• ‘নির্লোভ’ সেলিমের নির্বোধ শ্রেণী-সংগ্রাম
    মাসুদ রানা

    বাংলাদেশের ‘দৈনিক কালের কণ্ঠ’ পত্রিকা গত ১০ই মার্চ “নির্লোভ মানুষ মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম” শিরোনামে একটি সাক্ষাতকার প্রকাশ করেছে, যা আমি ফেইসবুকের কল্যাণে আজই পাঠ করলাম। মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম হলেন বাংলাদেশের কমিউনিষ্ট পার্টির কেন্দ্রীয় সভাপতি। (http://www.kalerkantho.com/print-edition/4th-anniversary-special-copy/20...)

    সাক্ষাতকারটিতে সেলিমের রাজনৈতিক-দার্শনিক উপলব্ধির উল্লেখ ও উদ্ধৃতি-সহ প্রকাশিত হয়েছে তাঁর রাজনীতিতে যুক্ত হওয়া, বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি অধ্যয়ন, হবু স্ত্রীর কাছে ভরণ-পোষণ দাবী করে তাঁর বিয়ে-বন্ধন, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ ইত্যাদি বিষয়ে ‘তথ্য’।

    মুজাহিদুল ইসলাম সেলিমের প্রতি ব্যক্তিগত সমস্ত শ্রদ্ধা অটুট রেখে ইতিহাসের স্বার্থে আমাকে কয়কটি প্রশ্ন করতেই হচ্ছে। আমি আশা করবো সংশ্লিষ্ট সবাই বিষয়টিকে কোনোভাবেই বঙ্কিমার্থে নেবেন না।

    ‘কালের কণ্ঠ’র পক্ষ থেকে সাক্ষাতকারটি নিয়েছেন বাংলাদেশের ধীমান ও নিষ্ঠাবান সাংবাদিক আরিফুজ্জামান তুহিন। আমি বিশ্বাস করি তিনিও আমার প্রশ্নকে নৈর্ব্যক্তিকভাবে বিবেচনা করবেন এবং উত্তর অনুসন্ধানে তৎপর হবেন।

    মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম সম্পর্কে ‘কালের কণ্ঠ’র প্রকাশিত তথ্যের যে-অংশটুকু আমার মধ্যে অদম্য জিজ্ঞাসার সৃষ্টি করেছে, তা হচ্ছেঃ

    "ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কালরাতে প্রতিরোধ যুদ্ধে তিনি ছিলেন সবার আগে। 'মুক্তি না হয় মৃত্যু'- এই স্লোগান নিয়ে তিনি চলে যান ভারতে।"

    উপরের ‘তথ্য’র প্রেক্ষিতে আমার প্রথম প্রশ্ন হচ্ছেঃ ১৯৭১ সালে ২৫ শে মার্চের মধ্যরাতে যখন পাকিস্তানী সেনাবাহিনী ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-বিদ্যার্থী-কর্মচারীদের ওপর গণহত্যা পরিচালিত করে, তখন কি সেখানে কোনো প্রতিরোধ যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিলো?

    ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ঊনিশশো আশির দশকের ছাত্র হিসেবে, তার আগের দশকে সংঘটিত মুক্তিযুদ্ধে এই বিদ্যাপীঠের ভূমিকা সম্পর্কিত আমি যতো কথিত-মুদ্রিত-চিত্রিত প্রামাণ্য বিবরণ শুনেছি-পড়েছি-দেখেছি, তাতে এর কোনো উল্লেখ পাইনি। তাই, আমার স্বাভাবিক সম্পূরক প্রশ্ন হচ্ছেঃ কালের কণ্ঠের ‘২৫ শে মার্চের কালরাতের প্রতিরোধযুদ্ধ’র ঘটনাটি কোথা থেকে এলো?

    আমি বাংলাদেশের বাইরে আছি গত ২৪ বছর। এমনও হতে পারে যে, এর মধ্যে নতুন তথ্য উদঘাটিত হয়েছে, যা আমি জানি না। তাই সম্ভাব্য অজ্ঞতা মেনে নিয়েই প্রশ্নটা জীবন্ত রাখলাম। আশা করি সাক্ষাতাকারের যে-কোনো পক্ষ এর উত্তর দেবেন।

    দ্বিতীয়তঃ কথিত সেই প্রতিরোধ-যুদ্ধে মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম “সবার আগে” ছিলেন দাবীটি প্রথম দাবীটির সত্যতার ওপর নির্ভরশীল। তাই, প্রথম দাবী যদি সত্য হয়, তাহলে প্রশ্ন হবেঃ তিনি কি ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চের সেই কালোরাতে সবার আগে থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিরোধ যুদ্ধ গড়ে তুলেছিলেন?

    তিনি যদি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিরোধ-যুদ্ধে সবার আগে থেকে থাকন, তাহলে মোটামুটি বুঝতে হবে তিনি সারা দেশের মধ্যে প্রথম প্রতিরোধ যোদ্ধা। কারণ, আক্রমণটা প্রথম শুরু হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। তাই, এখানেও একটি সম্পূরক প্রশ্নঃ এ-দাবী এতোদিন করা হয়নি কেনো?

    তৃতীয়তঃ “ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কালরাতে প্রতিরোধযুদ্ধে তিনি সবার আগে” ছিলেন দাবী করে, পরের বাক্যেই বলা হলো, “'মুক্তি না হয় মৃত্যু'- এই স্লোগান নিয়ে তিনি চলে যান ভারতে।”

    প্রকৃত প্রস্তাবে, এখানে আমার কোনো প্রত্যক্ষ প্রশ্ন নেই। কারণ, আমি দু’টো বাক্যের আলাদা অর্থ বুঝলেও, তাদের মিশ্র অর্থ উদ্ধার করতে পারছি না, যেমন কোনো দিন পারিনি “ঘোড়ায় চড়িয়া মর্দ হাঁটিয়া চলিল, কিছু দূর যাইয়া মর্দ রওনা হইল” কথার অর্থোদ্ধার। তাই, আমার পরোক্ষ প্রশ্নটি হচ্ছে এটি কি ঐ মর্দের বিবরণের মতো বিশিষ্ট ভাষাগত প্রকাশ?

    চতুর্থতঃ ‘কালের কণ্ঠ’ মুজাহিদুল ইসলাম সেলিমকে সাম্যবাদের ভবিষ্যত সম্পর্কে কিছু প্রশ্ন করে। উত্থাপিত প্রশ্নসমূহের একটির উত্তরে সেলিম “মৃদু হেসে” একটি তাত্ত্বায়ন করে বলেনঃ

    “একদিন অবশ্যই পৃথিবীতে সাম্যবাদ আসবে। শ্রেণীহীন সমাজ আসবেই। যত দিন শ্রেণী থাকবে, তত দিন শ্রেণীর বিরুদ্ধে লড়াই থাকবে, শ্রেণীহীন সমাজের লড়াইও তত দিন থাকবে। বিপ্লব আসবেই।”

    'কালের কণ্ঠ'র পাতায় উদ্ধৃতি চিহ্নের মধ্যে মুদ্রিত উপরে কথাগুলো মুজাহিদুল ইসলামের কথা হিসেবেই আমাকে ধরতে হবে। আর তার ভিত্তিতে আমার প্রশ্ন হচ্ছেঃ “শ্রেণীর বিরুদ্ধে লড়াই থাকবেই” কথাটার মানে কী?

    উত্তর আশা করছি। তবে প্রশ্নটিকে ঋদ্ধ করার স্বার্থে বলি, উপরে উল্লেখিত ক্লজ বা উপবাক্যটি আমার কাছে কোনো অর্থ প্রকাশ করছে না। কারণ, ‘শ্রেণী’ একটি সাধারণ প্রকরণ বলে, শ্রেণীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে হলে, এর বাইরে অন্য কোনো প্রকরণ লাগবে, যার স্বয়ংক্রিয় কোনো নির্দেশ এখানে নেই।

    উদাহরণ দিয়ে বলি, আমরা যদি ‘শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই’র কথা বলি, তখন শত্রুর বিপরীতে নিজেকে ও নিজের মিত্র বা মিত্রদেরকে লড়াকু হিসেবে বুঝি। যখন আমরা বলি ‘অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই’, তখন আমরা অন্যায়ের বিপরীতে ন্যায়ের পক্ষে লড়াইকে নির্দেশ করি।

    কিন্তু ‘শ্রেণীর বিরুদ্ধে লড়াই’ বললে, আমরা শ্রেণীর বিপরীতে কাকে বা কী বিষয়কে নির্দেশ করি? অশ্রেণী বা শ্রেণীহীন প্রকরণের লড়াই? কিন্তু সেলিম যেহেতু শ্রেণীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য “যত দিন শ্রেণী থাকবে” শর্তারোপ করেছেন, তাই শ্রেণীহীন প্রকরণ এখানে অনুপস্থিত।

    সেলিমের তত্ত্বায়ন স্পষ্টতঃ অস্পষ্ট। আর, এটিই হচ্ছে বাংলাদেশের কমিউনিষ্ট পার্টির দার্শনিক দারিদ্র, যা থেকে তার রাজনৈতিক অকার্যকারিতা উদ্ভুত। সমগ্র বিষয়টি কগনিটিভ বা বোধিক পর্যায়ে কমিউনিজম বা সাম্যবাদের তত্ত্বকার ও ভাষ্যকার কার্ল মার্ক্সের শ্রেণীসংগ্রাম তত্ত্ব না বোঝার ফল।

    কার্ল মার্ক্স অনির্দিষ্ট শ্রেণীর বিরুদ্ধ লড়াইয়ের কথা বলেননি। তিনি বলেছেন বুর্জোয়া বা ধণিক-বণিক শ্রেণীর বিরুদ্ধে প্রলেতারিয়েত বা সর্বহারা শ্রমিক শ্রেণীর লড়াইয়ের কথা।

    আর আমি বলি, মার্ক্সীয় শ্রেণী-সংগ্রামের তত্ত্ব যখন প্রলেতারিয়েতের হাতে না থেকে অপ্রলেতারিয়েত শ্রেণীর হাতে থাকে, তখন রূপতঃ এ-তত্ত্বের দেহ থাকলেও তার প্রাণ থাকে না। এতে কথা থাকলেও কথার অর্থ থাকে না। অর্থাৎ, শ্রেণীর উল্লেখ থাকলেও শ্রেণীর নির্দিষ্টকরণ থাকে না (যেমন, জিয়াউর রহমানের শাসনামলে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে হানাদারদের উল্লেখ থাকলেও, হানাদাররা কারা, তার কোনো সুনির্দিষ্টতা ছিলো না)।

    যে-কোনো সংগ্রামের তত্ত্বের নির্দিষ্টকরণ ঘটলেই সংগ্রাম মূর্তরূপ প্রাপ্তির দাবী নিয়ে হাজির হয়। তাই, শ্রেণী-সংগ্রামের বেলায়ও শ্রেণী নির্দিষ্টকরণের দাবী উঠতে বাধ্য।

    তবে এ-দাবীর প্রতি কে সাড়া দিতে পারবে, কে পারবে না এবং দিলেও কে কীভাবে সাড়া দেবে, তা নির্ভর করে কোন শ্রেণীর বিরুদ্ধে কোন শ্রেণীর সংগ্রামের কথা বলা হচ্ছে এবং সাড়াদানকারী কোন শ্রেণীর অবস্থানে অবস্থান করছেন।

    আমার উপরের তত্ত্বায়ন বুঝলে, স্পষ্ট হয়ে ওঠে কেনো স্বাধীন বাংলাদেশে গত ৪৩ বছর ধরে বাংলাদেশের কমিউনিষ্ট পার্টি “শ্রেণীর বিরুদ্ধে লড়াই”র কথা বললেও, মার্ক্স কথিত বুর্জোয়া শ্রেণী ও বুর্জোয়া রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে তার কোনো সংঘর্ষ বাঁধছে না।

    অনির্দিষ্ট শ্রেণী-সংগ্রামের তত্ত্ব ব্যাখ্যা করতে সক্ষম কেনো সেলিমদের কমিউনিষ্ট পার্টি স্বাধীনতা উত্তর-কালে স্বাধীন রাষ্ট্রের প্রথম বুর্জোয়া একনায়ক শেখ মুজিবুর রহমানের স্বৈরতান্ত্রিক দল বাকশালে যোগদান করেছিলো, কেনো তাঁরা দ্বিতীয় একনায়ক জিয়াউর রহমানের সাথে সহযোগিতা এবং কেনো-ই-বা তাঁরা তৃতীয় একনায়ক জেনারেল হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের নির্বাচনী সহযোগিতায় বাকাশালী পরম্পরা অনুসরণ করেছিলো। শুধু তাই নয়, অনির্দিষ্ট শ্রেণী-সংগ্রামের তত্ত্ব থেকে এ-দলটির সঠিক বর্তমান বেকারত্বের ব্যাখ্যাও পাওয়া সম্ভব।

    পরিশেষে বলি, মানুষে-মানুষে সাম্য প্রতিষ্ঠার যে আকাঙ্খা ও আন্দোলন, তার সাথে সম্পৃক্ত সংগ্রামী শ্রমিক, রাজনৈতিক কর্মী, লেখক, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী, শিল্পী ও সাহিত্যিকদের জন্য যেটি ইম্পারেটিভ বা করণীয়, তা হচ্ছেঃ শুধু আবেগ দিয়ে সাম্য বুঝলে হবে না, বিজ্ঞান দিয়ে বুঝতে হবে। আর এর জন্য প্রয়োজন নির্ভুল ভাষা ও সূক্ষ্ম বৈজ্ঞানিক চিন্তার ব্যবহার - পঠনে, লিখনে, কথনে ও শ্রুতিতে।

    কারণ, নির্ভুল ভাষা ছাড়া নির্ভুল চিন্তা করা যায় না; নির্ভুল চিন্তা ছাড়া নির্ভুল বোধ গড়ে ওঠে না; নির্ভুল বোধ ছাড়া নির্ভুল কর্ম পরিকল্পনা করা যায় না; নির্ভুল কর্ম-পরিকল্পনা ছাড়া নির্ভুল কর্ম-সম্পাদন করা যায় না। আর, নির্ভুল কর্ম-সম্পাদন ছাড়া অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছুনো অসম্ভব, তা লক্ষ্য যতো মহৎই হোক না কেনো।

    কাঙ্খিত সাম্যের জন্য অসাম্যের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতেই হবে। অসাম্যের ভিত্তি যেখানে উৎপাদনের উপায়ের ওপর মালিকানা-নির্ভর শ্রেণী-বিভক্তি, তাই শ্রেণী-সংগ্রাম ছাড়া সাম্য আসবে না, তা যে-রূপেই হোক না কেনো। আর এর রূপ নির্দিষ্ট না-করে অনির্দিষ্ট ও নির্বোধ শ্রেণীসংগ্রাম কিংবা কথিত ‘শ্রেণীর বিরুদ্ধে সংগ্রাম’ অসাম্যকে কেবল দীর্ঘতরই করবে।

    মার্ক্সবাদের সমস্যা হচ্ছে, এর শ্রেণী-সংগ্রামের তত্ত্ব যেমন নিপীড়িত শ্রেণীকে সংগ্রামের বোধ ও প্রেরণা যোগায়, তেমনি তার ঐতিহাসিক অনিবার্যতাবাদ তাদেরকে ইতিহাস সংঘটিত হওয়ার আশ্বাসে ও বিশ্বাসে যুগ-যুগ ধরে নিষ্ক্রিয়-অপেক্ষায় স্থবির করেও রাখতে পারে। আর এখানেই, বিজ্ঞানাশ্রিত মতবাদ হওয়ার পরেও মার্ক্সবাদ কোনো-কোনো ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষণে ধর্মের মতো নিয়তিবাদে পরিণত হয়।

    কমিউনিষ্ট পার্টির সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিমের কথিত “একদিন অবশ্যই পৃথিবীতে সাম্যবাদ আসবে” সেই নিয়তিবাদেরই প্রকাশ, যার সাথে হিন্দুত্ববাদীদের “রামরাজ্য প্রতিষ্ঠিত হবেই”, কিংবা খ্রিষ্টবাদীদের “পৃথিবীতে কিংডম অফ গড প্রতিষ্ঠিত হবেই”, কিংবা ইসলামবাদীদের “সারা পৃথিবীতে ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হবেই” বিশ্বাসের চরিত্রগত কোনো পার্থক্য নেই।

    আমি বলি, এভাবেই কখনও কখনও আদর্শ-বিশ্বাসীদের কাছে বিজ্ঞানের সম্ভাব্যতাবাদ এবং তা বাস্তবায়নের চেষ্টায় মানবিক সক্রিয়তাবাদ অবলীলায় মার খায়।

    শনিবার ২২ শে জানুয়ারী ২০১৪
    নিউবারী পার্ক
    এসেক্স, ইংল্যাণ্ড
    masudrna1@gmail.com

আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন