• গ্রীক পার্লামেন্ট স্কোয়ারে প্রবীণের আত্মহত্যাঃ অমর্যাদাকর দারিদ্রের চেয়ে মৃত্যু শ্রেয়
    Greek-commits-suicide.jpg

    ইউকেবেঙ্গলি - ৫ এপ্রিল ২০১২, বৃহস্পতিবারঃ  প্রাচীন সভ্যতার দেশ গ্রীসে স্থানীয় পুঁজিবাদী অর্থনীতি বৃহত্তর বিশ্ব-পুঁজিবাদী ব্যবস্থার নির্দেশে অস্টারিটি তথা ব্যয়-সঙ্কোচন নীতি গ্রহণের ফলে সমাজের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের জীবনে যে দুর্ভোগ ও হতাশা নেমে এসেছে, তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে গতকাল রাজধানী এ্যাথেন্সের পার্লামেন্ট চত্তর সিন্ট্যাগমা স্কোয়ারে ৭৭ বছর বয়সী এক নাগরিক আত্মহত্যা করেছেন।

    গতকাল স্থানীয় সময় সকাল ৯টার কিছুক্ষণ আগে নিজের হাতে নিজের প্রাণ-প্রদীপ নিভিয়ে দিয়েছেন অত্যন্ত সজ্জন বলে পরিচিত অবসরপ্রাপ্ত কেমিস্ট দিমিত্রিস ক্রিস্তৌলাস। আত্মহত্যার আগে একটি ‘সুইসাইড নৌট’ লিখে সাথে রেখেছিলেন ক্রিস্তৌলাস।

    পুলিসের হস্তগত সেই সুইসাইড নৌট উল্লেখ করে গ্রীক সংবাদ-মাধ্যমগুলো জানাচ্ছে যে, ক্রিস্তৌলাস সরকারের আর্থিক সাশ্রয় নীতির সমালোচনা করে লিখে গিয়েছেন যে, সরকার তাঁর পেনশনের অর্থ হ্রাস করে তাঁর বেঁচে থাকার সম্ভাবনাকেও নাকচ করে দিয়েছে। আর, এর ফলে তার সামনে যে অমর্যাদাকর দারিদ্র হাজির হয়েছে, তা নিয়ে বেঁচে থাকার চেয়ে তিনি মর্যাদার সাথে নিজের জীবনের ইতি টানাই শ্রেয় মনে করেছেন।

    ক্রিস্তৌলাস তাঁর সুইসাইড নোটে অভিযোগ করে লিখেছেন, ‘যে মর্যাদাকর পেনশন জন্য আমি রাষ্ট্রের কোনো সাহায্য ছাড়াই গত ৩৫ বছর ধরে অর্থ পরিশোধ করেছিলাম, তার উপর নির্ভরশীল আমার টিকে থাকার সমস্ত পথই বিলীন করে দিয়েছে সরকার।‘

    তারুণ্য ও যৌবন থাকলে তিনি এর বিরুদ্ধে সক্রিয় প্রতিরোধে ব্রতী হতেন ইঙ্গিত দিয়ে তিনি লিখেছেন, ‘আমার শেষ বয়স যেহেতু আমাকে কোনো সক্রিয় প্রতিক্রিয়ার পথ অবলম্বন করতে অনুমোদন করে না ... সুতরাং আমি যাতে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য আবর্জনার মধ্যে (খাবারের) ক্যান খুঁজে না ফিরি, তার জন্য আমার জীবনের এই মর্যাদাকর ইতি টানার চেয়ে আর কোনো সমাধান দেখি না।’

    উল্লেখ্য, অবসর গ্রহণের আগে ক্রিস্তৌলাস একটি ওষুধের দোকান চালাতেন, যা ২০০৪ সালে বিক্রি করে তাঁর অবসর জীবন শুরু করেন। স্ত্রী ও দুই সন্তান রেখে মৃত্যুর পথ বেছে নেয়া ক্রিস্তৌলাস তাঁর প্রতিবেশীদের কাছে অত্যন্ত সজ্জন হিসেবে পরিচিত ছিলেন।

    রাজনৈতিক চিন্তার দিক থেকে তিনি বামপন্থী ছিলেন এবং বর্তমান সরকারের গৃহীত নীতির বিরুদ্ধে তিনি আন্দোলনে যথাসাধ্য সক্রিয় ছিলেন। তবে আজ দৈনিক গার্ডিয়ানে প্রকাশিত একটি আর্টিকেলে এ্যাথেন্সের হেলেনা স্মিথ জানান যে, দেশের ক্রান্তি-কালে নতুন প্রজন্মের গ্রীকদের আপেক্ষিক উদাসীনতা ও নিষ্ক্রিয়তার কারণে তিনি খুবই ব্যথিত ছিলেন। লেখিকা ক্রিস্তৌলাসের এক বন্ধুকে উদ্বৃত করে এ-তথ্য দেন।

    এদিকে, দিমিত্রিস ক্রিস্তৌলাসের আত্মহত্যার ঘটনাটিকে দেশের প্রধানমন্ত্রী লুকাস পাপান্দেমোস ‘ট্র্যাজিক’ অভিহিত করে বলেন, ‘আমাদের সমাজের জন্যে এই কঠিন সময়ে আমাদের সকলকে - রাষ্ট্র ও নাগরিকদেরকে - আমাদের মধ্যে বিপন্নদের সাহায্যে এগিয়ে আসতে হবে।’

    আজ প্রাপ্ত সংবাদে জানা যায়, ক্রিস্তৌলাসের আত্মহত্যার স্থানে দরদী নাগরিকেরা ফুল ও হাতে লেখা চিরকূট রেখে সম্মান, সমবেদনা প্রকাশ করে জড়ো হন এবং সন্ধ্যা নামার সাথে-সাথে তাঁরা বিক্ষোভে ফেটে পড়ে পুলিসের উপর আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে।

    বিক্ষুব্ধ জনতা পুলিসের উপর হাত-বোমা নিক্ষেপ করে এবং পুলিস এর জবাবে কাঁদুনে গ্যাস ছুঁড়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করে।

    উল্লেখ্য, গত দু-বছর ধরে সরকারে ব্যয়-সঙ্কোচন নীতির ফলে গ্রীসের আত্মহত্যার হার ১৮% বৃদ্ধি পেয়েছে বলে পরিসংখ্যান প্রকাশ করেছে বিবিসি-সহ বিভিন্ন সংবাদ-মাধ্যম। প্রাপ্ত পরিসংখ্যানে দেখা যায়, রাজধানী গ্রীসে আত্মহত্যার হার বৃদ্ধি পেয়েছে ২৫%। অথচ দু-বছর আগে পর্যন্ত গ্রীসে আত্মহত্যার হার ছিলো সমগ্র ইউরোপের মধ্যে সর্বনিম্ন।

    গ্রীসের জন-জীবনে সর্বগ্রাসী সঙ্কটদায়ী অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে ক্ষোভে-অভিমানে দিমিত্রিস ক্রিস্তৌলাসের আত্মহত্যা অনেকের কাছে ২০১০ সালের ডিসেম্বরে তিউনিসিয়া ফল বিক্রেতা মোহামেদ বওয়াযিযির আত্মহত্যার সমান্তরাল হিসেবে আবির্ভুত হতে পারে। উল্লেখ্য, মোহামেদ বাওয়াযাযির আত্মহত্যার ঘটনাই 'আরব-বসন্ত' জন্ম দিয়ে পরিবর্তনের সূত্রপাত ঘটায়।

আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন