• একটি ধুসর ভোরের গল্প
    মাসুদ রানা

    উপবন। সুন্দর নাম তো! সিলেট থেকে ঢাকাগামী রাতের ট্রেইন এটি। ১৫ এপ্রিলের শেষ অপরাহ্নে সিলেটে পৌঁছে, বিকেল থেকে সন্ধ্যার পর পর্যন্ত, মেট্রোপলিটান বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় সাড়ে চার ঘণ্টার সেমিনার শেষে, রাতের খাবার দ্রুত সেরে, সময় থাকতেই ষ্টেইশনে পৌঁছুতে পেরে স্বস্তিবোধ করছিলাম। কিন্তু সিলেট ঘুরে দেখা হলো না বলে অতৃপ্তি লাগছিলো।

    আমাদের সেমিনার-দলের নেতা পিনাকী ভট্টাচার্য, সিলেটে পৌঁছুনোর আগেই, তাঁর ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানীর লোক দিয়ে ফিরতি যাত্রার ব্যবস্থা করে রেখেছিলেন। কারণ, ১৭ এপ্রিল রংপুরের সেমিনারে যোগ দেবার আগে আমাদের অন্ততঃ এক দিনের জন্য ঢাকাতে বিশ্রামের প্রয়োজন।

    ফার্ষ্ট-ক্লাসের টিকিট কেনা হয়েছিলো। রাতে ঘুমিয়ে আসা যাবে শুনে টাকার অপচয় মনে হয়নি। কিন্তু ট্রেইনের কামরায় ঢুকে মনে হলো, রাতের কৌচে গেলেই ভালো করতাম। এতো দীন-দশার নাম ‘প্রথম শ্রেণী’ দেখে, কল্পনা করার চেষ্টা করলাম ‘সুলভ’ তথা তৃতীয় শ্রেণীর দশা তাহলে কী হতে পারে।

    প্রথম-শ্রেণীর দশা আরও বুঝতে পারলাম রাত গভীরে। আমাদের চার বার্থের একান্ত কামরার দরজা খুলে জল পরিবর্তনের জন্য বেরুতে যেয়ে সরু করিডোরে ঘুমন্ত মানুষের গায়ে প্রায় হুমড়ি খেয়ে পড়তে-পড়তে সোজা হয়ে দাঁড়ালাম। অবৈধ ও অমানবিক যাত্রী!

    নিরুদ্বেগে শয্যা থেকেই এক প্রৌঢ় আমাকে হাতের ইশারা করে টয়লেটের দরজা দেখিয়ে দিলেন। প্রদর্শককে ধন্যবাদ দিয়ে টয়েলেটের দরজা খুলে ঢোকা মাত্রই তীব্র একটা গন্ধ আমার নাসারন্ধ্রের মধ্যে জ্বালা ধরিয়ে ঠিক মস্তিষ্কে গেঁথে গেলো। শ্বাস বন্ধ করে জল পরিবর্তন করতে পারবো বলে ধারণা করেছিলাম। কিন্তু দম রাখতে পারিনি। দ্বিতীয় দম নিতে গেলে গন্ধটা আরও ভেতরে প্রবেশ করলো।

    সারা রাত ঘুম ও জাগরণের লুকোচুরির সাথে মশার কামড়ের সংমিশ্রণে সৃষ্ট এক অদ্ভূত অনুভূতির মধ্যে এক সময় ভোরের আলো ফুটতে শুরু করলো। আমরা ভোর পাঁচটায় ঢাকার কমলাপুর ষ্টেইশনে পৌঁছুলাম।

    আমার মনে পড়ে গেলো বহু বছর আগে, এমনিভাবে এই ষ্টেশনে আমার ছোট্ট শহর হবিগঞ্জ থেকে ঢাকা পৌঁছেছিলাম মৃদু ভয় মিশ্রিত বিরাটত্ব দেখার বিস্ময় নিয়ে। এসএসএসির পর আমার জনক আমাকে আমার প্রিয় শহরে থাকতে দিননি। আজ, আবার কমলাপুর ষ্টেইশনটাকে দেখার চেষ্টা করলাম। যথেষ্ট বড়োই মনে হলো, আজও।

    আমাদের দল থেকে পাঁচ জন কখন যে নিজ-নিজ আবাসের দিকে যাত্রাপথে বিলীন হয়ে গেলেন খেয়াল করিনি। আমি থাকলাম পিনাকীর সাথে গাড়ীর অপেক্ষায়। আর এ-সময়ই দেখলাম দৃশ্যটা।

    ষ্টেইশনের ভবন থেকে রাস্তায় এগিয়ে গেলাম ভোরের চেহারা দেখতে। কিন্তু কিছু দেখার আগেই রাতের গন্ধটা আবার ফিরে এলো। পেট গুলিয়ে উঠলো আমার। ষ্টেইশনের বাইরে চোখে পড়লো রাস্তার উলটো দিকে অনুচ্চ দেওয়ালের প্রশ্রয়ে মানুষের মূত্র-ত্যাগে জমে-ওঠা কালো জলাবদ্ধতা থেকে গন্ধটা আসছে।

    চোখ সরিয়ে ডান দিকে তাকাতেই চোখে পড়লো রাস্তায় ঘুমন্ত মানুষের সারি। লক্ষ্য করিনি আগে, আমার অদূরেই গোটা একটি 'সিঙ্গল প্যারেণ্ট ফ্যামিলি' শুয়ে আছে।

    এক নারী তাঁর তিন সন্তান-সহ রাতের ঘুম ঘুমোচ্ছেন। সবচেয়ে ছোটটি মায়ের বুকের কাছে লেপ্টে আছে। ঘুমন্ত মানুষকে দেখার মধ্যে আমি কেনো যেনো অনুমোদন বোধ করি না। তাই আবার চোখ সরালাম। দূরে নিক্ষেপ করলাম দৃষ্টি।

    রাস্তা থেকে ষ্টেইশনে প্রবেশের মধবর্তী সংরক্ষিত খালি জায়গা জুড়ে অগণিত ঘুমন্ত মানুষ। আমার দৃষ্টি আরও দূরে নিক্ষেপ করলাম। যতো দূর যোখ যায়, খোলা আকাশের নীচে, রাস্তার পাশে মানুষ ঘুমাচ্ছে।

    আমার মনে হলো যে-দেশে লক্ষ-কণ্ঠে জাতীয় সঙ্গীত গেয়ে, কিংবা বিশালাকৃতির জাতীয় পতাকা তৈরি করে, গিনিস রেকর্ড বুকে নাম লেখানোর জন্য কোটি-কোটি টাকা খরচ করা হয়, সে-দেশে লক্ষ-লক্ষ মানুষের মাথার উপরে ছাদ নেই! কী আশ্চর্য্যের এই দেশ!

    গন্ধটা সত্যিই অসুস্থ করে তুলছিলো আমাকে। তাই রাস্তা থেকে ষ্টেইশনের দিকে ফিরে এলাম। দুর্গন্ধযুক্ত মুক্ত বাতাসের চেয়ে দুর্গন্ধমুক্ত বদ্ধ বাতাস সহনীয়।

    ষ্টেইশনের সিঁড়িতে পা রাখতেই দেখলাম কৈশোর ছুঁই-ছুঁই করা একটি ছেলে খালি গায়ে বসে আছে সিঁড়িতে। আমি রীতিমতো আঁৎকে উঠলাম ছেলেটির গায়ের ময়লা লক্ষ্য করে। কালো ময়লার স্তর নানা ঘনত্বে ছড়িয়ে রয়েছে তার শুকনো শরীর জুড়ে।

    ছেলেটির মাথা ভর্তি চুল। খাড়া এবং নোংরা। ব্রাশ দিয়ে কার্পেট পরিষ্কার করার পর ব্রাশের চুলে যে-রকম ময়লা লেগে থাকে, সে-রকমের ময়লা আটকে আছে ছেলেটির সমস্ত মাথা জুড়ে। লক্ষ্য করলাম, ছেলেটির পেটটি যেনো পিঠ ছোঁয়ার প্রতিজ্ঞা করে ভেতরে সেঁধিয়ে আছে। ঊর্ধ্বাঙ্গ উন্মুক্ত বলেই দেখা যাচ্ছিলো।

    ওর পরেন ছিলো একটা ঢোলা ট্রাউজার্স। কোমরের সাথে দড়ি দিয়ে বাঁধা। বসে থাকা সত্ত্বেও বুঝতে কোনো অসুবিধা হয়নি, নিম্নাঙ্গের এই পরিধানটি ওর জন্য তৈরি করা হয়নি পোশাক তৈরির এই দেশে। কারও কাছ থেকে পাওয়া হয়তো বা।

    ওকে দেখে আমার সূর্যের কথা মনে পড়ে গেলো। সূর্যও ওর মতো শুকনো। তবে ছেলেটির শুকনো শরীরে অপুষ্ঠির কশাঘাত স্পষ্ট, যা সূর্যের নেই। জননীর শতো বকুনি সত্ত্বেও খেতে চায় না সূর্য। হঠাৎ করে অনেকে লম্বা ও শুকনো হয়ে গেছে আমাদের ছেলেটি। দু’দিন পর ওর ১৩ বছর পূর্ণ হবে। ভাবছি, সেদিন আমার ফৌনের রিংয়ে ওর ঘুম ভাঙাবো। 

    সূর্যের কথা ভাবতে-ভাবতেই আমার সামনে সিঁড়িতে বসা ছেলেটির দিকে তাকালাম। কোনো এক অজ্ঞাত আকর্ষণে নিকটবর্তী হতেই ছেলেটি ঘাড় ঘুরিয়ে আমাকে দেখলো। আমি লক্ষ্য করলাম, নিদ্রা-বঞ্চিত ধুসর দুটি চোখ ছেলেটির। যেনো কোনো বৃদ্ধের চোখ। সেখানে শৈশব নেই, কৈশোর নেই, চাঞ্চল্য নেই, আগ্রহ নেই কোনো - যেনো সারা পৃথিবীর প্রতি নির্বিকার!

    আমার উপস্থিতি অগ্রাহ্য করে ছেলেটি মেঝেতে আধশোয়া হয়ে অবস্থান নিলো। আমি কাছে গিয়ে ওকে জিজ্ঞেস করলাম, “তোমার নাম কী?”

    ছেলেটি অপরিচিত উচ্চারণে কী যে বললো, ঠিক বুঝতে পারলাম না। তারপর আমি জিজ্ঞেস করলাম, “কতোদিন তুমি গোসল করোনি, বলো তো?”

    “বলতি পারবো না”, ছেলেটি আমার দিকে ভ্রুক্ষেপ না করেই উত্তর দিলো বললো।

    “এক মাস?”, আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম।

    “বলতি পারবো না”, সে পুনর্বার তার অজ্ঞতা প্রকাশ করলো।

    “কেনো বলো তো?” আমি নাছোড় হয়ে পুনরায় জিজ্ঞেস করলাম। আমার আগ্রহ দমন করতে পারছিলাম না।

    আমার দিকে না তাকিয়ে সে এবার সুনির্দিষ্ট উত্তর দিয়ে বললো, “পাল্টাবার কাপড় নাই বলি গোসল করতি পারি না।”

    কথাটা বলে ছেলেটি তার শুকনো শরীরটাকে মেঝের দিকে আরও একটুখানি এলিয়ে দিলো। এবার ছেলেটার পেট দেখে চোখে জ্বালা অনুভব করলাম। আমি সাবধান হলাম, কোনো পরিস্থিতিতেই নিজের চোখে জলকে স্বাগত জানাই না। তাই, নিজেকে পুনর্গঠিত করে জিজ্ঞেস করলাম, “কিছু খেয়েছো?”

    অর্ধশায়িত ছেলেটি কিছুই না বলে শুধু নোংরা চুল-ভর্তি মাথাটা একটুখানি তুলে দু’দিকে নেড়ে ‘না’ সঙ্কেতায়িত করলো।

    “উঠে বসো তো” বলাতে ছেলেটি উঠে বসলো। কিন্তু আমার দিকে তাকালো না সে।

    ভাবলাম পিনাকীকে বলবো ওকে কিছু টাকার দেওয়ার জন্য। আমার কাছে যে-টাকা ছিলো, তার সবটাই তিন দিন আগে আমাদের গ্রামের বাড়ীতে গিয়ে দরিদ্র আত্মীয় স্বজনের মধ্যে ভাগ করে দিয়েছি। আমার আত্মীয়দের মধ্যে এতো দরিদ্র মানুষ আছে, আমার জানা ছিলো না। কিন্তু পিনাকীকে বলার আগে আমার জিন্সের পকেটে হাত দিয়ে একটি নৌটের উপস্থিতি অনুভব করলাম। বের করে দেখলাম, ৫০ টাকার একটি নৌট।

    আমি ছেলেটি দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললাম, “ধরো, কিছু খেয়ে এসো।”

    আমাকে অবাক করে দিয়ে ছেলেটি বললো, “না। লাগবি না।”

    “কী বললে?”, আমি বিশ্বাস করতে পারছিলাম না।

    তিন দিন আগে আমার দরিদ্র আত্মীয়দের প্রত্যেককেই টাকা সেঁধেছি এবং তাঁদের মধ্যে কেউ “না” বলেননি। অবশ্য, ধন্যবাদও বলেননি কেউ এবং সেটি আমি আশাও করি না।

    ভিক্ষুক-সদৃশ ছেলেটি টাকা নিচ্ছে না? আমি কি ঠিক শুনছি? সে কি আরও বেশি চায়?

    আমি আবার সাধলাম। সে আবার “লাগবি না” বললো।

    এবার আমি একটু কর্তৃত্বের সুরে বললাম, “টাকাটা নাও। যাও, কিছু খেয়ে এসো। যাও!”

    ছেলেটি আমার দিকে দ্বিতীয় বারের মতো ধুসর চোখে তাকালো এবং টাকাটা নিয়ে সিঁড়ি থেকে নেমে সোজা হেঁটে চলে গেলো। ফিরেও তাকালো না।

    এর মধ্যে পিনাকী ভট্টচার্যের গাড়ী চলে এলো। আমরা দু’জনেই গাড়ীতে উঠলাম। পিনাকী বললেন, “রানা ভাইকে ধানমণ্ডিতে নামিয়ে দাও আগে।”

    পথে আর কোনো কথা হলো না আমাদের দুজনের মধ্যে। আমার মাথায় তখনও প্রশ্রাবের তীব্র গন্ধটা গা-ঘিনঘিন অনুভূতি দিচ্ছে। কিন্তু ছেলেটিকে ভুলতে পারছিলাম না।

    ন্যাংটা হতে হবে বলে ছেলেটি গোসল করে না। এটি কি তার কৈশোরের সম্ভ্রমবোধ? সূর্যও এখন আমার সামনে কাপড় পরিবর্তন করে না। কিন্তু হাত-বাড়ানো টাকার প্রতি ছেলেটি “লাগবি না” বললো সে কোনো বোধে? আত্মসম্মান? আত্মমর্যাদা? কী এটি?

    সারাটি দিন আমাকে ভাবিয়ে রাখলো ধূসর চোখের সেই ছেলেটি। ভোরের সূর্য আমার চোখে পড়েনি। কেমন যেনো একট দীর্ঘ ধূরস ভোর বেদনার মতো স্মৃতি হয়ে গেঁথে গেলো মনে-মস্তিষ্কে।

    সোমবার, ২৮ এপ্রিল ২০১৪
    নিউবারী পার্ক
    এসেক্স, ইংল্যাণ্ড
    masudrana1@gmai.com

আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন