• অচেনা বামুনকে পৈতা ধরাইয়া দেওয়া
    এলিসা এনুম

    ৭ জুলাই ঢাকার একটি নামকরা দৈনিকের প্রথম পাতায় ছাপা একটি ক্ষুদ্র কিন্তু বোমার ন্যায় সংবাদ, যার শিরোনামঃ 'ল্যাম্পপোস্ট নামে গুলশানে চরমপন্থী সংগঠনের বিক্ষোভ? গ্রেপ্তার দু কর্মী ৫ দিনের রিমান্ডে'। সংবাদ ছাপা হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক নামে। প্রতিবেদক জানানঃ

    গুলশানে ভারতীয় হাইকমিশনের সামনে বিক্ষোভ ও সংঘর্ষের ঘটনায় গ্রেপ্তার হওয়া দু-যুবক আশিষ কোড়ায়া (৩৬) ও প্রিন্স মাহমুদকে (৩১) পাঁচ দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। গুলশান থানা পুলিসের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গতকাল সোমবার ঢাকা মহানগর হাকিম আদালত এ-রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

    গত রোববার ভারতের টিপাইমুখ বাঁধ নির্মাণের প্রতিবাদেও ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তীকে প্রত্যাহারের দাবীতে ল্যাম্পপোস্ট নামের একটি সংগঠন বিক্ষোভ করে। বিক্ষোভকারীরা এক পর্যায়ে হাইকমিশনে ঢুকতে চাইলে পুলিসের সঙ্গে হাতা-হাতি, ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষ হয়। এতে পাঁচ পুলিস-সহ ১০-১২ জন আহত হন। পুলিস ঘটনাস্থল থেকে দু-বিক্ষোভকারী আশিষ ও প্রিন্সকে গ্রেপ্তার করে।

    গুলশান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কামরুল আলম মোল্লা জানান, ল্যাম্পপোস্ট কী ধরণের সংগঠন সেটা এখনও তারা জানেন না। এ-ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করতে গ্রেপ্তার হওয়া দুজনকে রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে।

    এদিকে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, চরমপন্থী সংগঠন পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টি (এমএল) ভেঙে জন্ম নেওয়া কথিত নতুন একটি মাওবাদী সংগঠনই রোববার ল্যাম্পপোস্টের ব্যানারে বিক্ষোভ ও সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। ওই গোপন সংগঠনটির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রিক পাঠচক্রের নাম ল্যাম্পপোস্ট। এ-নামে সংগঠনের একটি মুখপত্রও রয়েছে।

    গতকাল দুপুরে এ-সংগঠনের পক্ষ থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে সংবাদ সম্মেলনে গ্রেপ্তার হওয়া আশীষকে ল্যাম্পপোস্টের মুখ্য সম্পাদক এবং প্রিন্সকে সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য বলে দাবী করে এবং তাঁদের মুক্তি চায়। একই সঙ্গে তারা বিক্ষোভের সময় তাদের সদস্যদের উপর হামলার বিচারও দাবী করে।

    সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করা হয়, রোববার শান্তিপূর্ণ কর্মসূচির শুরুতেই পুলিস লাঠিচার্জ, নারী কর্মীদের জামাকাপড় ধরে টানা হ্যাঁচড়া করে ও বুটের লাথি মেরে আহত করে। তাঁদের দাবী, হামলায় আহত তাঁদের ছয় কর্মী চিকিৎসাধীন আছে। তবে আহতদের নাম পরিচয় এবং কোথায় চিকিৎসাধীন আছে, সেটা বলতে রাজি হননি।

    সংবাদ সম্মেলন আয়োজনকারীদের মধ্যে প্রদীপ নিজেকে ল্যাম্পপোস্টের উপদেষ্টা এবং আফরোজা খাতুন, ফেরদৌস অপু, ঝুমা সাধারণ সদস্য বলে পরিচয় দিয়েছে। তবে তাঁরা কেউ পুরো নাম, পরিচয় জানাতে রাজি হননি। সংগঠন সম্পর্কে জানতে চাইলে তারা তা এড়িয়ে যান। শুধু বলেন, তাঁরা পাঠচক্র-ভিত্তিক একটি সংগঠনের প্রতিনিধিত্ব করছেন এবং ল্যাম্পপোস্ট তাদের একটি মুখপত্র। এর সঙ্গে জড়িতরাই রোববার বিক্ষোভে অংশ নিয়েছিল।

    ল্যাম্পপোস্টের সদস্যদের দাবীর সঙ্গে একাত্মতা পোষণ করে পোস্ট লিবারেশন স্টুডেন্টস ইউনিয়ন ফর বেটার বাংলাদেশ নামে অখ্যাত একটি সংগঠনের ব্যানারে কিছু তরুণ গতকাল বিকেলে ক্যম্পাসে মিছিল করে।

    এদিকে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, ২০০৫ সালে ঢাকা থেকে পূর্ব বাংলা কমিউনিস্ট পার্টির (এমএল) শীর্ষ নেতা মোফাখখার চৌধুরীর গ্রেপ্তার ও ক্রস-ফায়ারে মৃত্যুর ঘটনায় সংগঠনটিতে বিরোধ হয়। তখন এ-নিয়ে তাদের নিজেদের মধ্যে খুনোখুনিও হয়।

    নিজেদের মাওবাদী দাবীদার পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টি (এমএল) ২০০৫ সালের ৫ অক্টোবর এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে সংগঠনের কেন্দ্রীয় তিন নেতা রিত্বিক ওরফে আত্তাব ওরফে দাউদ, কাজী হেলালুজ্জামান হেলাল ওরফে শফি ও ওলিয়ার ওরফে সুমন ওরফে শামীমকে বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগে বহিস্কার করা হয়েছে বলে ঘোষণা দেওয়া হয়।

    জানা গেছে, এরপর এ বহিষ্কৃত নেতারা নতুন মাওবাদী সংগঠন গড়ার উদ্যোগ নেন এবং ল্যাম্পপোস্ট নামে পাঠচক্রের মাধ্যমে সদস্য সংগ্রহ শুরু করেন।

    উপরের লেখার বিশেষ অংশ-বিশেষ ধরে এগুনো যেতে পারে। ল্যাম্পপোস্ট নামে একটি চরমপন্থী সংগঠন এর বিক্ষোভ। প্রতিবেদক বিশ্ববিদ্যালয়ের। সারাদিনরাত সেখানে থেকে প্রতিবেদক জিজ্ঞাসাচিহ্ন ব্যবহার করেন। এখনও বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক দেয়ালে ল্যাম্পপোস্ট এর নামে একাধিক  দেয়াল-লিখন দেখা যাবে - সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী দেয়াল-লিখন। অথচ পত্রিকা তাদের সম্পর্কে খুব বেশি জানলো না, দেশবাসীর সামনে জিজ্ঞাসাবোধক চিহ্ন তুলে ধরলো । ল্যাম্পপোস্ট লিখে কোটেশন চিহ্ন দিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করা হয়েছে আদৌ এ-নামের কোনো সংগঠন আছে কি-না। পত্রিকায় অনেক গল্প লেখা হয়েছে যার সূত্র উল্লেখ করা হয়নি। আরেকবার লেখা হয়েছে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র। এ-ধরণের দায়িত্বহীন রিপৌর্টিং করেছে প্রথম-সারির একটি দৈনিক । কথা উঠতে পারে, ওদের কাজ ওরা করেছে। আমরা দেখবো কেনো? আমরাও কিছু করে দেখাই। প্রশ্ন-একঃ কিন্তু চাইলেই কি সাধারণ মানুষ এধরণের প্রতিবেদনের বিপরীতে কোনো পদক্ষেপ নিতে পারে?

    প্রতিবেদনে আরেক জায়গায় লেখা আছে - তবে আহতদের নাম পরিচয় এবং কোথায় চিকিৎসাধীন আছে, সেটা বলতে রাজি হননি। প্রশ্ন-দুইঃ যারা বিক্ষোভ করতে গিয়েছিলো এবং যারা সংবাদ সম্মেলন করেছিলো, তারা কি সহকর্মীদের নিরাপত্তার স্বার্থে এটুকু করার কথা ভাববে না? বিক্ষোভ স্থান থেকে কর্মীদের ধরে নিয়ে যাবার মতো বাস্তবতায় আহত কর্মীদের ঠিকানা বলে দেয়াটা কতো বড়ো মাপের মূর্খতা হতে পারতো?

    সংবাদ-সম্মেলনকারীদের সম্পর্কে বলতে গিয়ে লেখা হয়েছে প্রদীপ নিজেকে ল্যাম্পপোস্টের উপদেষ্টা এবং আফরোজা খাতুন, ফেরদৌস অপু, ঝুমা সাধারণ সদস্য বলে পরিচয় দিয়েছে। তবে তাঁরা কেউ পুরো নাম, পরিচয় জানাতে রাজি হননি। আফরোজার নাম আফরোজা খাতুন লেখা হয়েছে প্রতিবেদনে, ফেরদৌস অপুর নামটিও পুরো বলেই ধরে নেয়া যেতে পারে বাকি থাকলো ঝুমা আর প্রদীপ। প্রদীপ পুরো নাম না বললেও তিনি যে ল্যাম্পপোস্টের উপদেষ্টা তাতো বলেছেন। প্রশ্ন-তিনঃ তারপরও কি করে এদের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ আনা হলো যে, তারা পুরো নাম, পরিচয় জানাতে রাজী হননি?

    পোস্ট লিবারেশন স্টুডেন্টস ইউনিয়ন ফর বেটার বাংলাদেশ নামে অখ্যাত সংগঠন ল্যাম্পপোস্টের পক্ষে মিছিল করেছে বলে প্রতিবেদনে দাবী করা হয়েছে। প্রতিবেদকের মতোই বলতে পারি, সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে জেনেছি, প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হবার দিন এ-সংগঠনটি পত্রিকা অফিসে বিজ্ঞপ্তি পাঠিয়ে জানায়, তারা এ-সংগঠনের সাথে সংশ্লিষ্ট না। প্রতিবেদনটি কী-ধরণের প্রভাব ফেলেছে, এ-থেকেই বুঝা যায়। যারা পাঠ করেছেন, সকলেই বুঝেছেন পুলিসী নজরদারীর মধ্যে পড়ে যাবার মধ্যে কাজ করার ঝুঁকির মধ্যে এদের পক্ষে এখন কাজ করাটা কতোটা বিপজ্জনক । প্রশ্ন-চারঃ উপরে বর্ণিত বিজ্ঞপ্তিটি দেখে প্রতিবেদক যদি তৃপ্তির ঢেকুর তুলে বলেন, আমি ঠিক তথ্যই দিয়েছি, তাহলে কি তাকে কিছু বলার থাকে?

    প্রতিবেদনের শেষ লাইনে ছিলো- জানা গেছে, এরপর এ-বহিষ্কৃত নেতারা নতুন মাওবাদী সংগঠন গড়ার উদ্যোগ নেন এবং ল্যাম্পপোস্ট নামে পাঠচক্রের মাধ্যমে সদস্য সংগ্রহ শুরু করেন। এ-থেকে সাধারণ বা অসাধারণ পাঠক মনে করে বসতে পারেন যে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এ-ধরণের নিষিদ্ধ দলের সদস্য সংগ্রহ নিয়মিতই চলে। এটা অনেকের জন্যই বিপদজ্জনক। বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র রাজনীতি বন্ধ করা নিয়ে যে নীল নক্সা বাংলাদেশের রাজনীতিবিদ এবং তাদের দালাল সুশীল সমাজ কায়েম করতে চায়, এ-ধরণের প্রচারণা সে-লক্ষ্য বাস্তবায়নে সাহায্য করবে। লক্ষণীয় ব্যাপার, সংবাদটি প্রকাশিত হবার দিন মানে ৭ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্রাজ্যবাদী ৫ সংগঠন মিলিত হয়ে একটি প্রতিবাদ মিছিল করে ধৃতদের মৃক্তির দাবি জানায়। এ-খবর কিন্তু ৮ জুলাই পত্রিকার প্রথম পাতায় জায়গা পায়নি; সন্দেহ দানা বেঁধে ওঠার কারন আছে বৈকি।

    একটি দেশের প্রত্যেক নাগরিক তার অধিকার সংশ্লিষ্ট বিষয়ে কথা বলতে পারা, তর্ক-বিতর্ক করা এবং সুষ্ঠু পরিবেশে নিজের এবং রাষ্ট্রের স্বার্থে প্রতিবাদ করতে পারার কথা। গণতন্ত্রের মধ্যে যখন কেউ সেটা পারে না তখন ফ্যাসিস্ট পরিবেশ তৈরী হয়েছে, বলা যায় নাকি যায় না?

    ল্যাম্পপোস্ট নামধারী সংগঠন যদি নাও থাকে, কয়েকজন নাগরিক যদি তাদের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠায় কোনো প্রতিবাদ জানায়, সেটা কি অনায্য হয়ে যায়। এটা কার দোষ যে, ল্যাম্পপোস্টকে কেউ চেনে না? যখন খবর এলো, এ-নামের একটি সংগঠন বিক্ষোভ জানিয়েছে, তখন যেহেতু তাদের চেনা নাই, সেহেতু চলো তাদের চেনার ব্যবস্থা করি। অতএব খ্যাতিমান পত্রিকাটি সিদ্ধান্ত নিলো কারণ থাকুক বা না থাকুক, এদের সাথে চরমপন্থীদের সাথে সংযোগ ঘটিয়ে দিই। এদের সাথে চরমপন্থী কারও যোগাযোগ আছে বা নাই, তা নিয়ে আমি কোনো কথা বলছি না। আমার আপত্তি শুধু সুযোগের অ-সৎ ব্যবহার করার বিষয়টিতেই। কেনো-না, ৭ তারিখের প্রতিবেদনটি প্রকাশের আগে ল্যাম্পপেস্টকে সবার সামনে পরিচয় করিয়ে দিয়ে প্রতিবেদক বলতে পারতেন - এই হলো ল্যাম্পপোস্ট, যাদের কাজ আলো ছড়ানো না, মাটির তলের অন্ধকারে টেনে নিয়ে যাওয়া। এরা চরমপন্থী। কিন্তু তা না করে যখন একটা জাতীয় ইস্যুতে ল্যাম্পপোষ্ট যখন দিনে-দুপুরে প্রতিবাদে নামলো তখন এমন একটা মন্তব্যধর্মী প্রতিবেদন যথেষ্ট অন্যায্য বৈকি।

    তাহলে ব্যাপারটা কেমন দাঁড়াচ্ছে? তাহলে এখন থেকে অচেনা, অখ্যাত ও অনির্ধারিত বিক্ষোভ দেখলেই চরমপন্থীর তকমা লাগিয়ে দিতে হবে?

    আপলৌডঃ ১১ জুলাই ২০০৯

আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন