• শ্রদ্ধাঞ্জলিঃ সেলিম আল দীনের 'নিমজ্জন' সভ্যতার অন্তর্গত রক্তক্ষত
    স্বকৃত নোমান

    সেলিম আল দীন‘তোমার সম্মুখে অনন্ত মুক্তির অনিমেষ ছায়াপথ। তোমার দুই হাতেই তো ধরা ওই দূর নীলাভ্রের ছত্রদণ্ড। দুই কানে কালাকালের বিস্তারিত সমুদ্রের উদ্বেলিত আহ্বান। পাঠ করে পাঠ করো অন্ধকারের নিঃশব্দ নিশিলেখা। সেইখানে বোধিধ্রুম। পাঠ করো নতুন কালের গ্রন্থ। চলো মানুষ। চলো নতুন ভাবনাভূমিতে নব্যকালের নিশ্চিত গ্রহভূমিতে। আলোহীন উল্কাপিণ্ডের গায়ে সঙ্গীতের সুর লিখে দাও রাষ্ট্রহীন দেশহীন কালহীনতার আনন্দিত সর্বমানবের মিলিত উৎসবের ভাষায়। ধূমকেতুর জলন্ত পুচ্ছে ঢেলে দাও সুগন্ধের নির্যাস। চাঁদ চাষ করো। কার্পাস তুলার চাষ। সেই কার্পাসের পোশাক হোক সকল মানুষের সৌরযাত্রার বসন। চলে মানুষ চলো।’

    প্রয়াত নাট্যকার আচার্য সেলিম আল দীন কৃত ‘নিমজ্জন’ নাটকের শেষের দৃশ্যে ঢাকা থিয়েটারের তরুণ নাট্যকর্মীরা মুষ্ঠিবদ্ধ হাত উঁচিয়ে বিস্তারিত দিগন্তের দিকে চেয়ে সমবেত কণ্ঠে যখন উপরোক্ত সংলাপগুলো উচ্চারণ করেন, তখন দর্শকদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে গণহত্যাহীন এক স্বপ্নীল ভুবন, সৌরলোকের শান্ত-সুনিবিড় কোনো এক গ্রহ। মনে হয়, এসব কথা যেনো কোনো নাটকের সংলাপ নয়, চিরায়ত মহাকাব্যের অপূর্ব পংক্তি। যে-পংক্তি মানুষের ভেতর এক ভিন্নতর বোধ ও ভাবনার জন্ম দেয়, জন্ম দেয় এক অপার্থিব পবিত্রতার।

    আচার্য সেলিম আল দীন তাঁর ‘নিমজ্জন’ নাট্যের স্ত্রোত্রস্পর্শী এ-সব পংক্তির মাধ্যমে এক আশ্চর্য অভিনব কাব্যিক অভিজ্ঞতায় পৃথিবীর গণহত্যার ইতিবৃত্ত রচনা করেছেন। প্রাচীন থেকে মধ্যযুগ ও আধুনিককালের সারাবিশ্বে ঘটে যাওয়া গণহত্যার লোমহর্ষক বয়ান তাঁর ‘নিমজ্জন’ নাটক। আর এ-বয়ানের দৃশ্যচিত্র নির্মাণ করেছেন সমকালীন বাংলা নাট্যমঞ্চের যশস্বী নির্দেশক নাসির উদ্দীন ইউসুফ। নাটকটিতে তিনি নিজের শিল্প-মানসের সর্বোচ্চ প্রকাশ ঘটিয়েছেন বলে নাট্যবোদ্ধারা বলে থাকেন। তাঁরা আরও বলেন, এ-নাটকের মধ্য দিয়ে সেলিম আল দীন মানুষকে বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন।

    সেলিম আল দীনের উদ্ভাবিত ‘ফোররিয়ালিজম’ দর্শনের এক স্বার্থক নান্দনিক রূপ এ-নাটক। পাশ্চাত্য সভ্যতা ও মানুষের অশুভ যান্ত্রিক বুদ্ধিতে সৃষ্ট দু’টি বিশ্বযুদ্ধের অভাবিত সর্বনাশের ইঙ্গিত রয়েছে এতে। তথাকথিত সভ্যতা কীভাবে গণহত্যার মাধ্যমে সারাবিশ্বকে অনিশ্চিত ধ্বংসের পথে নিয়ে চলেছে, তার একটি সুস্পষ্ট ইঙ্গিত বহন করে এ-নাটক।

    নাটটির কাহিনী শুরুতে একটি প্ল্যাটফর্মে এক আগন্তুককে দেখা যায়। আগন্তুক নাটকের অন্যতম কেন্দ্রীয় চরিত্র। তিনি বিশ্বভ্রমণ-শেষে মৃত্যুশয্যায় শায়িত বন্ধুর কাছে আসবেন বলে ত্রিনদীর মোহনায় গড়ে ওঠা এক ভয়ঙ্কর উদ্ভট শহরে এসে উপস্থিত হন। আগন্তুকের মৃত্যুশায়ী বন্ধুটি রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক। রাজনৈতিক মতবাদের জন্য সে-শহরের ব্ল্যাক ডেথ স্কোয়াড অব কারাভাঁর লোকেরা নির্যাতনের পর তাঁর মেরুদণ্ডে পেরেক ঠুকে দিয়েছিলো।

    আগন্তুক ট্রেইন চেপে বন্ধুর শহরে পৌঁছে বিভৎস্য সব দৃশ্য দেখতে পান স্টেইশনে নামার পর থেকেই। একে-একে দেখতে পেলেন এক কুলির ঝুলন্ত লাশ, দেখতে অদ্ভুত এক বুড়ো, স্টিমারের হলোকাস্ট, নাড়িভুঁড়ি বেরিয়ে আসা এক রূপসী নারী। তিনি জানতে পারেন, এ-নারীকে যতোবার কবরে শোয়ানো হয়, ততোবার তিনি মৃত্যু থেকে উঠে বসেন। আগন্তুক রেস্তোরাঁয় যাবে বলে ভুল করে চলে যান এক সেক্সডল শপে। ট্যাক্সীক্যাব ড্রাইভারের আকাশপথে উড়াল দেয়া, বরফের চাঙড়ের ভিতর একান্নটি শিশুর লাশ দেখতে পান। এক পর্যায়ে তিনি রাষ্ট্রবিজ্ঞানী বন্ধুটির বাড়ী খুঁজে পান। তাঁর সঙ্গে চলে গণহত্যা ও রাষ্ট্র বিষয়ক নানা কথপোকথন। তিনি জানতে পারেন, গান-গাওয়া মেয়েটিকে কারা যেনো ধর্ষণ করে জিভ যে কেটে নিয়েছিলো সে-কথা।

    মাঝখানে একটি দৃশ্যে বাঙালীর মুক্তিযুদ্ধের কথা উঠে আসে। ১৯৭১ সালে সেনেরখিল নামের এক গ্রামে কীভাবে হানাদাররা গণহত্যা চালিয়েছিলো সে-দৃশ্য দেখে দর্শক আবেগাপ্লুত হয়। তারপর আগন্তুক পরিচিত হলেন হাত কেটে নেয়া এক কবির সঙ্গে। তাঁর উদ্যোগে শহরের লেখকসংঘে আমন্ত্রিত হন আগন্তুক। তিনি তাঁর ভাষণে বলেন কীভাবে রুয়ান্ডায় তাঁকে তুতসি শিশুদের লবণমাখা সেদ্ধ কলিজা খেতে বাধ্য করা হয়েছিলো। বলেন, পৃথবীর কোথায় গণহত্যা সংঘটিত হয়েছে এবং হচ্ছে। লেখকসংঘরে সদস্যরা তাঁর উপর ক্ষিপ্ত হয়। তিনি তাঁর উপযুক্ত জাবাবও দেন বটে। তারপর নিহত হন তাঁর বন্ধু রাষ্ট্রবিজ্ঞানীর অধ্যাপক।

    আগন্তুককে ধরে নিয়ে যায় শহরের বিশেষ বাহিনী। চলে জেরা পর্ব। পরে তাঁকে রাষ্ট্রের জন্য বিপজ্জনক মনে না করে ছেড়ে দেয়া হয়। ধাপে-ধাপে ঘটনা এগিয়ে যায়। দৃশ্যে-দৃশ্যে ভেসে উঠতে থাকে গণহত্যার নানা বিভৎস রূপ। অবশেষে বাতিঘরে ভুল সিগনালে ত্রিশ হাজার টন উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন টি-এন-টির বিস্ফোরণ ষোলো কিলোমিটার পর্যন্ত বায়ুস্তরে আগুন ধরে যাওয়া শহরটির নিমজ্জন। আকাশের বিশাল বৃত্ত জুড়ে সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসে। সৌরলৌকের একটি সন্ধ্যাতারার আলো এসে পড়ে কুশীলবদের চোখেমুখে। আগন্তুক ও তার সঙ্গীরা পশ্চিমমুখী হয়ে হাঁটুগেড়ে বসেন। নিমজ্জিত নগরী পিছনে রেখে নিঃশব্দে কাঁদেন তাঁরা। তারপর আকাশে একটি-দুটি তারা ফুটে উঠতে থাকলে তাঁরা সম্মিলিতভাবে পাঠ করতে শুরু করে স্ত্রোত্র।

    নাটক শেষ হলে দর্শকদের ভেতর যে-ক’টি গুরুত্বপূর্ণ ভাবনার জন্ম দেয়, সেগুলো হচ্ছেঃ এক - শেষ মানুষটা খুন হওয়া মানে পৃথিবীতে আর কোন মানুষই থাকবে না। মানুষ পৃথিবীর পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে বেঁচে থাকার জন্য যেকোনোভাবে আত্মরক্ষার চেষ্টা করবে। কিন্তু সর্বশেষ মানুষটা যদি খুন হয়ে যায়, তাহলে নতুন করে আর পৃথিবীতে আর কোনো মানুষই জন্মাবে না। তবে এ-খুন বন্ধ করার উপায় কী? গণহত্যা কি তাহলে এভাবে চলতেই থাকবে! তবে কি সভ্যতা এ-গণহত্যার উপরই টিকে আছে? সভ্যতা কি হত্যার মধ্য দিয়েই এগিয়ে যায়? হত্যা ছাড়া কি সভ্যতার অগ্রগতি নেই? দুই - কেউ যদি কাউকে হত্যা করেন, আর তৃতীয় ব্যক্তি যদি সেটা দেখেন, তাহলে সে-হত্যার দায় তাঁকেই নিতে হবে।

    দর্শকগণ বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ্য করেন, সেলিম আল দীন তাঁর এ-নাটকের মাধ্যমে রাষ্ট্র বিষয়ক গুরুত্বপূর্ণ কিছু তত্ত্ব হাজির করেছেন। যেমন, রাষ্ট্রবিজ্ঞানীর অধ্যাপক বলেন, ‘রাষ্ট্রের ধারণা এতোটা মানবিক যে, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার বাইরে স্বৈরতন্ত্রের সামরিকতন্ত্র থাকা অবস্থায় কেনো সীমান্ত অধ্যুষিত অঞ্চলকে রাষ্ট্র বলা যাবে না। কারণ তা মৃত। এমনকি উপনিবেশ স্থাপনকারী কোনো দেশ রাষ্ট্র হিসেবে গণ্য হতে পারে না। অর্থাৎ শেষতম উপনিবেশ থাকা অবস্থায়ও ফ্রান্স ইংল্যান্ড রাষ্ট্র ছিলো না। অস্ত্রকে পণ্যতুল্য করে যে-রাষ্ট্র অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ঘটায়, তাও রাষ্ট্র হতে পারে না।’ কিংবা জাতিসংঘ সম্পর্কে যেমন বলেন, ‘জাতি সংঘে জাতিসমূহের প্রতিনিধিত্বের বদলে রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধিত্ব ঘটছে। ফলে জাতিসংঘ কনসেপচুয়াল একটা বিকলাঙ্গ দর্শনজাত সংগঠন। আমি বলেছি আইএমএফ-এর কনসেপ্টটা উন্নত বিশ্বের কুসীদজীবিতা। তার মালিকানা হওয়া উচিত জাতিসংঘ ভেঙে রাষ্ট্রসংঘের’। রাষ্ট্র-বিষয়ক এরকম বহু উক্তি যা নাটকে বাণী হয়ে উঠেছে বলে দর্শকদের কাছে মনে হতে পারে।

    সেলিম আল দীন নাটকটি রচনা করেছিলেন ২০০০-২০০২ সালের মধ্যে। আমাদের অবাক মানতে হয় এ-জন্য যে, গণহত্যর এতো তথ্য বা কোনো রাষ্ট্রের এতো টুকিটাকি তথ্য তিনি পেলেন কীভাবে? তিনি ইন্টারনেট ব্যবহার করলে না হয় একটা কথা ছিলো। ইন্টারনেটের মাধ্যমে অনেক তথ্য সহজে পাওয়া যায়। কিন্তু তিনি এ-মাধ্যমের কোনো সহায়তা নেননি। তার মানে বুঝা যায় যে, নাটকটি লেখার জন্য তিনি কী পরিমাণ গবেষণা করেছিলেন, কতো বই যে তাঁকে পড়তে হয়েছিলো!

    ‘নিমজ্জন’ নাটকটি লেখার ভাবনা তাঁর মাথায় কীভাবে এলো সে বিষয়েও জানা যায় তার ‘দিনলিপি’র মাধ্যমে। তিনি লিখেছেন,  ‘২০০০ সালের মাঝামাঝি একবার চাঁদপুরে গিয়েছিলাম। একদিন দুপুর বেলার পর হঠাৎ করে রাস্তায় একটা প্রচণ্ড ঘুর্ণিঝড় হলো। ঐ শহরের লোকেরা রাস্তায় বা মাছের আড়তে বলাবলি করতো শহরটি শীঘ্রই তলিয়ে যাবে। ঐ ধূলিঝড়ের মধ্যেই আমি সঙ্গী উল্লাসকে প্রায় হারিয়ে ফেলি এবং সহসা সুতীক্ষ্ণ শরের মতো ‘নিমজ্জনের’ আভাস আমার বুকে এসে লাগে। সে-ভাবনাটাকেই বিশ্বরূপে ন্যস্ত করতে গিয়ে কেবলই মানব সভ্যতা ও ইতিহাসে রক্তস্রোতের অন্বেষণ। নিমজ্জনের উদ্ভব এভাবেই ঘটেছিলো।’

    ‘নিমজ্জন’ নাটক ও তার মঞ্চায়নকে রবীন্দ্র মহাভুবনের উদ্দেশ্যে নিবেদন করা হয়েছে। কিন্তু কেনো এ-নিবেদন? উত্তরও পাওয়া গেলো সহজেঃ হয়ত এ-জন্য যে, রবীন্দ্রনাথই প্রথম প্রাজ্ঞ বাঙালী, যিনি পাশ্চাত্য সভ্যতা ও বৈজ্ঞানিক মানুষের অশুভ যান্ত্রিক বুদ্ধিতে সৃষ্ট দুটি মহাযুদ্ধের অভাবিত সর্বনাশ তথা অচিরাগামী অকল্যাণের ইঙ্গিত পেয়েছিলেন। অথবা রবীন্দ্রনাথ আমৃত্যু-আজীবন যে-মঙ্গলময় পৃথিবীর স্বপ্ন দেখতেন, ‘নিমজ্জন’ তারই বিপরীতে দাঁড়ানো এক বাস্তব দলিল; যা সভ্যতার অন্তর্গত রক্তক্ষতকে উদঘাটিত করেছে। সভ্যতার উলঙ্গ নখদন্ত কীভাবে গণহত্যার মাধ্যমে সমগ্র বিশ্বকে এক অনিশ্চিত মহাপ্রলয়ের পথে নিয়ে চলেছে, সে-আভাস এ-নাটকের অবলম্বন।

    ‘নিমজ্জন’-এর রচনা কৌশলকে সমালোচকগণ বিশ্ব শিল্পধারায় ফোররিয়ালিজমের প্রথম উদ্ভাবন হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এ-নতুন শিল্পধারা শুধু বাংলা নাটক নয়, বরং বিশ্ব শিল্প-অভিজ্ঞতার ক্ষেত্রেও এক নতুন শিল্প-দর্শন হয়ে দাঁড়াতে পারে। ‘ফোররিয়ালিজম’ বা ‘সম্মুখবাস্তবতা’ এ-পরিভাষা দুটি সেলিম আল দীনেরই উদ্ভাবিত।

    ১৮ আগস্ট আচার্য সেলিম আল দীনের জন্মদিন। ১৯৪৯ সালের এ-দিনে তিনি ফেনীর সমুদ্রস্নাত সোনাগাজী উপজেলার সেনেরখিল গ্রামে জন্মেছিলেন। ২০০৮ সালের মাত্র ৫৯ বছর বয়সে লোকন্তরিত হন এ-বরেণ্য নাট্যকার। শিল্প-সমর্পিত একজন মানুষের বিদায় শুধু তাঁর দেশের জন্যই নয়, সমগ্র বিশ্বের জন্যই অপরিসীম ক্ষতি। সেলিম আল দীনের শিল্প ক্রমান্বয়ে যে-উঁচুমার্গের দিকে ধাবিত হচ্ছিলো, বেঁচে থাকলে হয়তো তিনি এ-দেশের জন্য বড়ো কোনো সুনাম বয়ে আনতে পারতেন। তবুও তিনি যে শিল্প রেখে গেছেন, তা শিল্পপ্রেমীদের জন্য এক অমূল্য সম্পদ। তাঁকে জানা এবং তাঁর শিল্পচর্চার মধ্য দিয়ে তিনি আমাদের মাঝে বেঁচে থাকবেন অনন্তকাল...।

    স্বকৃত নোমান
    ১৭ অগাস্ট ২০১১

     

আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন