• নমি আমি গুরুজনেঃ ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক যখন প্রশ্ন-বিদ্ধ
    এনুমা এলিস

    একাডেমিক পড়ালেখার স্তর-গুলোর পাট চুকলেও আমি এখনো নিজেকে ছাত্র হিসেবেই দেখি -
    উপরের বিষয়টা ধরে এগুনোর আগে নত-মস্তকে একটি কথা স্বীকার না করে পারছি না। বিষয় উত্থাপনের জায়গায় দাঁড়িয়ে যে কথাটা শুরুতেই বলে নেয়া উচিত বোধ করছি সেটা হলো, নির্দিষ্ট কাউকে বা নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে হেয় করার কোন উদ্দেশ্য এই লেখায় খোঁজার চেষ্টা করবেন না, প্লিজ। বিষয়ের কারণেই, খোদ ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক বিষয়টির মধ্যে একটি দ্বিমুখী মজা আছে। যারা যে চোখে দেখতে চাইবেন তারা সেটাই খুঁজে বের করতে সক্ষম হবেন, আশা রাখি। আপনারা যে যেটা খুঁজুন না কেন আমি যে উদ্দেশ্যে লিখছি সেটা বলে নিতে চাই।

    আপনার জায়গায় আপনি আর আমার জায়গায় আমি, আমরা সকলেই নিজ-নিজ জায়গায় দাঁড়িয়ে জীবনের প্রতিটা পর্যায়ে শিখতে থাকি। শিখতে থাকি নিজেদের মতো করে। আমার বিবেচনায় যিনি শিখেন তিনি ছাত্র। আর ছাত্র যার কাছ থেকে শেখেন, তিনি শিক্ষক। প্রশ্ন হলো, প্রাতিষ্ঠানিক ছোঁয়ার বাইরে অভিজ্ঞতালব্ধ কারো কাছ থেকে যখন আমরা এমন কোন বিষয় জানি যেটা এর আগে কোথাও থেকে জানা হয়নি সেটাকে কিভাবে ব্যাখ্যা করবো? এখানেও শিক্ষক-ছাত্র সম্পর্ক বিরাজমান নয় কি? কিন্তু, তাকে আমরা শিক্ষক বলতে শিখি না কেনো? তার মানে শিক্ষক কারা বা কাদের শিক্ষক বলে ডাকা যায় সেটাও আমরা জীবনের নানা-পর্যায়ে শিখে থাকি। আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর বদৌলতে ৪ বছর বয়স থেকে একটি শিশু মোটামুটি পরবর্তী ১৭-১৮ বছর পর্যন্ত টানা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নানান পর্যায়ে শিক্ষক পেয়ে থাকে। সেখান থেকে বেরিয়ে জীবিকা-ক্ষেত্রে যাওয়ার পর বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ফেলে আসা স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের শিক্ষা স্মরণে আনা হয় না কেনো? এই প্রশ্নগুলো আমাদের মনে অসচেতনভাবে সব-সময়ই খেলা করে। আলসেমি করে এর মুখোমুখি না হয়ে, আমরা এগুলোকে পাশে সরিয়ে রাখি। এই লেখাটিকে সেই আলোচনার শুরু বলতে পারেন। আশা রাখবো আরো যারা আছেন, যারা শিক্ষক, যারা শিক্ষার্থী বা যারা শিক্ষার্থী জীবন শেষ করেছেন বলে মনে করেন তারা এটিকে এগিয়ে নিবেন।

    জীবনের শুরুতে যাই। ছোট শিশু। সে পৃথিবীতে আসার পর জানতে শুরু করে পরিবার থেকে- এটা করা যাবে, এটা করা যাবে না, এটা ঠিক এভাবে করতে হয়, সেটা ঠিক এভাবে না দেখলে চলে না। সে শিখে ফেলে কাকে কি বলে ডাকতে হবে, কখন কোন পোশাক পরতে হবে। সেই শুরুটাই হয় চাপিয়ে দেয়ার পথের প্রথম ধাপ। এ-সময়ের মধ্যেই আমরা শিখি, কাদের কাছ থেকে ধমক শুনবো আর কাদেরকে আমরা ধমক দেবো। গুরুজনের বিরুদ্ধে কথা বলা যাবে না, তাদের অভিজ্ঞতা তো এমনি- এমনি আসেনি - এসব বাক্য পরিবারেই প্রথম শুনি এবং শিখতে না চাইলেও শিখে ফেলি। কেবল আগে জন্মানোর ভিত্তিতে তিনি যা বলবেন সেটা প্রায় বেদ-বাক্যের কাছাকাছি। তারা আমাদেরকে শেখাচ্ছেন সেটা নিয়ে প্রশ্ন তোলার ধৃষ্টতা দেখাবো না। প্রশ্ন তোলা দরকার পদ্ধতিগত দিক নিয়ে। সন্ধ্যা কখন হয়েছে? পড়তে বসো। কেনো ঠিক সন্ধ্যা নামার সাথে-সাথে পড়ার টেবিলে বসতে হবে সে প্রশ্ন কি আমাদের মনে ছেলেবেলায় আসেনি? এসেছে। কিন্তু প্রশ্ন আসার আগেই আমাদের শিখিয়ে দেয়া হয়েছে যে, এসব প্রশ্ন কখনো করো না, বোবা-কালা হয়ে থাকো। শেখানো হয়েছে, তারা যা বলছেন সেটাই সব। হয়তো সেটাই সব। কিন্তু এখান থেকে আমরা কি শিখি? আমরাও অন্যদেরকে এভাবেই চাপিয়ে দিতে শিখি। আমি জানি, আমার এই অনুভূতির বিষয়ে অনেকেই দ্বিমত করবেন। হয়তো বলবেন, আমি যদি আমার সন্তানকে না শেখাই তবে সে শিখবে কোথা থেকে? লক্ষ্য রাখবেন, শেখা বা শেখানোর বিষয়ে বলছি না, বলছি কিভাবে শিখাবো সেটা নিয়ে। তারজন্য এমনও না যে কিছুই বলবো না, যা ইচ্ছে হয় করুক (শিশুদের জন্য হ্যাঁ বলুন)। ধীরে-ধীরে শিখে যাবে। কিভাবে শিখবে? কোন শিশুর যদি ছাদে উঠে পাখির মতো উড়াল দিতে চায় তবে তাকে নিষেধ করতে হবে বৈকি। এ বিষয়ে 'হ্যাঁ' বলাটা জরুরি নয়। আবার এমন একটা ইচ্ছে পোষণ করায় ঠাস করে গালে চড় বসিয়ে দিলাম সেটাও তো শেখানোর পদ্ধতি হিসেবে সুবিধার নয়। কিন্তু বুঝিয়ে বলতে যাওয়াটা যদি কেউ নিষেধ করার সামিল মনে করেন তবে তাদের থেকে এ-বিষয়ে আমি তফাতে থাকতে চাই। আপাতত। পদ্ধতি সম্পর্কে সিদ্ধান্ত পাকা হলে তবে বসা যাবে।
    শিশুর এই দোলাচল পার হতে না হতেই সে প্রবেশ করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। এবং তারপর জীবনের শেষ পর্যন্ত চলতে থাকা- এভাবেই। এক-সময় এই শিশুটিও শিক্ষকের আসনে বসেন। এবং সাধারণত সেই একই রোল প্লে করেন- সেটাও তো তিনি তার গুরুজনদের দেখেই শিখেছেন। সেই একই সাইক্লিক অর্ডার।

    এই বিষয় নিয়ে কথা বলার আগে একটি বিষয়ে সাবধানতা অবলম্বন করা জরুরি। এ-ধরনের প্রশ্নগুলো উত্থাপন করলে কিন্তু গুরুজনদের দ্বারা বেয়াদপ-অবাধ্য ধরণের উপমায় ভূষিত হবার সম্ভাবনা থাকে। তাই, বলে নিতে চাই, আমি মোটামুটি শিক্ষক অধ্যূষিত পরিবারের মেয়ে। শিক্ষক বা ছাত্র কাউকে ছোট বা বড় করার দীক্ষা আমি পরিবার থেকে পাইনি। আমার প্রশ্নের জায়গা হলো, যে যেখানেই কাজ করুন না কেনো জবাবদিহিতা থাকতে হবে। জবাবদিহিতা না থাকলে স্বচ্ছাচারীতা মাথা চাড়া দেবেই- হাজার হোক মানুষ তো। এই জায়গা থেকেই আমার মনে হয় বিদ্যমান পদ্ধতি পাল্টে দেয়া প্রয়োজন। কেউই এমন কোন পর্যায়ে আসীন যেনো না হয়ে যান যেখানে তাকিয়ে বাকিরা তার অধস্তন বোধ করবে এবং কোন কথা বলার সুযোগ পাবেনা।

    ছাত্র শিক্ষক সম্পর্কের বিষয়ে আমি নির্দিষ্ট করে বিশ্ববিদ্যালয়ের সময়টাকে নিয়েই কথা বলতে চাই। আমার পোক্ত ধারণা মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক সময়ে আমাদের সাথে শিক্ষকদের গুরু-শিষ্য সম্পর্ক একেবারেই তৈরী হয় না। কোনো প্রশ্নের উত্তর খোঁজার কিছুর জন্য পাঠ্য-পুস্তকের বাইরের কোন পাঠ দরকার হয় না, আর টিউশনির মাধ্যমে অনেক সহযোগিতা পাওয়া যায় বিধায় শিক্ষক-শিক্ষার্থীর ভিতরকার সুনির্দিষ্ট কোন সম্পর্ক সেই বারো বছরে তৈরী হয় না। সেখানে শিক্ষার্থীরা একতরফাভাবে শিখেই যেতে থাকে।
    কিন্তু, বিশ্ববিদ্যালয়ে? এখানে নির্দিষ্ট একটি বিষয়ে পড়তে এসে কয়েকটি সম্ভাবনা থাকে। এখানে গুরু-শিষ্য সম্পর্ক হতে পারে, হলুদ নোট শিক্ষক- জেরক্স নোট ছাত্র সম্পর্ক হতে পারে, কনসালটেন্সি করে বেড়ানো শিক্ষক- ফার্স্টক্লাসের লোভে তেল মারা শিক্ষার্থী সম্পর্ক হতে পারে; আবার চাইলে পাঁচ বছরের শিক্ষা-জীবনে পরস্পরের মধ্যে কোন ধরনের সম্পর্ক স্থাপিত নাও হতে পারে। এই সময় আপনি নিজেকে যেভাবে গড়তে পারবেন তার প্রভাবে বাকি জীবনটার ছক গড়ে উঠবে। বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি বিষয়ের ওপর সার্বিক পাঠ শেষ করে আপনি পেশায় নামবেন। সব মিলিয়ে নিজের আদলটা এখানে সম্পূর্ণতা পায় বা পাওয়ার কথা। এইসব বিবেচনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক বিষয়ে বিশ্লেষণের চোখে দেখা প্রয়োজন বলে আমি মনে করেছি।

    আরেকটু বিস্তারিত পরিসরে এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। এতোদিন কানাকানি হতো, এখন সরব হয়েছে। গণ-মাধ্যমেও। বিশেষত, সর্বশেষ ২০০৭ এর আগস্টের ছাত্র-আন্দোলনের পর এটা আরেকদফা মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে। এই বিক্ষোভের সাথে বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের অন্য বিক্ষোভের চরিত্রগত পার্থক্য আছে কয়েকটি দিক থেকে। বাংলাদেশের ইতিহাসে যখনই বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর কর্তৃত্ব খাটানো চেষ্টা করা হয়েছে তখনই পাল্টা অবস্থানে দাঁড়িয়েছে শিক্ষার্থীরা, নিজেদের অধিকার বুঝে নিতে। সরকার পাল্টানোর পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন সেই দলের রঙে নিজেদের রাঙায়। ফলে প্রশাসন কর্তৃক কোন অন্যায় সিদ্ধান্ত গৃহীত হলে বিরোধী রঙের শিক্ষার্থীরা মাঠে নামে, সরকারী শিক্ষার্থীরা তখন শিক্ষার্থীর পক্ষে না গিয়ে সরকারের লোক হিসেবে নিজেদেরকে মনে করে এবং প্রশাসনের পক্ষ নেয়। সাধারণত এমনটাই ঘটে এসেছে। কিন্তু ২০০৭ এর আন্দোলনের চরিত্র ভিন্ন। দেশে তথাকথিত নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায়। সরকারের সহযোগী হিসেবে মাঠে আছে সেনাবাহিনী। এই কাঠামো বাংলাদেশে এই প্রথম। সেই পরিস্থিতিতে যখন সহপাঠীর সাথে অন্যায় আচরণ করা হলো তখন আর শিক্ষার্থীরা কয়েক রঙে নিজেদের রাঙায়নি। একসাথে (!) বিক্ষোভে নেমেছে, নির্দলীয় সরকারের বিপরীতে নির্দলীয় শিক্ষার্থীরা। বিক্ষোভের দিনগুলোয় সংবাদপত্র মারফত জানতে পেরেছি, হাজার-হাজার টিয়ার সেল ছোঁড়ার পর আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর টিয়ার-সেল ফুরিয়ে গেছে। এতো-এতো বিশ্ববিদ্যালয়-কলেজ শিক্ষার্থী, সাধারণ জনতা আহত হয়ে হাসপাতালে গেলেন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন রিক্সাচালক পুলিশের গুলিতে নিহত হলেন, এলোপাথাড়ি টিয়ার-সেলে আশে-পাশের এলাকার শিশু আহত হলো তারপরও নির্দলীয় তত্বাবধায়ক সরকার দাবি করেন তারা ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছেন। তবে পরিস্থিতির কারণে দুঃখপ্রকাশ করছেন তারা (সূত্র: প্রেস বিজ্ঞপ্তি, তথ্য অধিদপ্তর)। এসব বড়-বড় বিষয় নিয়ে কেউ প্রশ্ন করলেন না কিন্তু সব প্রশ্নের বড় প্রশ্ন হয়ে দেখা দিলো,

    ১. ছাত্ররা আন্দোলন করছে সেখানে কেনো শিক্ষকরা একাত্মতা জানাবেন?
    ২. আচ্ছা সেটা না হয় বুঝা, কিন্তু ছাত্ররা মার খাচ্ছে সেটার প্রতিবাদে শিক্ষকরা কেনো মৌন-মিছিল করবেন?
    ৩. তাও না হয় হলো, কিন্তু শিক্ষক-শিক্ষার্থী একই প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে অধিকারের কথা বলবে কেনো?

    এই প্রশ্নগুলো উচ্চারিত করছে যে গোষ্ঠী তারা নিশ্চয় মনে-মনে ভাবেন, মনে-মনে জানেন যে কেমন হওয়া উচিত বিষয়গুলো। এ-সময়টাতে কিছু-কিছু উত্তরও পাওয়া গেছে। যে উত্তরগুলো পাওয়া গেছে সেগুলো থেকেই আমি প্রশ্ন উত্থাপন করতে চাই।

    ১. শিক্ষক-শিক্ষার্থী যদি একই সাথে আন্দোলন করে তাহলে পার্থক্য থাকেনা (আমার প্রশ্ন ঠিক কেমন ধরনের পার্থক্য রাখতে চান আপনারা?
    ২. ওদের রক্ত গরম, জরুরি অবস্থার কথা মনে না রেখে ভাঙচুর শুরু করেছে। তাই বলে শিক্ষকরাও সায় দিবেন? (রক্ত গরম থাকে কোন বয়স পর্যন্ত? আমার বুকে ছুরি মারলেও কি জরুরি অবস্থায় দোহাই দিয়ে চুপ করে থাকবো?)
    ৩. শিক্ষক হলে কিছু বিষয় মানতে হয়। লাল গেঞ্জি পরে, চুল বড় করে ঘুরে বেড়ানো শোভন নয়! (আপনাদের আপত্তি কিসে? লাল গেঞ্জি আর বড় চুলে আপত্তি নাকি আপনি ফুলহাতা শার্ট-প্যান্ট টাই পড়েও ছাত্রদের মাঝে জনপ্রিয় তে পারেন না সেখানে?

    ছাত্র এবং শিক্ষক যে ভিন্ন গোষ্ঠী তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় কনসেপ্টটা কি কেবল এই কথা বলে? শিক্ষকরা ক্লাসে ঢুকে গড়গড় করে পড়িয়ে যাবেন, আর ছাত্ররা পরীক্ষার খাতায় তা হড়বড় করে লিখে যাবে? এমনটাই হয়ে থাকে, যদিও এমনটা হবার কথা নয়। শিক্ষক পাঠ-দান করবেন ঠিকই। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের একটি ছাত্রতো বিষয়গুলো নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করবেন, শুধু শিক্ষক যা বলছেন সেটা নিয়েই তার প্রশ্ন উত্থাপিত হতে হবে তাও তো না। নিজের জ্ঞান পরিস্থিতিকে, বিষয়কে যেভাবে বুঝতে বলে সেভাবে আলাপ-আলোচনার আর কোন জায়গা থাকতে পারে কি - বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়া?

    আপনি আমি যদি শিক্ষকদের প্রশ্ন করি- কেমন ছাত্র চান আপনারা? তবে সাধারণত কোন উত্তরগুলো পাওয়া যাবে? ধারনা করি নীচের উত্তরগুলোই বেশি মিলবেঃ
    ১. ছাত্র হবে ভদ্র। বিভাগে যতোবার দেখা হবে সালাম দিবে।
    ২. বাবা-মা পড়াশোনা করতে পাঠিয়েছে পড়াশোনা করবে। অন্যন্য একটিভিজমের অনেক সময় পড়ে আছে। অতএব ছাত্র ক্লাস করবে, হলে ফিরে পড়ার টেবিলে বসবে, খবরের কাগজ পড়বে, টিভি রুমে যাবে, হলের ভিতর ক্যারাম খেলবে।
    ৩. ক্লাসে কোন তর্ক উত্থাপন করবে না। শিক্ষক সব জানেন এটা মেনে নেবে। এবং শ্রদ্ধা সহকারে শিক্ষক যেভাবে পড়াবেন সেভাবেই বুঝতে চাইবে
    ৪. কোন শিক্ষক পড়াতে পারলো কিনা সেটা নিয়ে সমালোচনা করবে না। তা তিনি বহু পুরনো নোট দেখে পড়ান আর বিসিএস গাইড দেখে পড়ান। মূল কথা বোবা-কালা হয়ে থাকো। কিছুই যদি না জানি এমনি এমনি শিক্ষক হয়েছি?
    ৫. চায়ের দোকানে দীর্ঘ সময় আড্ডা দিবে না

    ছাত্র সম্পর্কে শিক্ষকদের এগুলোই সম্ভবত গড়পরতা চাহিদা। কাঠামোটা এখন এমন দাঁড়িয়েছে যে যতো অন্যায় ঘটুক না কেনো বেশির ভাগ শিক্ষার্থী যাদের ফার্স্টক্লাস পাওয়ার সম্ভাবনা নাই বা যাদের সেকেন্ড ক্লাস হারানোর ভয় নাই তারাও অন্যায়ের প্রতিবাদ করে না। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, বেশির ভাগ শিক্ষার্থী ভয়ে এবং কতিপয় শিক্ষার্থী ফার্স্ট-ক্লাস বাগানোর তাগিদে মূলত শিক্ষকদের চাহিদাগুলো পূরণ করতে চায়। আর এ-পরিস্থিতির ভিতর দিয়ে যেতে গিয়ে গুরু-শিষ্য সম্পর্ক না হয়ে তা হুজুর-গোলামের সম্পর্ক শিক্ষার দিকে মোড় নেয়।

    কিন্তু শিক্ষার্থীরা কি-রকম শিক্ষক চান সেটা কি কেউ কখনো জানতে চেয়েছেন? কাদের তারা গুরু হিসেবে পেতে চান সে বিষয়ে শিক্ষার্থীদের মতামত দেয়ার কোন সুযোগ প্রচলিত কাঠামো করে দেয়নি। ক্লাস তো উপাচার্য করেন না। শিক্ষার্থীরা করে। একজন দলীয় লোক হলে চারটা বা চৌদ্দটা ফার্স্ট-ক্লাস (অনেক শিক্ষক আছেন যারা স্কুল জীবন থেকে কখনও দ্বিতীয় হননি) আছে বলেই একজনকে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দিতে হবে? ক্লাসে তিনি পড়াতে পারেন কিনা এমনকি তার গলার স্বরের কারণে ক্লাসরুমে কথা বুঝা যায় কিনা এসব ধর্তব্যে আনা যায় কিনা? যদি যায় তবে শিক্ষক-নিয়োগে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণের বিষয়টি ভাবা যেতে পারে। কিন্তু এমন প্রস্তাব করা হলে রে-রে করে উঠবেন সকলে, সক্কলে। আবারো সেই কর্তৃত্ব। আমি পড়ানোর যোগ্য কিনা একজন পুচকের কাছ থেকে আমার সে সার্টিফিকেট পেতে হবে? দেশে কি শ্রদ্ধাবোধ বিষয়টা উঠেই গেলো? ফলে ছাত্রদের অংশগ্রহণের বিষয়টা আলোচনায় উঠার আগেই বসে পড়ে।

    শিক্ষার্থীরা কেমন শিক্ষক চান? যারা তাদেরকে দিয়ে এনজিওর গবেষণা করাবেন, এমন শিক্ষক? যারা কনসালটেন্সি করার জন্য ক্লাস ফাঁকি দেবেন; এক মাস পর ক্লাসে এসে কোন একটা বিষয়ে এসাইমেন্ট হাজির করতে বলে আবারো এক মাস লাপাত্তা হয়ে যাবেন- এমন শিক্ষক চান? কিংবা এমন শিক্ষক, যিনি পরিবেশ-প্রতিবেশ পড়াতে গিয়ে বলবেন, পরিবেশ নিয়ে আর কি বলবো? আমাদের চারপাশের সবই আল্লাহর দান। সবাই বলো আলহামদুলিল্লাহ। গড়পরতা শিক্ষকরা বুদ্ধু-ছাত্র চাইলে কি হবে? গড়পরতা শিক্ষার্থীরা বোধ করি উপরে বর্ণিত ধরনের শিক্ষক চান না। ডিফার করবেন আমার সাথে? যাদের গুরু মানা যায় এমন শিক্ষকরা যখন শিক্ষার্থীদের পাশে আসেন তখন শিক্ষার্থীদের মধ্যে যে স্বতঃস্ফূর্ততা পরিলক্ষিত হয় সেটা থেকে বুঝা সম্ভব যে তারা আসলে ভয় পেতে হবে এমন শিক্ষক চান না।

    কেনো দিনের পর দিন এমন চলছে? আজ যারা ছাত্র তারাই শিক্ষক হয়ে কেনো একই বিষয়গুলো ঘটাচ্ছে? এমন দুটো উদাহরণ দেয়া যেতে পারে। এগুলোকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা ভাবার খুব একটা কারণ আছে বলে মনে হয়না। তবে এটুকু বলে নিতে চাই ব্যতিক্রম তো আছেই। শক্ত-ব্যতিক্রম আছে। নিজেকেই এবার উদাহরণের ছকে ফেলতে হচ্ছেঃ

    আমি তখন কেবল ৬ষ্ঠ শ্রেণীতে পড়ি। সে-বছর এক মিশনারী স্কুল থেকে এসে হেলেনাবাদ সরকারী বালিকা বিদ্যালয়ে ভর্তি হলাম। স্কুলের প্রথম দিন। ড্রেস বানানো হয়নি। ক্লাস শিক্ষক রোল কল শেষে পাঁচটা অংক করতে দিলেন। সবার আগে শেষ করে তার কাছে খাতা নিয়ে গেলাম। দুই-হাতে তার সামনে খাতা এগিয়ে দিয়েই তিনি একটানা আমাকে গোটা সাতেক চড় বসিয়ে দিলেন। আমি পড়ালেখায় যথেষ্ট ভালো ছিলাম। কখনো স্কুলে মার খাইনি। শিক্ষকদের সামনে সম্মানের সাথে দুই-হাতে কিভাবে খাতা এগিয়ে দিতে হয় তা আগের পাঁচ-বছর একটি মিশনারী স্কুল থেকে শিখে এসছি। সেই আমি মার খেয়ে হতভম্ব হয়ে গেলাম। বিষয়টা বুঝে উঠতে পারিনি। শিশু-মন ভাবলো ড্রেস না থাকায় বোধহয় মার পড়লো। কিন্তু না, পরে জানলাম দুই-হাতে খাতা দিয়ে শিক্ষককে অসম্মান (?) করার সাজা হয়েছে আমার।

    আমাদের ধর্মের শিক্ষক ক্লাসে অশোভন আচরণ করতেন। একদিন পড়া না পারার কারনে এক ছাত্রীকে তিনি ডাস্টার দিয়ে মারতে শুরু করেন। মারতে-মারতে তাকে মেঝেতে ফেলে দেন। তার ওড়না খুলে যায়। বুকেও কয়েকটা আঘাত করেন। এ-ঘটনা আমাদের বিক্ষুব্ধ করে তোলে। ক্লাস সেভেনে পড়ি। একটা আবেদন-পত্রে জানিয়ে দিলাম আমরা স্যারের ক্লাস করতে চাইনা। কেনো চাই না সেটাও জানিয়ে সবাই ¯^vi করে প্রধান শিক্ষিকার কাছে জমা দিলাম। পরের পিরিয়ডে তিনি ক্লাসে এসে অকথ্য গালাগালি করে বললেন, এতোটুকু মেয়ে অশালীন আচরণের কি বুঝো? কে উদ্যোক্তা বলো? সবাই চুপ করে থাকায় তিনি সব্বাইকে একটা করে চড় লাগালেন। এবং আমাদের বাধ্য করলেন সেই শিক্ষকের ক্লাস করতে।

    বিদ্যমান ব্যবস্থাতে আসলে কেউ একজন শিক্ষক হয়ে উঠলে প্রতিশোধ নেয়ার হাতিয়ারে শান দেয়া সহজ হয়। চাইলেই অমুক ছাত্র অন্যায় করেছে বলে আপনি তাকে ক্লাস থেকে বের করে দিতে পারবেন। ছাত্রের হাতেতো ক্ষমতা নেই যে বলে - অমুক স্যার পড়াতে পারে না; পড়ালেখা করে না। দিনের পর দিন বছরের পর বছর একই টপিক একই গতিতে একই উদাহরনের দ্বারা পড়াতে থাকেন। ছাত্র বলতে পারেনা যে তাকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অব্যাহতি দেওয়া হোক। বিভাগের শিক্ষক খুবই ‘পপুলার’। কোন গুণে? তিনি পিকনিক-বাসে শিক্ষার্থীদের সাথে হিন্দি গানের তালে নাচেন;  তিনি অন্য-শিক্ষকদের অজানা-তথ্য নিয়ে রসালো গল্প ফেঁদে শিক্ষার্থীদের সামনে নির্দ্বিধায় হাজির করতে পারেন; তিনি বলতে পারেন, ‘তোমাকে ফার্স্ট-ক্লাস পাইয়ে দিতে যে-যে খেলা দরকার খেলবো।’ এমন শিক্ষক পপুলার না হয়ে যায় কোথায়?

    শিক্ষকদের দুর্নীতি বিশ্ববিদ্যালয়ে মান-নষ্টের ক্ষেত্রে অন্যতম প্রধান উপাদান। কেমন দুর্নীতি? শিক্ষক প্রতি ব্যাচে দুই-তিনজন 'স্মার্ট ভালো শিক্ষার্থীর' দিকে মনোযোগ দেন এটাকে দুর্নীতি বলবো না? নোট দেখে একই পড়া বছরের পর বছর পড়াবেন এটা দুর্নীতি নয়? যারা এই দুর্নীতির তালে-তাল মিলাতে পারে না, যারা নিজ শক্তি বলে কোনটা দুর্নীতি তা ধরতে শিখেছে সে-শিক্ষার্থীদের কপালে কি থাকে তা কালে-কালে বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে লেখা আছে। চোখ-কান খুলে বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকেছো কি মরেছো। সব দেখেও আমি কিছু দেখিনি বলার অভ্যাস না করতে পারলে ভবিষ্যত অন্ধকার। আর এই গ্যাঁড়াকলে পড়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করেই অনেকে ভালো রেজাল্ট মানে একটি ফার্স্ট-ক্লাসের দিকেই মনোযোগী হয়ে পড়ে; এই রেজাল্ট তার পরবর্তী চাকরি-ক্ষেত্র নির্ধারণ করে। এছাড়াও দেয় ভালো বিয়ে-সুখের সংসার- নিশ্চিত জীবনের নিশ্চয়তা। কালে-কালে যে-সিস্টেম দাঁড়িয়েছে সেটা যাচাই করা জরুরি; সেটাকে চ্যালেঞ্জ করা জরুরি। আমাদের অভ্যাসগুলো পাল্টানো জরুরি। শিক্ষকরা এসে বলুন, কে আমাদের পরীক্ষা নিতে চাও, এগিয়ে এসো। তবে এ-রকম বলার পাশাপাশি এটাও বলতে হবে যে, যারা এগিয়ে আসবে তাদেরকে ভিকটিমে পরিনত করা হবে না। নিরাপত্তা দেয়া হলে দেখবেন কতো শিক্ষকের নামে যৌন-নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে, কতো শিক্ষকের বিরুদ্ধে পরীক্ষার খাতায় নাম্বার কমানো-বাড়ানোর সাপ-লুডু খেলার অভিযোগ ওঠে। প্রশ্ন উঠতে পারে, শিক্ষার্থীদের এই সুযোগ করে দিলে ভূয়া-অভিযোগে শিক্ষকদের অভিযুক্ত করার মতো ঘটনা ঘটতে পারে। মানলাম, পারে। তবে একপাক্ষিকভাবে শিক্ষার্থীরা যে-ধরনের নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন তার প্রতিকারের উদ্যোগের সূচনা হওয়াটা জরুরী। 

    এনুমা এলিসঃ কলামিস্ট

    ২৪ জুলাই ২০০৯

পাঠকের প্রতিক্রিয়া

GREAT...Aha! Sobai Jodi evabe Vabto!

A nice article analyzing the traditional relationship between our teachers and students. A feel-good reading. Thanks writer.

Excelle.write upI

Excellent write-up, carry on........

আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন