• ব্রিটেইনে সাধারণ নির্বাচন ২০১০: একটি ঐতিহাসিক রাজনৈতিক পরিবর্তন
    জে এল সরকার


    [ওয়ার্ল্ড সৌশ্যালিস্ট ওয়েবসাইটে শুক্রবার, ৩০ এপ্রিল, প্রকাশিত Chris Marsden এর Britain’s general election: An historic political shift অবলম্বনে]

    এবারের নির্বাচনের ফলাফল যা-ই হোক না কেন, ব্রিটেইনের রাজনৈতিক জগতে ইতিমধ্যেই সুদূরপ্রসারী এক পরিবর্তন ঘটে গেছে। নির্বাচনী প্রচারনায় সবচেয়ে চমকপ্রদ যে ঘটনাটি ঘটেছে তা হচ্ছে লেবার পার্টির জনপ্রিয়তার ধারাবাহিক হ্রাস। পর্যবেক্ষকদের মতে, সম্ভবত একটি কোয়ালিশন সরকার পেতে যাচ্ছে ব্রিটেইনের জনগণ। এ সবনার মূল কারণ হিসেবে বিশ্লেষকরা বলছেন লেবারের জনপ্রিয়তার পতন।

    ২০০৫ সালের সাধারণ নির্বাচনে লেবার পেয়েছিল মোটে ৩৩ শতাংশ ভৌট। এদিকে সাম্প্রতিক জনমত জরীপ বলছে আরো ভয়াবহ কথা - শতকরা ১৮ ভাগ ভৌট নিয়ে লেবার হয়তো এবার কনসার্ভেটিভ ও লিবারেল ডেমোক্র্যাটদেরও (লিবডেম) পেছনে পড়ে যাবে। যদি তা-ই ঘটে তাহলে তা হবে ১৯২২ সালের পর লেবারের এই প্রথম লিবারেল ডেমোক্র্যাটদের পেছনে আসা।

    এখন পর্যন্ত লেবার ধারণা করছে যে শেষতক কোয়ালিশন হলেও তারা লিবডেমকে সাথে নিয়ে মেজরিটি পার্টি হিসেবে সরকার গঠন করতে পারবে। সাম্প্রতিককালে লিবডেমের জনপ্রিয়তা বেড়েছেও প্রধানত ভৌটারদের লেবারের প্রতি মোহ কেটে যাওয়াতে। কিন্তু এদিকে সম্ভাব্য কনসার্ভেটিভ-লিবডেমের কোয়ালিশন নিয়েও কথা শোনা যাচ্ছে।

    যদিও লেবারের ভৌটারদের এক-তৃতীয়াংশই বলছেন যে তারা অন্য কোন পার্টিকে ভৌট দিবেন তবুও নির্বাচনের সম্ভাব্য ফলাফল নিয়ে এর বেশি কিছু বলা আপাতত কঠিন। কিন্তু যা নিশ্চিত করেই বলা যায় তা হলো লেবার এই ভৌট-লজ্জা থেকে রেহাই পাবে না। তার কারণ প্রধানত, লেবারের 'লেবার' বা শ্রমিক শ্রেণীর নাম ব্যবহার করে চালিয়ে আসা শ্রমিক বিরোধী ডানপন্থী রাজনীতির পর্দা দিন-দিন সরে যাওয়া।

    শ্রেণীর বিবেচনায়, লেবার কোনমতেই কনসার্ভেটিরদের চেয়ে কম ডানঘেঁযা কর্পোরেটপন্থী নয়। ১৩ বছর ক্ষমতায় থেকে তার ভালোভাবেই প্রমাণ করেছে যে তারা কতোটা কর্পোরেট-বান্ধব ও যুদ্ধবাজ একটি পার্টি। লেবার সম্পর্কে এই ধারণা কেবল বাম-রাজনৈতিক নয়, শ্রমিক ও যুবকদের মাঝেও বাড়ছে। ফলে টনি ব্লেয়ার গর্ডন ব্রাউনের লেবার পার্টি নিয়ে তাদের শ্রদ্ধাও কমেছে সমান তালে। লেবারের জনপ্রিয়তার এই ধ্বস প্রকাশ করছে শ্রমিক শ্রেণির সাথে তাদের যোজন-যোজন ফারাক।

    ২০০৮ এর বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বিপর্যয় আরো ঘনীভূত করেছে ব্রিটেইনসহ সারা পৃথিবীর শ্রেণীসংঘাতকে। এই সংঘাতকে এখন আর কেবলমাত্র আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক বলয়ে রাখা সম্ভব হচ্ছে না। লক্ষ লক্ষ মানুষ যারা মর্টগেইজ আর ব্যাক্তিগত ঋণ নিয়ে কোনমতে টিকে ছিল আজ তাদের জীবনযাত্রার মান ভয়াবহ রকমের নীচে নেমে গেছে। ত্রিশ লাখেরও বেশি মানুষ এখন বেকার। সর্বত্রই চাকরি ছাঁটাইয়ের আশঙ্কা। তার সাথে অলিখিত কর্মঘন্টা বৃদ্ধি আর বেতন-হ্রাস যোগ হয়ে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে ব্রিটেইনের বেশিরভাগ মানুষকে।

    গণমানুষের সংগ্রামের হাত থেকে পুঁজিবাদকে রক্ষা করার লক্ষ্ নিয়ে বিগত প্রায় এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে লেবার পার্ট ও তার অঙ্গ ট্রেইড ইউনিয়নগুলো গণমানুষের আন্দোলনকে সীমাবদ্ধ করে রেখেছে ঠুনকো কিছু 'রিফর্মের' প্রতিশ্রুতিতে। 'নিউ লেবার প্রোজেক্টের' পেছনে যে হিসেব-নিকেশ কাজ করেছিল তা ছিল অনেকটা এরকম - 'রিফর্মের' সকল প্রতিশ্রুতি ছুঁড়ে ফেলে দিলেও বণিক-শ্রেণীর আশীর্বাদ নিয়ে লেবার পার্টি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে টিকে থাকবে। কিন্তু লেবারের জনপ্রিয়তার সাম্প্রতিক ধ্বস বানচাল করে দিয়েছে সকল হিসেব। নিউ-লেবারের এই কূট-কৌশল সম্ভবত একটি পার্টি হিসেবে লেবারকেই শেষ করে দিল একেবারে।

    ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিচার করলে বর্তমান এই পরিস্থিতি ব্রিটেইনের বুর্জোয়া শ্রেনীর সামনে এক মহা- সঙ্কটের জন্ম দিয়েছে। ইনস্টিটুট অফ ফিস্কাল স্টাডিস গত সপ্তাহে প্রকাশিত তাদের এক রিপোর্টে (http://www.ifs.org.uk/bns/bn99.pdf) সতর্ক করে দিয়েছে, যেন প্রধান তিন পার্টিই ভৌটারদেরকে সৎভাবে জানিয়ে দেন, যে পার্টিই ক্ষমতায় আসুক না কেন, বৃহৎ আকারের অর্থনৈতিক সংকোচন আসছেই। রিপোর্টটি লেবার ও লিবডেমের প্রস্তাবিত সংকোচনকে তুলনা করেছে গত '৭০ এর দশকে নেয়া লেবারের সংকোচনের সাথে। স্মরণ করা যেতে পারে যে, সে সময় লেবারের নেয়া পদক্ষেপগুলোর পরিপ্রেক্ষিতেই জন্ম হয় 'উইন্টার অব ডিসকনটেন্ট' এর এবং পরের নির্বাচনে পরাজয় ঘটে লেবার সরকারের। রিপোর্টটি আরো জানাচ্ছে টৌরীদের প্রস্তাবিত সংকোচনও তথৈবচ - বরং তাদের প্রস্তাবের ৭০ থেকে ৮০ শতাংশই কোন খাতে বা কিভাবে হবে তা এখনো অজানা।

    এই পরিস্থিতিতে লেবারের পক্ষে এখন আর সম্ভব না গণমানুষের সহানুভূতি আদায় করা। বরং লেবারের এই পতন একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সংকেত - ব্রিটেইনে বড় ধরণের গণজোয়ার আসন্ন, যা মৌলিক বদল আনতে পারে সামগ্রিক রাজনীতিতে। এতদিন ধরে ব্রিটেইনের শ্রমিক শ্রেনী লেবার পার্টিকে নিয়ে এক ধরনের 'ফ্যান্টাসীতে' ভুগছিল - মনে করেছিল লেবারের হাত ধরে বুর্জোয়া গণতন্ত্রের কাঠামোতেই সম্ভব গণমুক্তি। কিন্তু খোদ লেবারেরই বুর্জোয়া রূপটি চাক্ষুষ করার পর এবার সেই ফ্যান্টাসীর প্রাসাদ ভেঙ্গে পড়েছে, মানুষ পুরোপুরি আস্থা হারিয়েছে তথাকথিত সংসদীয় গণতন্ত্রের আড়ালে বুর্জোয়া একনায়কতন্ত্রের প্রতি। বড় ধরণের পরিবর্তনের একটি সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে, কিন্তু তার জন্য প্রয়োজন সত্যিকারের বিপ্লবী নেতৃত্ব যা পারবে উদ্ভুত সম্ভবনার পূর্ণ সদ্ব্যবহার করে, পুঁজিবাদী রাষ্ট্র-কাঠামোর অবসান ঘটিয়ে ব্রিটেইনকে একটি সাম্যবাদী সমাজের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে।

    জে এল সরকার: কলাম লেখক

আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন