• সমতলের আদিবাসীদের জন্য পৃথক ভূমি কমিশন গঠন
    অদিতি ফাল্গুনী

    বাংলাদেশে আদিবাসী জনগণের ভূমি অধিকার বঞ্চণার ইতিহাসটি বেশ দীর্ঘই বলা যায়। দেশের সমতল অঞ্চলের আদিবাসী জনগণের জমি জোর-পূর্বক বেদখল সে-সংক্রান্ত নিপীড়নের মাত্রা পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের চেয়েও বেশি বলা যেতে পারে। সর্বশেষ গত ১২ই জুন উত্তর বাংলার নওগাঁতে প্রায় ৫৬টি সাঁওতাল পরিবারের জমি বসতবাটির উচ্ছেদের উদাহরণটি এ-প্রসঙ্গে টানা যেতে পারে।

    সাম্প্রতিক সময়ে অর্থনীতিবিদ আবুল বারকাত তাঁর সহযোগী তিন লেখক কর্তৃক রচিত গ্রন্থ লাইফ এ্যান্ড ল্যান্ড অফ আদিবাসীস: ল্যান্ড ডিসপসেসন এ্যান্ড এলিয়েনেশন অফ আদিবাসীস ইন দ্য প্লেইন ডিস্ট্রিক্টস্‌ অফ বাংলাদেশ-এ দেখা যায় বাংলাদেশের সমতল অঞ্চলের দশটি আদিবাসী জনগোষ্ঠী এ-পর্যন্ত তাদের ২০২,১৬৪ একর জমি হারিয়েছে। এ-জনগোষ্ঠীগুলো হলো ডালু, গারো, হাজং, খাসি, মাহাতো, ওঁরাও, পাত্র, পাহান, রাখাইন সাঁওতাল। এ-দশটি জনগোষ্ঠীর হাত হতে বে-দখলকৃত জমির বর্তমান বাজার-দর হলো ৬২.৭ বিলিয়ন বাংলাদেশী টাকা বা ০.৯ বিলিয়ন মার্কিনী ডলার। এ-অঙ্কের পরিমাণ বাংলাদেশের জিডিপির প্রায় দু-শতাংশ।

    বাংলাদেশের মোট জিডিপির পরিমাণ ২০০৭-০৮ অর্থ-বৎসরে ছিলো ৩,২১৭.৫৫৫ বিলিয়ন বাংলাদেশী টাকা বা ৪৫.৯৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। আদিবাসীদের জমির নিরেট অর্থ-মূল্য ছাড়াও যদি তাদের মানসিক যন্ত্রণা সামাজিক ক্ষয়-ক্ষতির পরিমান আমরা হিসেবে নেই, তবে ভূমি অধিকার বঞ্চণার নানা-মাত্রিক দিকটি আমাদের সামনে স্পষ্টতর হবে। ২০০৯-এর মে মাসে প্রকাশিত এ-গ্রন্থটি দেশের সমতল এলাকার বারোটি জেলার ৯৮৪টি আদিবাসী পরিবারের উপর পরিচালিত সমীক্ষার ভিত্তিতে প্রকাশিত হয়েছে। প্রতিটি আদিবাসী পরিবারে অন্ততঃপক্ষে পাঁচ জন সদস্য অনুমান করে এ-সমীক্ষাটি পরিচালিত হয়। এই ৯৮৪টি পরিবারের ভেতর ৫০টি ডালু, ২২০ টি গারো, ৮৮টি হাজং, ৬০টি খাসিয়া, ১০০টি ওঁরাও, ৫০টি পাত্র, ৫০টি পাহান, ৬০টি রাখাইন ২২০টি সাঁওতালী পরিবারের উপর এ-সমীক্ষা কার্যকরী করা হয়।

    আদিবাসীদের বেদখলকৃত জমির পরিমাণ এ-জমির আর্থিক মূল্য

    আদিবাসী জনগোষ্ঠী

    বেদখলকৃত জমির পরিমাণ

    জমির আর্থিক মূল্য (বর্তমান বাজার দরে)

    টাকা

    মার্কিনী ডলার (১ মার্কিনী ডলার = ৭০ টাকা)

    ডালু

    ১৮,৮০০

    ৫৫,৭৪৩২,০০০

    ৭৯৬,৩১৪

    গারো

    ১,৩৬৪,০০০

    ৩,৮৩৮,২৯৬,০০০

    ৫৪,৮৩২,৮০০

    হাজং

    ২৭৩,০০০

    ৮৩২,৬৫০,০০০

    ১১,৮৯৫,০০০

    খাসি

    ১৪০,০০০

    ৪৪৬,৬০০,০০০

    ৬,৩৮০.০০০

    মাহাতো

    ২০৪,০০০

    ৮৯০,৮৬৮,০০০

    ১২,৭২৬, ৬৮৬

    ওঁরাও

    ৩,০৪৫,০০০

    ৯,০৪০,৬০৫,০০০

    ১২৯,১৫১,৫০০

    পাত্র

    ২১৭,১০০

    ৮৯৪,২৩৪,৯০০

    ১২,৭৭৪,৭৮৪

    পাহান

    ১,৯৪২,৫০০

    ৮,০৩০,২৯৫,০০০

    ১১৪,৭১৮,৫০০

    রাখাইন

    ১,৩৭২,০০০

    ৩,৪৫৭,৪৪০,০০০

    ৪৯,৩৯২,০০০

    সাঁওতাল

    ১১,৬৪০,০০০

    ৩৫,১৯৯,৩৬০,০০০

    ৫০২,৮৪৮.০০০

    মোট

    ২০,২১৬,৪০০

    ৬২,৬৮৬,০৯০,৯০০

    ৮৯৫,৫১৫,৫৮৪

    সূত্রঃ লাইফ এ্যান্ড ল্যান্ড অফ আদিবাসীস: ল্যান্ড ডিসপসেসন এ্যান্ড এলিয়েনেশন অফ আদিবাসীস ইন দ্য প্লেইন ডিস্ট্রিক্টস্‌ অফ বাংলাদেশ, পৃষ্ঠা ২৯১।

    উপরোক্ত দশটি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মধ্যে আজ প্রায় ৬০ ভাগ ডালু পরিবার, দু-তৃতীয়াংশ গারো পরিবার, ৬৫ শতাংশ হাজং পরিবার, ১২ শতাংশ খাসিয়া পরিবার, এক-চতূর্থাংশ মাহাতো পরিবার, অর্ধেকেরও বেশি ওঁরাও পরিবার, প্রায় সব পাত্র পরিবার, অধিকাংশ পাহান পরিবার, দু-তৃতীয়াংশ রাখাইন পরিবার প্রায় তিন-চতূর্থাংশ সাঁওতাল পরিবার আজ কার্যতঃ ভূমিহীন বসতবাটির জমি বাদ দিয়ে কোনো পরিবারের মালিকানাধীন জমির পরিমাণ যদি ৫০ শতকের কম হয়, তবে পরিবারকে কার্যতঃ ভূমিহীন বলা যেতে পারে।

    যদি আমরা বিশেষভাবে উত্তর বাংলার সাঁওতাল পরিবারগুলোতে দৃষ্টি ফেরাই, তবে জানতে পারব যে, প্রায় ৬৫ শতাংশ বা দু-তৃতীয়াংশ সাঁওতাল পরিবারই জমি বে-দখল হবার অভিজ্ঞতার ভিতর দিয়ে গেছে। বাংলাদেশে গড়ে প্রতিটি সাঁওতাল পরিবার হারিয়েছে প্রায় ১৯৪ শতক জমি। বর্তমানে যেখানে বাংলাদেশে বসবাসরত প্রতিটি সাঁওতাল পরিবারের জমির পরিমাণ মাত্র ৬৩ শতক, তার তুলনায় তাদের হারিয়ে যাওয়া মাথাপিছু ১৯৪ শতক জমির পরিমাণ নিঃসন্দেহে অনেক বেশি। গত তিন প্রজন্মে প্রায় এক-পঞ্চমাংশ বা বিশ শতাংশ সাঁওতাল পরিবার ২৫০ শতকের বেশি জমি এবং ৪০ শতাংশ সাঁওতাল পরিবার ১০০ শতকের বেশি জমি হারিয়েছে (পৃষ্ঠা ২৫৬, প্রাগুক্ত)।

    বাংলাদেশে আদিবাসীদের ভূমি বঞ্চনার আখ্যানটি ১৮৭০ সালে ঔপনিবেশিক বন বিভাগ কর্তৃক বনভূমি গ্রাসের মাধ্যমে শুরু হয়। তবে, সমতল এলাকায় আদিবাসী জমি দখলের তুঙ্গ সময়কাল হলো ১৯৭১ হতে ১৯৮০-র বছরগুলো। যদিও ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গার পর হতে আদিবাসী জমি দখল ১৯৬৫-র পাক-ভারত যুদ্ধের পর হত শত্রু সম্পত্তির নামে ব্যাপকমাত্রায় আদিবাসী জমি দখল হওয়ার পর্বটি শুরু হয়েছিল। দেশ ¯^vaxb হবার পরও শত্রু -সম্পত্তির নাম বদলে অর্পিত সম্পত্তি নামকরণের মাধ্যমে একই ভাবে আদিবাসী জমি দখলের তৎপরতা চলতে থাকে। ১৯৪০-এর দশকের শেষ বছরগুলোয় ভারত উপমহাদেশের অন্যতম সাম্যবাদী কৃষক আন্দোলন তেভাগা আন্দোলনে হাজং, গারো সাঁওতাল জনগোষ্ঠির অংশগ্রহণের দরুণ তদানীন্তন মুসলিম লীগের পাকিস্তান সরকার কমিউনিস্ট জমি দখলের নামে প্রচুর আদিবাসী জমি দখল করে। উত্তর বাংলার সাঁওতালদের মোট জমির প্রায় ২৩ শতাংশ বেদখল হয় ১৯৬১-৭০ সময়-পর্বে ১৯৭০-এর দশকে আরও ২৩ শতাংশ জমি বেদখল সম্পন্ন হয়।

    অনাকাঙ্খিত রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ স্থানীয় শ্রেণী-ভিত্তিক আধিপত্যবাদী সংস্কৃতি, দুর্বৃত্তায়িত রাজনৈতিক অর্থনীতি, রাজনৈতিক মদদ-পুষ্ট প্রভাবশালী বাঙালীদের কর্তৃক জমি দখল, আদিবাসীদের নিজস্ব ভূমি অধিকার ব্যবস্থার প্রতি আমাদের নেতিবাচক সরকারী দৃষ্টিভঙ্গি, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা পরবর্তী জমি বে-দখল, সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা এড়িয়ে সীমান্তে পার হবার জন্য আদিবাসী জনগণ কর্তৃক খুব অল্প দামে জমি বিক্রি করা, মামলা দায়েরের মাধ্যমে জমি ফিরে পাবার জন্য প্রয়োজনীয় শিক্ষা, আর্থিক সামর্থ্য ভূমি আইন সম্পর্কে জ্ঞানের অভাবে সংরক্ষিত অরণ্য, ইকো পার্ক নামক নানা সরকারী উদ্যোগের মাধ্যমে আদিবাসী জমি হাতিয়ে নেওয়ার মাধ্যমে সমতলের আদিবাসীদের Ôwbt¯^KiYÕ ও প্রান্তিকীকরণ প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে।

    আদিবাসীদের সাথে কাজ করার আমার অত্যন্ত সীমিত পরিসর অভিজ্ঞতা থেকেই একটি/দুটো স্মৃতি এখানে বলতে চাই। ২০০৪-এ উত্তর বাংলার রাজশাহী দিনাজপুরে সাঁওতাল জনগোষ্ঠির ভিতর একটি আর্থ-সামাজিক সমীক্ষার গবেষণা কাজে টানা দশদিন ভ্রমণ সাক্ষাৎকার গ্রহণের সময় জয়পুর গ্রামের অশীতিপর বৃদ্ধ সনা হাঁসদার সাথে পরিচয়ের কথা আমি আজো ভুলতে পারি না। ১৯৪৮ সালে সরকারী শিল্প কারখানা রংপুর সুগার মিল নামমাত্র মূল্যে তার পিতৃপুরুষের ৮৪ বিঘা জমি অধিগ্রহণ করে। সনা হাঁসদা একা নন। গোটা জয়পুর গ্রামের সব সাঁওতালেরই জমি সুগার মিল অধিগ্রহণ করে। অথচ, এতো মানুষের জমি কেড়ে নিয়েও উপর্যুপরি লোকসান দুর্নীতিগ্রস্ততার কারণে শেষপর্যন্ত এ-কারখানাটি কয়েক বছর আগে বন্ধ হয়ে যায়। সনা হাঁসদা আজ ভূমিহীন। চাঁপাইনবাবগঞ্জের আমনূরার মিশন গ্রামে আর এক ভূমিহীন সাঁওতাল বৃদ্ধ জানিয়েছিলেন, দেশ-ভাগের পর হতে তদানীন্তন পাকিস্তান বর্তমান বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সাথে পিতৃ-পুরুষের ১০০ বিঘা জমি নিয়ে মামলা লড়তে গিয়ে কপর্দক-হীন হবার কথা। গোটা মিশন গ্রামের সব সাঁওতাল আদিবাসীরই এক অবস্থা। এক নরউইজীয় মিশনারী তাদের পক্ষে আদালতে লড়েও বিশেষ ফল পাননি। ক্রমাগত দারিদ্র্য ভূমি বঞ্চনার হাত এড়াতে উত্তর বাংলার সাঁওতালরা অনেকেই পিতৃপুরুষের ধর্ম ছেড়ে প্রটেস্ট্যান্ট (লুথেরান) খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ করেছেন। এতে করে তাদের ভাগ্যের অতি সামান্য কিছু বদল হলেও পরিস্থিতি খুব যে, বদলেছে তা বলা যাবে না।

    আদিবাসী মানুষের ভূমি অধিকার বিষয়ক আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা সনদ নং ১০৭ (১৯৫৭)-এর অনুচ্ছেদ ১১, ১২ ১৩ এবং আদিবাসী জনগণের অধিকার বিষয়ক জাতিসঙ্ঘের ঘোষণা (২০০৭) এর অনুচ্ছেদ নং ২৬ এর বাস্তবায়ন, সমতল এলাকায় আদিবাসী ভূমি কমিশন গঠন সক্রিয় কর্ম তৎপরতা, আদিবাসী জনগণের ভিতর ভূমি আইন বিষয়ক সচেতনতা সৃষ্টি স্থানীয় বাঙালীদের ভেতর রাজনীতি অর্থনীতির দুর্বৃত্তায়ন রোধই কেবল দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালী জনগণের সাথে আদিবাসীদের ভেতরকার দূরত্ব মত-পার্থক্য হ্রাস করতে পারবে।

    অদিতি ফাল্গুনী: গবেষক ও সাহিত্য-কর্মী।

    আপলৌডঃ ১২ জুলাই ২০০৯

     

আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন