• দেশকে মিনি পাকিস্তানে পরিণত করা হয়েছে

    অধ্যাপক ডঃ হারুন-অর-রশীদ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডীন ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক। এ-শিক্ষক ইউকেবেঙ্গলির সঙ্গে একান্ত সাক্ষাতকারে অধ্যাপক হারুন কথা বলেছেন যুদ্ধাপরাধীদের বিচার, রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা, গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ-সহ বিভিন্ন বিষয়ে। গত ৬ ডিসেম্বর ঢাকায় সাক্ষাতকারটি নিয়েছেন সৌরভ রহমান।

    ইউকেবেঙ্গলিঃ ১৯৭১-এ যে-স্বপ্ন নিয়ে মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিলো, বাংলাদেশে সে-স্বপ্ন কতটুকু বাস্তবায়িত হয়েছে?

    ডঃ হারুণ-অর-রশীদঃ ১৯৭১ সালে যে-আদর্শ ও চেতনার ওপর ভিত্তি করে মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিলো, তার প্রধান উদ্দেশ্য ছিলো একটি অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠন। বাঙালী জাতীয়তাবাদের ওপর ভিত্তি করে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্যে ১৯৭২ সালের সংবিধানে ধর্ম-নিরপেক্ষতার উপর গুরুত্বারোপ করে চারটি ধারা সন্নিবেশিত করা হয়, কিন্তু আজ ৩৭ বছর পেরিয়ে যাওয়ার পর জাতি সে-মূল লক্ষ্য, উদ্দেশ্যে, চেতনা ও আদর্শ থেকে বহুদূর সরে গেছে। মুক্তিযুদ্ধের মহান আদর্শের পরিবর্তে কিছু পশ্চাতপদ সাম্প্রদায়িক এবং সঙ্কীর্ণ চেতনা আমাদের জাতীয় জীবনে বাসা বেঁধেছে।

    মূলতঃ ১৯৭৫-এ মুক্তিযুদ্ধের অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু সপরিবারে নিহত হওয়ার পর থেকেই বাংলাদেশের রাজনৈতিক ধারা সম্পূর্ণ বিপরীত দিকে প্রবাহিত হতে শুরু করে। ১৯৭৫ পরবর্তী বিভিন্ন সামরিক সরকারের আমলে এ-ধারা আরও পুষ্টি লাভ করেছে। ১৯৯৬-এর শেখ হাসিনা সরকারের আমলে পুনরায় মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ বাস্তবায়নের একটা তাগিদ লক্ষ্য করা গেছে। তবে সার্বিকভাবে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন ব্যর্থ হওয়ার পেছনে স্নায়ুযুদ্ধ-কালীন বিশ্ব রাজনীতিও অনেকটা দায়ী। কিন্তু সবচেয়ে বেশি দায়ী বোধহয় সরকারগুলোর ধর্ম-ভিত্তিক রাষ্ট্রগঠনের পদক্ষেপ। দেশের ধর্ম-নিরপেক্ষ সংবিধান পরিবর্তন ও রাষ্ট্র-ধর্ম ইসলাম করার মাধ্যমে দেশকে মিনি পাকিস্তানে পরিণত করা হয়েছে।

    ইউকেবেঙ্গলিঃ ১৯৭১-এ মুক্তিযুদ্ধের সময় পুরো জাতি ঐক্যবদ্ধ ছিলো। এখন সেক্টর কমান্ডার ফৌরাম যখন যুদ্ধাপরাধীর বিচারের দাবী তুলছে তখন জাতি কেনো ঐক্যবদ্ধ হতে পারছে না?

    হারুণ-অর-রশীদঃ ১৯৭১ সালে জাতি ঐক্যবদ্ধ হয়েছিলো পাকিস্তানী শাসন শোষনের বিরুদ্ধে। পাকিস্তানী শাসকদের বিরুদ্ধে বাঙালী জাতিসত্তা রুখে দাঁড়িয়েছিলো, ঐক্যবদ্ধ হয়েছিলো। এখন বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করার মতো কেউ নেই। তাছাড়া স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্র-ক্ষমতায় মুক্তিযুদ্ধ-বিরোধী সাম্প্রদায়িক শক্তি প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে। এরা চিন্তা চেতনা ও আদর্শের দিক দিয়ে পাকিস্তানী মানসিকতার উত্তরসূরী। সেক্টর কমান্ডার ফৌরাম যখন যুদ্ধাপরাধীর বিচারের দাবী তুলছে তখন এ-অপশক্তি নানান পন্থায় জাতিকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা চালাচ্ছে।

    ইউকেবেঙ্গলিঃ বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে বাধা কোথায়?

    হারুন-অর-রশীদঃ দেশে যদি যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করতে হয়, তাহলে যে-সরকার তাদের বিচার করবে তাদের একটা সুদৃঢ় অবস্থান থাকা প্রয়োজন। সাধারণভাবে মানুষের মধ্যে একটা ধারণা আছে মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দানকারী আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলেই বিচার সম্ভব। কিন্তু দীর্ঘ ২১ বছর পর আওয়ামী লীগ যখন ক্ষমতায় এসেছে তখন বাংলাদেশের সমাজে পশ্চাৎপদ, সাম্প্রদায়িক শক্তির মূল অনেক গভীরে প্রথিত হয়েছে। ভৌটের রাজনীতির কথা চিন্তা করে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু করতে তারা উৎসাহী হননি। তাছাড়া ২০০১-এর পর আবার আওয়ামী-লীগ রাষ্ট্র ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে। ২০০১-এর পরে দেশে মৌলবাদের উত্থান হয়েছে আরও প্রবলভাবে। কট্টর ইসলামী মনোভাব দানা-বাঁধার ফলে এখন যুদ্ধাপরাধীদের বিচার আরও কঠিন হয়ে গেছে।

    ইউকেবেঙ্গলিঃ সামনে ১৬ ডিসেম্বর| বিজয়ের মাসে জাতি একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনের সামনেও দাঁড়িয়ে আছে। সব মিলিয়ে আপনি সামনের দিনগুলোকে কীভাবে দেখেন?

    হারুন-অর-রশীদঃ কিছু ক্ষেত্রে তো বাংলাদেশের ভবিষ্যতকে আমি ভালোই বলবো। কিছু রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার চেষ্টা হয়েছে। যেমন স্বাধীন নির্বাচন কমিশন। দুর্নীতি দমনের কিছু কার্যক্রম হাতে নেয়া হয়েছে। তাছাড়া উপজেলা ব্যবস্থা বা স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা নিয়ে এবং ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। আমরা জাতীয় পরিচয়পত্র-সহ একটা নির্ভুল ভোটার তালিকাও পেয়েছি। নব-নির্বাচিত সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ভালো কার্যক্রমগুলো বাস্তবায়ন করার মাধ্যমে একটি দক্ষ, গণতান্ত্রিক ও কার্যকর সরকার গঠন করতে পারবে বলে আমি আশাবাদী।

    আপলৌডঃ ১৬ডিসেম্বর ২০০৮

    সাক্ষাতকার দিয়েছেন: 
    অধ্যাপক ডঃ হারুন-অর-রশীদ

আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd>
  • Lines and paragraphs break automatically.

লেখা ফরম্যাট করার বিষয়ে আরো তথ্য

আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন