• টাওয়ার হ্যামলেটসের মেয়র ও ডেপুটিঃ আজ দু'জনার দু'টি পথ ওগো দু'টি দিকে গেছে বেঁকে?
    Lutfur-Ohid.jpg
    মোহাম্মদ আব্দুল হাই ইবনে ছফি

    বেশ কিছু দিন ধরে একটি প্রশ্ন টাওয়ার হ্যামলেটসের রাজনৈতিক অঙ্গনে পুনঃপুন জিজ্ঞাসিত হচ্ছেঃ মেয়র লুৎফুর রহমান এবং ডেপুটি মেয়র অহিদ আহমদের সুবিদিত ‘মানিক-জোড়’ বন্ধুতের মাঝে কি মতবিরোধ দেখা দিয়েছে?

    কিছুদিন আগেও একই ফ্রেমে তোলা এই দু’জনের ছবি এবং ফুটেজ স্থানীয় প্রায় সকল সংবাদপত্র ও বাংলা টিভি চ্যানেলে ছিলো নৈমিত্তিক ঘটনা। কিন্তু ইদানিং এর স্রোতে যেনো ভাঁটা পড়েছে।
     
    মেয়র নির্বাচনে লুৎফুর রহমানের নির্বাচনে ক্যাম্পেইন ম্যানেজারের দায়িত্ব পালন করে পরবর্তীতে ডেপুটি মেয়রের পদে অভিষিক্ত হয়ে ইতোমধ্যে এক বছরের বেশি কাল পার করেছেন অহিদ আহমদ। কিন্তু ইদানিং যা গুজবের মতো বলা-বলি হচ্ছে, তা যদি সত্য হয় তবে বলতেই হবে, সত্য বড়োই কঠিন।

    টাওয়ার হ্যামলেটসের ‘টক অফ দ্যা টাউন’ এখন এই মানিক-জোড়ের সম্পর্কের সন্দেহিত অবনতি। নিজ-নিজ অভিজ্ঞতা থেকে এই সম্পর্কাবনতির ভিন্ন ব্যাখ্যাও দিয়ে যাচ্ছেন কেউ কেউ। এ রকম তিনটি ব্যাখ্যার কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। 

    একঃ
    অহিদ আহমদের এমপি হওয়ার আকাঙ্খা অনেক দিনের। ২০১০ সালে কনজারভেটিভ দলের শক্ত ঘাঁটি ‘ওয়েস্ট-সাফোক’আসনে লেবার দলের মনোনয়ন নিয়ে নির্বাচন করে দলের মুখ উজ্জ্বল করতে পারেননি তিনি। তাই মেয়রের সাথে দূরত্ব সৃষ্টি করে লেবার দলে ফিরে অহিদ আহমদ অন্য কোথাও এমপি নির্বাচন করতে চান বলে মনে করছেন একটি মহল।

    দুইঃ
    অপর একটি অংশের ব্যাখ্যা আরেকটু গভীর। তাঁরা বলছেন, অহিদ আহমদ টাওয়ার হ্যামলেটসের মেয়র হতে চান। তাই তিনি লুৎফুর রহমানকে বেথনাল গ্রীন এ্যাণ্ড বোও আসনে এমপি পদে নির্বাচন করার জন্য চাপাচাপি করছেন।

    এ কথা সত্য যে, লুৎফুর রহমান এমপি হওয়ার বাসনা নিয়ে লেবার দলের মনোনয়ন প্রক্রিয়ায় রুশানারা আলীর কাছে পরাজিত হয়েছিলেন। কিন্তু অহিদ আহমদ হয়তো চান-স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসাবে হোক বা লেবার দলে ফিরে গিয়ে মনোনয়ন প্রক্রিয়ায় অংশ নিয়ে হোক-এমপি নির্বাচন করুন লুৎফুর রহমান। তাই যদি হয়, তাহলে ২০১৪ সালে মেয়র নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ক্ষেত্রে বাধা থাকে না অহিদ আহমদের।

    কিন্তু লুৎফুর রহমান সম্ভবতঃ একই সাথে ‘গাছেরটা ও তলারটা’- দুটোই ভোগ করতে চান। অর্থাৎ, ২০১৪ সালে মেয়র নির্বাচন এবং ২০১৫ সালে এমপি নির্বাচন দুটি পথই নিজের জন্য উন্মুক্ত রাখতে চান। যার ফলে অহিদ আহমদের জন্য কোনোটিই নিশ্চিত থাকছে না। এই কারণে এই মানিক-জোড়ের মধ্যকার সম্পর্কে ইদানিং ভাঁটা পড়ে থাকতে পারে বলে ব্যাখ্যা দেওয়া হচ্ছে।

    লুৎফুর রহমানের পরিকল্পনা হতে পারে এমন যে, তিনি ২০১৪ সালে মেয়র নির্বাচনে জয়লাভ করে একই ইমেইজ নিয়ে তিনি পরবর্তী বছর এমপি নির্বাচন করতে চান। তবে এমপি নির্বাচিত হলে মেয়র পদ ছেড়ে দিতে হতে পারে লুৎফুর রহমানকে। সে-ক্ষেত্রে মেয়র পদে উত্তরসূরি হিসাবে লুৎফুর রহমান নিজের পছন্দের লোককে মনোনয়ন দিতে পারেন। আর এ-মনোনয়ন তিনি অহিদ আহমদকেই দেবেন, এমন নিশ্চয়তা নেই।

    লুৎফুর রহমান ইদানিং তার চারপাশে কাজে সুদক্ষ ও ইংরেজি অনর্গল কথা বলতে সক্ষম লোকের সমাগম ঘটাচ্ছেন। যার ফলে, ভবিষ্যতে অহিদ আহমদ ছাড়াও লুৎফুর রহমানের পছন্দের অনেক লোক লভ্য হয়ে উঠবেন। আর এখানেই হারানোর ভয় অহিদ আহমদের। তিনি চান আগামী মেয়র নির্বাচনে লুৎফুর রহমান এখনই তাঁকে (অহিদ আহমদকে) প্রার্থী হিসাবে প্রতিশ্রুতি এবং নিশ্চয়তা দিন।

    তিনঃ
    এমনও শোনা যাচ্ছে, দুটি এমপি আসন নিয়ে গঠিত টাওয়ার হ্যামলেটসের সর্বোচ্চ আসনে বসে তৃপ্তই আছেন লুৎফুর রহমান। তাই এমপি পদ নয় বরং মেয়র পদেই থেকে যেতে চাইতে পারেন তিনি।

    বিগত কয়েকটি উপ-নির্বাচনে লুৎফুর রহমান স্থানীয় রেসপেক্ট দলের সাথে সমঝোতার ভিত্তিতে কাজ করে যাচ্ছেন বলে মনে হচ্ছে। স্পিটালফীল্ডস এ্যাণ্ড বাংলাটাউন ওয়ার্ডে অনুষ্ঠিত পূর্ববর্তী উপ-নির্বাচনে লুৎফুর রহমান রেসপেক্ট দলের বিপরীতে প্রার্থী না দিয়ে নীরব সমর্থন প্রকাশ করেছিলেন বলে একটি পর্যবেক্ষণ রয়েছে।

    ১৯ এপ্রিল অনুষ্ঠেয় একই ওয়ার্ডের আরেকটি উপ-নির্বাচনে মেয়র সমর্থিত প্রার্থীর বিপরীতে কোনো প্রার্থী দেয়নি রেসপেক্ট দল। ফলে মেয়র লুৎফুর রহমান রেসপেক্ট দলের সাথে পারস্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতে রাজনীতি করে যাচ্ছেন বলে একটি ধারণা সৃষ্টি হয়েছে।

    এভাবে চলতে থাকলে আগামী সাধারণ নির্বাচনে বেথনাল গ্রীন এ্যাণ্ড বোও আসনে রেসপেক্ট সমর্থিত এমপি প্রার্থীকে মনোনয়ন দেওয়ার কথা সক্রিয়ভাবে ভাবতে পারেন লুৎফুর রহমান। আর, এখানেও থাকতে পারে ডেপুটি মেয়র অহিদ আহমদের আশঙ্কা। কেনো না, মেয়র লুৎফুর রহমান যদি নিজ-স্থানে বহাল থাকেন এবং রেসপেক্ট প্রার্থীকে এমপি পদে নীরব সমর্থন দিন, তাহলে ডেপুটি মেয়র অহিদ আহমদের রাজনৈতিক ভবিষ্যত অপরিবর্তীতই থেকে যাওয়ার সম্ভাবনা থেকে যায়। ফলে, রেসপেক্ট দলের সাথে মেয়র লুৎফুর রহমানের বেশি মাখামাখি ভালো চোখে দেখছেন না অহিদ আহমদ।

    শেষ কথা
    কিছু সত্য, কিছু অর্ধ সত্য এবং কিছু ধরাণার ভিত্তিতে কানান্তরে ছড়িয়ে পড়া উল্লেখিত ব্যাখ্যাগুলোর কোনোটিরই ভিত্তি পাওয়া যাচ্ছে না। তবে একটি চাপা গুঞ্জন যে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে-এ বিষয়টি নিশ্চিত করে বলা যায়।

    রাজনীতিতে শেষ কথা বলতে কিছু নেই। রাজনৈতিক স্বার্থে গড়ে ওঠা সম্পর্ক রাজনৈতিক কারণেই অসহিষ্ণু হয়ে উঠতে পারে। লোকমুখে যেসব গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে সেগুলোকে রাজনীতিকরা নিজেদের স্বার্থেই সম্প্রসারিত হতে দেন কিম্বা বিদ্যমান অসহিষ্ণুতা কমিয়ে আনেন-এটি পুরোটাই কৌশলগত।

    টাওয়ার হ্যামলেটসে আগামী দিনের রাজনীতির কৌশল দেখতে অনেকের মতো মুখিয়ে আছি আমিও।      

আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন