• আদিবাসী সংস্কৃতি ও আত্ম-পরিচয়ের অধিকার
    জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা

    [ ৯ আগষ্ট আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস ২০১০ উপলক্ষ্যে ঢাকায় বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের সভাপতি জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমার পঠিত বক্তব্য।]

    প্রিয় সাংবাদিক বন্ধুগণ,

    বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের শুভেচ্ছা গ্রহণ করুন। প্রতি বছরের মতো এবারও আপনাদের আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবসের আগাম আমন্ত্রণ জানাই। বিশ্বের ৭০টি দেশের ৩৭ কোটি আদিবাসী জনগণের মতো বাংলাদেশ আদিবাসী জনগণও এবার জাতিসংঘ ঘোষিত আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস ৯ আগস্ট জাতীয়ভাবে পালনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এবারের দিবসের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় হলো - আদিবাসী সংস্কৃতি ও আত্ম-পরিচয়ের অধিকার। আমরা সকলে জানি যে, আদিবাসীরা নানামুখী শোষণ ও বৈষম্যের কারণে তাদের আত্ম-পরিচয় ও সংস্কৃতি হারাতে বসেছে।

    আপনারা জানেন, বাংলাদেশ একটি বহু জাতির, বহু ভাষার, বহু সংস্কৃতির বৈচিত্র্যপূর্ণ দেশ। এ দেশে বৃহত্তর বাঙালি জনগোষ্ঠী ছাড়াও প্রায় ৩০ লক্ষ জনসংখ্যার ৪৫টি আদিবাসী ক্ষুদ্র-ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী স্মরণাতীত কাল থেকে বসবাস করে আসছে। বাংলাদেশের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত রয়েছে তাদের জীবন, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, ইতিহাস ও আশা-আকাঙ্খা। বাংলাদেশের কোটি-কোটি জনগণের সঙ্গে তারা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। কিন্তু অত্যন্ত লক্ষনীয় বিষয় যে, বাংলাদেশের সংবিধানে আদিবাসীদের অস্তিত্ব আজ অবধি অস্বীকৃত। অথচ এদেশের জাতীয় সংহতি, উন্নয়ন, গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের প্রেক্ষাপটে এসব জাতিসমূহের সাংবিধানিক স্বীকৃতি প্রদান করা অপরিহার্য বলে বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে। সম্প্রতি সরকার সংবিধান সংশোধনের পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে এবং এ লক্ষ্যে একটি বিশেষ কমিটি কাজ করছে। আমরা আশা করবো, সংবিধান সংশোধনের সময় এবার আদিবাসীদের অস্তিত্ব, পরিচয়, সংস্কৃতি ও অধিকারের স্বীকৃতিও সংবিধানে অন্তর্ভূক্ত হবে এবং এতে রাষ্ট্র হিসেবে আমাদের দেশ আরও সম্মানিত হবে দেশে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে। কেননা জাতিসংঘ নিজে আদিবাসীদের অধিকার প্রতিষ্ঠা ও উন্নয়নে এগিয়ে আসার জন্য সদস্যরাষ্ট্রসমূহকে আহ্বান জানিয়ে আসছে। তা ছাড়া আদিবাসী বিষয়ক সংসদীয় ককাস সক্রিয়ভাবে কাজ করছে যেখানে কয়েকজন আদিবাসী-বান্ধব সংসদ সদস্য রয়েছেন। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, বাংলাদেশ কর্তৃক অনুস্বাক্ষরিত নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক চুক্তি এবং অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক চুক্তি মোতাবেক প্রত্যেক নাগরিকের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার রয়েছে এবং উক্ত অধিকার বলে প্রত্যেক নাগরিকের স্বাধীনভাবে রাজনৈতিক মর্যাদা নির্ধারণ করার অধিকার রয়েছে।

    আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার বিষয়ক জাতিসংঘ ঘোষণাপত্রের ৩নং অনুচ্ছেদ অনুসারে "আদিবাসী জনগোষ্ঠীর আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার রয়েছে। সেই অধিকার বলে তারা অবাধে তাদের রাজনৈতিক মর্যাদা নির্ধারণ করতে পারবে”। এতে আরো বলা হয় যে, আদিবাসী জনগোষ্ঠীর আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার উপভোগের বেলায়, তাদের অভ্যন্তরীণ ও স্থানীয় বিষয়ে তথা স্বশাসিত কার্যাবলীর অর্থায়নের পন্থা ও উৎস নির্ধারণের ক্ষেত্রে তাদের স্বায়ত্তশাসন বা স্ব-শাসিত সরকারের অধিকার রয়েছে। আদিবাসী জনগোষ্ঠীর রাষ্ট্র কিংবা তাদের উত্তরসূরীর সাথে সম্পাদিত চুক্তি, সমঝোতা স্মারক এবং অন্যান্য গঠনমূলক ব্যবস্থাবলীর স্বীকৃতি, প্রতিপালন এবং বাস্তবায়ন করার অধিকার রয়েছে এবং এসব চুক্তি, সমঝোতা স্মারক ও গঠনমূলক ব্যবস্থাবলীর অবশ্যই রাষ্ট্রীয় মর্যাদা লাভের অধিকার রয়েছে।

    আমরা বেশ আশান্বিত হয়েছিলাম যে, ক্ষমতাসীন আওয়ামীলীগের নির্বাচনী ইশতেহারে স্পষ্টভাবে অঙ্গীকার করা হয়েছিল আদিবাসীদের উন্নয়ন ও অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। নির্বাচনী ইশতেহারে বলা হয়েছিল, "ধর্মীয় সংখ্যালঘু, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, আদিবাসী ও চা বাগানে কর্মরত শ্রমজীবী জনগোষ্ঠীর ওপর সন্ত্রাস, বৈষম্যমূলক আচরণ এবং মানবাধিকার লংঘনের চির অবসান, তাদের জীবন, সম্পদ, সম্ভ্রম, মান-মর্যাদার সুরক্ষা এবং রাষ্ট্র ও সমাজ জীবনের সর্বক্ষেত্রে সমান অধিকারের বাস্তব প্রয়োগ নিশ্চিত করা হবে। আদিবাসীদের জমি, জলাধার এবং বন এলাকায় সনাতনী অধিকার সংরক্ষণের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণসহ ভূমি কমিশন গঠন করা হবে। সংখ্যালঘু, আদিবাসী ও ক্ষুদ্র নৃ-জাতিগোষ্ঠীর প্রতি বৈষম্যমূলক সকল প্রকার আইন ও অন্যান্য ব্যবস্থার অবসান করা হবে। ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু এবং আদিবাসীদের জন্য চাকুরি ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিশেষ সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা হবে। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি সম্পূর্ণভাবে বাস্তবায়ন করা হবে। অনগ্রসর অঞ্চলসমূহের উন্নয়নে বর্ধিত উদ্যোগ, ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী, আদিবাসী ও অন্যান্য সম্প্রদায়ের অধিকারের স্বীকৃতি এবং তাদের ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও জীবনধারার স্বাতন্ত্র্য সংরক্ষণ ও তাদের সুষম উন্নয়নের জন্য অগ্রাধিকার ভিত্তিক কর্মসূচি গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা হবে।” বলাবাহুল্য, বিগত প্রায় ১৮ মাসে আদিবাসী জীবনে নির্বাচনী ইশতেহারের এসব কথার প্রতিফলন আমরা দেখতে পাইনি, তবে আশা করি আগামী দিনে এসবের প্রতিফলন আমরা দেখতে পাবো।

    সাংবাদিক বন্ধুগণ,
    আদিবাসী অধিকারের সাংবিধানিক স্বীকৃতি প্রদানের জন্য জাতীয় সংসদে বর্তমান সরকারের প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। দেশে গণতান্ত্রিক শাসন এবং গণমুখী ও পরিবশমুখী সুষম উন্নয়ন নিশ্চিতকরণ, সর্বোপরি আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকারের স্বীকৃতিসহ সার্বিক উন্নয়নের কোনো বিকল্প নেই। বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম বিশ্বাস করে যে, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নসহ আদিবাসী অধিকারের স্বীকৃতি প্রদানের ক্ষেত্রে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের এখনই উপযুক্ত সময়। তাই আমরা, দেশের আদিবাসী জনগোষ্ঠী, সরকারের এই অঙ্গীকার অনুযায়ী আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সাংবিধানিক স্বীকৃতি দ্রুত ও যথাযথ বাস্তবায়ন দেখতে চাই।

    বলার অপেক্ষা রাখে না যে, বাংলাদেশ কর্তৃক অনুস্বাক্ষরিত ১৯৫৭ সালের আদিবাসী ও জনজাতি [ট্রাইবাল] সংক্রান্ত আইএলও কনভেনশন নং ১০৭ এবং ২০০৭ সালে জাতিসংঘ কর্তৃক গৃহীত আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার বিষয়ক ঘোষণাপত্র ও মানবাধিকার সংক্রান্ত অন্যান্য আন্তর্জাতিক চুক্তি মোতাবেক আদিবাসীদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার, ভূমি ও ভূ-খণ্ডের উপর অধিকার, আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ভূমি ও ভূখণ্ডের উপর সামরিক কার্যক্রম বন্ধের অধিকার, ভূমি থেকে তাদেরকে জোরপূর্বক উচ্ছেদ থেকে রেহাই পাওয়ার অধিকার আদিবাসীদের রয়েছে। দেশের আদিবাসী জনগোষ্ঠী আশা করে যে, এ-বছরের আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবসকে সামনে রেখে বর্তমান সরকার আদিবাসীদের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক, সামাজিক ও ভূমি অধিকারসহ সাংবিধানে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর স্বীকৃতি প্রদানে এগিয়ে আসবে।

    প্রিয় সাংবাদিক বন্ধুগণ,
    আপনারা নিশ্চয় জানেন, জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে আদিবাসীদের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন অব্যাহতভাবে এগিয়ে চলছে। বর্তমানে জাতিসংঘ ঘোষিত দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক আদিবাসী দশক (২০০৫-২০১৪) চলছে। দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক আদিবাসী দশকের কর্ম-পরিকল্পনা হিসেবে ৫টি লক্ষ্য গ্রহণ করা হয়েছে। এগুলো হলো-
    আঞ্চলিক, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নীতি-নির্ধারণ ও তা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা; আদিবাসীদের জীবনধারাকে সরাসরি প্রভাবিত করে এমন সকল ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণের বেলায় আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মতামত গ্রহণ করা; আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বৈচিত্র্যতার সাথে যথাযথভাবে সঙ্গতি বিধানের জন্য উন্নয়ন নীতি গ্রহণ করা; আদিবাসী নারী, শিশু ও তরুণদের গুরুত্ব প্রদান করে আদিবাসীদের জন্য উন্নয়ন কার্যক্রম গ্রহণ করা; এবং আঞ্চলিক, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আদিবাসীদের জন্য সংরক্ষণমূলক ব্যবস্থা গড়ে তোলা।

    উল্লেখিত লক্ষ্যমাত্রার আলোকে জাতিসংঘসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের আন্তঃরাষ্ট্রীয় সংস্থা, আদিবাসী সংগঠন, বেসরকারি সংস্থা ও সুশীল সমাজ স্ব-স্ব কর্মক্ষেত্রে উল্লেখিত কর্ম-পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়নের প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় যে, জাতিসংঘের সদস্য-রাষ্ট্র হয়েও বাংলাদেশ উল্লেখিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য কোনো বিশেষ কর্মপরিকল্পনা এখনো গ্রহণ করেনি। আপনারা নিশ্চয় জানেন যে, দেশের দরিদ্র, বঞ্চিত ও পশ্চাদপদ আদিবাসী জনগোষ্ঠীর উন্নয়নের জন্য সরকারের কোনো উন্নয়ন নীতিমালা নেই। আদিবাসীদের উন্নয়নের ক্ষেত্রে যে সকল উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নেয়া হয়, তা অনেকটা উপর থেকে আদিবাসীদের উপর চাপিয়ে দেয়া হয়। এসব উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন, গ্রহণ ও বাস্তবায়নে আদিবাসীদের সিদ্ধান্ত-নির্ধারণী কোনো ভূমিকা নেই। তাই এসব উন্নয়ন কার্যক্রমের ফলে আদিবাসীদের সামগ্রিক উন্নয়ন তো দূরের কথা, এতে আদিবাসী জীবনধারা বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। তাদের ঐতিহ্যগত সংস্কৃতি, জাতিগত অস্তিত্ব এবং ভূমি ও সম্পদের উপর তাদের মালিকানা স্বত্বকে বিপন্ন করে তোলে চরমভাবে। কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ বাঁধ নির্মাণ, মধুপুরে বনায়ন, ইকো-পার্ক ও জাতীয় উদ্যান ঘোষণা, পার্বত্য চট্টগ্রামে সরকারি উদ্যোগে দরিদ্র বাঙালি অভিবাসন কার্যক্রম ইত্যাদি প্রকল্প তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। অনুরূপভাবে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীন বিশেষ কার্যাদি বিভাগ কর্তৃক দেশের সমতল অঞ্চলের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর উন্নয়ন কার্যক্রমের ক্ষেত্রেও সমতল আদিবাসীদের কোন সিদ্ধান্ত-নির্ধারণী ভূমিকা নেই। এই বিভাগের থোক বরাদ্দের ক্ষেত্রে আদিবাসীদের কোনো অংশগ্রহণ নেই, ফলে এই বরাদ্দ আদিবাসীদের মধ্যে নতুন সমস্যা তৈরি করছে, যা তাদের চিরকালীন ঐক্য ও সংহতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

    নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার বিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তির ২৭ নং অনুচ্ছেদে "যেসব দেশে জাতিগত, ধর্মগত, অথবা ভাষাগত সংখ্যালঘু রয়েছে সেসব দেশে অনুরূপ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্যদের জন্য তাদের গোষ্ঠীর অন্যান্য সদস্যদের সাথে সম্মিলিতভাবে নিজেদের সংস্কৃতি উপভোগ, নিজেদের ধর্ম ব্যক্ত ও অনুশীলন অথবা নিজেদের ভাষা ব্যবহার করার অধিকার অস্বীকার করা যাবে না।” আইএলও’র ১৯৫৭ সালের আদিবাসী ও ট্রাইবাল জনগোষ্ঠী কনভেনশনে (১০৭ নং কনভেনশন) আদিবাসী জনগোষ্ঠীর নিজস্ব সংস্কৃতি ও প্রথাগত প্রতিষ্ঠান অক্ষুন্ন রাখার অধিকারসহ বিভিন্ন অধিকারের স্বীকৃতি দিয়েছে। আইএলও’র ১৯৮৯ সালের আদিবাসী ও ট্রাইবাল জনগোষ্ঠী কনভেনশনে (১৬৯ নং কনভেনশন) আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর তাদের নিজস্ব প্রথা এবং ঐতিহ্য মোতাবেক তাদের আত্মপরিচয় অথবা সদস্যপদ নির্ধারণের অধিকার রয়েছে। উক্ত দু’টি কনভেনশনে আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর শিশুদের তাদের নিজস্ব আদিবাসী ভাষায় অথবা তাদের জনগোষ্ঠী কর্তৃক সাধারণভাবে বহুল ব্যবহৃত ভাষায় পড়া ও লিখার জন্য শিক্ষাদান করার অধিকার স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে।
    দেশের সমতল অঞ্চলের মধ্যে বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলে এককালে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জন্য "আংশিক শাসন-বহির্ভূত এলাকা” সম্বলিত বিশেষ শাসন ব্যবস্থা প্রচলন ছিল এবং এতে আদিবাসীদের অধিকার ও প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা হয়েছিল। কিন্তু বর্তমানে দেশের সমতল অঞ্চলে কোথাও আদিবাসীদের জন্য বিশেষ শাসন ব্যবস্থা প্রচলন নেই। এমনকি জাতীয় সংসদসহ স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায়ও সমতল অঞ্চলে বা পার্বত্য চট্টগ্রামে কোথাও আদিবাসীদের আসন সংরক্ষণের ব্যবস্থা নেই। ফলশ্রুতিতে বিশেষ করে সমতল অঞ্চলে আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকায় বৃহত্তর বাঙালি জনগোষ্ঠীর সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে ইউনিয়ন পরিষদের মতো সর্বনিম্ন স্থানীয় সরকার পরিষদেও আদিবাসীরা নির্বাচিত হতে পারে না। দেশের শাসনব্যবস্থার কোনো স্তরে আদিবাসীদের প্রতিনিধিত্ব না থাকায় তারা বরাবরই সকল ক্ষেত্রে বঞ্চনা ও অবহেলার শিকার হয়ে আসছে। তাই আদিবাসী জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিতকরণের জন্য পার্বত্যাঞ্চলের সংসদীয় আসনসহ দেশের আদিবাসী অধ্যুষিত অঞ্চলগুলোতে আদিবাসীদের জন্য জাতীয় সংসদ ও স্থানীয় সরকার পরিষদে আসন সংরক্ষণ করা অপরিহার্য।

    প্রিয় সাংবাদিক বন্ধুগণ,
    দেশের আদিবাসী জনগণের মানবাধিকার পরিস্থিতি অত্যন্ত নাজুক। অতি সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আদিবাসীদের ভূমি জবরদখল ও তাদের চিরায়ত ভূমি থেকে উচ্ছেদ করার হীন উদ্দেশ্যে প্রশাসনের ছত্রছায়ায় আদিবাসী জনগোষ্ঠীর উপর সংঘবদ্ধ হামলা জোরদার হয়েছে। শ্রীমঙ্গলে নাহার খাসি পুঞ্জিতে খাসিদের ভূমি থেকে পাঁচ হাজারের অধিক গাছ জোরপূর্বক কেটে নেয়া হয়েছে। পানপুঞ্জির খাসি ও গারোদের ভূমি সমস্যার সমাধান এখনো হয়নি। মধুপুরের বনে মান্দিদের ভূমি সমস্যা ও শত-শত বনমামলার কোনো সুরাহা হয়নি। বরগুনা ও পটুয়াখালীতে রাখাইনদের জমিজমা নিয়ে সমাধানের কোনো লক্ষণ নেই। নওগাঁ জেলার পোরশা উপজেলাধীন খাতিরপুর (সোনাদাঙ্গা) ভূমিহীন আদিবাসী গ্রামে বর্বরোচিত হামলা চালিয়ে ৭৩টি বসতবাড়ি মাটির সঙ্গে গুড়িয়ে দিয়েছিল সন্ত্রাসীরা ২০০৯ সালের জুন মাসে। এর কোনো বিচার হয়নি এবং আদিবাসীদের পুনর্বাসনের কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি।

    অন্যদিকে রাঙ্গামাটি জেলার বাঘাইছড়ি উপজেলাধীন সাজেক-বাঘাইহাট এলাকায় গত ফেব্রুয়ারি মাসে যে হামলা চালানো হয়েছিল এবং দুই পাহাড়িকে হত্যা করা হয়েছিল, এ বিষয়ে সরকার জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যাপক প্রতিবাদ ও লেখালেখির পরও কোনো তদন্ত কমিটিও গঠন করেনি। খাগড়াছড়িতেও সাম্প্রদায়িক হামলা চালানো হয়েছিল। এসবের কোনো বিচার হয়নি। এদিকে চট্টগ্রামের সীতাকুন্ড এলাকায় ছোট কুমিরা, বড় কুমিরা ও মিরসরাই গ্রামের ত্রিপুরাদের প্রতারণা ও জোরপূর্বক ভূমি থেকে উচ্ছেদ প্রক্রিয়া চলছে এবং তারা অসহায়ভাবে মানবেতর জীবনযাপন করছে।

    বর্তমান সরকার পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নে কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। গত বছর পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন কমিটির আহবায়ক হিসেবে সংসদ উপনেতা সাজেদা চৌধুরীকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। প্রত্যাগত জুম্ম শরণার্থী ও আভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু পুনর্বাসন সংক্রান্ত টাস্কফোর্সের চেয়ারম্যান হিসেবে খাগড়াছড়ি থেকে নির্বাচিত সাংসদ যতীন্দ্র লাল ত্রিপুরাকে এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান পদে বান্দরবান থেকে নির্বাচিত সাংসদ বীর বাহাদুরকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। গত বছরই পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি খাদেমুল ইসলাম চৌধুরীকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। কিন্তু ভূমি কমিশনের চেয়ারম্যান কমিশনের অন্যান্য সদস্যদের বাদ দিয়েই এককভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করছেন। ভূমি জরিপের বিষয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন সার্কেল চীফ, সুধী সমাজ, বিভিন্ন আদিবাসী সংগঠন এবং সবস্তরের আদিবাসী জনগণ আপত্তি জানিয়েছেন।

    বলার অপেক্ষা রাখে না যে, বতর্মান মহাজোট সরকারের মেয়াদ দেড় বছারাধিক কাল অতিবাহিত হলেও আজ অবধি পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি। বরঞ্চ বলা যেতে পারে যে, সরকার পরিকল্পিতভাবে চুক্তি বাস্তবায়নে কালক্ষেপণ ও উদ্যোগহীনতা প্রদর্শন করে চলেছে। অধিকন্তু এই সরকারের আমলে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি পরিপন্থী ভূমি জরিপ ঘোষণা, ভূমি কমিশনের চেয়ারম্যান কর্তৃক একতরফা গণবিজ্ঞপ্তি জারী, উন্নয়নের নামে পার্বত্যাঞ্চলে সামাজিক বনায়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন, রাঙ্গামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন, পাহাড়ীদের ’আদিবাসী’ হিসেবে আখ্যায়িত না করে ’উপজাতি’ আখ্যায়িত করার পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে উগ্র সাম্প্রদায়িক ও জাতিবিদ্বেষী চিঠি প্রেরণ, পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন জায়গায় ভূমি বেদখলসহ পাহাড়ী জনগণের উপর নানা সহিংস হামলায় মদদদান ইত্যাদি চুক্তি পরিপন্থী ও গণবিরোধী কার্যক্রম প্রতীয়মান হচ্ছে।

    পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনের চেয়ারম্যান মহোদয় গত ২৭ জানুয়ারী ২০১০ ভূমি কমিশনের একবার মাত্র আনুষ্ঠানিক সভা আহ্বান করার পর কমিশনের আর কোন বৈঠক আহ্বান করেননি। পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনের চেয়ারম্যান মহোদয় কমিশনের আনুষ্ঠানিক সভা ব্যতীত এবং ভূমি কমিশনের আলোচনা ও সিদ্ধান্ত ছাড়াই একতরফাভাবে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি পরিপন্থী ভূমি জরিপ ঘোষণা, ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তির দরখাস্ত আহ্বান করে গণবিজ্ঞপ্তি জারী, গণবিজ্ঞপ্তি ও আহ্বান প্রচারের নামে তিন জেলায় পদযাত্রা আয়োজন, জেলা ভূমি কমিশন নামে ভূমি কমিশনকে বিভক্তি ইত্যাদি কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন।

    ভূমি কমিশনের সদস্যদের সাথে বৈঠক না করে বিধি ও পদ্ধতি বহির্ভূতভাবে কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার ফলে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি মোতাবেক ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে নানা বিভ্রান্তি দেখা দিয়েছে এবং এর ফলে ভূমি বিরোধের ক্ষেত্রে নতুন জটিলতা ও অচলাবস্থা দেখা দিতে শুরু করেছে। বর্তমান সরকার পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নে কিছু পদক্ষেপ নিলেও চুক্তি যথাযথ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে এখনো পর্যন্ত কোন কার্যকর সামগ্রিক পরিকল্পনা ঘোষণা করেনি। নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের জন্য সময়সূচি ভিত্তিক পরিকল্পনা (রোডম্যাপ) ঘোষণার দাবি জানালেও সরকারের তরফ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। পুনর্বাসনের উদ্যোগের অভাবে অভ্যন্তরীণ জুম্ম উদ্বাস্তুরা এখনো মানবেতন জীবন কাটাতে বাধ্য হচ্ছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি কমিশন আইন ২০০১-এর বিরোধাত্মক ধারা পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি মোতাবেক সংশোধনের এখনো কোনো উদ্যোগ সরকারের তরফ থেকে লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি অনুযায়ী সেনা, এবিপি, আনসার ও ভিডিপি’র অস্থায়ী ক্যাম্প প্রত্যাহারের উদ্যোগ পরিলক্ষিত হচ্ছে না এবং ’অপারেশন উত্তরণ’ নামে সেনাশাসন এখনো প্রত্যাহার করা হয়নি।

    বিগত জরুরী অবস্থার সময় পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির নেতা-কর্মীসহ পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন ও আদিবাসীদের ভূমি অধিকার নিয়ে সোচ্চার আদিবাসী সংগঠকদের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মিথ্যা মামলা প্রত্যাহারের জন্য রিভিউ কমিটির নিকট জমা দেয়া হলেও এখনো কোনো মামলা প্রত্যাহার করা হয়নি। জরুরী অবস্থার সময়ে দায়েরকৃত মামলায় দেশের অধিকাংশ রাজনীতিক ও ব্যবসায়ীরা মুক্তি পেলেও জনসংহতি সমিতির সাধারণ সম্পাদক সত্যবীর দেওয়ানসহ অনেক আদিবাসী নেতা-কর্মী এখনো জেলে অন্তরীণ রয়েছেন। জরুরী অবস্থা চলাকালে চলেশ রিছিলসহ আদিবাসী সংগঠকদের বিচার-বহির্ভূত হত্যার সাথে জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান করা হয়নি।

    প্রিয় সাংবাদিক বন্ধুগণ,
    নানা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও বাংলাদেশের আদিবাসী জনগণ দেশের গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক ও প্রগতিশীল রাজনৈতিক ও নাগরিক সমাজকে সাথে নিয়ে অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে। সমগ্র দেশের আদিবাসীদের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ ও সম্পর্ক দিন-দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং আদিবাসীরা অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর সাহস ও শক্তি অর্জন করছে। বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে যে, সংগ্রামের পথেই আদিবাসীরা একদিন না একদিন তাদের আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হবে। এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে বিশ্বের অন্যান্য দেশের আদিবাসীদের মতো বাংলাদেশের আদিবাসীরাও ৯ আগস্ট আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস পালন করতে যাচ্ছে। এ দিবসটি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার আদায়ের পথে নতুন চেতনায় উজ্জীবিত ও ঐক্যবদ্ধ হওয়ার দিন।

    ৯ আগস্ট উপলক্ষে বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম ঢাকায় ৬ আগস্ট থেকে চারদিন ব্যাপী বিভিন্ন কর্মসূচী হাতে নিয়েছে। এসব কর্মসূচীর মধ্যে রয়েছেঃ

    ৬ আগস্ট বিকাল ৪টায় প্রীতি ফুটবল প্রতিযোগিতা হবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মাঠে সমতলের আদিবাসী ও পাহাড়ের আদিবাসীদের মধ্যে;
    ৭ আগস্ট সকাল ১০.০০ থেকে দিনব্যাপী আগাঁরগাঁওয়ের এলজিইডি ভবনে ’আদিবাসীদের ভূমি সমস্যা ও উন্নয়ন’ শীর্ষক জাতীয় সেমিনার; ৮ আগস্ট বিকাল ৫টায় শিল্পকলা একাডেমীতে আদিবাসী জীবন, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির উপর চিত্র, ফিল্ম ও ফটো প্রদর্শনী। এখানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন তথ্য ও সংস্কৃতি মন্ত্রী আবুল কালাম আজাদ। প্রদর্শনী চলবে ১০ আগস্ট পর্যন্ত। উদ্বোধনী অনুষ্ঠান কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে অনুষ্ঠিত হবে। উদ্বোধন করবেন বাংলাদেশের কমিউনিষ্ট পার্টির সভাপতি কমরেড মঞ্জুরুল আহসান খান। এতে জাতীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, বরেণ্য বুদ্ধিজীবী, আইনজীবী, সাংবাদিক, সাংস্কৃতিক কর্মী ও মানবাধিকার কর্মীরা বক্তব্য রাখবেন।

    ৯ আগষ্ট সকাল ১০টায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে আদিবাসী রালী ও আলোচনা সভা, সঙ্গে সাংস্কৃতিক ডিসপ্লে। উদ্বোধন করবেন বিচারপতি গোলাম রাব্বানী। এতে জাতীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, সংসদ সদস্য, বরেণ্য বুদ্ধিজীবী, আইনজীবী, সাংবাদিক, সাংস্কৃতিক কর্মী ও মানাবাধিকার কর্মীরা বক্তব্য রাখবেন। ৯ আগস্ট বিকাল ৪টায় মূল আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হবে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক কনফারেন্স সেন্টারে। আলোচনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন আইনমন্ত্রী ব্যারিষ্টার শফিক আহমেদ।

    আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস উপলক্ষ্যে অনুষ্ঠিতব্য এসব কর্মসূচীতে অংশগ্রহণের জন্য বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের পক্ষ থেকে আমি আপনাদের সকলকে সাদর আমন্ত্রণ জানাচ্ছি।
    আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবসে সরকারের নিকট বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের দাবী -
    ১। সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে ৪৫টি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জাতিসত্তা, ভাষা ও সংস্কৃতিসহ সাংবিধানিক স্বীকৃতি প্রদান করতে হবে।
    ২। আইএলও-এর ১০৭ ও ১৬৯ নং কনভেনশন এবং ২০০৭ সালে গৃহীত জাতিসংঘ আদিবাসী জনগোষ্ঠী অধিকার বিষয়ক ঘোষণাপত্র মোতাবেক আদিবাসীদের ঐতিহ্যগত ভূমি অধিকারের সাংবিধানিক স্বীকৃতি প্রদান করতে হবে।
    ৩। আদিবাসী ও জনজাতি (ট্রাইবাল) বিষয়ক আইএলও কনভেনশন নং ১৬৯ অবিলম্বে অনুস্বাক্ষর করতে হবে।
    ৪। জাতীয় পর্যায়ের সেক্টোরাল পলিসিগুলোতে আদিবাসী স্বার্থ সংরক্ষণের লক্ষ্যে তা সংশোধন পূর্বক সন্নিবেশ করতে হবে।
    ৫। বাংলাদেশ সরকারি প্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, বাংলাদেশ মিলিটারী একাডেমী, ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজ, জুডিসিয়াল সার্ভিস ও পুলিশ সার্ভিস প্রশিক্ষণমালায় পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি ও পার্বত্য চট্টগ্রামের বিশেষ শাসনব্যবস্থাসহ আদিবাসী অধিকার সংক্রান্ত বিষয় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
    ৬। পার্বত্যাঞ্চলের ৩টি সংসদীয় আসনসহ দেশের আদিবাসী অধ্যুষিত অঞ্চলগুলোতে আদিবাসীদের জন্য জাতীয় সংসদ ও স্থানীয় সরকার পরিষদে আসন সংরক্ষণ করতে হবে।
    ৭।  সময়সূচি ভিত্তিক পরিকল্পনা (রোডম্যাপ) ঘোষণার মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি অবিলম্বে যথাযথ বাস্তবায়ন করতে হবে।
    ৮।  মধুপুরসহ আদিবাসী ভূমিতে ইকো-পার্ক নির্মাণ বাতিল করতে হবে এবং বনবিভাগের নিপীড়ন ও নির্যাতনসহ আদিবাসীদের ভূমি জবরদখল বন্ধ করতে হবে। বনবিভাগ কর্তৃক দায়েরকৃত মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করতে হবে। ভূমিগ্রাসী দখলদারদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। জোরপূর্বক সামাজিক বনায়ন কর্মসূচি বাতিল করতে হবে।
    ৯। বিশেষ কার্যাদি বিভাগের দায়িত্ব পার্বত্য চট্টগ্রাম মন্ত্রণালয়ে ন্যস্ত করতে হবে এবং সমতলের আদিবাসীদের জন্য ভূমি কমিশন গঠন করতে হবে।
    ১০। আদিবাসীদের মাতৃভাষা ও সংস্কৃতির অধিকার দিতে হবে। প্রাথমিক স্তর পর্যন্ত আদিবাসীদের মাতৃভাষায় পড়াশোনার ব্যবস্থা করতে হবে। আদিবাসী অঞ্চলের বিদ্যালয়সমূহে আদিবাসী শিক্ষক নিয়োগ করতে হবে।
    ১১। আদিবাসী অঞ্চলে সরকারি ও বেসরকারি কোনো উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণের পূর্বে আদিবাসীদের স্বাধীন মতামত গ্রহণ করতে হবে এবং প্রকল্পে আদিবাসীদের ফলপ্রসূ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। আদিবাসীদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেই, এরকম উন্নয়ন পদক্ষেপ আদিবাসী অঞ্চলে গ্রহণ করা যাবে না।
    ১২। ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর পরিবর্তে ’আদিবাসী” হিসেবেই আদিবাসীদের পরিচয়ের স্বীকৃতি দিতে হবে। ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান আইন পরিবর্তন করে ”আদিবাসী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান আইন” করতে হবে এবং ২৭টির পরিবর্তে কমপক্ষে ৪৫টি আদিবাসীর নাম অন্তর্ভূক্ত করতে হবে।
    ১৩। জাতিসংঘ ঘোষিত ৯ আগস্ট আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবসটি রাষ্ট্রীয়ভাবে পালন করতে হবে।

    আপনাদের সকলকে আন্তরিক ধন্যবাদ।

    আপলৌড ০৭/০৮/১০

পাঠকের প্রতিক্রিয়া

@ নিরন চাকমা, দেশের ভাষাগত সংখ্যালঘুরা 'উপজাতি', 'ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠি', 'ক্ষুদ্র জাতিস্বত্ত্বা' ইত্যাদি অভিধা বর্জন করে অনেক আগেই নিজেদের 'আদিবাসী' হিসেবে চিহ্নিত করেছে, এমনকি আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতির দাবিতে আন্দোলনও গড়ে উঠেছে, তখন আপনার 'ক্ষুদ্র জাতিস্বত্ত্বা'র পক্ষে সাফাই গাওয়াটা সত্যিই খুব হাস্যকার। আর কতকাল নিপীড়িত আদিবাসীদের 'ক্ষুদ্র' মানসিকতায় আটকে রাখতে চান? সেনা বাহিনী প্রত্যাহার প্রসঙ্গে সৈ. সাজেদার বক্তব্য আপনি উদ্ধৃত করে আপনি যে প্রশ্ন তুলেছেন, তার সত্যতা পাগলেও বিশ্বাস করবে না। ধন্যবাদ।

Can you say that all the Bangali are free from exploitaion though Banglai Nationality is gauranted by constitution? Woking class and Rich or exploiters are same? No. so, any one who is worker he is not friend or brother of same nations rich man, rather they exploite the working class without discriminataing the national identity. Moreover, Capitalism has conquerd the world & unified the whole world and now the decaying capitalism controled the world economy from one centre that is I.M.F. Thus, under the I.M.F there is no indipendent nation . So, Natinal liberation is not reality, but a myth and therefore it is enemy of working class as well as human being. Politicians including Lenin-Moa and their followers are cheating working class in the name of bogus " Right of self determination of national". Even, henious & barbars capitaism is yet exist with the help of betryal leaders of 2nd international & Leninist, who took the political line of so called national liberation etc. In details - " Lenin Cheat & Betraying Marx So I.M.F The World Loard And..." written by Shah Alam is in www.icwfreedom.org.

Can you say that all the Bangali are free from exploitaion though Banglai Nationality is gauranted by constitution? Woking class and Rich or exploiters are same? No. so, any one who is worker he is not friend or brother of same nations rich man, rather they exploite the working class without discriminataing the national identity. Moreover, Capitalism has conquerd the world & unified the whole world and now the decaying capitalism controled the world economy from one centre that is I.M.F. Thus, under the I.M.F there is no indipendent nation . So, Natinal liberation is not reality, but a myth and therefore it is enemy of working class as well as human being. Politicians including Lenin-Moa and their followers are cheating working class in the name of bogus " Right of self determination of national". Even, henious & barbars capitaism is yet exist with the help of betryal leaders of 2nd international & Leninist, who took the political line of so called national liberation etc. In details - " Lenin Cheat & Betraying Marx So I.M.F The World Loard And..." written by Shah Alam is in www.icwfreedom.org.

আদিবাসী হিসেবে নয়, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দাবিই যুক্তিযুক্তি। কারণ আদিবাসী বললে রাজনৈতিক দিকটি উহ্য থেকে যায়। শুধুমাত্র সাংস্কৃতিক দিকটি প্রাধান্য লাভ করলে একটি জাতি জাতি হিসেবে গড়ে উঠতে পারে না। আর আদিবাসী শব্দটি নিয়েতো এখন নানা ধরনের কান্ডকারখানা চলছে। বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত জাতিসত্তাসমূহের পরিচয়কে আদিবাসী হিসেবে চিত্রিত করে উপরোক্ত সাংবাদিক সম্মেলনে যারা অংশ নিয়েছেন তারাই দেদারছে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে।প্রকৃত জাতীয় মুক্তির কথা না বলে চুক্তি বাস্তবায়নের কথা বলে জনগণকে বিভ্রান্ত করছে।আদতে চুক্তি পুরোদমে বাস্তবায়ন হলেও পার্বত্য চট্টগ্রামে কোন শান্তি প্রতিষ্ঠিত হবে না।
আর পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রকৃত শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য সেনাবাহিনী প্রত্যাহারের কোন বিকল্প নেই। কিন্তু গত ৭ আগস্ট ঢাকায় এলজিইডি অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠিত সংখ্যালঘু জাতিসত্তাসমূহের ভূমি অধিকার সম্পর্কিত এক সেমিনারে বক্তব্য দেয়ার সময় সংসদ উপনেতা ও পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়ন কমিটির চেয়ারম্যান সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী বলেছেন জ্যোতিরিন্দ্র লারমার(সন্তুলারমা) সুপারিশের ভিত্তিতে পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে সেনাবাহিনী প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত বাতিল করা হয়। তাহলে প্রশ্ন জাগে সন্তু লারমা একদিকে চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য রক্ত দেয়ার কথা বলেন, অপরদিকে সেনাবাহিনী প্রত্যাহার বাতিলের সুপারিশ করেন এটা কি ধরনের নীতি??

আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন