• পার্বত্য চট্টগ্রামে ক্ষুদ্র জাতিগুলোকে উপজাতি হিসাবে আখ্যায়িত করার চেষ্টা ও রাষ্ট্রের এথনিক ক্লিনজিং পলিসি
    নিরন চাকমা

    গত ২৮ জানুয়ারী ২০১০ ”উপজাতীয় সম্প্রদায়গুলোকে আদিবাসী হিসাবে আখ্যায়িত করার অপতৎপরতা প্রসঙ্গে” শিরোনামে সরকারী এক গোপন প্রতিবেদনে বাংলাদেশে সংখ্যালঘু জাতিসত্তাগুলোকে উপজাতি হিসেবে অভিহিত করার জন্য নির্দেশ দেয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় কর্তৃক আদিষ্ট হয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে তিন পার্বত্য জেলার ডিসি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবর এই গোপন নির্দেশ জারি করা হয়। এতে বলা হয়, “জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে বাংলাদেশ সরকার বরাবরই বলে আসছে যে, বাংলাদেশে কোন আদিবাসী নেই। কিছু উপজাতি জনগোষ্ঠি রয়েছে মাত্র।“ উক্ত গোপন প্রজ্ঞাপন এমন সময় দেয়া হয়েছে যখন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ বর্তমান ক্ষমতাসীন আওয়ামী সরকারের উচ্চপদস্থ কর্তাব্যক্তিরা পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণের শান্তি, উন্নয়ন ও অধিকার প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকারের কথা অহর্নিশ বলে বেড়াচ্ছেন। এ নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের আদেশ-প্রাপ্ত হয়ে দেয়া হয়েছে, যার অর্থ হলো স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী এর সাথে সংশ্লিষ্ট। আর সহজভাবে বললে তার নির্দেশেই উক্ত গোপন প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। কিন্তু কেন এই গোপন প্রজ্ঞাপন? কেন দেশের সংখ্যালঘু জাতিগুলোকে অবমাননাকর ও তুচ্ছার্থে ব্যবহৃত “উপজাতি” হিসেবে অভিহিত করা?

    এই প্রশ্নের উত্তর দেয়ার আগে বলা দরকার ক্ষুদ্র ও দুর্বল জাতিগুলোকে “উপজাতি” বলে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য ও অবমাননা করার মধ্যে রাষ্ট্রের উপনিবেশিক দৃষ্টিভঙ্গিই প্রতিফলিত হয়ে থাকে। ক্ষুদ্র ও দুর্বল জাতিগুলোকে পরাধীন ও উপনিবেশিক শৃঙ্খলে আবদ্ধ রাখার জন্য বা তাদের ওপর প্রভূত্ব বজায় রাখার জন্য শাসকগোষ্ঠিগুলো বিভিন্ন ধরনের পন্থা ও কলা-কৌশল অবলম্বন করে। তারা জানে কেবল পেশি শক্তি বা বন্দুকের জোরে একটি জনগোষ্ঠিকে দাবিয়ে রাখা সম্ভব নয়। তাই জোর-জবরদস্তির পাশাপাশি চলে ক্ষুদ্র জাতিসত্তার জনগণের চেতনার ওপরও প্রভুত্ব বিস্তার করার প্রচেষ্টা, তাদেরকে চেতনাগতভাবে দাসে পরিণত করা। এজন্য কৌশলী প্রচারণা চালিয়ে পরাধীন জাতির জনগণের মধ্যে হীনমন্যতাবোধ সৃষ্টি করা হয়। কারণ কোন একটি জাতি যদি নিজের সম্পর্কে হীনমন্যতায় ভোগে, তাহলে তাকে শাসন করা সহজ হয়। হীনমন্যতায় আক্রান্ত জাতি বা জনগোষ্ঠি কখনো সংগ্রামী হয় না, নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হয় না। বাংলাদেশের শাসকগোষ্ঠির কাছে “উপজাতি” শব্দটির গুরুত্ব এ কারণেই। “উপজাতি” যেহেতু জাতি নয়, জাতি থেকে অধস্তন, কাজেই তোমাদেরকে বাঙালী জাতির অধীন হয়ে থাকতে হবে--ওই গোপন প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে সরকার এই বার্তাটিই দিতে চেয়েছে।

    আসলে “উপজাতিরা” যদি নিজেদের জাতি হিসেবে ভাবতে শুরু করে তাহলে শাসকগোষ্ঠির জন্য বিপদ। অবশ্য এই জাতীয় চেতনা ইচ্ছে করলেই কেউ সৃষ্টি করতে পারে না। একটি জনগোষ্ঠির মধ্যে জাতীয় চেতনার উন্মেষ হয় তখনই যখন সে জনগোষ্ঠির সমাজ তার ঐতিহাসিক বিকাশের প্রক্রিয়ায় একটি নির্দিষ্ট স্তরে উপনীত হয়। সাধারণত: সামন্ত সমাজের অবক্ষয় ও পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক সম্পর্কের প্রারম্ভকালে একটি জনগোষ্ঠির মধ্যে জাতীয় চেতনার বিকাশ ঘটতে দেখা যায়। যে জাতি বা জনগোষ্ঠি পরাধীনতার নাগপাশ থেকে মুক্ত হতে চায় তাকে তাদের ওপর শাসকগোষ্ঠির আরোপিত বিরূপ ধ্যান-ধারণার বিরুদ্ধে সংগ্রাম পরিচালনা করতে হয়। তা না হলে শাসকদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে জনগণকে সংগঠিত ও জড়িত করা যায় না। তাই, চার্লস টেইলর তার পলিটিক্স অব রিকগনিশন গ্রন্থে বলেন, “The first task of the colonised and racially oppressed must be to purge themselves of the destructive identity imposed on them by their oppressors” অর্থাৎ উপনিবেশিক ও নির্যাতিত জনগণের প্রথম কাজ হলো তাদের ওপর নির্যাতক জাতির আরোপিত ক্ষতিকর পরিচিতিগুলো ঝেটিয়ে বিদায় করা।

    এই কাজটা করা সম্ভব হলে মুক্তি অর্জনের লক্ষ্য  অর্ধেক পূরণ হয়ে যায়। এ প্রসঙ্গে ‘আদিবাসী’ শব্দটি সম্পর্কেও কিছুটা আলোচনা করা দরকার। সরকার একদিকে দেশে ‘আদিবাসী’ নেই বলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রচার করে বেড়ায়, অপরদিকে তার মন্ত্রী, এমপিসহ আওয়ামী ঘরানার বুদ্ধিজীবীরা ক্ষুদ্র জাতিগুলোকে “আদিবাসী” বলে আখ্যা দেয়। আবার দাপ্তরিকভাবে বা অফিসিয়ালি সরকার তাদেরকে “উপজাতি” হিসেবে উল্লেখ করে থাকে। “আদিবাসী” শব্দটি যথেষ্ট প্রচলন হলেও, নিজেদেরকে “আদিবাসী”হিসেবে পরিচয় দেয়ার মধ্যে গৌরবের কিছু নেই। তাছাড়া রাজনৈতিক ও নৃতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকেও জাতি বা জাতিসত্তার বিকল্প হিসেবে আদিবাসী শব্দটির ব্যবহার যথার্থ নয়। বিশেষণ হিসেবে “আদিবাসী” শব্দটি ব্যবহার করা হলে আপত্তির কারণ থাকতে পারে না--যেমন আদিবাসী জাতিসমূহ বললে বোঝা যায় তারা অন্যরা আসার আগে নির্দিষ্ট ভূমিতে বসবাস করেছিলেন। কিন্তু “আদিবাসী” শব্দটি জাতি বা জাতিসত্তার বিকল্প হতে পারে না। বর্তমানে “আদিবাসী” শব্দটি যে অর্থে ব্যবহৃত হচ্ছে তাতে শব্দটির মধ্যে এমন ব্যঞ্জনা তৈরি হয় যাতে মনে হতে পারে যে, যে জনগোষ্ঠিকে “আদিবাসী” হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে সে জনগোষ্ঠি অপরিবর্তনীয় স্থির কোন এক সত্তা। এতে সমাজ বিকাশের নিয়মকে পুরোপুরি অস্বীকার করা হয়। কারণ কোন জাতি বা জনগোষ্ঠি কখনোই স্থির বা অপরিবর্তনীয় নয়। দ্বিতীয়ত, “আদিবাসী” শব্দটিকে রাজনৈতিক অভিধা হিসেবে আখ্যা দেয়া যায় না; বরং এর মধ্যে সাংস্কৃতিক বর্গ হিসেবে পরিচয় পাওয়ার ঝোঁকই বেশী। সেই জন্য “আদিবাসীরা” অধিকার আদায়ের সংগ্রামকে কখনোই রাজনৈতিক সংগ্রামের উচ্চস্তরে নিয়ে যান না। তারা একে সাংস্কৃতি আন্দোলনের গন্ডিতে সীমাবদ্ধ রাখেন-- তথাকথিত আদিবাসী মেলা ও উৎসব আয়োজনের মাধ্যমে (বর্তমানে এই আদিবাসী মেলাকে আর্থিকভাবে সহযোগিতা দিচ্ছে বিভিন্ন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান)। অথচ যে কোন জনগোষ্ঠির অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম হলো প্রকৃতপক্ষে রাজনৈতিক সংগ্রাম। এই সংগ্রামকে নিছক সাংস্কৃতিক মেলায় নামিয়ে ফেলা চরম মূঢ়তারই পরিচায়ক।

    জাতি ও উপজাতির মধ্যে সম্পর্ক কখনোই সম-মর্যাদার উপর প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না। সে কারণে তাদের মধ্যে কখনোই প্রকৃত ঐক্য প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। একটি প্রকৃত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে বসবাসরত বিভিন্ন জাতি বা জনগোষ্ঠি--ক্ষুদ্র হোক, বৃহৎ হোক-- প্রত্যেকে সমানাধিকার ও সম-মর্যাদা ভোগ করবে সেটাই স্বাভাবিক। একটি জাতি যে অধিকার ভোগ করে অন্য একটি জাতিও সেই একই অধিকার ভোগ করবে এবং কোন জাতির বিশেষ অধিকার থাকবে না, কোন জাতি অন্য কোন জাতির ওপর প্রভুত্ব করবে না--এটাই হলো গণতান্ত্রিক ভিত্তিতে জাতিগুলোর মধ্যে ঐক্য ও মহা-মিলন ঘটানোর একমাত্র পথ। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতার ভাষায় : আমরা সবাই রাজা আমাদের রাজার রাজত্বে, নইলে মোরা রাজার সনে মিলব কি সত্তে? একটি দেশের ভৌগলিক সীমার মধ্যে জাতিগুলোর বিকাশ সমান নাও হতে পারে। অর্থ্যাৎ জাতিগুলো তাদের ঐতিহাসিক বিকাশের বিভিন্ন স্তরে থাকতে পারে। একটি প্রকৃত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো পশ্চাদপদ জাতিগুলোর বিকশিত হওয়ার পূর্ণ অধিকার ও পরিবেশ নিশ্চিত করা। এক্ষেত্রে রাষ্ট্রের ভূমিকাকে বাগানের মালির সাথে
    তুলনা করা যেতে পারে। মালি যেমন বাগানের প্রত্যেক গাছের পরিচর্যা করে এবং বিশেষত দুর্বল ও কচি চারা গাছগুলোর বেশী করে যত্ন নিয়ে থাকে, বিভিন্ন জাতির বিকাশে সহায়তা দেয়ার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের কাজও  হলো অনেকটা তেমনই।

    বাংলাদেশ রাষ্ট্রের চরিত্র মোটেই গণতান্ত্রিক নয় এবং এদেশে বসবাসরত জাতিগুলো সমান অধিকার ভোগ করে না। বাংলাদেশের সংবিধানে তাদের কোন স্বীকৃতি নেই এবং এখনো
    দেশে তাদের উপস্থিতিকে অস্বীকার করা হয়। বস্তুত স্বাধীনতার পর থেকেই ক্ষুদ্র জাতিগুলোর অস্তিত্ব ধীরে ধীরে বিলীন করে দেয়ার ষড়যন্ত্র শুরু হয়। সংবিধানে জাতিসত্তার স্বীকৃতি না দেয়া, পার্বত্য চট্টগ্রামে ব্যাপক সামরিকায়ন, সেটলার পুনর্বাসন, একের পর এক গণহত্যা চালানো, ভূমি বেদখল, অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করা ইত্যাদি রাষ্ট্রের এথনিক ক্লিনজিং নীতির সাথে সম্পর্কিত। “উপজাতি” আখ্যায়িত করার নির্দেশনামা যে উপরোক্ত পদক্ষেপের নতুন সংযোজন তাতে কোন সন্দেহ থাকতে পারে না।

    ০২/০৭/১০

     

পাঠকের প্রতিক্রিয়া

@ নিরন চাকমা,

দেশের ভাষাগত সংখ্যালঘুরা 'উপজাতি', 'ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠি', 'ক্ষুদ্র জাতিস্বত্ত্বা' ইত্যাদি অভিধা বর্জন করে অনেক আগেই নিজেদের 'আদিবাসী' হিসেবে চিহ্নিত করেছে; এমনকি যখন আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতির দাবিতে আন্দোলনও গড়ে উঠেছে, তখন আপনার 'ক্ষুদ্র জাতিস্বত্ত্বা'র পক্ষে সাফাই গাওয়াটা সত্যিই খুব হাস্যকার। আর কতকাল নিপীড়িত আদিবাসীদের 'ক্ষুদ্র' মানসিকতায় আটকে রাখতে চান?

আপনার ভাষ্যমতে, 'আদিবাসী' শব্দটিকে নাকি রাজনৈতিক অভিধা হিসেবে আখ্যা দেয়া যায় না; আপনার মতে, বরং এর মধ্যে নাকি সাংস্কৃতিক বর্গ হিসেবে পরিচয় পাওয়ার ঝোঁকই বেশী।...আপনার এ কথাও মিথ্যেরই নামান্তর।

ইতিহাস স্বাক্ষী, প্রায় দেড়শ বছর আগের সাঁওতাল বিদ্রোহ, নাচোলের তেভাগা আন্দোলন, কোচ-মুণ্ডা বিদ্রোহ-- ইত্যাদি রক্তক্ষয়ী আন্দোলনকে নিখিল ভারত কমিউনিস্ট পার্টি প্রথম 'আদিবাসী বিদ্রোহ' হিসেবে আখ্যায়িত করে; সেই থেকে ভাষাগত সংখ্যালঘু জাতিগোষ্ঠিসমূহ 'আদিবাসী' অভিধা জনপ্রিয়তা লাভ করে।

এরপরেও পুরনো বিতর্কটিকে উস্কে দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।
---
আপনার লেখাটি ফেসবুক গ্রুপ 'পাহাড়ের রূদ্ধকণ্ঠ CHT Voice' এ শেয়ার করলাম।

আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন