• বাংলাদেশে টেরিস্ট্রিয়্যাল চ্যানেল ও শিক্ষা-মূলক অনুষ্ঠান নির্মাণ প্রতিষ্ঠান
    রওশন আক্তার

    বেসরকারী কোনো টেলিভিশন চ্যানেল টেরিস্ট্রিয়্যাল সুবিধা পাবে না। জনগণের একচ্ছত্র ম্যান্ডেইট নিয়ে বাংলাদেশে ক্ষমতায়-আসা সরকারের এ-সিদ্ধান্ত আমাদের ব্যথিত করলেও খুব একটা বিস্মি করেনি। কারণ, এদেশে গণ-মাধ্যমের অতীত যারা জানেন, তাদের কাছে বেতার-টেলিভিশনের ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার আকাঙঙ্খা অতি-স্বাভাবিক একটি প্রবণতা হিসেবেই এতো-দিনে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। তবে এ-ব্যথাও কিছুটা উপশমিত হয়, যখন প্রধানমন্ত্রী যখন ঘোষণা দেন ভবিষ্যতে সরকার বিটিভির আরেকটি টেরিস্ট্রয়্যাল চ্যানেল চালু করবে, সে-চ্যানেলে সরাসরি সংসদ অধিবেশন দেখানো হবে এবং সংসদ যখন থাকবে না তখন শিক্ষামূলক অনুষ্ঠানমালা প্রচারিত হবে। অল্প কিছুদিন আগে ভারতের স্পীকার যখন বাংলাদেশ সফর করেন, তখন থেকেই অবশ্য সরকার ভারতের অনুসরণে সংসদ অধিবেশন প্রচারের জন্য একটি চ্যানেল চালুর বিষয়টি নিয়ে মিডিয়াতে টুকটাক কথা বলছিলো। এখন প্রধানমন্ত্রী সরাসরি সে-ঘোষণাটাই দিলেন।

    বর্তমানে আমরা বিটিভির মাধ্যমে সংসদ অধিবেশন দেখতে পারি। তবে ভারতের ন্যায় সংসদের জন্য আলাদা চ্যানেল চালু হলে নিরবচ্ছিন্নভাবে এবং আরও বিস্তারিতভাবে দেশবাসী সেটা দেখার সুযোগ পাবেন। কিন্তু আমার লেখার বিষয় সংসদ অধিবেশন দেখার উপকারিতা নয়। বরং সংসদ যখন থাকবে না তখন শিক্ষা-মূলক অনুষ্ঠান সম্প্রচারের যে-ঘোষণা আমরা পেয়েছি, সেখানটাতেই কিছুটা আলোকপাত করতে চাচ্ছি। আমাদের স্যাটেলাইট চ্যানেলগুলোর সবই মূলতঃ বিনোদন-নির্ভর। বাজার-নির্ভর কর্পোরেইট মিডিয়ার যুগে অবশ্য সেটাই স্বাভাবিক| এ-সব চ্যানেলে সপ্তাহের কোনো-কোনো দিন সামান্য সময়ের জন্য বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে প্রচারিত ইংরেজী ভাষা শিক্ষার অনুষ্ঠান ছাড়া আর কোনো শিক্ষা-মূলক অনুষ্ঠান দেখেছি বলে আমার মনে পড়ছে না। বিটিভির দশাও প্রায় একই রকম। অবশ্য উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু অনুষ্ঠান বিটিভিকে স্যাটেলাইট চ্যানেলগুলো থেকে একটু আলাদা করে। তারপরও বলতে হয় শিক্ষামূলক অনুষ্ঠান প্রচারের ঐতিহ্য আমাদের ব্রডকাস্ট মিডিয়ার তেমন একটা নেই।

    তাই সত্যিই যদি আমরা একটি শিক্ষা-মূলক অনুষ্ঠান প্রচারের চ্যানেল পেয়ে যাই, তাহলে সেটা কীভাবে কেমন অনুষ্ঠান প্রচার করবে, সে-বিষয়ে শুরু থেকেই একটা নির্দেশনা থাকা দরকার। অনুষ্ঠানগুলো কারা তৈরী করবে? সেটা কি সংশ্লিষ্ট চ্যানেলের লোকজনই তৈরী করবে, নাকি এখন যে-ভাবে ইংরেজী ভাষা শেখানোর বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেরাই নিজেদের অনুষ্ঠান তৈরী করে চ্যানেলে পৌছে দেয়, সে-রকমই হবে? এ-সব অনুষ্ঠানের মানই বা কীভাবে নির্ধারিত হবে? বিশ্বের বহু দেশেই শিক্ষা-মূলক অনুষ্ঠান প্রচার করা হয় এবং সেটা সাধারণতঃ প্রতিটি দেশের নিজম্ব শিক্ষা ব্যবস্থা, চাহিদা এবং এ-সবের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবেই করা হয়। আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় দেখেছি ইউরৌপীয়ান দেশ সুইডেনে শিক্ষা-মূলক অনুষ্ঠান তৈরীর জন্য রয়েছে সুইডিশ এডুকেশন্যাল ব্রডকাস্টিং কৌম্পানী বা সংক্ষেপে ইউআর। এ-প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তোলা হয়েছে প্রি-স্কুল, প্রাইমারী স্কুল, সেকেন্ডারী থেকে শুরু করে কলেজ পর্যন্ত সবার জন্য শিক্ষামূলক ও সাধারণ জ্ঞানের অনুষ্ঠান তৈরীর উদ্দেশ্যে। রেডিও টিভি অনুষ্ঠান, ওয়েব সাইট, বই অর্থাৎ মাল্টি-মিডিয়া ব্যবহারের মাধ্যমে এ-প্রতিষ্ঠানটি শিক্ষণ-বিক্ষণকে ছড়িয়ে দেওয়ার কাজ করে। সুইডিশ রেডিও ও সুইডিশ টেলিভিশনে নির্দিষ্ট সময়ে অনুষ্ঠান সম্প্রচারের পাশাপাশি এরা ২০০৪ সাল থেকে নিজস্ব নৌলেইজ চ্যানেল ও চিলড্রেনস চ্যানেল নামের দুটি চ্যানেলে নিয়মিত অনুষ্ঠান সম্প্রচার করছে। গণিত, প্রযুক্তি, স্বাস্থ্য ইত্যাদি বিষয়ে সুনির্দিষ্ট দর্শকের জন্য অনুষ্ঠান প্রচারের পাশাপাশি এ-সব চ্যানেলে সমাজ, রাষ্ট্র ও বিশ্ব সম্পর্কে নতুন প্রজন্মের মাঝে সচেতনতা তৈরীর উদ্দেশ্যে নানা অনুষ্ঠান প্রচারিত হয়। যেমন, স্কুলের ছেলেমেয়েদের হিউম্যান রাইটস, ফ্রীডম অব এক্সপ্রেশন, ব্রেইকিং দ্যা সাইলেন্স ইন ইসরায়েল ইত্যাদি নানা বিষয়ের ওপর তথ্য-মূলক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে জ্ঞান ছড়িয়ে দেয়া হয়। শেখানো হয় সহজ পদ্ধতিতে ইংরেজী-সহ বেশ কয়েকটি বিদেশী ভাষা। সেখানকার ৭৭ শতাংশ প্রাইমারী ও সেকেন্ডারী স্কুল শিক্ষক এবং ৫৩ শতাংশ কলেজ শিক্ষক ইউআরের শিক্ষা উপকরণের সহায়তা নিয়ে থাকেন। আর ৮৫ শতাংশ ভাষা শিক্ষক তাদের ক্লাসে ইউআরের উপকরণ ব্যবহার করে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করেন। দেশের প্রখ্যাত শিক্ষাবিদরাই ইউআর এর এ-উপকরণগুলো নির্মাণে সহায়তা করেন আবার নেটওয়ার্ক, সেমিনার, আলোচনা, ওয়ার্কশপ এ-সবের মাধ্যমে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এগুলো ব্যবহারে উদ্বুদ্ধ করা ও এক্ষেত্রে কোনো সমস্যা হলে, তা সমাধান করার ক্ষেত্রেও এ-সব শিক্ষাবিদ সহায়তা করেন।

    অনুষ্ঠান সম্প্রচারের ৬ মাসের মধ্যেই সেগুলো আবার ইউআরের ওয়েব সাইটে পাওয়া যায়। ফলে কেউ রেডিও/টিভিতে কোনো অনুষ্ঠান মিস করলেও পরবর্তীতে ইন্টারনেটে সেটা পেতে পারে। ইউআর বয়স্কদের জন্যও অনুষ্ঠান নির্মাণ এবং প্রচার করে। (বিস্তারিত জানতে দেখতে পারেন ইউআর এর ওয়েব সাইট www.ur.se)। বাংলাদেশের বর্তমান সরকার তাদের নির্বাচনী অঙ্গীকার ডিজিট্যাল বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে ইতোমধ্যেই দেশের সব স্কুল কলেজে কম্পিউটার সরবরাহের ঘোষণা দিয়েছে। এখন আরেক ধাপ এগিয়ে যদি এ-জাতীয় একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা যায়, তবে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিশুটিও পাবে মানসম্পন্ন শিক্ষার ছোঁয়া। রেডিও-টিভি ছাড়াও তারা সিডি-ডিভিডির মাধ্যমে ক্লাসরুমে বসে দেখতে পাবে এসব শিক্ষা ও সচেতনতা-মূলক অনুষ্ঠান। আর শিক্ষকদেরও দক্ষতা বৃদ্ধি পাবে এতে নিঃসন্দেহে। অবশ্য নতুন করে প্রতিষ্ঠান না গড়েও এটা সম্ভব যদি আমাদের জাতীয় গণমাধ্যম ইন্সটিটিউট (নিমকো) নামের যে-প্রতিষ্ঠানটি গণ-মাধ্যম কর্মীদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য রয়েছে সেটিকে শিক্ষামূলক অনুষ্ঠান তৈরীর উপযোগী করে গড়ে তোলা হয়। এখান থেকে যোগ্য ব্যক্তিরা প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ নিয়ে তৈরী করবেন, এসব শিক্ষামূলক, সচেতনতামূলক ও সাধারণ জ্ঞানের অনুষ্ঠান। প্রস্তুতকৃত অনুষ্ঠানের মান নির্ধারণের জন্য থাকতে হবে, একটি বৌর্ড। আর দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষাবিদদেরকেও সম্পৃক্ত করতে হবে এ-সব অনুষ্ঠান তৈরীর সাথে। ঢাকা-কেন্দ্রিক না হয়ে দেশের বিভিন্ন এলাকার শিক্ষাবিদদের চুক্তিতে বা অন্য কোনো ভাবে নিয়োগ-দানের মাধ্যমে সত্যিকার অর্থেই মান-সম্পন্ন অনুষ্ঠান তৈরীর উদ্যোগ নিতে হবে। এ-প্রতিষ্ঠানের অনুষ্ঠানগুলো বিভিটির নতুন চ্যানেলেই শুধূ সীমাবদ্ধ থাকবে না; চাইলে স্যাটেলাইট চ্যানেলগুলোও এখান থেকে উৎপাদিত অনুষ্ঠান কিনে সম্প্রচার করতে পারবে। হয়তো ভবিষ্যতে সুইডেনের মতো আমাদের দেশে গড়ে ওঠা এ-প্রতিষ্ঠান নিজস্ব চ্যানেলও চালু করতে পারবে।

    লেখাক চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক

    আপলৌড ১৭ জুলাই ২০০৯

আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন