• ‘স্যার, আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা। আমি একটু...’
    যায়নুদ্দিন সানী


    কমবেশি প্রায় সকল চিকিৎসকই রোগীদের কাছ থেকে ‘কম ভিজিট’ নেয়ার একটি আবদারের সম্মুখীন হন। কখনও সমস্যায় পড়ে, কখনও একটি সুযোগ নেয়ার অংশ হিসেবে রোগীরা এই বিশেষ আবদারটি করেন। ‘স্যার পুরো ভিজিট দিলে বাড়ী যাওয়ার ভাড়াটা থাকবে না’; কিংবা ‘একটু কম নিলে হয় না?’ - ইত্যাদি। তবে বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে চিকিৎসককে ভিজিট একটু কম দেয়ার মাঝে কোথায় যেনো একটা জয়ের স্বাদ সবাই খুঁজে পান। দরদাম করে জেতার জয়। দারিদ্রের অজুহাত দেয়া কাউকে যদি বলি, ‘তাহলে কমদামী ওষুধ লিখি?’ তখন তিনি আবার প্রতিবাদ করেন। ‘যেটা দিলে ভালো হয় সেটা দেন, টাকা লাগে লাগুক।’ এভাবেই কখনও ‘দারিদ্র’ কখনও ‘অমুকের আত্মীয়’ কখনও বা আবার ‘এলাকার লোক’ অজুহাত আমাদের নিত্য সঙ্গী।

    এ-কারণে মাছওয়ালাদের মাঝে মাঝে হিংসে করি। তাঁরা এদিক দিয়ে বেশ একটু ভাগ্যবান। ক্রেতার হাবভাব দেখে যখন বুঝে ফেলেন ‘এ-লোক দামদর করবে’ তখন তিনি ইচ্ছে করেই একটু বেশি দাম হাঁকিয়ে ফেলতে পারেন। ক্রেতা দরদাম করে বেশ কমিয়ে ‘জিতেছেন’ ভেবে মাছটা কিনে খুব খুশি মনে বাড়ী ফেরেন। অন্যদিকে মাছওয়ালাও খুশি। তিনি তাঁর মূল দামই পেয়েছেন। তাঁর মৃদু চালাকি করার কারণে তাঁকেও বেজার হতে হয়নি।

    এদিক দিয়ে চিকিৎসকরা কিছুটা দুর্ভাগা। নির্দিষ্ট ভিজিট নির্ধারিত থাকায় চালাকির সুযোগ নেই। এসব ব্যাপার নিয়ে আগে মৃদু আফসোস করতাম - ‘আজকের আয় কিঞ্চিৎ কমে গেলো’! তবে এখন অভ্যস্থ হয়ে গিয়েছি। এখন বরং মজাই লাগে। কখনও কখনও নিজের সঙ্গেই ধাঁধা খেলি — ‘এই লোকটা কি কম দেয়ার একটা বাহানা দিবে?’

    সেদিন একজন রোগী চেম্বারে ঢোকার পরে যখন পকেটে হাত দিয়ে মানিব্যাগটা বের করলেন — ধাঁধা খেলা শুরু হলো। রোগীর রোগ-উপসর্গ যেহেতু এখনও পরীক্ষা করিনি তাই ভিজিট দেয়ার জন্য তিনি মানিব্যাগ বের করেন নি, তা নিশ্চিত। সম্ভবতঃ নিজের ভিজিটিং কার্ড দেবেন। হয়তো বড়ো কোন অফিসার হবেন কিংবা নিজস্ব কোনো ব্যাবসা আছে। এক্ষেত্রে উদ্দেশ্য হবে, যেনো একটু বেশী সময় নিয়ে দেখি অর্থাৎ শরীরের এখানে-সেখানে বেশ ঘাঁটাঘাঁটি করে দেখি। রোগীদের ভাষায়, ‘ভালো করে দেখা‘ আরকি! অবশেষে অপেক্ষা শেষ হলো। একটি কার্ড এগিয়ে দিতে-দিতে রোগী জানালেন, ‘স্যার, আমি মুক্তিযোদ্ধা।‘

    এ-ধরনের পরিচয় দেয়ার অনেক কারণ থাকা সম্ভব। তবে, আমার সংক্ষিপ্ত চিকিৎসক জীবনে দুটো সম্ভাবনা বেশী পেয়েছি — ‘ভালো করে দেখুন’ অথবা ‘ভিজিট কম রাখুন’। প্রথমটা যেহেতু এখনও বলছেন না, সম্ভবতঃ দ্বিতীয় অনুরোধটা আসবে।

    রোগী-দেখা শেষে এলো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। আমার ধাঁধার উত্তর পাবো এখন। তিনি শুরু করলেন, ‘অমুক কে চেনেন?’ নিজের অজ্ঞানতা স্বীকার করলাম, ‘জ্বি না’। উনি জানালেন, ‘চেনেন না? উনি তো অমুক ওয়ার্ডের কমিশনার। আমাকে খুব ভালো চিনে। আর তাছাড়া আমার এলাকার আমি অমুক। ভিজিট কিন্তু আমি একটু কম দিবো।‘ ধাঁধার উত্তর পেয়ে গেলাম। ভদ্রলোক তাঁর মুক্তিযোদ্ধা পরিচয়ের ওপর খুব একটা ভরসা করতে পারেন নি। তাই কমিশনারের সঙ্গে সখ্যতা আর নিজ এলাকায় তাঁর দাপটের তথ্যও যোগ করলেন। ফলে কনসেশানটা ঠিক কি কারণে চাইছেন, বুঝতে পারলাম না। সম্ভবতঃ তিনটিই। কিংবা যেটা কাজে লাগে — মোট কথা কনসেশানটা জরুরী।


    মুক্তিযোদ্ধা পরিচয়টা ব্যবহারের ক্ষেত্রে কোন নির্দিষ্ট নীতিমালা আছে কি-না, আমার জানা নেই। থাকা উচিৎ কি-না সে ব্যাপারেও তেমন কোনো আলোচনা চোখে পড়েনি। বেশ কিছু সরকারী ক্ষেত্রে মুক্তিযোদ্ধা এবং তাঁদের সন্তানদের জন্য সুবিধা আছে। তবে, বেসরকারী ক্ষেত্রে তেমন কোন প্রণোদনা কি আছে? যতোটুকু যা হয়, তা ব্যক্তির ইচ্ছে বা করুণার ওপরই নির্ভর করে। ডাক্তার চাইলে ভিজিট কম নেবেন, না চাইলে রোগীকে পুরোটাই দিতে হবে। পরীক্ষা নিরীক্ষা কিংবা ক্লিনিক-হাসপাতালের ভাড়ার ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। মালিকের ইচ্ছের ওপর কনসেশান। ওষুধের দামের ক্ষেত্রে তো তাও নেই। মোট কথা এই কনসেশান দেয়া-নেয়ার সঙ্গে আর যাই হোক মর্যাদা পাওয়া বা দেওয়া নেই। দাতার দিক থেকে আছে একরাশ করুণা, দয়া কিংবা ভিক্ষা দেয়ার মানসিকতা। অন্যদিকে, যাঁরা এভাবে মুক্তিযোদ্ধা পরিচয়ে কনসেশন চান, তাঁদের ভেতরও কাজ করে এক ধরনের হীনমন্যতা।

    এমন অনেককে চিনি যাঁরা 'মুক্তিযোদ্ধা' পরিচয় দেন না। তাঁরা হয়তো মনে করেন, এই পরিচয় দেয়া মানেই সামনের মানুষটি ভাববে - নিশ্চয়ই কোন 'ধান্দা' আছে, হয়তো টাকা কম দিবে। কেউ ভাবেন হয়তো যে, পরিচয় দিলেই তো ডাক্তারবাবু ভাববেনঃ ভিজিট কম দিবে! আর তখন তাঁর আচার-আচরণেও একটা তাচ্ছিল্য এসে ভর করবে। চিকিৎসা ছাড়া অন্য কোনো ক্ষেত্র সম্পর্কে আমার তেমন কোন স্পষ্ট ধারণা নেই। সেখানেও কি সম্মানসূচক নিয়মতান্ত্রিক কোন কনসেশান এর ব্যবস্থা আছে? যেমন, হোটেল-রেস্তোরায়?

    কনসেশান কিংবা অনুগ্রহ চাইবার এই ধরনের ঘটনাগুলো ঠিক সর্বজনীন না। প্রচুর মুক্তিযোদ্ধা রয়েছেন যাঁরা কখনোই এমন করেন না। বিশেষতঃ যাদের সামর্থ্য আছে কিংবা এখন সচ্ছল জীবন যাপন করছেন তাঁরা। আবার অনেকে আছেন যদিও পরচয় দেন তবে ঠিক কোনো উদ্দেশ্য নিয়ে তা করেন না। কেউ দেন বেশ গল্পচ্ছলে, ‘এখন তো বয়স হয়ে গেছে, একটা সময় ছিল যখন...’ এভাবে বলে ফেলেন দেশ স্বাধীনে তাঁর গর্বিত ভূমিকার কথা।

    এই গল্প বলার পেছনে কোন চাওয়া নেই। বা হয়তো থাকে — একটু শ্রদ্ধা পাওয়ার আকাংখা কিংবা একটু উচ্ছ্বাস। হয়তো অবাক শ্রোতার মুখে শুনতে চান, ‘তাই? আপনি যুদ্ধ করেছেন?’ আবার অনেকেই আছেন যাদের ভিজিট দেয়ার সামর্থ্য থাকুক কিংবা না-থাকুক মুক্তিযোদ্ধা পরিচয়টা কখনই মুখ ফুটে বলেন না। কারণ তিনি এই পরিচয়ের বিনিময়ে কিছুই চান না। আর কিছু মানুষ আছেন, যাঁরা পরিচয় দেন না বা দিতে পছন্দ করেন না।

    এমন রোগী হয়তো অনেক দেখেছি। কখনও জানতে পেরেছি অন্য কারো কাছে কিংবা অন্য কোন পরিস্থিতিতে। কারও-কারও কথা হয়তো আজও অজানা। আর কেউ-কেউ থাকেন মাঝামাঝি - ‘কোথাও আর বলিনা আমি মুক্তিযোদ্ধা’। গলায় থাকে অভিমান। এঁদের উদ্দেশ্য ঠিক বোঝা যায় না। পরিচয় দিতে অনাগ্রহী? না-কি দেয়ার পরে আশানুরূপ ব্যবহার না পেয়ে ক্ষুব্ধ তা জানিয়ে দেয়া? নাকি মুক্তিযোদ্ধা হওয়ার পরও দেশের কাছ থেকে পাওয়া ব্যবহার নিয়ে হতাশ? হয়তো সবগুলোই। পুরনো অভিজ্ঞতায় হয়তো কোথাও পরিচয় দিয়ে প্রার্থিত সুবিধা কিংবা ব্যবহার পাননি, হয়তো মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় দেয়ার পরেও সামনের মানুষটির কথায় বা আচরণে সম্মান ফুটে ওঠেনি, হয়তো বা সামনের মানুষটি ধরেই নেন যে এই পরিচয় দেয়ার পেছনে লুকিয়ে আছে কোনো উদেশ্য। আর তখন একটা বক্র হাসি দেন, যা তাঁর পছন্দ নয়। ফলে এই পরিচয় দেয়া ছেড়ে দিয়েছেন।

    তবে কেউ-কেউ কনসেশান চান। কখনও তাঁরা এই কনসেশানের জন্যই মুক্তিযোদ্ধা পরিচয়টা দেন। কেউ অধিকার ভেবে কনসেশানটা চান কেউ বা দেন বেশ কুণ্ঠিত ভাবে, দয়া চাচ্ছেন ভেবে। বলাই বাহুল্য, কনসেশান যাঁরা চান, তাঁদের বেশীর ভাগই দরিদ্র। তাঁদেরকে কিছু কনসেশান দেয়ার সামর্থ্য হয়তো অনেকেরই আছে। হয়তো অনেকে দিচ্ছেনও। তবে সরকারী কিংবা কোন সংগঠনের কোন নীতিমালা না থাকায় এই ‘চাওয়াটা’র সঙ্গে কোথায় যেন অসম্মান মিশে যায়। মিশে থাকে সংশয়, ‘দিবে তো?’। যিনি দিচ্ছেন তাঁর ব্যাবহারেও একটা সুযোগ তৈরি হয়, তাচ্ছিল্য দেখাবার।


    এদেশে চিকিৎসা সেক্টরের প্রাইভেট প্র্যাকটিসে মুক্তিযোদ্ধা রোগীদের জন্য কনসেশান দেয়ার তেমন কোন নির্দিষ্ট নিয়ম নেই। থাকলেও আমার জানা নেই। উন্নত দেশের ক্ষেত্রে কী ঘটে তা থেকে কোন নিয়ম তৈরি করা যায় কি-না, কিংবা দ্বায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষ তা নিয়ে ভাবছে কি-না সে-সম্পর্কেও আমি অজ্ঞ। তবে মুক্তিযোদ্ধা রোগী দেখার ব্যক্তিগত কিছু অভিজ্ঞতা আমার আছে। বিশেষ করে যারা পরিচয় দেন তাঁদের একটি অংশের চাহিদা থাকে ভিজিট একটু কম দেয়ার। কারো দারিদ্রের কারণে কারো বা ‘দরদাম’ মানসিকতার কারণে। আর বেশ অল্প সংখ্যক থাকেন যারা ‘ভালো করে দেখেন’ ধাঁচের অনুরোধের ভুমিকা হিসেবে নিজেদের ‘মুক্তিযোদ্ধা’ পরিচয়টা দেন। আবার যথারীতি নিজের এই ভুমিকা নিয়ে অহংকার বোধ করেন, তাই কোন সুযোগ পেলেই কথাটা বলেন কিংবা গল্পচ্ছলে বলতে ভালবাসেন—এমন মানুষও আছেন।

    ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে মনে হয়েছে, বেশ অনেকেই ‘মুক্তিযোদ্ধা’ পরিচয়টা কেন যেন একটা দাগের মত মনে করেন। বিশেষ করে দরিদ্র মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে এটি ঠিক গর্বের পরিচয় আর নেই। একটি সাধারণ ধারণা তৈরি হয়ে গেছে, কেউ এই পরিচয় দিচ্ছেন, মানে তিনি আসলে কিছু চাইছেন। উন্নত দেশে যা সরকার কিংবা সাধারণ মানুষের নিজেদেরই দিয়ে থাকেন, এদেশে আজ তাঁরা তা ভিখিরির মতো চেয়ে বেড়াচ্ছেন। এই পরিচয়টা সম্মানের চেয়ে কোথায় যেন একটা অসম্মানের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। যা সারাক্ষণ তাঁদেরকে তাড়া করছে। কিভাবে এর শুরু, দোষটা কার—জানি না। তবে এই অপমান আমাদের সবার।

    লেখকের কাজ সমাধান দেয়া নয় - সমস্যা তুলে ধরা। এতোক্ষন তা-ই করলাম। তারপরও কিছু কথা বলতে ইচ্ছে করছে। জীবনে চলার পথে যে-পণ্য বা সেবাগুলো ক্রয় করতে হয় আমাদের হরহামেশা, তাঁর কোনো-কোনোটার মূল্য থাকে নির্ধারিত। আবার অনেক পণ্য-সেবার মূল্য নির্দিষ্ট করে পূর্ব-নির্ধারিত নয়। আলু, পটল কিংবা মাছের মত অনির্ধারিত পণ্যে হয়তো সেভাবে কনসেশান দেয়া সম্ভব না। তবে, দেয়ার রীতি চালু করা অসম্ভব না। আর মূল্য নির্ধারিত এমন সব ক্ষেত্রে হয়তো নিয়মিত এবং নির্ধারিত কনসেশান দেয়া সম্ভব। যেমন গণ-পরিবহন তথা বাস-ট্রেইন-লঞ্চ-বিমানের টিকিট কিংবা শিক্ষা, চিকিৎসার ব্যয়।

    সরকারী, বেসরকারী সকল ক্ষেত্রে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ কনসেশানের ব্যবস্থা চাইলেই করা সম্ভব। তাঁদের জন্য না হলেও — আমাদের নিজেদের জন্যই। এই সূর্য-সন্তানদের প্রতি আমাদের কৃতজ্ঞতার নিদর্শন স্বরূপই এই কাজ আমাদের করা উচিৎ। কী করা যায়? শুধু একটি নীতিমালা। যেনো তাঁরা নিজ অধিকার বলেই এসে নিজের কার্ড দেখাতে পারেন। তখন তাঁদের প্রতি করা এই কনসেশান হয়ে যাবে তাঁদের প্রাপ্য। এবং এটি তাঁরা পাবেন অনুকম্পা হিসেবে নয়, অধিকার হিসেবে। এতে মিশে থাকবে না কোনো ধরণের করুণা বা দয়া। তাঁর চেয়েও বড় কথা, এতে করে অবসান হবে জাতির এই শ্রেষ্ঠ সন্তানদের দোদুল্যমানতা, করুণার অপেক্ষায় থাকা; গর্বিত না হয়ে কুণ্ঠিত চিত্তে এই পরিচয়টা জানানো। তাঁদের আর বলতে হবে না, ‘আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা, আমি একটু কনসেশান পেতে পারি?‘

    লেখকঃ কলামিস্ট, গল্পকার https://www.facebook.com/ahmad.z.sani
    ৩১ মার্চ সোমবার
    রংপুর, বাংলাদেশ

আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন