• শ্রমিক সংগঠন করার আইন আছে কিন্তু অধিকার নেই
    ফেরদৌসী শম্পা

    শ্রমিক সংগঠন করতে গেলে পেটে ভাত থাকবো না, আবার সবাই চায়ও না। শ্রমিক সংগঠন করতে চাওয়াতেই আমরা মার্ক হই। বেতন বাড়াতে বললে চাকুরিচ্যুত করার কথা বলে। কথায়-কথায় ভুল ধরার চেষ্টা করে। ৫০ পিস টার্গেট পূরণ করার কথা থাকলেও বেশিরভাগ সময়েই তার চেয়ে বেশি কাজ করতে হয়; করতে না পারলে তাকে বের করে দেয়ার চেষ্টা করে। এভাবে আমাদের অনেককেই চাকুরি-ছাড়া করে কোন রকম টাকা পয়সা ছাড়াই। টাকা চাইতে গেলে অফিসে বেধে রাখে। গোপনে অনেক লোক ছাটাঁই করা হয়। এমনকি আশেপাশের কারখানাতেও যাতে কাজ না পাই সে ব্যবস্থাও করা হয়েছে। শুধু চাকুরি-ছাড়া করা নয় আমাদের অনেকের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলাও দেয়া হয়েছে- এগুলো হচ্ছে ঢাকার রেডিয়্যাল ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড গামের্ন্টস থেকে চাকরিচ্যুত হওয়া কিছু শ্রমিকের বক্তব্য। 

    ট্রেইড ইউনিয়ন বা শ্রমিক ইউনিয়নভুক্ত হবার অধিকারটি মানবাধিকারের সার্বজনীন ঘোষণাপত্র দ্বারা স্বীকৃত। এটা সাংবিধানিক মৌলিক অধিকার। আইএলও কনভেনশন নং ৮৭ ও ৮৯ এসব অধিকারের কথা বলে। বাংলাদেশও তা অনুমোদন করেছে। প্রত্যেকেই নিজ স্বার্থ রক্ষায় জন্য শ্রমিক ইউনিয়ন বা ট্রেইড ইউনিয়ন গঠন ও এতে যোগদানের অধিকার রয়েছে। ধারা-২৩ অনুসারে,  শ্রমিকের ট্রেইড ইউনিয়ন গঠন করার ও সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নের গঠনতন্ত্র সাপেক্ষে তাহাদের নিজস্ব পছন্দের ট্রেইড ইউনিয়নে যোগদানের অধিকার থাকবে। ২০০৯ সালে নভেম্বরে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ ঢাকা ও চট্টগ্রামে গামের্ন্টস ও  নির্মাণ শিল্পের উপর একটি জরিপ করে ২০০৬ সালে প্রণীত শ্রম আইনের কার্যকারিতার উপর। তখন দেখা যায় একেবারে আইন করে বাংলাদেশের কিছু কর্মক্ষেত্রে ট্রেইড ইউনিয়নকে বন্ধ করা হয়েছে। জরীপে দেখা যায় কর্মক্ষেত্রে নিজেদের অধিকার সুনিশ্চিত ও সামাজিক নিরাপত্তার জন্য সকল শ্রমিকই ট্রেইড ইউনিয়ন অধিকারটির চর্চা করতে চায় কিন্তু মালিকের ভয়ে বা চাকুরিচ্যুত হওয়ার ভয়ে করতে পারে না। শ্রমিকরা ট্রেইড ইউনিয়ন আইনের যথার্থভাবে কার্যকারিতার পুরোপুরি পক্ষে।

    ২০০৬ সালে শ্রম আইন অনুযায়ী অনুযায়ী একটি কারখানায় ৩০% শ্রমিক যদি সদস্য থাকে তাহলে ট্রেিড ইউনিয়নের রেজিস্টেশনের জন্য আবেদন করতে পারে। সবার সুবিধার জন্য, মেহনতি মানুষের অধিকার রক্ষা এবং সকলকে একটি শৃঙ্খলার মধ্যে রাখার জন্য শ্রম আইন জাতীয় সংসদে পাশ করা হয়। কিন্তু আমাদের বাংলাদেশে অধিকাংশ গামের্ন্টস মালিকই সরাসরি এই আইন অমান্য করে। আর আইনভঙ্গের লজ্জাটুকু অনেক নিয়োগদাতাকে স্পর্শ করে না। অন্যদিকে,  আইন ভঙ্গের কারণে মালিকের উপর যে জরিমানা ধার্য করা হয় তা খুবই নগন্য ও সময় সাপেক্ষ হয়। যার শ্রমিকদের মধ্যে অসন্তোষ ধূমায়িত হতে থাকে। উদাহরণস্বরুপ, কিছুদিন আগে টঙ্গীর এরশাদনগরে নিপ্পন গার্মেন্টস ইণ্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের কথা বলা যায়। মালিকপক্ষের ভয় হচ্ছে ট্রেইড ইউনিয়ন করতে দেয়া হয় তারা অধিক মুনাফা লাভ থেকে বঞ্চিত হবেন। তাই তারা আন্তরিকভাবে চায় না ট্রেইড ইউনিয়ন চালু হোক।

    বাংলাদেশের অর্থনীতিতে একটি বিশেষ স্থান দখল করে আছে গামের্ন্টস শিল্প।  এই শিল্পের বদৌলতে অর্জিত ফরেন কারেন্সির প্রশংসা নিচ্ছে মালিকপক্ষ অথচ শ্রমিকরা এর কোন ক্রেডিট পায় না। যে শ্রমিকের ঘাম ও শ্রমের বিনিময়ে দেশের অর্থনীতি সমৃদ্ধি হচ্ছে তার অংশ-ভাগ শ্রমিকদের দিতে রাজী নয় মালিকরা। যে মালিক ৫-১০ বছর পূর্বে ১টা গামের্ন্টসের মালিক ছিলেন বর্তমানে আজ তারা কয়েকটি কারখানার মালিক; এ-রকম অনেক উদাহরণ দেয়া যাবে। তাদের  অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অনেকাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে শ্রমিকের ভাগে পড়ে শূন্য। কর্মক্ষেত্রে শ্রমিক-বান্ধব ট্রেইড ইউনিয়ন থাকলে শ্রমিকদের শোষণের পথ বন্ধ হয়ে যায়, যা মালিকের স্বার্থের চরমভাবে ব্যাঘাত ঘটায়। অন্যদিকে, দীর্ঘদিন অধিকার হতে বঞ্চিত শ্রমিকদের মধ্যে অসন্তোষ পঞ্জীভূত হতে থাকে এবং একসময় তা বিস্ফোরিত হয়। কর্মক্ষেত্রে শ্রমজীবি মানুষের সুখ-দু:খের সার্বক্ষণিক সাথী ট্রেইড ইউনিয়ন। সারা পৃথিবীর শ্রমিক আন্দোলন কর্মক্ষেত্রে অধিকার প্রতিষ্ঠা, বৈষম্য দূরীকরণ, স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপদ স্বাস্থ্যসম্মত কর্ম-পরিবেশ প্রতিষ্ঠাসহ সকল শ্রমিকের জন্য সামাজিক ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার জন্য অগ্রণী ভূমিকা পালন করার কথা ট্রেইড ইউনিয়নের।  সামাজিক নিরাপত্তার অভাবে একজন শ্রমিক বিভিন্ন ধরনের সুযোগ- সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়। এক্ষেত্রে তার প্রয়োজনীয় সমর্থন ও সহযোগিতা দিতে পারে ট্রেইড ইউনিয়ন। শ্রমিকরা বঞ্চিত; কিন্তু দেখা যায় যে শ্রমিকরা সরাসরি অভিযোগ করার অধিকার প্রয়োগ করতে যেয়ে নানাভাবে জটিলতায় পড়ে। স্বাভাবিকভাবে বাংলাদেশের মত দেশে শ্রমিক ও কর্মচারী ইউনিয়নগুলো চায় মামলা-মোকদ্দমা এড়াতে। যে শ্রমিক জীবনের বেশিরভাগ সময় ব্যয় করে কর্মস্থলে, তার অসহায়ত্বের  সময়ে তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও মালিকের কর্তব্য। নিম্ন মজুরি, কাজের অভাব ও অনিশ্চয়তা, নিয়মিত কাজ না থাকা, বেকারত্ব, দারিদ্র্য পরিস্থিতি, চাকুরীর বাজারে তীব্র প্রতিযোগিতা, পেশাগত সুরক্ষার অভাব, বৃদ্ধকালীন সময়ে সুরক্ষা ও মাতৃত্বকালীন সুরক্ষার অভাব এ-রকম হাজারো কারণে শ্রমজীবি মানুষের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা জরুরি প্রয়োজন। অধিকাংশ শ্রমজীবি পরিবারেই উপার্জন করে এমন ব্যক্তির সংখ্যা একজন; তাকে ঘিরে থাকে একটি পরিবারের নিরাপত্তা। তার সচলতা ও সক্রিয়তা উপর নির্ভর করে পরিবারের ভবিষ্যত। সুতরাং তার পেশাগত জীবনে কোন বিপর্যয় মানেই অনেকগুলো মানুষের অসহায়ত্ব ও অনিশ্চয়তা। শ্রমজীবি মানুষের এই অসহায়ত্ব ও অনিশ্চয়তায় নিরাপত্তা দেয় ট্রেইড ইউনিয়ন।

    বিশ্বব্যাপী ঐক্যমত পোষণ করা হয় অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক উন্নয়ন সম্ভব নয় নারী অবদান ছাড়া। নারী ক্ষমতায়নের ও কর্মক্ষেত্রে নারী অধিকার সুরক্ষার জন্য বহু পূর্ব থেকেই ট্রেইড ইউনিয়নে নারীদের অংশগ্রহণ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বাংলাদেশের মত দেশগুলোতে পুরুষের তুলনায় নারীদের অংশগ্রহণে বিভিন্ন রকম বাধার সম্মুখীন হতে হয়। কর্মক্ষেত্রে বিদ্যমান বৈষম্যের বিরুদ্ধে এবং তাদের অধিকার সুনিশ্চিত করতে শ্রমিক সংগঠনে তাদের অংশগ্রহণ খুব একটা চোখে পড়ার মতো নয়। সকল নারী শ্রমিকদের কাছে ট্রেইড ইউনিয়ন সম্পর্কিত ধারণা পরিষ্কার নয়।  এদের অনেকে মনে করে এটি একটা রাজনৈতিক সংগঠন। তাই তারা ট্রেড ইউনিয়নে যোগদানে আগ্রহ প্রকাশ করে না। অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা যায় যে, কর্মজীবি নারী শ্রমিকদের পরিবার চায় না তারা ট্রেইড ইউনিয়নে অংশগ্রহণ করুক, এমনকি আমাদের সমাজব্যবস্থাও এটাকে ভালো চোখে দেখে না। এমনকি ট্রেইড ইউনিয়নের নেতারা অনেক সময় নারীদেরকে সিদ্ধান্তগ্রহণকারীর স্থানটি দিতে চায় না, তারা মনে করে নারীরা এজন্য যথেষ্ট পরিমান দক্ষ না এবং তাদেরকে অবহেলার চোখে দেখা হয়।

    সামাজিক নিরাপত্তা বর্তমান বিশ্বে একটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অর্থনৈতিকভাবে একজন শ্রমিকের নিরাপত্তা না থাকলে তার কাছ থেকে কাঙ্খিত উৎপাদনশীলতা আশা করা যায় না। আমাদের দেশে সামাজিক নিরাপত্তার প্রশ্নটি এখনও অবহেলিত। শ্রমজীবি মানুষের সামাজিক নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করার জন্য নারী ও পুরুষের সকলেরই ট্রেইড ইউনিয়ন করার অধিকার সুনিশ্চিত করতে হবে। বাংলাদেশে বিভিন্ন খাতে বিদ্যমান শ্রমিকদের অতি অল্প সংখ্যক ট্রেইড ইউনিয়নের সদস্য, কাজেই শ্রমিকদের মাঝে ট্রেইড ইউনিয়নসমূহের সদস্যপদ লাভের উদ্যোগী করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ প্রয়োজন। ট্রেইড ইউনিয়নে অংশগ্রহণই সমস্যার সমাধান নয় কিন্তু এটা হচ্ছে উত্তরণের প্রথম সোপান।

    ফেরদৌসী শম্পা: গবেষক
    ২৪/০৪/১০

পাঠকের প্রতিক্রিয়া

Do you think I.L.O is for the interest of Working Class? Capitalism is the root cause of all degradation & miseries of working class. Capital is nothing but surpluse-value, which produce by only working class.But by dint of private ownership capitalist calss has misappropriate the surpluse-value, and therefore they are exploiter & workers are exploited. This is unfair, unjust & crime and cause of all evil done by capitalist class. I.L.o has founded by lord of cpitalism to protect & defend the capitalism after the henious 2nd ww. So, not to follow but deny & destruction of I.L.O is the principal social duty of workers who want freedom from capitalism that is form yoke of private ownership. In details- Lenin Cheat & Betraying Marx So I.M.F The World Lord and ----- is in www.icwfreedom.org.

আমরা মধ্যবিত্ত, আমাদের কথা শোনার সময় নেই কোনো দেশেরই সরকারের বা কারখানা কতৃপক্ষের| এই অবস্থার বদল হতে প্রয়োজন বিপুল সংখ্যায় কর্মচারীর চাহিদা বাড়ানো| এটা একমাত্র সম্ভব হতে পারে যদি সরকার সহায়তা করে| স্বনির্ভরতার জন্য উদ্যোগী হয়ে নতুন ব্যবসা শুরু করার সময় থেকেই নিয়মিত লেনদেন-এ সরকারি সুরক্ষা দিয়েই এই অবস্থার আমূল পরিবর্তন করা যেতে পারে| কিভাবে? সেটা বিশদে আলোচনা সাপেক্ষ অবশ্যই|

Ei lekha ta ki kono office er janno toiri kora? Ja hok, tobu lekhok ke thanks.

Please write something on sexual abuse, harrasment and physical assult of the women workers by 'Malik Pakkoh'. We all know what the hell is going on inside the garment industry in Bangladesh.

আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন