• ‘বার্মিংহ্যামের বুদ্ধিজীবী’ বিষয়ক জটিলতা
    মাসুদ রানা

    পত্রিকার জুন ১৮-২৪ সংখ্যায় ‘‘কবি ‘তান্দুরী শেফ’ নজরুল’’ শিরোনামে আমি একটি মন্তব্য প্রতিবেদন লিখেছিলাম, যা প্রকাশিত হয়েছিলো বার্মিংহ্যামের ‘দেশপ্রেম বাংলাদেশ সাহিত্য ও সংস্কৃতি পরিষদ’-এর সভায় কবি নজরুল ইসলাম সম্পর্কে উপস্থাপিত কিছু তথ্যে ভ্রান্তি নির্দেশ করে। ভ্রান্তিগুলোর মধ্যে ছিলো নজরুলকে ‘তান্দুরী শেফ’ মনে করা, ‘দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সৈনিক’ হিসেবে জানা, ইত্যাদি।

    লিখেছিলাম, ছেলেবেলায় নজরুল ইসলাম একটি টী-স্টলে কাজ করলেও তিনি তান্দুরী শেফ ছিলেন না এবং তিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নয়, বরং প্রথম বিশ্বযুদ্ধে সৈনিক হিসেবে যোগ দিলেও তাঁর যুদ্ধের ময়দানে যাওয়া হয়নি।

    উল্লিখিত তথ্য-সংশোধন ক্রিয়াটি একটি উপলক্ষ্য হলেও, আমার লেখার মূল বক্তব্যটি ছিলো যে, ভক্তরা সাধারণতঃ তাঁদের বীরকে নিজের চেহারায় তৈরী করতে পছন্দ করেন। ছেলেবেলায় আসানসোলের ওয়াহিদের টী-স্টলে কাজ-করা নজরুলকে ব্রিটেইনের ‘কারী ইণ্ডাস্ট্রী’র বাঙালী শ্রমিকেরা ভুল করে ‘তান্দুরী শেফ’ হিসেবে অভিহিত করলেও মূলতঃ তাঁরা তাঁর সাথে একাত্মতা প্রকাশ করেছেন এই জন্য যে, তিনি ছিলেন শ্রমজীবী শ্রেণীর পক্ষের কবি।

    মন্তব্য প্রতিবেদনটির উপসংহারে আকারে-ইঙ্গিতে নয়, স্পষ্ট করে, হুবহু নিচের ৫টি বাক্যে লিখেছিলামঃ

    ‘তবু এতোটুকু শান্তনা যে, বাংলা তথা ভারত থেকে বহু দূরে ব্রিটেইনের ক্যাটারিং ইণ্ডাস্ট্রির বাঙালী শ্রমিকেরা এক সময়কার রুটির দোকানের কর্মী নজরুলের সাথে এখনও একাত্মতা বোধ করেন। নজরুলের এখানেই অমরত্ব। আপাততঃ ধরে নিই নজরুল ‘তান্দুরী শেফ’ ও ‘ওয়েইটার’ই ছিলেন। নামে কী আসে যায়? সবচেয়ে বড়ো কথা, তিনি স্বয়ং শ্রমজীবী এবং বোধে ও কর্মে শ্রমজীবীর লড়াকু বন্ধু ছিলেন।’

    দুর্ভাগ্যবশতঃ বার্মিংহ্যামের ‘দেশপ্রেম’-এর সভাপতি মোঃ ইবাদুল ইসলাম ফয়সাল আমার লেখার ভুল অর্থ করেছেন। পত্রিকার অগাস্ট ২০-২৬ সংখ্যায় প্রকাশিত ‘পাঠক প্রতিক্রিয়া’য় তিনি অনুযোগের সুরে লিখলেন, ‘‘আমরা আমাদের আলোচনায় কবিকে ‘তান্দুরী শেফ’ বানিয়ে হেয় প্রতিপন্ন করার চেষ্টা করিনি বরং কবিকে দারিদ্র-বিজয়ী একজন মহান বীর হিসেবে মূল্যায়ন করেছি।’’

    উপরের বাক্যটি তিনি কার ও কোন্‌ অভিযোগের কৈফিয়ত হিসেবে রচনা করেছেন, তা আমার বোধগম্য না হলেও, পরবর্তী বাক্যে তিনি যা বলেছেন, তাতে পাঠকের মনে হতে পারে, তিনি উল্টো আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ করছেন যে, শ্রমিকের কাজ করাকে আমি ছোটো করে দেখেছি। ফয়সাল লিখেছেনঃ

    ‘‘তাছাড়া একজন মহান ব্যক্তি ভাগ্যহত হয়ে জীবনের কোন একটু সময়ে শ্রমশিল্পে নিয়োজিত হয়ে থাকলে তার কি সম্মানহানি হয়ে যায়?’’

    সম্মানহানির প্রসঙ্গ কোথা থেকে এলো, বেমালুম! দেশপ্রেম বাংলাদেশ সাহিত্য ও সংস্কৃতি পরিষদের সভাপতি এখানেই থেমে থাকেননি। তিনি জানানঃ

    ‘ইরানের বিশ্বনন্দিত কবি শেখ সাদি (রঃ)’র কথাই ধরা যাক - কবি এক পর্যায়ে দেশান্তরিত হয়ে শ্রমশিল্পে নিয়োজিত হন এবং তার উপলব্ধি থেকে লিখেন এক অন্যন্য কবিতা যার দু’টি লাইন সকলের জন্যই শিক্ষণীয় - ভাগ্য বিপর্যয় ঘটিলে কর হে সবুর/ সবুর তিক্ততর হলেও ফল বড় মিষ্টতর।’

    ফয়সাল এবার মোড় নিয়ে এলেন ভারতের প্রাক্তন প্রেসিডেন্টে আব্দুল কালামের প্রসঙ্গ নিয়ে (যদিও তিনি ভদ্রলোকের পিতৃদত্ত নামটি পাল্টে দিয়ে তাঁকে ‘আবুল কালাম’ বলে নির্দেশ করেছেন - ‘নেভার মাইণ্ড’!)। তিনি লিখলেনঃ

    ‘‘কবিদের কথা বাদ দিয়ে এবার এ শতাব্দির লোমহর্ষকর জীবনী, মিসাইলম্যান খ্যাত ভারতের প্রক্তন প্রেসিডেন্ট ড. এপিজে আবুল কালামের কথাই ধরা যাক। তিনি স্পষ্ট ভাষায় তার আত্মজীবনীতে লিখেছিলেন, অভাবের তাড়নায় এক সময় তিনি পত্রিকা বিক্রির কাজ করেছেন এবং এ থেকে বেরিয়ে এসেছে তার মধ্য দিয়ে সুন্দর কবিতা - ‘খবরের কাগজ সংগ্রহ করে/ মন্দির নগরীর বাসিন্দাদের কাছে বিতরণ/ সূর্যোদয়ের কয়েক ঘন্টা পর, ইশকুলে যাওয়া।/ সন্ধ্যা, রাতে পড়ার আগে ব্যবসায় সময়/ এইসব যন্ত্রণা এক বালকের।’’’

    স্পষ্টতঃ ফয়সালের উল্লিখিত উৎপাদন অত্যন্ত, অত্যন্ত, অপ্রাসঙ্গিক। কারণ, আমার মন্তব্য প্রতিবেদনের সাথে এর কোনো সম্পর্ক নির্দেশ করতে পারেননি তিনি। কিন্তু তা সত্ত্বেও কেবল মাত্র তাঁর প্রতিক্রিয়া পড়লে একজন পাঠকের মনে হতে পারে আমি নিশ্চয় শ্রমিকের কাজকে ‘হীন’ করে মন্তব্য প্রতিবেদনটি লিখেছিলাম।

    আমি সমালোচনা করতে এবং সমালোচিত হতে কুন্ঠিত নই। কিন্তু লেখক ও সমালোচকের জন্য একটি সততার বিষয় হচ্ছে অন্যের বক্তব্যকে বিকৃত না করা। অন্য যেটি বলেননি, তাঁর মুখ দিয়ে সেগুলো কল্পনায় বলিয়ে নেয়াটা সততার মধ্যে পড়ে না।

    কোনো বিষয়কে বস্তুনিষ্ঠভাবে না বুঝে, মনের ইচ্ছে মতো বুঝলে, শুধু অন্যকে ঠকানো হয় না, নিজেকেও ঠকানো হয়। সত্য যদি মহার্ঘ্য হয়, তাহলে সত্য থেকে নিজেকে বঞ্চিত করলে, বোধ ও বুদ্ধির দারিদ্রে নিপতিত হতে হয়।

    আমি নিজে একজন বাঙালী লেখক হয়ে সব সময় প্রত্যাশা করি, বাংলা ভাষায় উৎপাদিত সকল বুদ্ধিজীবীর সমুদয় বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ যেনো গুণে ও মানে বিশ্ব-মানের হয়, উন্নত মানের হয়। সে-প্রত্যাশায় ভ্রান্তির হ্রাস ও সূক্ষ্ম-সঠিকতার বৃদ্ধি দাবি করি নিজের কাছে ও অন্যের কাছে। আমি বিশ্বাস করি, বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে সমালোচনা ও আত্মসমালোচনার চর্চাটা থাকলে তাতে সবাই উপকৃত হন।

    জাতি হিসেবে আমাদের ‘এক্সেলেন্স’-এর বড়োই অভাব। আমাদের মধ্যে ‘আচ্ছা চলছে তো, চলুক না’ ধরনের একটা বোধ কাজ করে। এজন্যেই আমাদের মধ্যে উন্নত বুদ্ধিবৃত্তিক, নৈতিক ও হৃদয়বৃত্তিক মানুষ তৈরী হয় না। কারণ, ‘প্রিসিশন’-এর প্রতি আমাদের আগ্রহ কম।

    ‘‘কবি ‘তান্দুরী শেফ’ নজরুল’’ মন্তব্য প্রতিবেদনে আমি একটি দায়িত্ববোধ, ভালোবাসা ও একাত্মতা থেকে, বার্মিংহ্যামের সেই বাঙালী বুদ্ধিজীবীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চেয়েছিলাম ঐ লেখায়। কিন্তু এতে আমি যে একটি নতুন প্রকারের বিশ্লেষণ করলাম, তা তাঁরা বুঝলেন না। তাঁরা ধরেই নিলেন, আমি তাঁদের দূরবর্তী কেউ হয়ে গালমন্দ করেছি। সম্ভবতঃ সে-কারণেই ফয়সাল তাঁর উপসংহারে লিখলেনঃ

    ‘পরিশেষে একথা নির্ধিদ্বায় বলা যায়, বহির্বিশ্বে সর্বপ্রথম বাংলাদেশী পতাকা উত্তোলনকারী শহর বার্মিংহামের বাঙালি বুদ্ধিজীবিগণ বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতি চর্চায় অন্য কোনো শহরের চেয়ে কোনো অংশেই পিছিয়ে নেই।’

    তিনি অযথাই বার্মিংহ্যামের বিরুদ্ধে আমাকে দাঁড় করিয়ে নিজের পক্ষে একটি আঞ্চলিক সহানুভূতি সঞ্চারের চেষ্টা করেছেন। তিনি লিখেছেনঃ

    কলামিস্ট আমাদের পাঠানো সংবাদকে ভিন্নভাবে বিশ্লেষণ করেছেন এবং এক পর্যায়ে বহুবচন ‘বার্মিংহামের বুদ্ধিজীবীরা’ শব্দ দু’টি প্রয়োগ করে বার্মিংহামে ব্যাপক সমালোচিত হয়েছেন।’

    তাঁর সাথে সম্পর্কিত এক ব্যক্তি ফেইসবুকে ‘নিঃশর্ত ক্ষমা’ দাবি করেছেন আমার কাছ থেকে এই অভিযোগে যে, আমি নাকি ‘বার্মিংহ্যামের বাঙালী বুদ্ধিজীবীরা’ বলে একজনের ভুলের জন্য বার্মিংহ্যামের সকল বাঙালী বুদ্ধিজীবীদের দায়ী করেছি।

    আমি সত্যি খুব হতাশ হয়েছি ইচ্ছাকৃত ‘ওয়ার্ড টুইস্টিং’-এর এই চাতুরী লক্ষ্য করে। সংশ্লিষ্টরা ভালো করেই জানেন যে, ‘বার্মিংহামের বাঙালী বুদ্ধিজীবীরা’ দিয়ে বার্মিংহ্যামের সেই বাঙালী বুদ্ধিজীবীদের নির্দেশ করা হয়েছিলো, যাঁরা নজরুল বিষয়ে ‘দেশপ্রেম বাংলাদেশ’ সংগঠনটির আলোচনা সভায় বক্তব্য রেখেছিলেন। কিন্তু তাঁরা আমার সমগ্র লেখা থেকে তিনটি শব্দ তুলে নিয়ে  মাঝখানেরটি ছেঁটে ফেলে আমাকে ‘বার্মিংহামের বুদ্ধিজীবী’ শব্দ দু’টি ব্যবহারের অপরাধে ‘ব্যাপক সমালোচিত’ বলে অভিহিত করেছেন। যদিও আমার সাথে বার্মিংহ্যামের অনেক সাংবাদিকের সাথে দেখা হয়েছে একটি বিশেষ অনুষ্ঠানে লণ্ডনে, কিন্তু তাঁরা কেউই বলেননি আমার এই ব্যাপক সমালোচিত হবার খবর। কেমনতরো সাংবাদিক তাঁরা? নাকি কেবলই বন্ধু?

    আমি বার্মিংহ্যামের আঘাতপ্রাপ্ত বুদ্ধিজীবীদের উদ্দেশ্য বলছি, আমার রেফারেন্স ছিলো সুনির্দিষ্ট সেই বাঙালী বুদ্ধিজীবীদের প্রতি, যাঁদের কথা ‘দেশপ্রেম বাংলাদেশ’ নামের সংগঠনের সংবাদ-বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছিলো। আমি লিখেছিলামঃ

    ‘‘বার্মিংহ্যামের বাঙালী বুদ্ধিজীবীরা দাবী করেছেন যে, কবি নজরুল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সৈনিক ছিলেন। তাঁদের পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে কবি নজরুল ‘১৯৩৯ সনে সৈনিক হিসেবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অংশ নেন।’ নজরুল সৈনিক ছিলেন সত্য, কিন্তু তিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেননি।’’

    স্পষ্টতঃ প্রথম বাক্যের কর্তা ‘বার্মিংহ্যামের বাঙালী বুদ্ধিজীবীরা’ দ্বিতীয় বাক্যে সুনির্দিষ্ট হয়েছে ‘তাঁদের পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তি’র সাথে যুক্ত হয়ে। সুতরাং ফয়সাল যেভাবে এটিকে প্রেক্ষিত থেকে বিচ্ছন্ন করে একেবারে ‘বার্মিংহামের বুদ্ধিজীবীরা’ বলে আমাকে নির্বিচার মন্তব্যকারী রূপে চিত্রিত করেছেন, তা মোটেও ঠিক নয়।

    প্রকৃত বুদ্ধিজীবীরা আপন কর্মে অন্যের ধরা ভুলে বিচলিত হোন না। সম্প্রতি লণ্ডনে চারণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্র’র ১১৪তম মাসিক পাঠচক্রে ঈশ্বরচন্দ্র বন্দোপাধ্যায়ের কর্ম ও জীবনের উপর পাঠ ও আলোচনা হয়ে গেলো। এতে আলোচক ছিলেন বিখ্যাত ‘গৌল্ডেন বুক অফ বিদ্যাসাগর’ বইয়ের সম্পাদক মানিক মুখার্জী, যিনি নিজেও একজন বুদ্ধিজীবী। তাঁর আলোচনার এক পর্যায়ে তিনি বললেন, বাংলার নবজাগরণ-কালে ‘বিদ্যাসাগরের বিখ্যাত বোধোদয়’ বইয়ের মধ্যে ভুল ধরে একটি মুসলমান ছেলে পূর্ব-বাংলার কোনো একটি গ্রাম থেকে চিঠি লিখেছিলো ঈশ্বরচন্দ্র বন্দোপাধ্যায়ের কাছে।

    মুখার্জী বললেন, ভারত-বিখ্যাত এই পণ্ডিতের ভুল ধরার সাহস তখন কেউ থাকতে পারে, তা ভাবাই যেতো না। কিন্তু ঈশ্বরচন্দ্র বন্দোপাধ্যায় তাঁর বইয়ের পরবর্তী সংস্করণে সেই ভুলতো সংশোধন করলেনই, এর সাথে তিনি ভুল-ধরা সেই বালকটির কথা উল্লেখ করে মানুষকে জানালেন যে, তাঁর মতো পণ্ডিতেরও ভুল হতে পারে। পর-পর কয়েকটি সংস্করণে এর  উল্লেখ অব্যাহত রাখলেন ঈশ্বরচন্দ্র বন্দোপাধ্যায়।

    বলাবাহুল্য, ভুল স্বীকার ও সংশোধন করার মধ্য দিয়ে ঈশ্বরচন্দ্র বন্দোপাধ্যায় ছোটো হননি, বরং বড়োই হয়েছেন। তাঁকে আজও মানুষ ‘বিদ্যাসাগর’ বলে সম্মান করে।

    রোববার, ৯ সেপ্টেম্বর ২০১২
    নিউবারী পার্ক
    এসেক্স, ইংল্যাণ্ড
    masudrana1@gmail.com

     

আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন