়ে এবং বাংলাদেশকে ইসলামিক সম্মেলন সংস্থার সদস্য করে। লাহোর বিমানবন্দরে অবতরণ করে তিনি বাঙালী নিধক টিক্কা খানের সাথে করমর্দন এবং বাঙালী ঘৃণক জুলফিকার আলি ভূট্টোর সাথে শুভেচ্ছা চুম্বন বিনিময় করেছিলেন।

    শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন বাংলাদেশে গণতন্ত্রের প্রথম হন্তারক। তিনি গণতন্ত্রকে নিজ হাতে হত্যা করেছিলেন ১৯৭৫ সালে সমস্ত রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ ও একদলীয় শাসন ব্যবস্থা বাকশাল-কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে।

    তাঁর শাসনামলেই একদিকে দুর্ভিক্ষে মানুষের অমানবিক মৃত্যু এবং অন্যদিকে মুষ্টিমেয় লোকের লুটপাট ও দুর্নীতির পৃষ্টপোষকতা শুরু হয়েছিলো। রাষ্ট্র ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে এবং স্বজাতির নিঃস্ব ও দরিদ্র শ্রেণীর মানুষকে শোষিত ও বঞ্চিত করার মধ্য দিয়ে মুষ্টিমেয় লোকের বিত্তবান হওয়ার প্রক্রিয়া তাঁর শাসনামল থেকেই শুরু হয়েছিলো।

    তিনিই প্রথম আইন বহির্ভূতভাবে রাজনৈতিক শত্রুকে ‘ক্রসফায়ারে’ হত্যা করিয়েছিলেন। সিরাজ সিকদারকে হত্যা করিয়ে তিনি পার্লামেন্টে ঔদ্ধত্য উচ্চারণে বলেছিলেন, ‘আজ কোথায় সিরাজ সিকদার!’

    পরবর্তী একনায়কেরা - জিয়াউর রহমান, হোসেইন মুহাম্মদ এরশাদ - এবং গণতন্ত্রের ছদ্মনামে পালা-ক্রমে খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনার পরিবারতান্ত্রিক সরকারগুলো শেখ মুজিবুর রহমানের ধারাকে অব্যাহত রেখেছেন। এ-পর্যবেক্ষণ বস্তুনিষ্ঠ ও প্রমাণযোগ্য। এখানে বিশ্বাসের কোনো বিষয় নেই। কারণ, এগুলো ইতিহাসের ঘটনা।

    নিঃস্ব শ্রেণীর নিঃস্বতা
    এটিও বস্তুনিষ্ঠ পর্যবেক্ষণ যে, বাংলাদেশের শ্রমিক ও নিঃস্ব শ্রেণীর রাজনৈতিক দল নেই, যদিও অনেক দলই নিজেদেরকে গরীব মানুষের দল, সর্বহারা শ্রেণীর দল, এমনকি সর্বহারা শ্রেণীর বিপ্লবী দল বলেও দাবি করে থাকে। শব্দে ও বাক্যে যা-ই দাবি করা হোক না কেনো, তাতে এ-সত্যের তারতম্য হয় না যে, শ্রমিক শ্রেণীর লোকদের নিয়ে এ-দলগুলো গঠিত নয়। এ-দলগুলোর কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব থেকে শুরু করে তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত, কোথাও কোনো নিঃস্ব শ্রেণীর নেতৃত্ব নেই। দলের 'কম্পোজিশন' বলতে যা বুঝায়, তার মধ্যে শ্রমিক শ্রেণী কিংবা দরিদ্র শ্রেণীর মানুষ নেই।

    কেনো নেই? তার উত্তরে দলের নেতারা বলেন, এটি হচ্ছে ঐতিহাসিক সীমাবদ্ধতা। লেনিনের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়, শ্রমিক শ্রেণীর মধ্যে শিক্ষা-দীক্ষা-জ্ঞান-বুদ্ধির অভাবের কারণে শ্রেণী-চেতনা তাঁদের ভেতর থেকে আসে না। আসে বাইরে থেকে - অর্থাৎ, মধ্যবিত্ত শ্রেণী থেকে। কিন্তু তাঁরা এ-সত্যটি পর্যবেক্ষণ করেন না যে, লেনিন শ্রমিক শ্রেণীর অগ্রগামী বাহিনীর দল তৈরী করতে চান বলেই, তাঁর দলের 'কম্পোজিশন' দ্রুত শ্রমিক প্রধান হয়ে ওঠে। এ-দলের কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত নেতৃত্বে সমাসীন হন অগ্রগামী শ্রমিকগণ। লেনিনের জীবদ্দশায়ই শ্রমিকের ছেলে শ্রমিক জোসেফ স্ট্যালিন দলের শীর্ষ নেতা হয়ে ওঠেন।

    সুতরাং আমরা লক্ষ্য করি, লেনিন স্বয়ং শ্রমিক শ্রেণী থেকে না এলেও, তিনি বিশ্বাস করেন যে, রুশ জাতি-জাতি-সহ সমগ্র মানবজাতির শোষণ-বঞ্চনা-দুঃখ নিরসনের জন্য ও মানব-সভ্যতাকে এগিয়ে নেবার জন্য শ্রমিক শ্রেণীর নেতৃত্বাধীন বিপ্লব করতে হবে। তিনি বিশ্বাস করেন শ্রমিক শ্রেণীর কর্তৃত্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেই পুঁজিবাদী শোষণ ও নিপীড়নের অবসান ঘটাতে হবে। তাই, লেনিন তাঁর দলের কম্পোজিশন ও নেতৃত্ব সেভাবেই গড়ে তোলেন।

    লেনিন তাঁর বিখ্যাত এপ্রিল থিসেসে এক এক করে ১০টি পয়েন্টে স্পষ্ট ঘোষণা করেন যে, জারতন্ত্র (সামন্ত রাজতন্ত্র) উৎখাতের মধ্য দিয়ে রাশিয়াতে ধনিক-বণিক শ্রেণীর প্রতিনিধি কেরনস্কির সরকার শ্রমিক-দরদী কর্মসূচি হাজির করলে, বিপ্লবী শ্রমিকদের কর্তব্য হচ্ছে ধনিক-বণিক শ্রেণীর নেতৃত্ব না মেনে রাষ্ট্র ক্ষমতা নিজেদেরই দখল করা। সেদিন লেনিনের কথার যুক্তি বুঝতে স্ট্যালিনেরও দীর্ঘ ১০ দিন লেগেছিলো। কিন্তু তরুণ ও বিপ্লবী শ্রমিকেরা তাৎক্ষণিকভাবেই লেনিনের কথার মর্ম বুঝতে পেরেছিলেন। শ্রমিক শ্রেণীর সাথে বোধে-বুদ্ধিতে-আবেগে-আচরণে সম্পূর্ণ একাত্ম লেনিন শ্রমিক শ্রেণীর সচেতন অংশের সমর্থনে তাঁর এপ্রিল থিসিস তাঁর দলের ভিতরে প্রতিষ্ঠিত করে বিপ্লব সম্পন্ন করেছিলেন।

    কিন্তু বাংলাদেশে আমরা কী দেখছি? আমরা দেখছি লেনিনের নামে লেনিনের শত্রু, শ্রমিকের নামে শ্রমিকের শত্রু মধ্যবিত্ত নেতৃত্ব তথাকথিত দেশপ্রেম ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার নামে বাংলাদেশের লুটেরা ধনিক-বণিক শ্রেণীর দল আওয়ামী লীগের একটি বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক ফ্রন্টে পরিণত হয়েছে। রাজনৈতিক ভাষায় এঁদেরকে ধনিক-বণিক শ্রেণীর সেবাদাস বলা যুক্তিসঙ্গত। এটিও কোনো বিশ্বাসের বিষয় নয়। ইতিহাস থেকে প্রমাণিত।

    ভ্রান্ত তত্ত্বের পরিণতি
    বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি তাত্ত্বিকভাবে বিশ্বাস করে যে, জাতীয় ধনিক-বণিক শ্রেণীর মধ্যে একটি অংশ আছে যা প্রগতিশীল। বাংলাদেশের কমিউনিস্টরা এই প্রগতিশীলদেরকে সাথে নিয়ে সমাজতন্ত্র গড়তে চায়। তাই, তারা ১৯৭৫ সালে নিজেদের কমিউনিষ্ট পার্টি বিলুপ্ত করে দিয়ে স্বৈরশাসক শেখমুজিবুর রহমানের ফ্যাসীবাদী দল বাকশালে যোগ দিয়েছিলো। শুধু তাই নয়, পরবর্তী স্বৈরশাসক জিয়াউর রহামান যখন তাঁর তথাকথিত খালকাটা বিপ্লব শুরু করলেন, তখনও এই কমিউনিস্ট পার্টি সেখানে ‘প্রগতি’ লক্ষ্য করে লেনিনবাদী বিপ্লবের আয়োজন ছেড়ে রহমানবাদী খালকাটা বিপ্লবে আত্মনিয়োগ করে। কমিউনিষ্ট নাম নিয়েও তাঁরা কেনো তা করতে পারে? এর বস্তুনিষ্ঠ ও প্রমাণযোগ্য উত্তর হচ্ছে এই যে, নামে কমিউনিষ্ট হলেও এ-দলটি শ্রমিক কম্পোজিশনের ও শ্রমিক নেতৃত্বের দল নয়। এর বাইরে যে তাত্ত্বিক ও দার্শনিক সীমাবদ্ধতা আছে, সেটি সাবজেক্টিভ এবং তর্ক সাপেক্ষ।

    তত্ত্বগতভাবে জাসদ ও বাসদ আদিতে বাংলাদেশের ধনিক-বণিক শ্রেণীর মধ্যে কোনো প্রগতিশীল অংশ দেখতে না পেলেও, পরবর্তীতে দেখতে শুরু করেছে। ১৯৮০ সালে এ-দেখার ভিত্তিতে জাসদ ভাগ হয়ে বাসদ হয়েছিলো। জাসদ একাধিক বিভক্তির ফলে আলাদাভাবে আ স ম রব, শাহজাহান সিরাজ ও হাসানুল হক ইনুর নেতৃত্বে অন্ততঃ তিন টুকরো হয়েছে এবং এর প্রতিটি টুকরোরই শীর্ষ নেতৃত্ব শেষ পর্যন্ত তাঁদের দেখা ধনিক-বণিক শ্রেণীর প্রগতিশীলদের সাথে যোগ দিয়ে মন্ত্রী হয়ে ইতিহাসে আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হয়েছে।

    ১৯৮০ সালে বাসদ গঠিত হবার পর তার আদি তত্ত্ব খানিকটা অস্বচ্ছতার মধ্যে একভাবে বজায় রেখেছে বলে মনে হলেও সম্প্রতি এর প্রকৃত রূপ স্পষ্টতর হয়ে উঠেছে। গত জুলাই মাসে কমিউনিষ্ট পার্টির সাথে ঐক্যবদ্ধ কর্মসূচি ঘোষণা করার মধ্য দিয়ে তার চরিত্র স্পষ্ট করেছে। বাসদ এবার খোলাখুলি লেফট-লিবারেল ঐক্যের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে ক্ষমতায় যাবার কথা বলছে। অর্থাৎ, বাসদ ও কমিউনিষ্ট পার্টির মতো বাংলাদেশের ধনিক-বণিক শ্রেণীর মধ্যে একটি ‘প্রগতিশীল’ ও ‘দেশপ্রেমিক’ অংশ দেখতে পাচ্ছে এবং এদের সাথে মৈত্রী তৈরী তথা আত্ম-সমর্পণ করার জন্যে এ-দলটির মধ্যবিত্ত শ্রেণীচেতনা অস্থির হয়ে উঠেছে। বাসদও জাসদের ঐতিহাসিক পরিণতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

    বাংলাদেশে শ্রমিক শ্রেণীর নামে অন্যান্য যে দল আছে সেগুলোও মোটামুটি একই কম্পোজিশন ও নেতৃত্বের এবং এদের মধ্যে দৃশ্যমান যেগুলো রয়েছে, তাদেরও একই পরিণতি। বাংলাদেশের সাম্যবাদী দল দিলীপ বড়ুয়ার নেতৃত্বে মন্ত্রীত্ব গ্রহণের মধ্য দিয়ে আমার জাসদীয় পরিণতি বরণ করেছে। রাশেদ খান মেননের নেতৃত্বে ওয়ার্কার্স পার্টিও আওয়ামী লীগের কাছে নতি স্বীকার করেছে। রাশেদ খান মেনন নিজে মন্ত্রী না হলেও মন্ত্রী-সম সুবিধা ভোগ করে কী করছেন, তা দেশবাসী জানেন।

    ঔপনিবেশিক যুগে শ্রমিক শ্রেণীর নামে গড়ে ওঠা মধ্যবিত্ত দলগুলো শ্রমিক শ্রেণীর মধ্যে যতোটুকু আন্দোলন গড়ে তুলতে পেরেছিলো, তা মর্মের দিক থেকে বস্তুতঃ ঔপনিবেশকতার বিরুদ্ধে মধ্যবিত্ত উপাদান নিয়েই গড়ে উঠেছিলো। কিন্তু, বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর বাঙালী ধনিক-বণিক শ্রেণী রাষ্ট্র-ক্ষমতায় আসীন হবার কারণে, সে-দলগুলোর মধ্যবিত্ত শ্রেণীজাত নেতৃত্বের আকাঙ্খা জাতীয় রাষ্ট্রের মধ্যেই পূর্ণ হতে চাইলো। মেনন, বড়ুয়া, ইনু, রব, সিরাজ প্রমুখ বিপ্লবীদের আজকের এই পরিণতির কারণ তাঁদের ব্যক্তিগত চরিত্রের মধ্য দিয়ে ব্যাখ্যা করা যাবে না; করলে তা বৈজ্ঞানিক হবে না। এর উত্তর পেতে হবে তাঁদের রাজনৈতিক তত্ত্ব ও চর্চার মধ্যে, তাঁদের দলের কম্পোজিশন, ওরিয়েণ্টেশন ও প্রোগ্রামের মধ্যে।

    ভীষণ বৈপরীত্য
    বাংলাদেশে শ্রমিক শ্রেণীর বিপ্লবী দল নেই বলে আমরা লক্ষ্য করলাম ২৪ নভেম্বরে ঢাকার আশুলিয়ার তাজরীন ফ্যাশনের কারখানায় অগ্নিদগ্ধ হয়ে প্রায় দেড়শো শ্রমিকের মৃত্যুর পর 'শ্রমিক শ্রেণীর দল' নামের দলগুলোর কোনোটিই রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে দ্বন্দ্বে প্রবৃত্ত হলো না। এ-দলগুলো শোক, প্রতিবাদ, মালিকের গ্রেফতার, দোষী ব্যক্তির শাস্তি, ইত্যাদি শ্রমিক শ্রেণীর বিপ্লবী চেতনাহীন কথাবার্তা বলে দুয়েকটি মিছিল করে কর্তব্য শেষ করলো। শ্রমিকেরা কারখানার ফটকে রাষ্ট্রের পুলিসের সাথে খানিকটা লড়ে আপাততঃ পরাজয় মেনে নিলো। কারণ, এখনও পর্যন্ত তাঁরা তাঁদের নিজস্ব দলের জন্ম দিতে পারেনি। মধ্যবিত্তের ভান-করা দলগুলোকেই তাঁরা অসচেতনার কারণে নিজেদের দল মনে করে। আর, এই ভুলের কারণেই তাঁরা লড়াইটাই শুরু করতে পারছেন না। স্বতস্ফূর্ততার মধ্য দিয়ে যে লড়াইগুলো সূচিত হয়, সেগুলোকে ধারণ করে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয় না শ্রমিক শ্রেণীর বিপ্লবী দলের অভাবে।

    নিজেদেরকে 'শ্রমিক শ্রেণীর বিপ্লবী দল' বলে দাবি করা দলগুলো নভেম্বরে শ্রমিকদের মৃত্যুতে দেশ-কাঁপানো আন্দোলনের কর্মসূচি না দিলেও ডিসেম্বরে এসে এ-দলগুলোর নেতারা রাজাকারদের ‘ডরতালের বিরুদ্ধে জনগণের হরতাল’ কর্মসূচি ঘোষণা করলেন। তাঁরা ধনিক-বণিক শ্রেণীর অপ্রগতিশীল অংশ তথা জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করার দাবিতে হরতাল করলেন ১৮ ডিসেম্বর। তাঁদের কথার সাথে পার্লামেণ্টে বলা আওয়ামী লীগের সদস্য তোফায়েল আহমেদের সাথে হুবহু মিলে গেলো। এমপি তোফায়েল আহমেদের মতো বাসদ-সম্পাদক খালেকুজ্জামানও ঘোষণা করলেন, অন্ততঃ রাষ্ট্রের পুলিস ও সম্পত্তির উপর যুদ্ধভঙ্গিতে আক্রমণ করার অপরাধে জামায়াতকে নিষিদ্ধ করা প্রয়োজন। বিপ্লবীদের পালিত হরতালে সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী খুশি হয়ে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করলেন এবং বললেন, হরতাল করলে এভাবেই করা উচিত।

    আমরা লক্ষ্য করলাম, ১৯১৭ সালে সংঘটিত বিশ্বের প্রথম বিজয়ী শ্রমিক-বিপ্লবের মাস নভেম্বরে বাংলাদেশে দেড়শো শ্রমিকের মৃত্যু ‘শ্রমিক শ্রেণীর একমাত্র বিপ্লবী দল’-এর নেতা খালেকুজ্জামানকে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কোনো কর্মসূচি গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করলো না। অথচ ১৯৭১ সালে সংঘটিত বাঙালী জাতীয় বুর্জোয়া বিপ্লবের বিজয়ের মাস ডিসেম্বরে কেনো জামায়াত হরতাল ডাকার স্পর্ধা খালেকুজ্জামানকে সহজেই হরতাল কর্মসূচি ঘোষণা করতে অনুপ্রাণীত করলো। এ-থেকেই বুঝা যাচ্ছে শব্দে ও বাক্যে শ্রমিক শ্রেণীর কথা বললেও এ-দলগুলো শ্রমিক শ্রেণীর দল নয়।

    বাংলাদেশে রহমানিজমের বিরুদ্ধে একটি তাহরির স্কোয়ার প্রকারের আন্দোলন গড়ে ওঠার সম্ভবনা আমার মতো একজন সাধারণ মানুষ বুঝতে পারলেও বাংলাদেশের অসাধারণ বিপ্লবীরা কেনো বুঝতে পারলেন না? তাঁরা যদি বুঝতে পারতেন এবং তাঁরা যদি সত্যি শ্রমিক শ্রেণীর প্রতি একাত্ম হতেন বোধে-বুদ্ধিতে-আবেগে-আচরণে, তাহলে তাঁরা সেই তাহরির স্কোয়ার বা শাহবাগ স্কোয়ার সেই নভেম্বর মাসেই তৈরী করতে পারতেন। কিন্তু তা তাঁরা করেননি।

    লক্ষ্য করি, ২৪ এপ্রিল যখন আড়াই শতাধিক শ্রমিকের মৃত্যু হলো মালিকের মুনাফার লিপ্সার কারণে এবং সরকার যখন সে-ঘটনা সম্পর্কে মিথ্যা প্রচার করছে, তখনও শ্রমিক শ্রেণীর বিপ্লবী বলে দাবিদার দলগুলো সেই একই অশ্রমিক ও অবিপ্লবী দাবি নিয়ে খণ্ড মিছিল করছে। নেতারা সম্ভবতঃ নিজেদের মধ্যবিত্ত শ্রেণীগত সীমাবদ্ধতার কারণে বুঝতে পারছেন না যে, ধনিক-বণিক শ্রেণী ও সরকারের বিরুদ্ধে শ্রমিক ও নিঃস্ব শ্রেণীসমূহের বিপ্লবী কর্মসূচি ঘোষণা ছাড়া তাঁরা বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি প্রগতিশীল পরিবর্তন আনতে পারেন না। এ-মহূর্তে বাংলাদেশে যে-রাজনৈতিক অচলাবাস্থা চলছে, সেখানে একমাত্র শক্তিশালী শ্রমিক আন্দোলনের একটি জোয়ারের মাধ্যমে গণ-অভ্যূত্থান সৃষ্টি করে প্রগতিশীল পরিবর্তন আনা সম্ভব।

    (শ্রমিক জাগরণের একটি রূপরেখা আগামী কাল উপস্থাপন করা হবে)

    বৃহস্পতিবার, ২৫ এপ্রিল ২০১৩
    নিউবারী পার্ক
    এসেক্স, ইংল্যাণ্ড

পাঠকের প্রতিক্রিয়া

বস্তুনিষ্ঠ লেখা । সঠিক দ্বন্দবাদী মূল্যায়ন । শুভেচ্ছা রইল । পরবর্তী পদক্ষেপের রূপরেখার অপেক্ষায় রইলাম।

মাসুদ রানাকে বিশেষ ধন্যবাদ খুবই চমৎকার ভাবে একেবার প্রকৃ্ত্য সত্য তুলে ধরার জন্য।
বর্তমানে বাংলাদেশের বাম রাজনীতির একটা বড় অংশ সংশোধনবাদীদের দখলে। যারা কেবল কথায় ও নামে বিপ্লবী , কাজের বেলায় তারা শ্রমিকশ্রেণীকে বাদ দিয়ে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে বুর্জোয়া শ্রেণীকেই উর্দ্ধে তুলে ধরে... কিন্তু এদের বাহিরে যে সত্যিকার অর্থেই শ্রমিকশ্রেণী স্বার্থে কাজ করতে চায় এমন সংগঠন বা লোক নেই এমন বলাটা বোধহয় অবিচার করা হয়... স্বীকার করছি তাদের মাঝে অনেক ভূল হয়ত রয়েছে... তাদের শক্তি সামর্থ্য ও নিতান্তই কম। কিন্তু একটা বিষয় ঠিক যে তারা সর্বহারা শ্রেনীর প্রতি মতাদর্শগত ভাবে সৎ এবং তারা সর্বহারা বিপ্লবের স্বপক্ষের শক্তি। এই ছোট ছোট শক্তি গুলো এখনো অনেক বিক্ষিপ্ত, এমন কি অনেকেই কোন সংগঠনের সাথেও নেই, তাই এদের অনেক দুর্বল মনে হয়। যদি বিপ্লবের স্বপক্ষের এই বিক্ষিপ্ত শক্তি সমূহকে একত্রিত করা যায় তবে তা একটি বড় শক্তি হিসেবে দাড় হওয়ার উজ্জ্বল সম্ভাবনা রয়েছে। যা জনগনকে ঐক্যবদ্ধ করতে, এবং ওইসব সংশোধনবাদীদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম গড়ে, সঠিক বিপ্লবী শক্তিকে সংহত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে। আমি মনে করি আমাদের এখন এ চেষ্টাই করা উচিত এবং নিজ নিজ জায়গা থেকে এগিয়ে আসা উচিত।

লেখাটা পড়ে দেখবেন আশাকরি।
হায় কমিউনিস্ট পার্টি হায় বিপ্লব
আবির হাসান
http://rafpata.blogspot.com/2012/02/blog-post.html

TV দেখতে পারছি না, পত্রিকা পড়তে পারছি না। অসম্ভব রাগ, ঘৃণা আর কিছু না করতে পারার যন্ত্রণায় শরীর রি রি করে। ধন্যবাদ অসাধারণ এই লেখাটার জন্য। কান্না ছাড়া আমাদের কি আর করার আছে বল!

আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন