• বোরখা-নিকাব নিয়ে বিতর্ক ইউরোপের দেশে-দেশে
    চিত্রা পাল

    ইউরোপের দেশে-দেশে এখন চলছে বোরখা-নিকার নিয়ে নানামুখী বিতর্ক। ফ্রান্স, ডেনমার্ক, নরওয়ে আর সুইডেনে সাম্প্রদিক দিনগুলোতে এ-বিষয়টি বয়ে যাচ্ছে আলোচনার ঝড়।

    ইউরোপের বিভিন্ন  দেশের মত ফ্রান্সের রাস্তা-ঘাটে দেখা যায় মুখমন্ডল আবৃত বা   আপাদমস্তক বোরখায় ঢাকা নারীদের। পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলির মধ্যে ফ্রান্সেই সবচেয়ে বেশী মুসলিম বসবাস করে। নারীদের বোরখা পরা নিষিদ্ধকরণ সংক্রান্ত আলোচনার জন্য গত বছর জুন মাসে ফ্রান্সে গঠিত হয় ৩২ সদস্যবিশিষ্ট একটি সংসদীয় তদন্ত কমিটি। গত ছয় মাস ধরে এই ইস্যু নিয়ে বিতর্কের ঝড় শেষে চলতি মাসের দুই তারিখে সংসদীয় কমিটি এ-বিষয়ে তাদের মতামত-নির্ভর এক প্রতিবেদন জাতীর উদ্দেশ্যে তুলে ধরে। সংসদীয় কমিটির ব্যাখ্যায় সরকারী ও বেসরকারী অফিস-আদালতসহ বিভিন্ন স্কুল, কলেজ ও বিভিন্ন বেসরকারী ভবনের স্থানগুলোতে মুখঢাকা নেকাব বা বোরখা পরার উপর নিষেধাজ্ঞা  আরোপের প্রস্তাব করা হয়।  

    ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট  নিকোলাস সারকোজি অনেক আগেই বোরখার ব্যাপারে নেতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেছেন। তার মতে বোরখা  নারীর অধিকার খর্ব করে যা কিনা ফ্রান্সের গনতন্ত্রের মৌলিক নীতি-বিরুদ্ধ। কমিটির তথ্য রিপোর্ট নিয়ে মন্তব্যকালে সারকোজি বলেন, "বোরখা নিষিদ্ধ ইস্যু নিয়ে আমি পার্লামেন্টের পক্ষ থেকে একটা যৌক্তিক ভাবে  স্বচ্ছ সমাধান চাই, যা কিনা ভবিষ্যতে আইনের জটিলতা থেকে মুক্ত থাকবে"। ক্ষমতাসীন সরকারের রক্ষনশীল দলের জোট ইউএমপিও এ-ব্যাপারে সহমত পোষন করেন। আইন লঙ্ঘন করে বোরখা পরা নারীদের আর্থিক জরিমানার আইন প্রস্তাব নিয়ে প্রেসিডেন্টের উপর চাপ সৃষ্টি করেছেন দলীয় সহকর্মী জেন-ফ্রানকুয়ীস। এদিকে  ইউএমপির দলগুলো বোরখা নিষিদ্ধ আইন বাস্তবায়নের ব্যাপারে প্রশ্ন উত্থাপ্ন করেছেন। তারা জানতে চাচ্ছেন 'এই আইন কি সবার জন্য নাকি কোন বিশেষ সরকারী ভবনের বেলায় প্রযোজ্য?'

    বোরখা নিষিদ্ধ আইন বিতর্ক যখন তুঙ্গে ঠিক সে সময়েই স্ত্রীকে জোর পূর্বক নেকাব পরতে বাধ্য করার দায়ে ফ্রান্স সরকার এক ব্যক্তির নাগরিত্বের আবেদন নাকচ করে দিয়েছে। এ-তথ্য জানিয়েছেন ইমিগ্রেশন মন্ত্রী এরিক বেসন। এর প্রতিক্রিয়া হিসেবে ফ্রান্সের ক্যাথলিক গীর্জা সরকারের প্রতি সতর্কতা ব্যক্ত করে বলেছে, ফ্রান্সের মুসলিম ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের  নাগরিক অধিকারের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা আছে। একই সাথে আমরা আশা করবো পৃথিবীর মুসলিম দেশগুলোতে খৃষ্টান ধর্মাবলম্বী সংখ্যালঘুদেরকে সম্মান দেখানো নিশ্চিত করা।  

    ফরাসী দৈনিক পত্রিকা লে ফিগারো একটি কৌতূহলউদ্দীপক প্রশ্ন তুলেছে। পত্রিকাটির প্রশ্নঃ বোরখা নিষিদ্ধ আইনের আওতায় কাতার বা সৌদী আরব থেকে আসা রাজপরিবারের কন্যাদের বেলায়ও প্রযোজ্য হবে কিনা, যারা কিনা খুব ঘনঘন ফ্রান্সের বিলাসবহুল বিপনীবিতাগুলোতে আসেন পছন্দের জিনিস কিনতে! 

    ফ্রান্সের মত ডেনমার্ক সরকার  অনেক দিন থেকে মুখমন্ডল ঢাকা ঘোমটা, আপাদমস্তক মোড়ানো বোরখা ও নেকাব পরার বিরুদ্ধে আইন করার জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল। অতি সম্প্রতি ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী রাসমুসেনও নারীদের বোরখা না পরার পক্ষে কথাবার্তা বলেচেহ্ন। বোরখা নিষিদ্ধকরণ আইনের ব্যাপারে কিছু সংশোধনী এনে  ডেনিশ কর্তৃপক্ষ ওয়েবসাইটে  কয়েকটি বিকল্প প্রস্তাব উত্থাপন করেছেন  সাধারন মানুষকে ষ্পষ্ট ধারনা দেয়ার লক্ষ্যে। বিকল্প প্রস্তাবে বলা হয়েছে, জোরপূর্বক নারীদের বোরখা পরানোর শাস্তি হবে চার বছরের কারদন্ড। প্রস্তাবে আরো বলা হয় আদালতে সাক্ষ্যদানের সময় নেকাব বা বোরখা নিষিদ্ধ থাকবে।

    বোরখা বিষয়ক বিতর্কের ঢেউ  লেগেছে স্ক্যান্ডেনেভিয়ান দেশ নরওয়েতে।  শ্রমিকদলের মুখপাত্র লিসা ক্রিষ্টোফারসেন দৈনিক ডিএন কে গত সপ্তাহে বলেন, "বোরখা এবং নিকাব নারী নিয়ন্ত্রনেরই প্রতীক"। তিনি এ-প্রসঙ্গে আরো বলেন, "নারী হচ্ছে পুরুষের সম্পত্তি এমন একটা পদ্ধতি কোন ভাবেই গ্রহন করতে পারিনা"। তার মতে বোরখা বা নিকাব পরার সাথে ধর্মীয় স্বাধীনতার কোন সর্ম্পক নেই বরং ধর্মীয় অনুভূতিকে ক্ষমতার লোভে অপব্যবহারের সম্পর্ক আছে। ক্রিষ্টোফারসেন অবশ্য এসব বক্তব্যকে 'একান্ত ব্যক্তিগত' বলে জানিয়েছেন।

    এদিকে গত বুধবার সুইডিশ বেতারের এক সাক্ষাতকারে সুইডেনের সরকারী নেতা রেইনফিল্ড ও বিরোধী দলীয় নেতা মোনাসালিনকে ফ্রান্সের বোরখা নিষিদ্ধ আইন প্রনয়ন সংক্রান্ত নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তারা দুজনেই মুখাবৃত বোরখার বিরুদ্ধে মত পোষন করেন। তবে তার আইন করে বাতিল করার বিপক্ষে। বিরোধী নেত্রী মোনাসালিন  তার বক্তব্যে বোরখা নিষিদ্ধের চেয়ে নারীর প্রতি বৈষম্যের উপরই জোর দেন। যেসব অভিবাসী এলাকায় নারী-পুরুষের সম-অধিকার উপেক্ষা করে বৈষম্যমূলক আচরন করবে এবং যে সব অভিবাসী সংগঠন শিশুদেরকে লিঙ্গ-বৈষম্যের সৃষ্টি করবে, শাস্তি হিসেবে তারা সরকারী অনুদান বা বিনোদন ভাতা থেকে বঞ্চিত হবে। সুইডিশ রেডিওর সাক্ষাতকারে বোরখা নিয়ে প্রশ্নের মুখে সরকারী দলের প্রধান রেইনফিল্ড তার মতামত ব্যক্ত করে বলেন, বোরখা নারী অধিকার লঙ্ঘনের প্রতীক। সুইডেনে নাগরিকের ব্যক্তি স্বাধীনতার মত ধর্মীয় বিশ্বাসের স্বাধীনতাও আছে । তবে তার আশঙ্কা বোরখা নিষিদ্ধ আইন হলে অনেক নারী ঘরের বাইরে আসার ন্যুনতম সুযোগটুকুও হারাবে। তবে বাস্তবতার আলোকে সরকারী বেসরকারী স্কুল কলেজ কোর্টসহ পাবলিক প্লেইসে বোরখা বা নেকাব গ্রহনযোগ্য নয় বলে মত-প্রকাশ করেন রেইনফিল্ড। স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের বেলাতে এটি প্রযোজ্য বলে জানিয়েছে তিনি।

    বোরখা নিষিদ্ধ  আইনের গ্রহনযোগ্যতা এবং এই ইস্যুতে নারী অনুভূতির গুরুত্ব নিয়ে  ইউকেবেঙ্গলির পক্ষ থেকে স্টকহৌমের ফিত্তিয়া স্বাস্থ্য-কেন্দ্রের কনভারশেসন থেরাপিষ্ট  কেরলিন রামযিকে প্রশ্ন করা হলে তিনি  বলেন, রাষ্ট্র এবং ধর্ম দুটোকে আলাদা করে দেখতে হবে। এখানে ভীরুতা না দেখিয়ে আইন-প্রনেতাদের উচিত মিডিয়া-ভিত্তিক খোলামেলা আলাপ করা। তিনি জানান আমরা যে ইস্যু নিয়ে বিতর্ক করছি সে সম্পর্কে পরিষ্কার ধারনা ও জ্ঞান থাকা উচিত। রামযি বলেন, বিশ্বের সব মুসলিম দেশে বোরখা ব্যবহার হয় না। মিশর ইউনিভার্সিটিতে লেখাপড়া করেছি। সেখানে মেয়েরা স্কার্ট পরতো। তাছাড়া মাথায় ঘোমটা এবং বোরখা পরার বিভিন্ন কারণগুলোকে সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করা উচিত। এ-প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অনেক নারী পারিবারিক সহিংসার কারনে মুখ ও শরীরের বিকৃত চিহ্ন লুকানোর জন্য মুখ ঢেকে রাখেন। অনেক ক্ষেত্রে  স্বামীরা আত্মীয়-স্বজনের চাপের মুখে স্ত্রীকে বোরখা পরতে বাধ্য করেন। রামযি্র মতে, বোরখা নারী নিয়ন্ত্রনের একধরনের প্রতীক। কেরোলিন রামযি স্টকহৌমের একটি অভিবাসী অধ্যুষিত এলাকাতে রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থী ডিপার্টমেন্টে কয়েক বছর থেকে কাজ করছেন।

    স্টকহৌম থেকে চিত্রা পাল
    ০৮/০২/১০

     

আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন