• ঔসবর্নের ন্যায্যতার যুপকাষ্ঠে শিশুভাতার সর্বজনীনতা

    আরেক বার ‘ফেয়ার-আনফেয়ার’ ধ্বনি তুলিয়া নাগরিকগণের  আরও একটি প্রতিষ্ঠিত অধিকার হরণ করিবার ঘোষণা আসিল যুক্তরাজ্যের ‘কল্যাণ-রাষ্ট্র’ হইতে। ছয় দশকের অধিক কাল ব্যাপিয়া প্রতিষ্ঠিত সর্বজনীন শিশুভাতা শীঘ্রই আর সর্বজনীন থাকিবে না। যুক্তি কী? যুক্তি হইল ন্যায্যতা। রক্ষণশীল সরকারের অর্থকর্তা শ্রীমান জর্জ ঔসবর্ন রক্ষণশীল দলের সম্মেলনে ঘোষণা দিয়াছেন, যাঁহারা অধিক আয় করেন, তাহাদের শিশুদের জন্য ভাতা দেওয়া অন্যায্য। সুতরাং শিশুভাতা সর্বজনীন হইতে পারে না। ইহা হইবে পিতা-মাতার আয় নির্ভর। যাঁহারা উচ্চ-হারের কর-যোগ্য উপার্জন করেন, তাঁহাদের শিশুদের জন্য ভাতা থাকিবে না। দৃশ্যতঃ কথা ন্যায্য।

    এই প্রকারের ‘ন্যায্য’ কথা বলিয়া প্রায় দেড় দশক আগে উচ্চশিক্ষার সর্বজনীনতা হরণ করা হইয়াছিল। বলা হইয়াছিল, অবস্থাপন্ন পরিবারের তরুণ-তরুণীরা কেন রাষ্ট্রীয় খরচে বিদ্যা-লাভ করিবে? ইহা ‘আনফেয়ার’, অর্থাৎ অন্যায্য। দরিদ্ররা উচ্চশিক্ষা লাভ করুক নিঃখরচায়, কিন্তু সম্পন্ন পরিবার হইতে আসা শিক্ষার্থীদিগকে আপন আপন খরচ বহন করিতে হইবে, অন্ততঃ আংশিক হইলেও। ন্যায্যতার কথা বলিয়া তখন-যে উচ্চ-শিক্ষার সর্বজনীনতা হরণ করা হইল, তাহা ন্যায্যতার গণ্ডি পার হইয়া অন্যায্যতার পাহাড়ে চড়িয়া বসিল। উচ্চ-শিক্ষা এখন ক্রয়যোগ্য একটি পণ্যে পরিণত হইয়াছে, যাহা বাস্তবে দরিদ্র পরিবারের শিক্ষার্থীদের নাগালের বাইরে। কোথায় গেল ন্যায্যতা?

    ন্যায্যতা আবার ফিরিয়া আসিল, তবে অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য নয়, হরণের জন্য। ইউকেবেঙ্গলি বলিবে, ইহা মূলতঃ ‘ডিভাইড এ্যান্ড রুল’ নীতির কৌশল। মুখে বলিয়া যাও, গরীবেরা কেন ধনীদের খরচ যুগাইবে? এই কথা বলিয়া অধিকারের সর্বজনীনতা হরণ করো, তারপর অধিকার-হীনতাকে সর্বজনীন কর।

    গত শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকের শেষ দিকে রুশদেশে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত করিয়া দরিদ্র শ্রেণী যে-অধিকার লাভ করিয়াছিল, তাহা দেখিয়া ইউরৌপের দেশে-দেশে যে-বিপ্লবের তরঙ্গ উথলিয়া উঠিতেছিল, তাহাতে শঙ্কিত হইয়া কল্যাণ রাষ্ট্রের সূচণা করা হইয়াছিল। ইহাতে কার্ল মার্ক্স ও তদীয় বন্ধু এঙ্গেলসের কথিত ‘কমিউনিজমের ভূত’ দেখিতে শুরু করিয়াছিল ইউরৌপ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর পুঁজিবাদী বিশ্বের নেতা ও যুদ্ধে-বাণিজ্যে লাভবান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ‘মার্শাল প্ল্যান’-এর অধীনে সাহায্য দিয়া ইউরৌপকে ‘লালে রূপান্তরিত’ হওয়ার হাত হইতে রক্ষা করিল কল্যাণ-রাষ্ট্রের উৎকোচ দিয়া। বলিল, সমাজতন্ত্রের দরকার কী? উহা যাহা দিবে, পুঁজিবাদও তাহা দিবে - শিক্ষা, চিকিৎসা, বাসস্থান ও কর্ম-সংস্থান (অন্যথায় বেকার ভাতা), শিশু-পালন, সবকিছু।

    ইউরৌপে সমাজন্ত্রের পতন হইয়াছে। সুতরাং ভুতের ভয়ও সরিয়া গিয়াছে। তবে আর কল্যাণ-রাষ্ট্র কেন? যখন ভয় ছিল, তখন বলিয়াছিলাম, এখন বলিব কেন? উচ্চ-শিক্ষার সর্বজনীন অধিকার লুপ্ত। এখন শিশুভাতার অধিকার আক্রান্ত। সামনে কী আসিবে কে জানে!

    লন্ডন, ৫ অক্টোবর, ২০১০

আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd>
  • Lines and paragraphs break automatically.

লেখা ফরম্যাট করার বিষয়ে আরো তথ্য

আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন