• হেনা দাস: শেষ যুদ্ধ শুরু আজি কমরেড
    জোবাইদা নাসরীন

    Hena Das হেনা দাস
    জন্ম ১২ ফেব্রুয়ারী ১৯২৪, সিলেট; মৃত্যু ২০ জুলাই ২০০৯, ঢাকা

    হেনা দাস নেই। তাঁর এই চলে যাওয়া অনেক বড় ক্ষতি আমাদের জন্য। সময়ের পরিক্রমায়  শোষনহীন সমাজের স্বপ্ন-দ্রষ্টাদের অনেকেই ভিন্ন-পথের মানুষ হয়েছেন বাংলাদেশে। অনেকেই নিজেই নিজেকে সঁপে দিয়েছেন নতুন ব্যবস্থাপণার কাছে। এসব পথে হাঁটেননি হেনা দাস; নিজের আদর্শের বাইরে কোন কিছুর সঙ্গে আপোষ করতে চাননি। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত শোষনহীন সমাজের জন্য,  সমাজতন্ত্রের জন্য লড়াইয়ের প্রদীপটি হাতে নিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। চল্লিশ  দশকে পাওয়া কমিউনিষ্ট পার্টির সদস্য-পদটিকে আঁকড়ে ধরেছিলেন সারাটা জীবন। এ-এক বিরল জীবন-খুব কম মানুষই পারে আদর্শ দিয়ে জীবনকে মোড়াতে,  লিপ্সাহীনতার আবরনে নিজেকে ঢাকতে।

    হেনা দাসকে আর দেখা যাবেনা কমিউনিস্ট পার্টির সন্মেলনে। জাগো জাগো জাগো সর্বহারা, সনাতন ও বন্দী কৃতদাস, শ্রমিক দিয়াছে আজি সাড়া, উঠিয়াছি মুক্তির আশায়, ... শেষ যুদ্ধ শুরু আজি কমরেড....মোরা মিলি একসাথ’- এই গানটি হেনা’দি কখনও আর গাইবেননা সন্মেলনে। হেনা দাস নেই মানে একজন আজীবন সংগ্রামী মানুষের চলে যাওয়া, এই সমাজ ভেঙ্গে নতুন সমাজ গড়ার শপথের মিছিল থেকে একজন অগ্রপথিকের চলে যাওয়া। আমাদের প্রজন্মের কাছে হেনা দি এক আইকন- মানবতার আইকন, মানুষের সম-মর্যদার লড়াইয়ের এক সাহসী সৈনিক।

    বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িকতা-বিরোধী মুক্ত-চিন্তার অন্যতম পথ-প্রদর্শক ছিলেন হেনা’দি। তিনি অগ্নিযুগের বিপ্লবী। সে এক অগ্নি-সময় ছিলো; যখন জমিদার পরিবারের অনেক সন্তানই জমিদারী ব্যবস্থা এবং জমিদারী শাসনের বিরুদ্ধে লড়াই  শুরু করেছিলেন। জমিদার পরিবারের মেয়ে হেনা’দি নিজেকে আবিষ্কার করেছেন সর্বহারাদের মিছিলে, কৃষক-মজুরের কাতারে। শখের বশে কিংবা বড় ভাইদের দেখাদেখি নয়. বেশ খানিকটা জেনে-শুনেই এ-জীবন বেছে নিয়ে ছিলেন তিনি। ব্রিটিশ শাসনের সময় সিলেট অঞ্চলে গড়ে উঠা নানকার আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক হেনা দাস। মেয়ে কুলির ছদ্মবেশে তিনি  দীর্ঘদিন কাজ করেছেন চা বাগানগুলোতে - কুলী নারীদের তৈরি করতে, তাদের সংগঠিত করতে। সিলেট অঞ্চলের বিভিন্ন চা-বাগানে এখনও হেনা’দির সেই দিনগুলোর কথা রূপকথার মতো মানুষের মুখে-মুখে ফেরে।

    হেনা দাস একজন শিক্ষক, তিনি শিক্ষা-আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃত। পাকিস্তান আমল থেকেই তিনি শিক্ষকদের আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত। হেনা দাস শিক্ষক হিসেবে ছিলেন অত্যন্ত সন্মানিত। নারায়নগঞ্জ গার্লস স্কুলকে তিনি তৈরি করেছেন সেই পাকিস্তান আমল থেকেই। চল্লিশের দশক থেকে শাসন-শোষন বিরোধী এমন কোন আন্দোলন ছিলোনা যার সঙ্গে হেনা’দির সম্পৃক্ততা ছিলোনা। বাংলাদেশে নারী আন্দোলনের প্রাচীনতম সংগঠন মহিলা পরিষদের সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততাও বহু আগের। প্রথম থেকেই সংগঠনটিতে তিনি দায়িত্ব নিয়েই কাজ করেছিলেন। ২০০০ সালের পর থেকে বেশ কিছু দিন এই সংগঠননের সভাপতি ছিলেন। এ-ধরণের বহু যুক্ততার মধ্য দিয়ে হেনা দাস হয়ে উঠেছেন একাধারে ব্রিটিশ, পাকিস্তান এবং স্বাধীন বাংলাদেশে  শোষন-নিপীড়ন বিরোধী আন্দোলনের এক দীর্ঘ ইতিহাস।

    বাংলাদেশে স্বাধীনতা সংগ্রামীদের গুরুত্ব এমননিতেই কম। আজীবন সংগ্রামী এই মানুষটি পাননি কোন রাষ্ট্রীয় সন্মান। হেনা দাস অবশ্য কখনও এসবের জন্য লালায়িত ছিলেন না। ‘মানুষের জীবন একটাই, তা একবারই ধারণ করতে দেয়া হয়। আমি আমার জীবন এমনভাবে ধারণ করবো যেন মৃত্যুর সময় আমি বলে যেতে পারি, আমি আমার সমস্ত উৎসর্গ করেছি, পৃথিবীর সুন্দরতম আদর্শের জন্য- মানুষের মুক্তির সংগ্রামে’ - ‘ইষ্পাত’ এ লেখা এই কথাগুলো  হেনা দাসের জন্যই যেন লেখা ছিলো । হেনা দাস আমৃত্যু ছিলেন মানুষের মুক্তি-সংগ্রামের অবিচল যাত্রী। উপনিবেশবাদ, নব্য-উপনিবেশবাদ এবং সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে যে-লড়াই তার শেষ এখনো হয়নি। হেনা দাস মানুষের মুক্তি দেখে যেতে পারেননি। কিন্তু লড়াই চলছে। এক দূর্লভ ঈর্ষণীয় জীবন ছিল যাঁর, সেই কমরেড হেনা দাস, তোমায় লাল সালাম।

    জোবাইদা নাসরীনঃ লেখক ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক

    ২২ জুলাই ২০০৯

পাঠকের প্রতিক্রিয়া

হেনা দাস হয়ে উঠেছেন একাধারে ব্রিটিশ, পাকিস্তান এবং স্বাধীন বাংলাদেশে শোষন-নিপীড়ন বিরোধী আন্দোলনের এক দীর্ঘ ইতিহাস। কমরেড হেনা দাস, তোমায় লাল সালাম।

কমরেড হেনা দাস, তোমায় লাল সালাম।

আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন