• আমার জাদু দেখার শেষ হবে কি?
    মাসুদ রানা

    বোকা আমি বরাবরই। এখন যেমন, ছেলেবেলায়ও তেমন। আমার বহুর মধ্যে একটি বোকামো হচ্ছে, মানুষের বলা কথাগুলো বিশ্বাস করা।

    আমাদের ছোট্ট শহরটা তখন এতো ভীড়াক্রান্ত ছিলো না। বিকেল চারটেয় স্কুল ছুটির পর ফাঁকা রাস্তার পাশের প্রায়ই জাদু দেখার জটলা দেখতে পেতাম। সুযোগ পেলে দাঁড়িয়ে যেতাম জাদু দেখতে। দুয়েকবার কান-মলাও খেয়েছি বাড়ী ফেরায় উত্তর-বিহীন বিলম্বের জন্য। কিন্তু প্রধান জাদুটি আমার কখনও দেখা হতো না। তাঁরা শুরু করতেন ছোটো-খাটো জাদু দিয়ে, কিন্তু প্রধান জাদুটির কথা 'শীঘ্রই আসছে' বলে শুরু করে দিতেন তাঁদের ওষুধ বিক্রির কথা।

    এখন বুঝি, পথের ধারে ওষুধ বিক্রেতারা জাদু দিয়ে খেলা শুরু করতেন লোক জড়ো করার জন্য। কিন্তু তখনই থামিয়ে দিতেন তাঁদের সর্বাকর্ষণীয় জাদুটি, যখন তাঁরা বুঝতে পারতেন ওষুধ বিক্রির জন্য লোক-সমাগম যথেষ্ট হয়েছে।

    বয়স-প্রাপ্তি জনিত কিঞ্চিত বুদ্ধি-বৃদ্ধি হেতু এখন হয়তো পথ-পাশে আর ঐ জাদুকরদের যাদু দেখতে দাঁড়াবো না। এতোক্ষণে বুঝে গিয়েছি, জাদু এঁরা আসলে দেখাবেন না। ওষুধ বিক্রিই তাঁদের মোক্ষ।

    কিন্তু এ-সত্য কি আমি একাই বুঝেছি? নিশ্চয় না। কিন্তু তবুও মানুষ এখনও ভীড় করে দাঁড়ায়। জাদু দেখতে চায়, কিন্তু দেখতে পায় না।

    বোকা দর্শক তো আছে আমার মতো অনেকেই। কিন্তু বোকা জাদুকর আছে জানতাম না। অতি সম্প্রতি বাংলাদেশে দেখলাম এক বোকা জাদুকরকে। আত্মপ্রচারের বিমুগ্ধকরণ বড়ি বিক্রিই যাঁর লক্ষ্য বলে প্রতিভাত হচ্ছে, তিনি আরবদেশে শিরোচ্ছেদ প্রথার (বস্তুতঃ আইন)  বিরুদ্ধে বাংলাদেশের ১৬ কোটি মানুষকে একফোঁটা করে চোখের জল ফেলতে অনুরোধ করেছেন।

    একজন সংবেদশীল লেখক আবার দু-চোখ থেকে একফোঁটা জল ফেলা সম্ভব নয় বলে জৈবরাসায়নিক ভ্রান্তি চিহ্নিত করেছেন। অন্য আরেক জন ‘এক সাগর রক্ত’র সাথে তুলনা করে দাবী করেছেন, এক সাগর রক্ত সম্ভব হলে এক ফোঁটা চোখের জলও সম্ভব। মনোমুগ্ধকর বিতর্ক!

    তৃতীয় একজন চিহ্নিত করে লিখলেন, শিরোচ্ছেদ-প্রথা বিরোধী আন্দোলক যে-ভাবে ‘রাজনীতিবিদদের মতো বড় বড় করে নিজের নাম’ পৌস্টারে লিখে প্রদর্শন করেছেন, তা তাঁর ভালো লাগেনি

    মন্তব্যটি পড়ে ছবিটা মনোযোগের সাথে লক্ষ্য করে দেখলাম, সত্যিইতো! বড়ো-বড়ো করে লেখা ‘বর্বর শিরোচ্ছেদ প্রথার বিলুপ্তি চাই - সৈয়দ আবুল মকসুদ’। রাজনীতিবিদেরা এভাবে নিজের নাম লিখে প্রদর্শন করে কি-না আমার জানা নেই। ওঁরা বোধ হয় আরও চালাক। অন্ততঃ নিজের নামের পোস্টার নিজেই বহন করেন না। সে-তুলনায় আন্দোলক খানিকটা বোকা বলেই প্রত্যক্ষিত হয়ে থাকবেন অনেকের কাছে।

    আশ্চর্য্য! ছবিটি আমি আগেও দেখেছি, সংবাদও পড়েছি, কিন্তু এর নিহিতার্থটা মাথায় আসা তো দূরের কথা, ব্যাপারটা এভাবে আমার চোখেই পড়েনি! মনে হয়নি আন্দোলনের পিছনে আত্মপ্রচারের একটি বিষয় আছে!

    তখনই মনে পড়লো, আমি বদলাইনি। সেই বোকাই রয়ে গেছি। রাস্তার পাশে এখনও জাদু দেখা আমার শেষ হয়নি। আদৌ হবে কি?

    রোববার, ১৯ অক্টোবর ২০১১
    নিউবারী পার্ক
    এসেক্স, ইংল্যান্ড

পাঠকের প্রতিক্রিয়া

Some people never change. hhehehehehe!!!

আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন