• প্রধানমন্ত্রী ক্যামেরোন, লিবিয়াতে একটি 'ইউ-টার্ন' মারুন!

    সম্পাদকীয়

    প্রধানমন্ত্রী ডেইভিড ক্যামেরোন 'ইউ-টার্ন' মারিতে মারিতে বিখ্যাত হইয়া উঠিয়াছেন। স্বাস্থ্য নীতিতে 'ইউ-টার্ন', অপরাধ দণ্ডনীতিতে 'ইউ-টার্ন'। আশা করা যায়, পেনশন-নীতিতেও 'ইউ-টার্ন' মারিবেন। আন্দোলন চলিতে থাকিলে, 'ইউ-টার্ন' তিনি আরও মারিবেন।

    তবে তিনি ইহাকে দুর্বলতা বলিয়া মানিতে নারাজ। তাহার মতে, ইহা হইতেছে প্রকৃত শক্তি ও আস্থার প্রতীক। আমরা অনুরোধ করিয়া বলিব, প্রধানমন্ত্রী ক্যামেরোন, আপনি শক্তি ও আস্থা প্রদর্শন করিয়া লিবিয়া-যুদ্ধেও একটি 'ইউ'টার্ন' মারুন।

    লিবিয়া আক্রমণ করা মোটেও সমীচীন হয় নাই। তবে সংশোধনের এখনও সময় শেষ হইয়া যায় নাই। লিবিয়ার গাদ্দাফি ভালই সহযোগিতা করিতেছিল। প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারও গাদ্দাফির দেশে অতিথি হইয়া, হাসিয়া করমর্দন করিয়া আসিলেন।

    কিন্তু পরিস্থিতির ভুল পাঠ করিয়া ভুল পদক্ষেপ গ্রহণ করিলেন আপনি। আপনার পররাষ্ট্রমন্ত্রী উইলিয়াম হেইগ - যিনি আপনার আগে আপনার দলেরই ব্যর্থ নেতা ছিলেন - মর্যদাহানিকর কাজ করিলেন। তিনি মিথ্যাচার করিলেন।

    মধ্যপ্রাচ্যের বসন্তের বাতাস লিবিয়াতেও একটু দোলা দিয়াছিল বৈকি। রাজনৈতিক সংস্কার চাহিয়া লিবিয়ার পূর্বাঞ্চলীয় নগরী বেনগাজিতে রাস্তায় মানুষ সমাবিশেত হইয়াছিল। অবশ্য রাজধানীতে না হইয়া পশ্চিমা উপস্থিতি ও তৎপরতা-সমৃদ্ধ বেনগাজিতে হইল কেন, সেই ব্যাপারেও নানা ষড়যন্ত্র তত্ত্ব রহিয়াছে।

    তথাপি বলি, তাহরির স্কোয়ারের শিহরণ সঞ্চারক মলয় ভূমধ্যসাগরের উপকূল ধরিয়া স্পেইনে সূর্যতোরণ স্কোয়ারে স্পর্শ করে নাই? তরুণ সম্প্রদায় কি আনুষ্ঠানিক ভাবে আইন ভঙ্গ করে নাই?

    বেনগাজিতেও মানুষ রাস্তায় নামিয়াছিল সত্য। কিন্তু সেই মানুষের মধ্যে মিথ্যা প্রচার করিয়া উস্কাইয়া দিয়া তাদেরকে 'পয়েন্ট অফ নো রিটার্ন' পরিস্থিতিতে ঠেলিয়া দিলেন উইলিয়াম হেইগ। তিনি দিনে-দ্বিপ্রহরে মিথ্যা বলিয়া, অর্থাৎ 'গাদ্দাফি লিবিয়া হইতে পলায়ন করিয়া ভেনিজুয়েলার পথে আছেন' বলিয়া মানুষকে রাষ্ট্রের অস্ত্র লুন্ঠন পূর্বক বিদ্রোহী করিয়া তুলিলেন।

    লন্ডনে ৩০শে জুন যখন ধর্মঘটী শিক্ষক, কর্মচারী ও শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নামিবে, তখন যদি বিবিসি প্রচার করিয়া বলে যে, 'টোরী প্রধানমন্ত্রী ডেইভিড ক্যামেরোন পালাইয়া ফ্রান্সে নিকোলাস সারকোজির নিকট আশ্রয় লইয়াছেন', তখন লন্ডনের অবস্থা কী হইতে পারে মনে করেন? মানুষ-জন কি উন্মাদ হইয়া উঠিবে না? লুটতরাজ শুরু হইবে না? অক্সফৌর্ড স্ট্রীটের দোকানগুলি কি একটাও আস্তা থাকিবে?

    হেইগের মিথ্যা প্রচারের পর লিবিয়ার বিক্ষোভকারীদের মধ্যেও একই অবস্থা হইয়াছিল। তাহারা উন্মাদ হইয়া উঠিয়াছিল। তাহারা বাংলাদেশের মতো দরিদ্র দেশ-সমূহ হইতে আগত শ্রমিকদের জবাই করিয়া, ধর্ষণ করিয়া, লুটতরাজ করিয়া, বিদ্রোহী হইয়া উঠিল। আপনারা তাহাদিগকে বলিলেন 'বিপ্লবী'।

    কী করিবেন তাহা আপনাদের মনে পূর্ব হইতেই প্রস্তুত ছিল। ব্রিটিশ মস্তিষ্ক বলিয়া কথা!

    ঔপনিবেশিক কালের প্রতিযোগী কিন্তু অধুনা সহযোগী ফরাসী দেশের সহিত মিলিত হইয়া অপনি আওয়াজ তুলিলেন, গাদ্দাফি তাহার নিজের দেশের মানুষকে খুন করিতে উদ্যত হইয়াছে। পশ্চিমা গণমাধ্যম বলিল, গাদ্দাফি বিমান হইতে বোমা নিক্ষেপ করিতেছে। রাশিয়া উপগ্রহ হইতে পর্যবেক্ষিত ও সংরক্ষিত উপাত্ত প্রকাশ করিয়া ইহা মিথ্যা প্রমাণ করিল।

    আপনারা জতিসঙ্ঘে প্রস্তাব আনিলেন লিবিয়ার জনগণকে রক্ষা করিবার জন্য আকাশে 'নো ফ্লাই জৌন' তৈরী করিবার। কিন্তু শব্দের চালাকি করিয়া 'সকল প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ'ও যুক্ত করিয়া প্রস্তাব পাস করাইয়া লইলেন।

    দেশটির উপর আক্রমণ করিলেন। শত-শত মিলিয়ন পাউন্ড মূল্যের ক্ষেপণাস্ত্র ও বোমা ফেলিলেন। গাদ্দাফিকে দেশ ছাড়িতে বলিলেন। তাহার এক পুত্র ও তিন শিশু-পৌত্রকে খুন করিলেন। গাদ্দাফিকে নড়াইতে পারিলেন না। কিন্তু বোমা মারিয়া চলিয়াছেন। কোথায় আপনাদের মানুষ রক্ষা করিবার কথা, কিন্তু আপনারা উল্টা মানুষ মারিতেছেন। শত্রু-মিত্র কেহই বাদ যাইতেছে না আপনাদের বোমার আঘাত হইতে।

    যুক্তি কী? জনগণকে রক্ষা করিবার জন্য আপনারা পূর্ব-সম্মত চতুর ইংরেজি শব্দগুচ্ছ 'সব প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ'কে রাবারের ন্যায় টানিয়া ইচ্ছা মাফিক ব্যাখ্যা করিতেছেন। আসলে যে 'জোর যাহার মুল্লুক তাহার'ই সত্য, তাহাই প্রমানিত হইল।

    কিন্তু আপনার জোরে ভাটা পড়িয়াছে। ন্যাটোর দারিদ্র প্রকটিত হইয়া উঠিয়াছে। আপনাদের যে মূল লক্ষ্য - ভবিষ্যতে লিবিয়ার উন্নত মানের তেল, মরুগর্ভের বিশুদ্ধ জল ও বিশাল সম্ভাবনাময় কৃষি দখল করিয়া প্রভূত সম্পদ লুন্ঠন করিবেন এবং আমেরিকার খরচে উহা অর্জন করিবেন - তাহা পুরণ করিবার মতো নহে। মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী রবার্ট গেইটস গোটা ন্যাটোকে 'আচ্ছাসে' তিরষ্কার করিলেন ব্রাসেলসে। বলিলেন, আপনাদের অর্থ নাই, গোলা নাই, শক্তি নাই অথচ যুদ্ধ করিতে আসিয়াছেন!

    শুধু কি মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী? আপনার বাহিনী-সমূহ কী বলিতেছে? শ্রবণ করিতেছেন? রাজকীয় নৌবাহিনীর প্রধান এ্যাডমিরাল স্যার মার্ক স্টেনহৌপ বলিলেন, লিবিয়া আক্রমণ অব্যাহত রাখা দূরহ। শক্তি নিঃশেষিত। সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করিতে হইবে।

    ইহাতে আপনি ক্ষেপিয়া উঠিলেন। নৌ-প্রধানকে ডাকাইয়া আনিয়া তিরষ্কার করিলেন। কিন্তু আপনার তিরস্কারকেও তিরষ্কার করিয়াছেন প্রাক্তন নৌ-প্রধান রিয়ার এ্যাডমিরাল ক্রিস প্যারী। তিনি নৌ-সেনাদিগকে তাহাদের প্রধানের চারিপাশে সমাবেশিত হইবার কথা বলিয়াছেন।

    এখন দেখিতেছি, একই কথা বলিয়াছেন রাজকীয় বিমান বাহিনীর উপ-প্রধান এ্যায়ার চীফ মার্শাল স্যার সাইমন ব্রায়ান্টও। তিনি লিখিত ভাবে প্রকাশ করিয়াছেন, লিবিয়া আক্রমণ অব্যাহত রাখিলে যে-কোন জরুরী পরিস্থিতি মোকাবিলা করিবার ক্ষমতা লোপ পাইবে রাজকীয় বিমান বাহিনীর।

    তিনি লিখিয়াছেন, সেনাদের মনোবল দুর্বল হইয়া পড়িয়াছে এবং তাহারা নিজেদেরকে মূল্যহীন মনে করিতেছেন। অফিসারগণ কৌশলিক দিক নির্দেশনা বিষয়ে উদ্বিগ্ন। সকলই যুদ্ধ-ক্লান্ত। তাহারা স্পষ্টই যুদ্ধ বন্ধের ইঙ্গিত দিতেছেন।

    দয়া করিয়া শ্রবণ করুন। নিশ্চিত হউন, অতীতে মিশরের সুয়েজ-যুদ্ধের মত আপনি ও আপনার ফরাসী বান্ধব নিকোলাস সারকোজি হারিবেন। কারণ, এবারেও ইঙ্গ-ফরাসী যুদ্ধাকাঙ্খার প্রতি মার্কিন সমর্থন তেমন একটা নাই।

    এমনকি মার্কিন নেতৃত্ব থাকিবার পরও আপনারা আফগানিস্তানে হারিয়াছেন। আফগানিস্তান হইতে পালাইয়া আসিবার জন্য মার্কিন প্রশাসনের প্রাণ ওষ্ঠাগত প্রায়। নিশ্চিত হউন, আপনারা লিবিয়াতেও হারিবেন। সুতরাং, সব চাহিতে উত্তম হয়, যদি এখনই যুদ্ধ বন্ধ করিতে পারেন।

    প্রধানমন্ত্রী ক্যামেরোন, লিবিয়াতে সুন্দর করিয়া একটি ইউ-টার্ন মারুন! সত্যই সাহসের পরিচয় দিন!

    মঙ্গলবার, ২১ জুন ২০১১

পাঠকের প্রতিক্রিয়া

এক কথায় অসাধারন মন্তব্য প্রতিবেদন! এরকম লেখা আরো চাই। অভিনন্দন সম্পাদক সাহেব।

অনন্ত, এ্যাসেক্স

আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন