• ল-সা-গু'র নাম রুমানা মনজুর
    ওমর তারেক চৌধুরী

    ধর্ষণের পর অগ্নিদগ্ধ নোয়াখালির যে-নারীটি গতকাল বার্ন ইউনিটে মারা গেলেন, তিনিও রুমানা মনজুর!

    স্বামীর দ্বারা সারাদিন প্রহৃত হবার পর রাত নয়টায় মতিঝিল কলোনিতে যে গৃহবধূ প্রাণ হারালেন, তিনিও রুমানা মনজুর।

    সিঙ্গাপুর প্রত্যাগত যে-নারী শ্রমিকটিকে গণধর্ষণের পর গায়ে আগুন ধরিয়ে দেয়া হলো, তিনিও রুমানা মনজুর।

    পাহাড়ে বা সমতলে যে-নারীরা অপহৃত আর নিগৃহীত হন, তারাও রুমানা মনজুর।

    ফ্যাসিবাদী নিপীড়নের শিকার কৃষকের কলেজ-পড়ুয়া পঙ্গু ছেলে লিমন আর মানুষের মুক্তিতে জীবন নিবেদিত ক্রসফায়ারে শহীদ কমিউনিস্ট ডাক্তার টুটুলের অসহায় বিচারপ্রার্থী জননীরাও রুমানা মনজুর।

    সন্তানদের মাতৃভাষা শেখাতে না-পারা, নূন্যতম চিকিৎসা, বিনোদন, জীবিকা আর সুস্থ জীবনের নিশ্চয়তা দিতে অপারগতা নিয়ে জেনেভা ক্যাম্পে বাস করা 'বিহারী' মা আর নানা আদিবাসী জননীরাও রুমানা মনজুর।

    শহরে বা গ্রামে, বিলাসবহুল অট্টালিকা বা ঝুপড়িতে, বিশ্ববিদ্যালয়ে বা প্রাইমারি স্কুলে, বারোতে বা বায়ান্নোতে, ছেলের বা স্বামীর হাতে বা যে-কারো দ্বারা, রাস্তায় বা বাসে, কেতাদুরস্ত অফিসে বা কারখানায়, ইটভাটায় বা ফসলের ক্ষেতে যে-নারীরা প্রতিনিয়ত অপদস্ত-নিগৃহীত-লাঞ্চিত হন, তারা সবাই রুমানা মনজুর।

    আসন্ন-প্রসবা যে-নারী হাসপাতাল থেকে বিতাড়িত হয়ে ফুট ওভার ব্রিজ থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করেন, তিনিও রুমানা মনজুর।

    স্বামীর কারণে এইডস আক্রান্ত একঘরে গৃহবধূ থেকে খদ্দের আর পুলিশের হাতে নিগৃহীত 'যৌনকর্মীরাও' রুমানা মনজুর।

    আজীবন বঞ্চিত, অবহেলিত আর কেবল ‘মা দিবস’ এর মেকি পূজোয় প্রশংশিত নারীরা রুমানা মনজুর।

    আমাদের সমাজ কাঠামোর মইতে ল-সা-গু’র নাম রুমানা মনজুর!

    এই ল-সা-গু তাই আমাদের প্রাত্যহিক সংগ্রাম আর যে-কোনো গণতান্ত্রিক আন্দোলনের অংশ। পরিবার থেকে পরিবেশ, বিনোদন থেকে বৃদ্ধাশ্রম, প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষা থেকে সংবিধানে রাষ্ট্রধর্ম, সংসার থেকে সংসদ, জন্মনিয়ন্ত্রণের দায় থেকে ফসলের জাত রক্ষা, মুক্তিযুদ্ধ থেকে অসমাপ্ত জাতীয় মুক্তির সংগ্রাম এবং এই অসমাপ্ত তালিকার সবকিছুর ল-সা-গু. হচ্ছে রুমানা মনজুর।

    এই ল-সা-গু’র কথা ভুলে গিয়ে আমরা কোথাও কোনো ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে পারি না। এই ল-সা-গু মনে না-রাখা মানে নিজের অংশ বিস্মৃত হওয়া।

    রুমানা মনজুরদের অবস্থা যদি আমাদের উদ্বিগ্ন আর উদ্বেলিত না করে, তাহলে বুঝতে হবে যে আমরা চেতনাহীন, দৃষ্টিহীন - সমগ্রের বদলে অংশকে নিয়ে খণ্ডিত।

    ২৪শে জুন ২০১১

পাঠকের প্রতিক্রিয়া

আমাদের সমাজে যে হাজারটা নরপিশাচ সাঈদ আছে, এর দায় এড়াতে পারিনা আমি আপনি কেউই। আমাদের মানুষ করার প্রতিষ্ঠানগুলো টাকা কামানো শেখায়, ক্ষমতায় আরোহণের লোভ দেখায়, আধিপত্য শেখায়। মানবিকতা শেখায়না। মানুষকে মানুষ ভাবতে শেখায় না। মানুষে মানুষে ক্ষমতার পার্থক্য শেখায়। মতপার্থক্য কিংবা আলাদা চিন্তার অধিকার যে সবার আছে তা ভাবতে শেখায় না। আমার চিন্তায় অন্যকে ও আসতে হবে, এই ধারণাটা যতদিন না বদলাচ্ছে ততোদিন হাজারটা রুমানা ট্রাজেডির অপেক্ষা ছাড়া উপায় নেই।

আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন