• পৃথিবীটা কার গোলাম?
    চিররঞ্জন সরকার

    রম্য কলাম

    পৃথিবীটা কার গোলাম? পৃথিবী টাকার গোলাম। এ-ব্যাপারে কারো কোনো সংশয় থাকার কথা নয়। দুনিয়ায় আমরা যারা বেঁচে আছি, টিকে আছি তারা প্রতিনিয়ত হাড়ে-হড়ে টের পাচ্ছি টাকার গুরুত্ব এবং মাহাত্ম্য। টাকা হলে রাধারাও নাচে। বাঘের দুধ দিয়ে তৈরি চা পান করা যায়। মার্কিন রাষ্ট্রপতি বারাক ওবামার অতিথি হয়ে তার সঙ্গে এক টেবিলে খাবার খাওয়া যায়। জগতের শ্রেষ্ঠ সুন্দরীরও সান্নিধ্য লাভ করা যায়। ইচ্ছে হলে সমুদ্রের তলদেশের বিচিত্র প্রাণীজগৎকেও নিজ চোখে দেখে আসা যায়। টাকা হলে যা ইচ্ছে তাই করা যায়। টাকা বা টাকাওয়ালাদের পক্ষেই গোটা জগৎ। টাকাওয়ালাদের স্বার্থেই রাষ্ট্র এবং সরকার। টাকাওয়ালাদের স্বার্থ রক্ষার জন্য আইন-কানুন-প্রশাসন।

    দুনিয়াটা টাকার গোলাম হলেও বাংলাদেশ ছাড়া পৃথিবীর কোনো দেশেই কিন্তু কাঁড়ি কাঁড়ি টাকার মালিক হওয়া সহজ কাজ নয়। অন্য সব দেশে এজন্য অনেক পরিশ্রম করতে হয়। একটু একটু করে, অনেক সাধ্য-সাধনার পর টাকার মালিক হওয়া যায়। ধনী হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাওয়া যায়। পুঁজিবাদী দেশগুলোতেও পুঁজি গড়ে ওঠে ধীরে এবং কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে। আমেরিকার বিল গেটস, ফোর্ড, কার্নেগি, রকফেলার; জার্মানির ক্রুপস, জাপানের মিৎসুবিশি, মিৎসুই থেকে শুরু করে ভারতের টাটা-বিড়লা পর্যন্ত কেউই পারমিটবাজি বা নিছক সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় দু'দশ বছরের মধ্যে নিঃসম্বল অবস্থা থেকে কোটিপতিতে পরিণত হননি।

    কিন্তু বাংলাদেশে কোটিপতি হওয়ার জন্য তেমন কোনো সাধনা বা পরিশ্রম করতে হয় না;  এখানে 'অলৌকিক' উপায়ে রাতারাতি কোটিপতি হওয়া যায়। রাষ্ট্র এবং সরকার স্বয়ং এ ব্যাপারে যথাযথ সহায়তা প্রদান করে। কিছু সংখ্যক মতলববাজ কপর্দকহীন অর্বাচীনকে রাতারাতি কোটিপতিতে রূপান্তরিত করতে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটির কোনো জুড়ি নেই।

    বাংলাদেশকে পৃথিবীর সবচেয়ে দরিদ্র দেশগুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই অনুন্নত গরিব দেশটি কোটিপতি উৎপাদনের কারখানাও বটে। বর্তমানে বাংলাদেশে ধনী বা কোটিপতির সংখ্যা কত? বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্ণরের পক্ষে তা বলা সম্ভব নয়। কারণ কে যে কোথায় ফুলে-ফেঁপে কীভাবে কোটিপতিতে পরিণত হচ্ছে তার হদিস রাখার মত কোনোরকম ম্যাকানিজম বাংলাদেশ ব্যাংকেরও নেই। অথচ মাত্র তিন দশক আগেও বাংলাদেশে টাকাওয়ালা লোকের সংখ্যা ছিল হাতে গোনা। পাকিস্তান আমলে মাত্র ২২ টি পরিবারের কোটিপতি হিসেবে খ্যাতি ছিল। ওই ২২ পরিবারের কোটিপতি হওয়ার পেছনেও অবশ্য রাষ্ট্রীয় আনুকূল্য ও ভোজবাজি কাজ করেছিল। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর কোটিপতি হওয়ার এই ধারা আরো অনেক বেশি বিকশিত হয়েছে। এখন আমাদের দেশে কোটিপতির মোট সংখ্যা কেউ জানে না; তবে বিশেষজ্ঞদের ধারণা বাংলাদেশে এখন কোটিপতির সংখ্যা কয়েক লাখে পরিণত হয়েছে।

    বাংলাদেশে অযুত-নিযুত কোটিপতি সৃষ্টির এই যে জাদুকরি ব্যবস্থা, একে কি কোনোভাবে খাটো করে দেখা চলে? ২২ পরিবার থেকে অযুত-নিযুত কোটিপতি পরিবার - এটাই হচ্ছে আমাদের স্বাধীনতা অর্জনের সবচেয়ে বড় সুফল! পাকিস্তান আমলে এই ২২ পরিবারের ইচ্ছাতে দেশ চলতো। আর এখন এই নব্য-কোটিপতিদের ইশারায় দেশ চলে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যেমন কোটিপতির ছড়াছড়ি, কোটিপতির সংখ্যার দিক থেকে আমরা সম্ভবত খুব শিগগিরই তাদের সঙ্গে পাল্লা দেয়ার মত অবস্থায় পৌছে যাব। যদিও সামগ্রিকভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে চারপেয়ে জন্তুদের জীবনযাত্রার মান আমাদের দেশের সাধারণ মানুষের চেয়ে অনেক অনেক ভালো।

    বিশিষ্ট সাংবাদিক জহুর হোসেন চৌধুরী একবার দরবার-ই-জহুর কলামে লিখেছিলেন, সন্তান উৎপাদনের যেমন একটামাত্র প্রক্রিয়াই রয়েছে, তেমনি কোটিপতি হওয়া যায় একটামাত্র পন্থাতেই - চৌর্যবৃত্তি ও দুর্নীতির মাধ্যমে। পৃথিবীর অন্যান্য দেশে সাধারণত আইনের আওতার মধ্যে এদিক-সেদিক অনেক ঝকমারি করে বড়োলোক বা কোটিপতি হতে হয়। আর এখানে রাতারাতি আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হওয়ার নিয়ম। রাতে ফাটা স্যান্ডেল, ছেঁড়া জুতা তো সকালেই নতুন বাড়ি, নতুন গাড়ি। এখানে এমনকি ভাঙা স্যুটকেসওয়ালাও কোটিপতি বনে যায়। আমাদের দেশের কোটিপতিদের সঙ্গে অন্যান্য দেশের কোটিপতিদের পার্থক্য রয়েছে। অন্যান্য দেশের কোটিপতিরা দেশকে শিল্পায়িত করার ব্যাপারে অবদান রাখেন। দেশের টাকা দেশের ব্যাংকে জমা রাখেন। কিন্তু আমাদের দেশের ফাটকা কোটিপতিরা শিল্পায়নে পুঁজি বিনিয়োগে বড় বেশি আগ্রহ দেখান না। নামকাওয়াস্তে শিল্প-কারখানা দেখিয়ে দেশীয় ব্যাংক থেকে কোটি- কোটি টাকা ঋণ নিয়ে তা আর ফেরত দেন না। ওদিকে তথাকথিত এই শিল্প-প্রতিষ্ঠান 'সিক' দেখিয়ে আরো টাকা নেয়ার অথবা ঋণ মওকুফের চেষ্টা চালান।

    এদেশে মুক্তবাজার অর্থনীতি বা বেসরকারিকরণের নামে পানির দামে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলো বিভিন্ন ব্যক্তির হাতে তুলে দেয়া হয়েছে, এই প্রক্রিয়া প্রত্যক্ষভাবে না হলেও পরোক্ষভাবে এখনও অব্যাহত রয়েছে। আর একসব প্রতিষ্ঠান কিনে যেমন, বেচেও তেমনি অনেকেই কোটিপতি বনে গেছেন। পাশাপাশি সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে দুর্নীতি ও লুটপাটের মাধ্যমে কোটিপতি তৈরির পথ সুগম রাখা হয়েছে। এছাড়া রাষ্ট্রীয় আনুকূল্য নিয়ে আদম পাচার, মাদক ব্যবসা, অস্ত্র ব্যবসাসহ আরো নানা অবৈধ ব্যবসা করে এদেশে কোটিপতি তৈরির এক মহা-আয়োজন জারী আছে বলে শুনা যায়। সরকারি লাইসেন্স-পারমিটবাজি, কমিশন-সুদ-ঘুষ, চাঁদাবাজি ইত্যাদির মাধ্যমে কোটিপতি সৃষ্টির প্রয়াস তো আছেই। ব্যাংক থেকে কোটি-কোটি টাকা ঋণ নিয়ে এবং তা মেরে দিয়ে কোটিপতি হওয়ার এমন কাহিনী পৃথিবীর অন্য কোথাও আর খুঁজে পাওয়া যাবে বলে মনে হয় না। এ এক আশ্চর্য নীতির দেশ বটে! এখানে রাজউকের কর্মচারীরাও কোটিপতি। বিমানবন্দর কাস্টমের ঝাড়ুদারও কোটিপতি। তহসিল অফিসের কেরানি, টেক্সট বুক বোর্ডের পিয়ন, শিক্ষা অধিদপ্তরের দারোয়ান, পুলিশের সেপাই, আদালতের পেশকার প্রমুখ ব্যক্তিও অবৈধ আয়ের জোরে কোটিপতি। আর একবার কোটিপতি হয়ে গেলেই তাদের হাব-ভাব-স্বভাব সবকিছু পাল্টে যায়। তারা তখন দেশ নয়, বিদেশ নিয়ে স্বপ্ন দেখেন। আরো-আরো অর্থ কামানোর অবারিত পথ খোঁজেন। শুধু টাকাই নয়, তখন একটু ক্ষমতার স্বাদও নিতে চান। 

    ইদানীং আমাদের দেশে টাকাওয়ালাদের প্রকোপ এতটাই বেড়েছে যে, তারা নেপথ্যে থেকে অনুগত গোষ্ঠীকে দেশ চালানোর ভার দিয়ে এখন আর খুব একটা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না। তারা নিজেরাই এখন ক্ষমতা দখল ও পরিচালনায় তৎপর। গত কয়েকটি জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী ও বিজয়ী ব্যক্তিদের আর্থ-সামাজিক অবস্থা পর্যালোচনা করলে দেখা যায় জাতীয় সংসদ বর্তমানে স্রেফ পুঁজিপতি ও কোটিপতিদের ক্লাবে পরিণত হয়েছে। তারা তাদের ইচ্ছে ও স্বার্থানুযায়ী এই ক্লাব পরিচালনা করছেন। তারা তাদের স্বার্থ ও সুবিধে অনুযায়ী আইন প্রণয়ন করছেন, নিজেদের স্বার্থের অনুকূল নয়, এমন আইন বা বিধি বাতিল করছেন। নিজেদের স্বার্থ অনুযায়ী সংসদে যাচ্ছেন, আবার স্বার্থের ব্যাঘাত ঘটার আশঙ্কায় যাচ্ছেন না। এ ব্যাপারে তাদের কোনো দায় নেই, দায়িত্ব নেই, আর জবাবদিহিতা তো নেই-ই।  

    এই পুঁজিপতিদের দেশে, কোটিপতিদের শাসনে, ধনপতিদের দৌরাত্ম্যের মধ্যে আমাদের একমাত্র সান্ত্বনা - আমরা গরিব। আমরা চুরি-জোচ্চুরি করে, গরিবের রক্তচোষা টাকায় বড়লোক হইনি (হতে পারিনি!)। গরিব হওয়ার বা গরিব থাকার অনেক অসুবিধা আছে। কিন্তু সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো গরিব থাকার জন্য কোনো খরচা লাগে না। আমরা বেহুদা খরচার হাত থেকে মুক্ত থাকতে পেরেছি - এর চেয়ে বড় সান্ত্বনা আর কি হতে পারে?     

    ১১ নভেম্বর ২০০৯

আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন