• শাহবাগের গণজমায়েত নিয়ে জরুরী কিছু কথাঃ আমরা কি বার-বার হেরে যাবো?
    আরিফুজ্জামান তুহিন

    কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে মানবতা-বিরোধী অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার পরও যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। একই ধরণের অপরাধে আবুল কালাম আযাদের ফাঁসি হওয়ার জনসাধারণের আশা ছিলো মোল্লারও ফাঁসি হবে। না হওয়ার ক্ষুব্ধ ঢাকার জনতা শাহবাগে জড়ো হয়েছে প্রতিবাদ করতে।

    শাহবাগে এখন অজস্র মানুষের ঢল নেমেছে। এখানে সকল মতের মানুষ আছেন। মাঝ-বয়েসী, শিশু-কিশোর, পৌঢ়-প্রবীণ থেকে শুরু করে কলেজগামী ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র-ছাত্রী, বেকার যুবক-যুবতীরাও আছেন। এখানে যাঁরা এসেছেন তাঁদের একটিই দাবি, ‘কাদের মোল্লার ফাঁসি’। আন্দোলনের যতো দিন গড়াচ্ছে, ততোই সে-দাবি আরও জোরালো হয়ে উঠছে।

    যিনিই মাইকের সামনে দাঁড়িয়ে দু'কথা বলার সুযোগ পাচ্ছেন, তিনিই শাহবাগ আন্দোলনের একটি করে নাম দিয়ে দিচ্ছেন। এর ফলে ইতোমধ্যে এ-আন্দোলনের অনেকগেুলো নাম দাঁড়িয়ে গেছে। এতো নাম হওয়ার কারণে গণমাধ্যম বিভ্রান্ত হয়ে পড়ছে এবং বিভ্রান্ত করছে আন্দোলনটিককেও । আন্দোলকদের উচিত দ্রুত এ-বিষয়টির ফয়সালা করা। জমায়েত প্রদিক্ষণ করে দেখলাম, কেউ-কেউ বলছেন যেখানে দাঁড়িয়ে ভাষণ দেয়া হচ্ছে তার নাম ‘শহীদ জননী জাহানারা ইমাম মঞ্চ’ দেয়া হোক। আর সারা দেশে এ-মঞ্চের নামে আন্দোলন হোক। আমার কাছে এ-বিষয়টি খুবই যৌক্তিক ও প্রয়োজনীয় মনে হয়েছে। শহীদ জননীর সম্পর্ক বিশেষ কিছু নতুন করে আর বলার নেই। তাঁর নামেই মঞ্চের নাম হতে পারে।

    এ-আন্দোলনের কোন মূল নেতৃত্ব নেই এখনও। যদি কেউ চেষ্টা করে আন্দোলনের নেতৃত্ব ছিনতাই করতে, তাহলে সে-চেষ্টার পরিণতি ভালো হবে না, তা অন্ততঃ আজ বৃহস্পতিবার আওয়ামী লীগের মাহবুব উল আলম হানিফের দিকে পানির বোতল ছুঁড়ে মারার ঘটনা থেকে স্পষ্ট হয়েছে। সত্যিকার অর্থে, নেতৃত্ববিহীন নৈরাজ্যিক বিপ্লবী জমায়েত যাকে বলে, তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ এ-মূহূর্তের শাহবাগের লাখো জনতা। এ-জনতার এখন কিছু পরিণত ও যৌক্তিক দাবি সামনে এসেছে। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছেঃ

    ১. যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে দ্রুত ফাঁসির রায় দিয়ে তা কার্যকর কর,

    ২. জামায়েতে ইসলামীর সঙ্গে আওয়ামী লীগের কোনো আঁতাত করা চলবে না,

    ৩. জামায়াত-সহ যুদ্ধাপরাধে অংশ নেয়া সকল রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করে তাদেরমতাদর্শ প্রচার আইন করে নিষিদ্ধ কর।

    আনন্দ থেকে বিষাদগ্রস্ত আওয়ামী লীগ

    সারা দেশে জামায়েতে ইসলামীর সশস্ত্র সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ কোনো প্রতিরোধ তো গড়ে তুলেইনি বরং পুলিসের নিঃর্শত আত্মসমর্পণ আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকারের ভূমিকাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। এরকম পরিস্থিতিতে  'কসাই কাদের' নামে পরিচিত কাদের মোল্লার ফাঁসি না দিয়ে যাবজ্জীবন কারা-সাজা হওয়ায় , জনগণের মধ্যে জনপ্রিয় যে-রাজনৈতিক-ভাষ্য দাঁড়িয়েছে তাহলোঃ আওয়ামী লীগের সাথে জামায়েতের গোপন আঁতাত হয়েছে। এ-কারণে কাদের মোল্লা সাড়ে তিন'শো মানুষ হত্যা করেও প্রাণদণ্ড থেকে বেঁচে গিয়েছেন। 

    এ-পরিস্থিতি জামায়েতের  ডাকা হরতাল প্রতিরোধে শাহবাগের এ-আন্দোলন অবশ্য সরকারের পক্ষেই গিয়েছে। কিন্তু আওয়ামী লীগের কপালে চিন্তার ভাঁজ দীর্ঘতর হচ্ছে, যখন জামায়েতের হরতাল শেষে শাহবাগের জনতা ঘরে ফেয়ার কোনো লক্ষণ দেখাচ্ছে না।

    কী হবে যদি শাহবাগের জনগণ ঘরে ফিরে না যায়? ইতিমধ্যে তিনদিন হয়ে গিয়েছে। এ-জনতা যদি এভাবে দিনের পর দিন শাহবাগে থেকে যায়, তাহলে জরুরী অবস্থা জারি করা ছাড়া আর কোন গত্যন্তর থাকবে না হাসিনার সরকারের। ঠিক এ-কারণে যতো দ্রুত সম্ভব শাহবাগ থেকে লোকজনকে কিছু একটা 'বুঝ' দিয়ে বাড়ী পাঠাতে হবে। এ-জন্য সরকারের বেশ কয়েকটি পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে বলে আশঙ্কা করছে শাহবাগের বিক্ষুব্ধ জনতা। এ-আশঙ্কাগুলোর সবগুলোই যে বাস্তবে ফলবে, তা হয়তো নয়; তবে কোনো আন্দোলনের মধ্যে যখন সাধারণ জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেন, তখন সে-জনগণের চিন্তা যে-কোনও ঘরে-বসে-থাকা অগ্রসরতর তাত্ত্বিকের চিন্তার চেয়েও উন্নততর হয়ে থাকে। এটা ইতিহাসের শিক্ষা।

    আওয়ামী লীগ -জামায়াত ঐক্য

    আওয়ামী লীগের সাথে জামাতের ঐক্য কোনো নতুন ব্যাপার নয়। এদের ঐক্য ১৯৮৬ সালের নির্বাচন থেকে শুরু করে ১৯৯৬ সালের নির্বাচনেও দেখা গিয়েছে। অর্থাৎ, ক্ষমতার রাজনীতিতে আওয়ামী লীগকে জামায়াতের মিত্র শক্তি হিসেবে দলটির উচ্চ পর্যায়ের নেতারা দেখে থাকেন। কিন্তু মাঠ পর্যায়ের আওয়ামী লীগ আর কেন্দ্রীয় কমিটী কিন্তু এক নয়। এ-বিষয়টি জানার পরও আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব তা আমলে নেন না।

    তবে, সম্প্রতি যে-বক্তব্যটি ঘুরে ফিরে আসছে, তা হলোঃ আওয়ামী লীগ জামাতের ঐক্যের কারণেই 'কসাই কাদের'-এর ফাঁসি না হয়ে যাবজ্জীবন হয়েছে। এটি যদি সত্য হয়, তাহলে প্রশ্ন দাঁড়ায়ঃ ঐক্য বা আঁতাতটি কী?

    এ-মুহূর্তে যে-খবরটি ঢাকার সাংবাদিক মহলে ভাসছে, তাহলোঃ দীপু মনি স্বামীর 'ভারতের বাঁশি' শুনতে সে-দেশে গিয়েছেন। এ-সফরে তিনি ভারতের প্রেসিডেণ্ট প্রণব মুখার্জীর সাথে বৈঠকে বসবেন। বাঙালী 'প্রণবদা' আবার ঢাকায় আসছেন শীগ্‌গীরই। সব মিলিয়ে ধারণা করা হচ্ছে, এ-যড়যন্ত্রের বিদেশী নেতা হলে 'প্রণবদা'।

    হাসিনা নিজেকে প্রধান করে, সংসদ ভেঙ্গে দিয়ে, দলীয় সরকারের অধীনেই একটি নির্বাচন দিবেন। সে-নির্বাচনে বিএনপি যাবে না। এ-সময় প্রথমে বিএনপিকে ভাঙ্গা হবে। অনুমান করা যায়'ওয়ান ইলেভেনের' 'সংস্কারপন্থীরা একাজটি করবেন। ভাঙ্গা বিএনপির একটি অংশ বিএনপি নামে অংশ নিবে নির্বাচনে। জামায়াত চার দলীয় জোট থেকে বেরিয়ে গিয়ে আলাদাভাবে নির্বাচন করবে। ফলাফল জাতীয় পার্ট প্রধান বিরোধী দল। আর হাসিনার দল আবার বিজয়ী হয়ে সরকার গড়বে। জামায়াত ও  খণ্ডিত বিএনপি যদি নির্বাচনে যায়, তবে বিএনপির একাংশ যদি না-ও যায় তবুও নির্বাচনকে সারা পৃথিবীর চোখে জায়েজ করতে তেমন অসুবিধা হবে না আওয়ামী লীগের। 

    কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, ষড়যন্ত্রকারীরা কি ঘাস খান? এসব বিষয় যদি মানুষ ধরেই ফেলে, তাহলে কীভাবে সফল হবে ষড়যন্ত্র? আর আওয়ামী লীগের সঙ্গে রয়েছে শুধু ভারত। এতোবড়ো ঘটনা সামাল একা দিতে পারবে কি ভারত? স্পষ্টই বুঝা যাচ্ছে, বিএনপিকে উস্‌কে দিচ্ছে আমেরিকা। আর আমেরিকার কথা না শুনে ভারত কি আওয়ামী লীগের পক্ষে থাকবে? বিশ্বাস করা কঠিন।

    তাহলে বিষয়টি এরকম হতে পারে যে, আওয়ামী লীগের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভারত শেষ পর্যন্ত হয়তো পাশে থাকবে না। যেমনটি আমেরিকাও বিএনপির পাশে থাকবে না। ফলাফল হবে, আরেকটি ওয়ান ইলেভেন। সে-পরিস্থিতি তৈরি করার জন্যই জল ঘোলা করার হচ্ছে।

    শাহবাগ আন্দোলনের কী হবে?

    শাহবাগে সত্যিকার অর্থেই একটি নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি বিরাজ করছে। এ-মুহূর্তে কোন নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের হাতেই পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ নেই। যদি আগামীকাল (শুক্রবার) ঘোষিত সমাবেশ থেকে আওয়ামী লীগ ও আওয়ামী-বান্ধব বামপন্থীরা বলে বসেন, 'বন্ধুরা আন্দোলন অনেক করেছি। শেখ হাসিনা আমাদের সাথে ভিডিও কনফারেন্স (হাসিনা সেটা আন্দোলকদের সাথে করে থাকলেও থাকতে পারেন) করে দাবি মেনে নিয়েছেন। এখন বাড়ি ফিরে যাই', তাহলে এই ক’দিনে যতোখানি কড়াই তেতেছিলো, তাতে পানি ঢেলে দেওয়া হবে।

    আন্দোলনকারীরা এ-পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন। আমি যদি ভুল না করে থাকি, তাহলে লক্ষ্য করেছি যে, আন্দোলনকারীরা দলে-দলে ভাগ হয়ে আলোচনা করছেন আন্দোলনের ভবিষ্যাত নিয়ে। তবে নিশ্চিত করেই একটা অংশ রয়েছেন, যারা সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করতেও রাজি। তাঁরা আন্দোলনে বিজয়ী না হওয়া পর্য়ন্ত ঘরে ফিরতে রাজি নন। তাঁরা কারোর মুখের কথা বিশ্বাস করেন না; তাঁরা দেখতে চান ফলাফল - আগে ফাঁসি দাও তারপর ফিরে যাবো ঘরে।

    তবে এ দাবির সাথে জামাত নিষিদ্ধের দাবি আওয়ামী লীগকে কাঁপিয়ে দিয়েছে। এ-দাবি ওঠার পর আওয়ামী লীগের গায়ে জ্বর চলে আসার কথা। এ-দাবিটি মূলতঃ আজ বৃহস্পতিবার থেকে জোরে-শোরে উঠেছে। বিভিন্ন লিফলেট আর স্লৌগানে-স্লৌগানে এটা উঠেছে। জনতা এ-দাবির ব্যাপারে একাত্বতা প্রকাশ করেছে। আমি বিভিন্ন স্লৌগানের মধ্যে এ দাবিটি ফুটে উঠতে দেখেছি, যেখানে হাজার-হাজার মানুষ দাবির সাথে কণ্ঠ মিলিয়ে বলেছেন, 'জামাতকে নিষিদ্ধ কর'।

    আন্দোলনকারীদের চ্যালেঞ্জ মূলতঃ এখানেই। তাঁরা এক মহাসন্ধিঃক্ষণে উপস্থিত হয়েছেন। একটু আপোস করলে দারুন সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যাবে। আর যদি একটু কষ্ট স্বীকার করেন, ধৈর্য্য ধরেন, তাহলে বিজয় অনিবার্য। 

    যদি জামাতকে নিষিদ্ধ না করে আমরা ঘেরে ফিরি, তাহলে ইতিহাসের দায় আমাদের কাঁধে থাকবে। আমরা লড়াইয়ের এমন একটি পরিস্থিতিতে এসে দাঁড়িয়েছি যেখানে বিজয় খুব কাছে। আবার বিজয় অর্জন করাটাও সময়ের হিসেবে খুব কৌশলের।

    বামপন্থীদের একাংশ বরাবরের মতোই শাসক দল আওয়ামী লীগকে বাঁচানোর চেষ্টা করবেন। তবে আমদেরকে অগ্রভাবে থেকে তার বিরুদ্ধে স্লৌগান তুলতে হবে, আর নয়, আঁতাত করলে জবাব দেবে বাংলাদেশ। যদি কেউ আঁতাতমুখী বক্তব্য দেন, সাথে-সাথে তা প্রত্যাখান করে স্লোগান দিতে হবে। জামায়াত নিষিদ্ধ না হওয়া পর্যন্ত শাহবাগে অবস্থান করাই হবে এই মুহূর্তের সব চেয়ে বড়ো কাজ। আর যদি আঁতাতকারীরাই আবার বিজয় অর্জন করেন, তাহলে ইতিহাস আবার পেছনে যাবে।

    আরিফুজ্জামান তুহিন
    সাংবাদিক, কবি, আন্দোলনকর্মী
    শাহবাগ থেকে, ৭ ফেব্রুয়ারী ২০১৩ মধ্যরাত

     

পাঠকের প্রতিক্রিয়া

এক কথায় অসাধারণ ব্যাখ্যা। কারণ ছাত্রলীগ, ছাত্র ইউনিয়ন, ফ্রন্ট, ফেডারেশন, মৈত্রী ভেগেছে আন্দোলন থেকে।

আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন