• বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধ ও হিং-টিং-ছট

    বাংলাদেশে ১৯৭১ সালে কৃত যুদ্ধাপরাধের বিচার-প্রক্রিয়া শুরু হইয়াছে চার দশক পর। ইংরেজিতে একটি প্রবাদবাক্য আছে, যাহার অর্থঃ না হওয়ার চাহিতে বিলম্বে হওয়া ভাল। ক্ষমতাসীন দলের জন্য বিলম্বে হওয়া বস্তুতঃ ভাল হইয়াছে। বিষয়টি নির্বাচনী ইশতেহারে অন্তর্ভুক্ত করিয়া নির্বচনী বৈতরণী পার হইতে সুবিধা হইয়াছে।

    যুদ্ধাপরাধের বিচার এক সময় ছিলো ক্ষমতাসীন দলটির দাবি। নির্বাচনের আগে ইহা হইল তাঁহাদের প্রতিশ্রুতি। ক্ষমতায় আসিবার পর ইহা হইয়া উঠিল কর্মসূচি। বিচার সমাপ্ত হইলে তাহা হইয়া উঠিবে ইতিহাস।

    হঠাৎ করিয়া কিছু দিন আগে ক্ষমতাসীন দলটি রাস্তায় নামিয়া বিচার সুনিশ্চিত করিবার দাবি জানাইয়াছে। যাঁহারা ক্ষমতায়, তাঁহারা রাস্তায় নামিয়া কাহার কাছে দাবি জানাইয়াছে, তাহা তাঁহারাই জানেন। বঙ্গদেশের ভাষার দারিদ্রে রাজনীতিতে দাবীনামা ও কর্মসূচি প্রায়শঃ আপন-আপন গোত্র-পরিচয় ভুলিয়া একাকার হইয়া যায়।

    অবস্থাদৃষ্টে মনে হইতে পারে, দলটির দাবি ছিল যুদ্ধাপরাধীদের সমীপেই। যুদ্ধাপরাধী হিসাবে পরিচিত দলটির পথ-প্রদর্শক আদালতে হাজিরা দিয়া সে-দাবি পূরণের পথ প্রসারিত করিলেন। এইবার সুষ্ঠ বিচার হউক, ইহাই কাম্য।

    বাঙালীর কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিখ্যাত ‘হিং টিং ছট্‌’ কাহিনী-পদ্যে রাজা হবুচন্দ্র আন্তর্জাতিক বিচার-সভা বসাইয়াছিলেন স্বপ্নে শ্রুত ‘হিং টিং ছট’ কথাটির অর্থ খুঁজিয়া বাহির করিবার জন্য। ফরাসী, ইংরাজ ও বিবিধ ভারতীয় পণ্ডিত কিছুই মীমাংসা করিতে পারিলেন না। অবশেষে ক্ষুদ্র দেহের এক বাঙালী পণ্ডিত মীমাংসা করিলেন। কিন্তু মীমাংসা করিবার আগে তিনি কোন অভিবাদন ছাড়াই রাজাকে জিজ্ঞাসা করিলেনঃ ‘কী লয়ে বিচার!’

    বিচার বুঝিবার জন্য ইহা অতীব জরুরী প্রশ্ন।  বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধ সংঘটিত হইয়াছে চার দশক পূর্বে। ক্ষমতাসীন দলের ক্ষমতায় আসা ইহাই প্রথম নহে। ইহার পূর্বে ক্ষমতায় আরোহণের অভিপ্রায়ে তাঁহারা আজিকার যুদ্ধাপরাধীদের গুরুজনকে নিজেদের গুরুজন হিসাবে গণ্য করিয়াছিলেন। তাঁহার নিকট আশীর্বাদ প্রার্থনা করিয়াছিলেন। তবে কি তখন যুদ্ধাপরাধ অপরাধ বলিয়া গণ্য হয় নাই?

    আমরা প্রত্যাশা করিব নিন্দুকদের এই আশঙ্কা ভুল প্রামাণিত হউক যে, ক্ষমতাসীন দলটি আগামী নির্বাচনে বিজয় সুনিশ্চিত করিবার জন্য যুদ্ধাপরাধী বিচারের খেলা খেলিতেছে। আমরা আশা করিব, শুধু শেষপ্রান্তে কে অপরাধ কর্ম সংঘটিত করিল শুধু তাহাতে আটকাইয়া না থাকিয়া, আলোকপাত করা হইবে সেই আদর্শবাদের উপর যাহা বাঙালীর বিরুদ্ধে গণহত্যাকে উৎসাহিত করিয়াছিল।

    বঙ্গদেশে যুদ্ধাপরাধের বিচারের পক্ষে বুদ্ধিজীবীগণ প্রায়শঃ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নাৎসী যুদ্ধাপরাধের বিচারের নজির উল্লেখ করিয়া থাকেন। কিন্তু তাঁহারা কদাচিৎ উল্লেখ করেন যে, বিচারে নাৎসীদের যেমন শাস্তি হইয়াছিল, তেমনি তাঁহাদের আদর্শবাদের নির্বাসন হইয়াছিল। নাৎসীবাদ দেশে-দেশে আইনতঃ নিষিদ্ধ হইয়াছিল।

    ইহা বলিবার অপেক্ষা রাখে না যে, ধর্মকে ভিত্তি করিয়া রাষ্ট্র চালাইবার ভ্রান্তি-বিলাস হইতেই বঙ্গদেশ প্রথমে বিভক্ত হইল ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দে। পূর্ববঙ্গ পূর্বপাকিস্তান হইল। ধর্মের দোহাই দিয়া বঙ্গজনের মাতৃভাষাকে নির্মূল করিবার চেষ্টা করা হইল। বঙ্গজনেরা শোণিত প্রবাহিত করিয়া বঙ্গভাষা রক্ষা করিলেন। এতক্ষণে ইঁহারা বুঝিলেন যে, ধর্ম দিয়া জাতি হয় না। ১৯৭০ খ্রিস্টাব্দের নির্বাচনে চূড়ান্ত বুঝিলেন, ইঁহারা বাঙালী ভিন্ন আর কিছুই নহেন। এই সত্য ইঁহারা অধিকতর মূল্য দিয়া বুঝিলেন, যখন ধর্মের নাম দিয়া বাঙালীর নিধন শুরু হইল ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দে ২৫শে মার্চ রাত্রি দ্বিপ্রহরে।

    বঙ্গজনদের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধ সংঘটিত হইয়াছে একটি বিপদজনক আদর্শকে ভিত্তি করিয়া। বর্ণবাদের সাথে রাজনীতি মিশাইয়া যেভাবে জার্মানদেশে নাৎসী-বাহিনী তৈরী হইয়াছিল, ১৯৭১ সালে বঙ্গদেশে তেমনি ভাবে ধর্মবাদের সাথে রাজনীতি মিশাইয়া রাজাকার, আল-বদর, আল-শামস বাহিনী তৈরী করা হইয়াছিল। ইহাদের সৃষ্টির পশ্চাতে আছে সেই বিপজনক আদর্শ।

    দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের বিচার যেমন নাৎসীবাদকে অক্ষুণ্ণ রাখিয়া হয় নাই, তেমনইভাবে বাংলার স্বাধীনতা যদ্ধে সংঘটিত যুদ্ধাপরাধের বিচারও ধর্মবাদী রাজনীতিকে অক্ষুণ্ণ রাখিয়া হইতে পারে না। সুতরাং জিজ্ঞাসা করিতে হবে কী লইয়া বিচার। 'হিং-টিং-ছট' মন্ত্র মানুষ মানবে কেনো, তা যতো তারস্বরেই হোক?

    অতঃপর গৌড় হতে এল হেন বেলা,
    যবন পণ্ডিতের গুরুমারা চেলা।
    নগ্নশির, সজ্জা নাই, লজ্জা নাই ধড়ে,
    কাছা কোঁচা শতবার খসে খসে পড়ে।
    না জানে অভিবাদন, না পুছে কুশল,
    পিতৃনাম শুধাইলে উদ্যতমুষল।
    সর্বাগ্রে জিজ্ঞাসা করে, ‘কী লয়ে বিচার!
    শুনিলে বলিতে পারি কথা দুই-চার,
    ব্যাখ্যায় করিতে পারি উলটপালট।’
    সমস্বরে সবে কহে - হিং টিং ছট।

     

    রোববার, ১৫ই জানুয়ারী ২০১২

আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd>
  • Lines and paragraphs break automatically.

লেখা ফরম্যাট করার বিষয়ে আরো তথ্য

আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন