• লন্ডনের রাস্তায় কাজের খোঁজে হন্যে হয়ে ঘুরছে বাঙালী শিক্ষার্থীরা
    আশফাক চৌধুরী

    কাজ-কর্ম না পেয়ে ব্রিটেইনে চরম দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন বাংলাদেশ থেকে আগত নতুন শিক্ষার্থীরা। সাম্প্রতিক সময়ে দেশ থেকে আসা বহু শিক্ষার্থীই এখন ন্যুনতম মুজুরীর বিনিময়ে যেনো-তেনো একটি কাজের জন্য হন্যে হয়ে ঘুরে বেড়েছেন লন্ডন নগরীর পথে-ঘাটে। এদের মধ্যে অনেকেই আবার সঙ্গে করে নিয়ে আসা অর্থ-কড়ি শেষ হয়ে যাবার মতো পরিস্থিতিতে থাকা-খাওয়ার মতো মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণের ক্ষেত্রেও ভয়ানক সমস্যার মধ্যে দিন-যাপনে বাধ্য হচ্ছেন।

    ইউকেবেঙ্গলির প্রতিবেদকের সাথে গত কয়েক দিন ধরে এসব ব্যাপারে আলাপ-আলোচনা হয়েছে সাম্প্রতিক সময়ে দেশ থেকে আসা বেশ কিছু শিক্ষার্থীর। এদের প্রত্যেকেই জানিয়েছেন, বিলেতে এসে এতটা ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি হবার আশঙ্কা তারা দেশে থাকতে কখনোই করেননি। খুলনা থেকে আগত ইফতেখার (২৬) নামে এক শিক্ষার্থী জানালেন তার দুর্ভোগের কথা। ইফতেখার বিলেত এসেছেন জুলাই মাসে,  এখন পর্যন্ত কোনো কাজের সন্ধান পাননি। যে-পরিমাণ অর্থ-কড়ি নিয়ে এসেছিলেন, তা এখন একেবারে তলানীতে। পরিবারের পক্ষে নতুন করে টাকা পাঠানোও সম্ভব নয়। সামনের দিনগুলো নিয়ে ভাবতে গিয়ে চোখে অন্ধকার দেখছেন ইফতেখার। হাসিবের অবস্থা আরো করুন। কর্মহীন প্রায় ৪ মাস। বাবার পেনশনের টাকা খরচ করে বিলেতে এসেছেন সংসারের ভাগ্য ফেরাতে। পরিবারের পক্ষে নতুন করে টাকা পাঠানো কিছুতেই সম্ভব না। আশা ছিলো পড়াশোনার পাশাপাশি কিছু আয়-উপার্জনের মাধ্যমে সংসারের জন্য কিছু করা। এখন সব উলোট-পালট মনে হচ্ছে।

    আরেক শিক্ষার্থী নাজমুল হোসাইন(১৯) বললেন কলেজগুলোর অসহযোগিতার কথা। ঢাকায় স্টুডেন্ট রিক্রুটমেন্ট এ্যাজেন্সীকে টিউশন ফী বাবদ ৩৫০০ পাউন্ড দিয়ে লন্ডনে এসে নাজমুল শুনেন কলেজ কোন পাউন্ড পায়নি। এখন কলেজ তাকে আনুষাঙ্গিক কাগজ-পত্র দিতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছে। উল্লেখ্য, বাংলাদেশ থেকে আসা শিক্ষার্থীদের বেশির ভাগের মধ্যেই কলেজগুলোর ব্যাপারে তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে। বেশ কয়েক-জন শিক্ষার্থী জানিয়েছেন ওয়েবসাইটে যে-ধরণের তথ্যাদি দেয়া হয় কিংবা যে-ধরণের আকর্ষণীয় ফটৌ সংযোজন করা হয়, লন্ডনে হাজির হবার পরে সে-সবের সাথে তেমন কোন মিল খুঁজে পাওয়া যায় না। এ-প্রসঙ্গে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষার্থী জানান এ-ধরণের অনুযোগ-অভিযোগ আমলেই নেয়নি তার কলেজ। ইউকেবেঙ্গলি অফিসে বসে আর এক শিক্ষার্থী বলেন, আমার কথা শুনে কলেজওয়ালারা হাসে।

    এছাড়াও অনেকে শিক্ষার্থীর মধ্যে বাংলাদেশে স্টুডেন্ট রিক্রুটমেন্ট এ্যাজেন্সীগুলোর ব্যাপারেও আছে তীব্র ক্ষোভ। জানা যাচ্ছে, নতুন নিয়মের ফলে কলেজগুলোতে টিউশন ফী ব্যাপকভাবে বেড়ে যাওয়ার সাথে-সাথে সুযোগ বুঝে এ্যাজেন্সীগুলোও কমিশনের হার বাড়িয়ে দিয়েছে যথেচ্ছভাবে। শিক্ষার্থীদের অনেকেই জানান, কলেজগুলোর বাংলাদেশী প্রতিনিধিরা ভুলভাবে তথ্য উপস্থাপন করার কারণেই অনিশ্চয়তার মধ্য পড়তে হচ্ছে।

    এদিকে, পূর্ব-লন্ডনের বাঙালী জব-সেন্টারগুলো উপচে পড়ছে বাংলাদেশ থেকে সদ্য আসা শিক্ষার্থীদের ভীড়ে। বিশেষ করে ব্রিটেইন-জুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা বাঙালী রেস্টুরেন্টগুলোতে কাজের আশাতে জব-সেন্টারগুলোতে জড়ো হচ্ছেন শত-শত শিক্ষার্থী। জব-সেন্টারগুলো জানাচ্ছে এ-বিপুল চাহিদা মেটানোর কোনো ব্যবস্থাই তাদের হাতে মজুত নেই। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষার্থী বলেন, বেতন দূরে থাকুক, শুধুমাত্র থাকা-খাওয়ার বিনিময়েও বাঙালী রেস্টুরন্টে কাজ পাওয়া যাচ্ছে না। লন্ডনে ঘনিষ্ঠ এমন কেউ নেই যার কাছ থেকে অর্থ সাহায্য পাবো। অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে চরম হতাশায় দিনাতিপাত করতে হচ্ছে"। কাজের ব্যাপারে দুয়েক-জন রেস্টুরেন্ট-মালিকদের সাথে কথা বলে জানা গেলো, তারা প্রতিদিন প্রচুর পরিমাণ ফৌন কল পাচ্ছেন। কিন্তু এতো লোকজনকে এক সাথে কাজ দেয়া তাদের পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না, আর এ-ধরণের কোনো প্রয়োজনও তাদের নেই। অর্থনৈতিক মন্দার প্রভাবে আগের মতো ব্যবসা না থাকার কারণে বাড়তি কর্মী নিয়োগের প্রয়োজনীয়তাও কমে গেছে বলে জানালেন একাধিক রেস্টুরেন্ট-মালিক।

    পরিস্থিতি ইদানীং এতোটাই মারাত্মক পর্যায়ে চলে গেছে যে, কাজ-কর্ম না পেয়ে অর্থ-কড়ির অভাবে বাধ্য হয়ে পূর্ব লন্ডনের কয়েকটি মসজিদে রাত্রি-যাপন এবং কোনো-কোনো ক্ষেত্রে খাবার-দাবারের সুযোগ নিতে বাধ্য হচ্ছেন বেশ কিছু শিক্ষার্থী। রোজার মাস কোনোভাবে কেটে গেলেও, ঈদের পরে মসজিদে থাকার সুযোগও খুব একটা নেই। গত কয়েক বছর ধরে সুপার স্টৌরগুলোতে বাঙালী ছাত্র-ছাত্রীরা ভালো রকমের কাজ-কর্ম করার সুযোগ পেলেও, এখন এসব সুযোগ একেবারেই কমে গেছে। সুপার মার্কেটের একজন ম্যানেজার বললেন, পুরোনো কর্মী ছাঁটাই করে সেলফ চেক আউট সিস্টেম চালু করায় নতুন কর্মী নিয়োগ অনেকটা কমে গেছে। তাই রিটেইল শপগুলোতে কর্মীও লাগছে না আগের মতো। এছাড়াও মন্দার কারণে সুপার মার্কেটগুলোতে ব্যাপকবভাবে কর্ম-ঘ্ন্টা কমানোর পর্ব চলছে। শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগের ব্যাপারে একাধিক কলেজের সাথে যোগাযোগ করা হলে তারা জানান, শিক্ষার্থীরা জেনে-শুনে আসতে চাইলে তাদের কিছুই করার নেই। বর্তমান পরিস্থিতির ব্যাপারে ব্রিটিশ প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করার কোনো যুক্তি নেই বলেও জানান কেউ-কেউ; কেনোনা  ব্যক্তিগত ব্যয়ে পড়তে আসা শিক্ষার্থীরা ভিসার আবেদন পত্র জমা দেয়ার সময় টিউশন ফী এবং জীবন-যাপনের ব্যয় বহনে সক্ষম বলেই উল্লেখ করেছেন। বাংলাদেশে কলেজগুলোর এ্যাজেন্টরা বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়ে শিক্ষার্থীদের অনিশ্চয়তার দিয়ে ঠেলে দিচ্ছে কিনা - এমন এক প্রশ্নের জবাবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কলেজ মালিক বলেন "বাংলাদেশে এজেন্টরা শিক্ষার্থীদের কি ধরনের তথ্য দিচ্ছেন সে ব্যাপারে আমাদের কিছু জানা নেই"।

    এছাড়াও অর্থনৈতিক মন্দার কারণে হাই স্ট্রীটের শপগুলোও কর্মী নিয়োগ-কমিয়ে দিয়েছে ২০০৮ এর মাঝামাঝি থেকে। তাছাড়া শীর্ষ-স্থানীয় রিটেইল শপগুলো এখন জব সেন্টারের ও ইন্টারনেটের মাধ্যমে কর্মী নিয়োগ করেছে। এর ফলে পরিচিত বাঙালীর সূত্র ধরে এ-শপগুলোতে কাজ পাবার সুযোগ বলতে গেলে বন্ধ হয়ে গেছে। ব্যাংক লৌনের সুবিধা প্রসঙ্গে নামকরা এক ব্যাংকের বাঙালী এক ম্যানেজারের সাথে আলাপ করা হলে তিনি জানান, ব্রিটেনের ব্যাংকগুলো  ব্রিটিশ শিক্ষার্থীদেরকেই এখন ব্যাংক দেয়ার ক্ষেত্রে অনেক কড়াকড়ি আরোপ করেছে। আর ক্রেডিট স্কৌরিং ব্যবস্থা চালু হবার পর বাইরে থেকে নতুন আসা কারু পক্ষে লোন পাওয়া প্রায় অসম্ভব।

    ইউকেবেঙ্গলির পক্ষ হতে নতুন আসা শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগের ব্যাপারে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে লন্ডনে বাংলাদেশ দূতাবাসের প্রেস মিনিস্টার রাশেদ চৌধুরী জানান, সমস্যার মূল কারণ অনুসন্ধান ও এ-ব্যাপারে কোনো করণীয় থাকলে, সে-ব্যাপারে তারা সচেষ্ট হবেন। উল্লেখ্য, হাতে গোনা কয়েক-জন পাঠদানকারী আর যেনোতেনো কয়েকটি কক্ষ সম্বল করে গড়ে ওঠা পূর্ব লন্ডনের কিছু কলেজে ভর্তি হবার জন্যও এখন একেক জন শিক্ষার্থীকে গুনতে হচ্ছে হাজার তিনেক পাউন্ড; এর সাথে থাকছে এ্যাজেন্সীগুলোর মোটা-দাগের কমিশন। বিমান ভাড়া, কিছু কেনা-কেটা আর বিলেতে এসে প্রাথমিক খরচ হিসাবে ধরলে একেকটি ভিসার জন্য ব্যয় হচ্ছে বিপুল পরিমাণ অর্থ। সাম্প্রতিক সময়ে বিলেতে আসা শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে নিম্মে পাঁচ থেকে সর্বোচ্চ আট লক্ষ টাকা খরচ হবার তথ্য পাওয়া গেছে। খুব সহসাই আয়-উপার্জনের ব্যবস্থা না হলে পরিস্থিতি কোথায় গিয়ে ঠেকবে, তা নিয়ে সাধারণ মধ্যবিত্ত বা নিম্ম মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো থেকে আগত শিক্ষার্থীদের মধ্যে এখন বিরাজ করছে তীব্র আশঙ্কা।

    ০৩ অক্টৌবর ২০০৯

আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন