• পশ্চিমা কর্পোরেইটদের কারণেই খাদ্য-সঙ্কটের সৃষ্টি
    আশফাক চৌধুরী (রনি)

    দিন-দিন বেড়ে চলেছে ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা। ধারণা করা হচ্ছে, স্থায়ী খাদ্য সঙ্কটের মধ্যে প্রবেশ করতে যাচ্ছে পৃথিবীর মানুষ। সাধারণতঃ প্রয়োজনের তুলনায় খাদ্য উৎপাদনের অপ্রতুলতা অথবা খাদ্যের উচ্চমুল্যের ফলে খাবার মানুষের ক্রয়-ক্ষমতার বাইরে চলে গেলে সৃষ্ট হয় খাদ্য সঙ্কট।

    কিন্তু গত এক দশকে পর্যাপ্ত খাদ্য উৎপাদন সত্ত্বেও খাবারের উচ্চমূল্য ভাবিয়ে তুলেছে পৃথিবীর মানুষকে। খাবারের সংস্থান করতে না পেরে অনাহারে দিনাতিপাত করছে বিশ্বের প্রায় ১.২ বিলিয়ন মানুষ।

    প্রতিবছর অপুষ্টি এবং ক্ষুধার যন্ত্রণায় প্রায় ৯০ লাখ মানুষ (যার মধ্যে ৫ মিলিয়ন শিশু) মৃত্যুকে বরণ করে নিচ্ছে। খাবারের জন্য আফ্রিকা-সহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মানুষ জড়িয়ে পড়ছে দাঙ্গা হাঙ্গামা। তিউনিশিয়া, মিশর, আলজেরিয়াতে দেখা গেছে বিশাল গণক্ষোভ। দক্ষিণ এশিয়াতেও দেখা দিয়েছে অস্থিরতা।

    তবু বেড়ে চলছে খাদ্যের মুল্য।  বিশ্ব ব্যাংক বলছে, গত তিন বছরে খাবারের মুল্য বৃদ্ধি পেয়েছে ৮৩%। সম্প্রতি ব্রিটিশ দাতব্য প্রতিষ্ঠান অক্সফ্যাম জানিয়েছে, ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাপী খাদ্যের গড়মূল্য বাড়বে দ্বিগুণেরও বেশি।

    কেনো এ-খাদ্য সঙ্কট?  কেনোই-বা খাদ্যমুল্যের ঊর্ধ্বগতিকে নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না? এর সোজা উত্তরঃ মুনাফা।

    কিছু কর্পোরেইটের হাউস মুনাফার জন্য পৃথিবীর মানুষ আজ ক্ষুধার যন্ত্রনায় কষ্ট পাচ্ছে। আমেরিকা ভিত্তিক এ্যাগ্রোবিজনেস ফার্মগুলোর আগ্রাসনে ফলে পৃথিবীর কৃষি ব্যাবস্থা সম্পূর্ণ ধবংসের পথে। এ্যাগ্রোবিজনেস ফার্মগুলোর পাশাপাশি আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোও কৃষি পণ্য নিয়ে শুরু করেছে বিভিন্ন ধরনের ব্যাবসা। এর পরণতিতে সৃষ্টি হচ্ছে খাদ্যের কৃত্রিম সঙ্কট।

    আবাসন ব্যবসায় ধ্বস নামার পর আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর তেড়ে আসে কোমৌডিটি মার্কেটের দিকে। মুনাফা সর্বোচ্চকরণের নিমিত্তে শুরু করে ফটকাবাজারী। দিন-দিন কৃত্রিমভাবে বাড়াতে থাকে খাদ্যের মূল্য। এসব আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মুনাফার কারণেই ২০০৭-২০০৮ সালে বিশ্বে দেখা দেয় চরম খাদ্য সঙ্কট।

    তাছাড়া জ্বালানী তেলের অস্থিতিশীল বাজার খাদ্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির জন্য অনেকাংশে দায়ী। বিভিন্ন পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, জ্বালানী তেলের মূল্য বৃদ্ধির সাথে সাথে খাদ্যের মূল্যও বেড়ে যায়। জ্বলানী তেলের মূল্য বৃদ্ধির ফলে পরিবহন খরচ, জ্বালানী খরচ, সেচ ও সারের মতো উপকরণের মুল্য বৃদ্ধি পাওয়াতে কৃষকের উৎপাদন খরচও বেড়ে যায়। যার ফলে কৃষকগণ তাদের ফসলের মুল্য বাড়াতে বাধ্য হয়।

    জাতিসংঘের ফুড এ্যান্ড এ্যগ্রিকালচার  অর্গানাইজেশন   (FAO) এর এক রিপৌর্টে দেখা যায়, জুলাই   ২০০৭ থেকে জুন ২০০৮ এর মধ্যে প্রতি ব্যারেল অপরিশোধিত তেলের মূল্য ৭৫ ডলার থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ১৪০ ডলারে দাঁড়ায়। একই সময়ে মৌলিক খাদ্য ( গম, ভুট্টা, মেইজ ইত্যাদি) মুল্য ১৬০ ডলার থেকে ২২৫ ডলারে গিয়ে ঠেকে। এছাড়া, তেলের মূল্য বৃদ্ধির কারণে পশ্চিমা দেশগুলো বায়োফুয়েল ও ইথানলের মতো জ্বালানীর উৎপাদন বৃদ্ধি করছে (এ ধরণের জ্বালানী প্রস্তুতে প্রচুর পরিমাণে গম, ভুট্টা ও মেইজ ব্যবহৃত হয়)।

    খাদ্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে তেলের মূল্যের পাশাপাশি আর্থিক প্রতিষ্ঠনগুলোর মুনাফা লিপ্সাও দায়ী। ব্যাংক, বীমা, পেনশন ফান্ড এবং হ্যাজ ফান্ডের মতো আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো কোমৌডিটি মার্কেটে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করে। ২০০৭-২০০৮ সালে এ-বিনিয়োগ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। অধিক মুনাফার আশায় এসব প্রতিষ্ঠান কৃত্রিমভাবে স্টক মার্কেটগুলোতে খাদ্য শষ্যের দাম বাড়াতে থাকে, যা বিশ্ব খাদ্য বাজারকে প্রভাবিত করে মারাত্মক ভাবে।

    বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম কয়েকটি ব্যাংক - গৌল্ডম্যান সেকস, মরগান স্টেনলী, বার্কলেইস পিএলসি - বর্তমানে কমৌডিটি মার্কেটে সেরা বিনিয়োগকারী। এসব প্রতিষ্ঠানের ‘ফাইনান্সিয়াল স্টেইটম্যান্ট’ পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, কমৌডিটি মার্কেট থেকে তারা বিপুল পরিমাণ মুনাফা অর্জন করছে।

    বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু বার্কেইলস পিএলসি ‘ফুড স্পেকুলেশন’ এর মাধ্যমে প্রতিবছর ৩৪০ মিলিয়ন পাউন্ড মুনাফা করে থাকে। ব্রিটেইন ভিত্তিক দারিদ্র-বিরোধী সংগঠন ‘ওয়ার্ল্ড ডেভেলপমেন্ট মুভমেন্ট’ তাদের এক রিপৌর্টে উল্লেখ করেছেন, ২০০৫ সালে ‘ইন্ডেক্স ফান্ড’-এ বিভিন্ন ব্যাংকের মোট বিনিয়োগ ছিলো ৪৬ বিলিয়ন ডলার।

    ২০০৭-২০০৮ সালে এ-খাতে ব্যংগুলোর বিনিয়োগ দাঁড়ায় ২৫০ বিলিয়ন ডলার।  আমেরিকান ইনভেষ্টম্যান্ট ব্যংক ‘লীম্যান ব্রাদার্স’  তাদের এক রিপৌর্টে উল্লেখ করেছে, ২০০৩ সালের পর থেকে কমৌডিটি মার্কেটে আর্থিক প্রতিষ্ঠনের বিনিয়োগ বৃদ্ধি পায় ১৯০০% (২০০৮ সাল পর্যন্ত)।

    আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর দুর্নীতি ছাড়াও আমেরিকা এবং ইউরোপীয়ান ইউনিয়নের জ্বালানী বিষয়ক বিভিন্ন নীতি খাদ্য সঙ্কটকে চরম পর্যায়ে নিয়ে যায়। এসব দেশের সরকার বায়োফুয়েল উৎপাদন বৃদ্ধির ব্যাপারে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত খাদ্য শষ্যের উপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে (এ ধরণের জ্বালানী প্রস্তুতে প্রচুর পরিমাণে গম, ভুট্টা, মেইজ ব্যবহৃত হয়)।

    বিশ্ববাজারে জ্বালানী তেলের মূল্য অস্থিতিশীল থাকার ফলে পশ্চিমা দেশগুলো বায়োফুয়েল এবং ইথানলের মতো জ্বালানী উৎপাদন বাড়িয়ে দিচ্ছে। বায়োফুয়েল উৎপাদন বৃদ্ধির ফলে দরিদ্র দেশগুলোতে খাদ্য সঙ্কট সৃষ্টি হবে জেনেও এসব দেশ এর উৎপাদন আরো বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত অটল।
    ২০০৭ সালের বায়োফুল উৎপাদনের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, পৃথিবীর মোট উৎপাদনের ( বায়োফুয়েল) ৪৩% উৎপাদিত হয় আমেরিকায়, ৩২% ব্রজিলে, ১৫% ইউরোপীয়ান ইউনিয়নে, ৩% চীনে, ১% করে ভারতে ও থাইল্যান্ডে এবং ৫% পৃথিবীর অন্যান্য দেশে।

    যেহেতু বায়োফুয়েল উৎপাদনের মূল উপাদান শষ্য, সেহেতু এর উৎপাদন বৃদ্ধির পরিকল্পনা খাদ্য মূল্যে স্বাভাবিকভাবেই খারাপ প্রভাব ফেলবে। খারাপ পরিণতির কথা জেনেও  আমেরিকান কংগ্রেস ২০০৫ সালে শুধু তাদের প্রয়োজনে বায়োফুয়েল উতপাদন বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়। সে-পরিকল্পনা অন্যাযায়ী, তারা ২০১৫ সাল নাগাদ ৫৭ বিলিয়ন লিটার এবং ২০২২ সাল নাগাদ ১৩৬ বিলিয়ন লিটার বায়োফুয়েল উৎপাদন করবে বলে লক্ষ স্থির করেছে।

    খাদ্য সঙ্কটের বর্তমান অবস্থার জন্য বিশেষজ্ঞরা আমেরিকা, ইইউর ধ্বংসাত্মক নীতির পাশাপাশি  আইএম এফ ও ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের স্ট্রাকচারাল এ্যাডজাস্টমেন্ট প্রৌগ্রামকে দায়ী করে থাকেন। তারা মনে করেন, এ-প্রৌগ্রামের মাধ্যমে আইএমএফ এবং বিশ্ব ব্যাংক আফ্রিকা ও দক্ষিণ-এশিয়ার দেশগুলোর কৃষি-খাতকে পশ্চিমা-বিশ্বের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসে।

    তথাকথিত ‘সবুজ বিপ্লবের’ নামে আইএমএফ ও বিশ্ব ব্যাংক কৃষি-ভিত্তিক কর্পোরেইটদের একচেটিয়া বাজার দখলের ব্যাবস্থা করে দেয়। এসব প্রতিষ্ঠান তাদের বীজ, সার ও  কৃষি যন্ত্রপাতির মতো কৃষি উপকরণের মাধ্যমে কৃষকদের জিম্মি করে কৃষি উৎপাদনকে তাদের নিয়ন্ত্রনে নিয়ে যায়। গত কয়েক বছরে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো চরম লোকাসানের মধ্যে থাকলেও কৃষি ভিত্তিক কর্পোরেইটগুলোর মুনাফা অতীতের চেয়ে কয়েকগুণ বেড়ে যায়।

    খাদ্য-সঙ্কট চরম আকার ধারণ করায় বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা বিশ্ব-নেতৃবৃন্দকে ভয়াবহ বিপর্যয়ের ব্যাপারে হুঁশিয়ার করে দিয়েছেন। গত মে মাসে,  দাতব্য প্রতিষ্ঠান অক্সফ্যাম বিশ্ব-নেতৃবৃন্দকে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাপী খাদ্যের গড় মূল্য দ্বিগুণেরও বেশি হবে। এ-বছরের এপ্রিল মাসে বিশ্বব্যাংক তার এক রিপৌর্টে বলেছে, খাদ্যমূল্য বৃদ্ধির ফলে জুন মাস থেকে পৃথিবীর  প্রায় সাড়ে চার কোটি  মানুষকে নতুন করে দারিদ্র-সীমার ভেতরে ঠেলে দিয়েছে। এসব হুঁশিয়ারির পরিপ্রেক্ষিতে ইউরৌপ ভিত্তিক প্রগতিশীল দলগুলো আন্তর্জাতিক খাদ্য-পদ্ধতির আমূল সংস্কারের দাবী জানিয়েছে।

    খাদ্য নিয়ে পশ্চিমা বিশ্বের কর্পোরেইটদের অনৈতিক ব্যবসা বন্ধ না হলে ভবিষ্যৎ এ-পৃথিবীর মানুষ ভয়াবহ পরিণতির মুখোমুখি হবে। এ-পরিণতি ঠেকাতে সর্বস্তরের মানুষের প্রতিরোধ প্রয়োজন।

    মঙ্গলবার, ২০ জুলাই ২০১১
    গ্যান্টসহিল
    এসেক্স, ইংল্যান্ড

পাঠকের প্রতিক্রিয়া

খুব সুন্দর একটি প্রবন্ধ। অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য এতে সন্নিবেশ করা হয়েছে। লেখকে ধন্যবাদ।

SALAM RONY BHI,
THANK YOU VERY MUCH, ITS IMPORTENT INFORMATION

রনি,
লেখটি খুব ভালো হয়েছে। সব সময় লিখবে এই আশা করতে পারি নিশ্চয়ই। পরের লেখার অপেক্ষায় থাকলাম।
- স্বপন

রনি,
লেখা খুব চমৎকার! পড়ে ভাল লাগলো।

আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd>
  • Lines and paragraphs break automatically.

লেখা ফরম্যাট করার বিষয়ে আরো তথ্য

আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন