• টাওয়ার হ্যামলেটসের রাজনীতির পাটীগণিতঃ বাংলাটাউনের উপ-নির্বাচন এবং নিকট ভবিষ্যত
    মোহাম্মদ আব্দুল হাই ইবনে ছফি

    কম ভোটার উপস্থিতির মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠিত টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলের স্পিটালফীল্ডস এ্যাণ্ড বাংলাটাউন ওয়ার্ডের উপ-নির্বাচনে লেবার পার্টির প্রার্থীকে অল্প ব্যবধানে পরাজিত করে জয়লাভ করেছেন মেয়র লুৎফুর রহমান সমর্থিত ‘স্বতন্ত্র’ প্রার্থী।

    গত ১৯ এপ্রিল অনুষ্ঠিত ওই উপ-নির্বাচনে মেয়র সমর্থিত প্রার্থী গোলাম রব্বানী পান ১০৩০ ভৌট। আর তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী লেবার পার্টির প্রার্থী আলাউদ্দিন পান ৯৮৭ ভৌট। এই হিসেবে গোলাম রব্বানী মাত্র ৪৩ ভোটের ব্যবধানে জয়লাভ করেছেন। শতকরা হিসাবে এই ব্যবধান মাত্র ১.৮৭ শতাংশ।

    এছাড়া, গ্রীন পার্টির প্রার্থী ব্লেইক কার্স্টি পেয়েছেন ৯৯ ভোট, লিবারেল ডেমোক্র্যাটস প্রার্থী রিচার্ড অ্যালান ম্যাকমিলান পেয়েছেন ৩৯ ভৌট এবং কনজারভেটিভ পার্টির প্রার্থী ম্যাথু জেইমস স্মিথ পেয়েছেন ১৪০ ভৌট । সঠিকভাবে ভোট প্রয়োগকারী ভোটারের সংখ্যা ছিল মাত্র ২২৯৫ জন। নির্বাচনে ভৌট দিয়েছেন ৩১.৪৩ শতাংশ ভৌটার।

    এদিকে, স্পিটালফীল্ডস এ্যাণ্ড বাংলাটাউন ওয়ার্ডের সর্বশেষ উপ-নির্বাচনকে সামনে রেখে লেবার দল এবং মেয়র সমর্থিত গ্রুপের পক্ষ থেকে আগ্রাসী প্রচারণার পরও ভৌটার উপস্থিতির হার কেনো এতো কম ছিলো- এ নিয়ে আলোচনারও কমতি নেই। ওয়ার্ডের প্রতিটি ঠিকানায় এই দুই পক্ষের প্রার্থীরা কমপেক্ষে একবার সশরীরে হাজির হয়ে ভৌট প্রার্থনা করেছেন বলে জানিয়েছেন প্রত্যদর্শীরা।

    স্মরণ করা যেতে পারে, ২০১০ সালে অনুষ্ঠিত কাউন্সিল নির্বাচনে স্পিটালফীল্ডস এ্যাণ্ড বাংলাটাউন ওয়ার্ডে তিনজন কাউন্সিলারই লেবার দল থেকে নির্বাচিত হয়েছিলেন। সেই নির্বাচনে লেবার দলের প্রার্থী হিসাবে সর্বোচ্চ ১৬৬০ ভৌট পেয়েছিলেন লুৎফুর রহমান। আর সম্প্রতি কারাদণ্ডপ্রাপ্ত সেলিনা আখতার ১৫৪৫ ভোট পেয়ে দ্বিতীয় অবস্থান এবং ১৫০০ ভোট পেয়ে তৃতীয় স্থান দখল করেছিলেন সম্প্রতি কাউন্সিল থেকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত হওয়া হেলাল আব্বাস। প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ করা যেতে পারে, কাউন্সিলের কিছু তথ্য তৃতীয় পক্ষের কাছে নিয়মবহির্ভূতভাবে হস্তান্তরের দায়ে কাউন্সিলার পদের দায়িত্ব থেকে হেলাল আব্বাসকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়। 

    এই তিন বিজয়ী প্রার্থীর মধ্যে লুৎফুর রহমান ও সেলিনা আখতার পরবর্তীতে লেবার দল থেকে বহিষ্কৃত হলেও হেলাল আব্বাস থেকে যান। সেই হিসাবে সাম্প্রতিক উপ-নির্বাচনে লেবার দলের প্রার্থীর পক্ষে ১৫০০-এরও অধিক ভৌট প্রয়োগ হবে বলে দলীয়ভাবে আশা করা হয়েছিলো। কিন্তু হেলাল আব্বাস যেমন তাঁর সমর্থিত প্রার্থী আলাউদ্দিনের জন্য ১৫০০ ভৌট নিশ্চিত করতে পারেননি, তেমনি লুৎফুর রহমানও তার সমর্থিত প্রার্থীর জন্য ১৬৬০ ভৌট নিশ্চিত করতে পারেননি। তবে কি লেবার দলের ভৌটাররা ভৌট-কেন্দ্রে আসেননি?

    বিশ্লেষকরা বলছেন, লেবার দলের নিয়মিত ভোটাররা তাঁদের ভৌট প্রয়োগ করেছেন (১০৩০+৯৮৭=২০১৭)। তবে এই ভৌটগুলো ভাগ হয়ে গেছে লুৎফুর সমর্থিত প্রার্থী এবং লেবার দলের প্রার্থীর মধ্যে। কেনো-না, লেবার দলের সমর্থকরা এই দুই পক্ষের প্রার্থীদের মধ্যে এখনও সুস্পষ্ট কোনো পার্থক্য রয়েছে বলে বিশ্বাস করেন না। এই দুই পক্ষের পলিসি, কর্মসূচি ও মূল্যবোধ সবই অভিন্ন। লেবার দলও মেয়র-সমর্থিত পক্ষের সাথে তাঁদের সুস্পষ্ট বিভাজন রেখা এঁকে দেখাতে পারছে না। ফলে ভাগাভাগি হয়ে যাচ্ছে নির্বাচনের ভৌট ।

    নানা কারণে স্পিটালফীল্ডস এ্যাণ্ড বাংলাটাউন ওয়ার্ডের সর্বশেষ উপ-নির্বাচন খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিলো মেয়র লুৎফুর রহমান এবং স্থানীয় লেবার পার্টির জন্য। মেয়র লুৎফুর রহমান প্রতিনিয়তই চেষ্টা করে যাচ্ছেন ফুল কাউন্সিল মিটিং এর ভৌটে লেবার দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতার ক্ষমতাকে খর্ব করতে। এই নির্বাচনে পরাজয় হলে তার সমর্থনে কাউন্সিলারের সংখ্যা কমে আসতে পারতো। এই ক্ষতি পুষিয়ে ওঠা মেয়রের পক্ষে হয়তো সম্ভব হতো না।

    অপরদিকে, একই ওয়ার্ডে অনুষ্ঠিত প্রথম উপ-নির্বাচনে পরাজয়ের পর দ্বিতীয়টিতে জয়লাভের আশায় শক্তিশালী প্রার্থী মনোনীত করেছিলো লেবার পার্টি। কিন্তু দ্বিতীয় পরাজয়ের ফলে হতাশা বিরাজ করছে লেবার শিবিরে আর মনোবল বৃদ্ধি পেয়েছে মেয়র লুৎফুর রহমানের। এই মনোবলকে পুঁজি করে আগামী ৩ মে অনুষ্ঠিতব্য উইভার্স ওয়ার্ডের উপ-নির্বাচনে মেয়র লুৎফুর রহমান তার সমর্থিত প্রার্থী রেসপেক্ট দলের আবজল মিয়াকে বিজয়ী করে আনতে চান।

    আবজল মিয়া প্রার্থী হিসাবে খুবই শক্তিশালী। কেনো-না, ইতিপূর্বে তিনি টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলে বিরোধী দলীয় নেতার ভূমিকা পালন করেছেন এবং ২০১০ সালের সাধারণ নির্বাচনে বেথনাল গ্রীন এ্যাণ্ড বোও নির্বাচনী এলাকা থেকে রেসপেক্ট দলের এমপি প্রার্থী হিসাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতাও করেছেন। লেবার দলের আংশিক ভোট, মেয়র সমর্থিত গ্রুপের ভৌট এবং রেসপেক্ট দলের ভোট নিয়ে জয়ের স্বপ্ন দেখছেন এক সময়ের লেবার কর্মী আবজল মিয়া।

    আর আবজল মিয়া জয়ী হতে পারলে কাউন্সিলে লেবার দলের একক সংখ্যাগরিষ্ঠতাকে খর্ব করা যাবে। তবে কাউন্সিলে নিজেদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা বজায় রাখতে লেবার দলও মরণ-পণ চেষ্টা করে বিজয়ী করে আনতে চাইবে তাঁদের প্রার্থীকে। যেহেতু ৩ মে একই দিনে লণ্ডন মেয়র নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে সেহেতু কেন্ লিভিংস্টৌনের জনপ্রিয়তার স্রোতকে কাজে লাগিয়ে স্থানীয় লেবার পার্টি উইভার্স ওয়ার্ডে নিজেদের প্রার্থীকে বিজয়ী করার চেষ্টা করবে। 

    ২০১০ সালের মে মাসে সাধারণ নির্বাচনের সাথে কাউন্সিল নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার পর স্পিটালফীল্ডস এ্যাণ্ড বাংলাটাউন ওয়ার্ডে দুটি উপ-নির্বাচন অনুষ্ঠানের অত্যাবশ্যকীয়তা সৃষ্টি হয়। ২০১০ সালের অক্টোবর মাসে টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলের মেয়র নির্বাচনে লুৎফুর রহমান নির্বাচিত হওয়ায় ওই ওয়ার্ডে তার আসন শূন্য হয়। সেই ধারাবাহিকতায় একই বছরের ১৬ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত উপ-নির্বাচনে শূন্য আসনে নির্বাচিত হয়ে আসেন রেসপেক্ট দলের প্রার্থী ফজল মিয়া।

    বিশ্লেষকদের ধারণা, ওই নির্বাচনে সদ্য নির্বাচিত মেয়র লুৎফুর রহমান প্রকাশ্যে কোনো প্রার্থীকে সমর্থন না করলেও ফজল মিয়ার প্রতিই তার সমর্থন ছিলো এবং অনানুষ্ঠানিকভাবে তিনি ফজল মিয়ার সমর্থনেই কাজ করেছিলেন; যার সত্যতা খুঁজে পাওয়া যায় মেয়র সমর্থিত কাউন্সিলারদের সর্বশেষ তালিকা দেখে। কেনো-না, তালিকায় ফজল মিয়াও রয়েছেন।  অপরদিকে, মেয়র সমর্থিত স্বতন্ত্র কাউন্সিলার সেলিনা আখতার বেনিফিট প্রতারণা মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হলে মাস দেড়-এক আগে স্বয়ংক্রিয় প্রক্রিয়ায় স্পিটালফীল্ডস এ্যাণ্ড বাংলাটাউন ওয়ার্ডের আরও একটি আসন শূন্য হয়। তারই পরিণতিতে গত ১৯ এপ্রিলের উপ-নির্বাচন অত্যাবশ্যকীয় হয়ে পড়ে।

    ২২ ফেব্রুয়ারী ২০১২

আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন