• চীনকে রুখতে জাপানে সামরিক 'নবজাগরণ'
    japan_anti_war_protest.jpg

    রফিকুল রঞ্জু - ২ জুলাই ২০১৪, বুধবারঃ  শান্তিবাদী দেশ হিসেবেই পরিচিত জাপান। তাদের সংবিধানকেও শান্তির পক্ষের বিধি বলা হয়ে থাকে। অন্ততঃ গত মঙ্গলবার পর্যন্ত দেশটির আনুষ্ঠানিক অবস্থান ছিল যুদ্ধে না-জড়ানোর পক্ষে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর গত ৬০ বছর দেশটির প্রকাশ্য অবস্থান ছিলো এমনই।

    তবে, সম্প্রতি ওই অঞ্চলে ক্রমশঃ বাড়তে থাকা সামরিক উত্তেজনার মধ্যে প্রত্যয়ী ভূমিকা রাখতে চাইছে জাপান। সেই লক্ষ্যকে সামনে রেখেই মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রী শিন্‌জো এ্যাবে দিলেন সংবিধানের নতুন ব্যাখ্যা। এর ফলে ছয় দশক পর দেশটির সামরিক বাহিনী মুক্ত হতে চলেছে শুধুমাত্র স্বদেশ রক্ষায় নিয়োজিত থাকার বাধ্যবাধকতা থেকে।

    এ্যাবের নতুন ব্যাখ্যা এবং জাপান সরকারের নতুন সিদ্ধান্তের ফলে এখন দেশটি তার বিশাল ও উন্নত প্রযুক্তির সামরিক বাহিনীকে এমনভাবে ব্যবহার করতে পারবে যা এক দশক আগেও চিন্তা করা যেত না।

    সংবিধানের নতুন ব্যাখার ফলে জাপানের সামরিক বাহিনী এখন আক্রান্ত যে-কোনো বন্ধুরাষ্ট্রকে সাহায্য করতে যেতে পারবে। এই বন্ধুরাষ্ট্রের তালিকায় যুক্তরাষ্ট্রও রয়েছে। এখন যদি কোনো মার্কিন জাহাজ আক্রান্ত হয়, কিংবা উত্তর কোরিয়া যদি যুক্তরাষ্ট্রের দিকে কোনো ক্ষেপনাস্ত্র ছোঁড়ে, তবে 'আত্মরক্ষা বাহিনী' হিসেবে পরিচিত জাপানের সামরিক বাহিনী এই প্রথমবারের মতো মার্কিনীদের সহযোগিতায় এগিয়ে যেতে পারবে। নতুন এ সিদ্ধান্ত সামনের শরৎকাল থেকে কার্যকর হওয়ার সম্ভবনা রয়েছে।

    জাপানের এই অবস্থান এশিয়ায় দ্রুতগতিতে ঘটে চলা ক্ষমতার ভারসাম্য পরিবর্তনেরই অংশ -যেখানে চীন এবং এর ক্রমবর্ধমান সামরিক শক্তি যুক্তরাষ্ট্র এবং জাপানসহ তার মিত্রদের আঞ্চলিক আধিপত্যের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

    শিন্‌জো এ্যাবের এই ঘোষণায় চীনাদের নিশ্চিতভাবেই ক্ষিপ্ত করবে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নির্মম আগ্রাসনের জন্য তারা এখনও জাপানকে ক্ষমা করতে পারেনি। এ্যাবের এ-ঘোষণা তাই এশিয়ার বৃহত্তম দুই শক্তিকে সঙ্ঘাতের দিকে ঠেলে দিতে পারে আরও বেশি।

    টোকিওর মেইজি গাকুইন বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি বিশেষজ্ঞ কাজুশিমা কাওয়াকামি এ বিষয়ে বলেন, "চীনের ক্রমবর্ধমান চাপ জাপানের আভ্যন্তরীন রাজনৈতিক বিতর্ক পাল্টে দিয়েছে।"

    এ্যাবে সরকারের এই ঘোষণা এমন সময় এলো যখন চীনের নেতার রাষ্ট্রীয় সফরে সিউলে পৌঁছানোর কথা। অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, এই সফরে চীন চেষ্টা করবে চাপ দিয়ে দক্ষিণ কোরিয়াকে তার দীর্ঘদিনের মিত্র যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে সরিয়ে আনতে।

    জাপানে অনেকের কাছেই তাদের যুদ্ধবিরোধী সংবিধান অনেকটা কষ্টিপাথরের মতো। ফলে নতুন ব্যাখ্যা দেশটির রাজপথে বিক্ষোভের জন্ম দিয়েছে, যা ছিলো খুবই বিরল। এমনকি টোকিওতে চলতি সপ্তাহে একজন বিক্ষোভকারী প্রকাশ্যে নিজ-দেহে আগুন লাগিয়ে আত্মাহুতি দেয়ার চেষ্টা করেন।

    জাপানের এই উদ্যোগকে খুব সঙ্গত কারণেই দ্রুততার সাথে স্বাগত জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মঙ্গলবার ওবামা প্রশাসন বলেছে, জাপানের সামরিক বাহিনী যাতে মিত্রজোটের কাঠামোর মধ্যে থেকে আরো বেশি ভূমিকা রাখতে পারে, সেজন্য তারা সহযোগিতা করবে।

    কিন্তু শিন্‌জো এ্যাবের নতুন পদক্ষেপ বারাক ওবামার জন্য কিছু চ্যালেঞ্জও তৈরি করেছে। কারণ আগে থেকেই তারা জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যকার দ্বন্দ্ব জোড়াতালি দিয়ে মেটাতে গিয়ে হিমশিম খেয়েছে। চীনের মতো দক্ষিণ কোরিয়াও তিক্ত জাপানী ঔপনিবেশিক ইতিহাসের ভোলেনি। তাছাড়া চীনের সাথে জাপানের উত্তেজনা নিরসন করা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

    জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো এ্যাবে দীর্ঘদিন ধরে দেশটির সংবিধানে পরিবর্তন এনে যুদ্ধ-বিরোধী রাষ্ট্রীয় নীতি থেকে সরে আসতে চেষ্টা করছেন। তিনি জাপানকে একটি ‘স্বাভাবিক’ দেশে পরিণত করার কথা বলে আসছেন। এ-বক্তব্য তাঁর নির্বাচনী প্রচারণারও অংশ ছিল। কিন্তু তিনি জনসমর্থন পাননি। তা সাত বছর আগে তাকে প্রধানমন্ত্রীত্বই ছাড়তে হয়েছিলো।

    ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির সেন্টার ফর ইণ্টারন্যাশনাল স্টাডিসের পরিচালক রিচার্ড জে. স্যামুয়েলস মনে করেন, যদিও এশিয়ায় এখনো পুরোদমে অস্ত্রের প্রতিযোগিতা শুরু হয়নি, তবু জাপানের এই পদক্ষেপে বোঝা যাচ্ছে, জাপান এবং অন্য দেশগুলোকে তাদের নিজেদের নিরাপত্তার বিষয়টি আগের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হচ্ছে।

    ১৯৮০'র শেষদিকে ও ১৯৯০ দশকের শুরুতে জাপান প্রথমবারের মতো জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে সৈন্য পাঠিয়েছিলো। সেনাশক্তি ব্যবহারের আপাত নির্দোষ সে-ঘটনাও দেশটিতে ব্যাপক বিক্ষোভের জন্ম দিয়েছিলো। এছাড়াও মার্কিন কর্মকর্তারা উত্তর কোরিয়ার সাথে বিবাদের কথা তুলে জাপানে ঘাঁটি স্থাপনের ব্যাপারে বছরের পর বছর গোপনে আলাপ চালিয়েছে। জাপানের রাজনীতিবিদ ও আমলারা খুব বেশি আশাবাদী হতে ততোটা ভরসা পায়নি, যদিও তাদের নিজেদের দেশই ছিল ঝুঁকিতে।

    কিন্তু এ্যাবের মতো জাতীয়তাবাদী নেতারা তখন প্রতিবাদী অবস্থান নিয়েছিলেন। তাঁদের বক্তব্য ছিলো - নিজেদের প্রতিরক্ষার জন্য জাপান ওয়াশিংটনের ততোটা মুখাপেক্ষী নয়। তাদের পাশাপাশি সনি করেপারেশনের প্রতিষ্ঠাতা আকিও মরিতা, টোকিওর প্রাক্তন গভর্নর শিনতারো ইশিহারাসহ অনেকের বক্তব্য ছিলো, বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশের উপযুক্ত  সামরিক নীতিই গ্রহণ করা প্রয়োজন।

    অর্থনীতির আকারের বিচারে জাপান আজ তৃতীয় অবস্থানে - চীন তাদেরকে টপকে দ্বিতীয় স্থানটি দখল করে নিয়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, জাপান আবার উঠতে শুরু করবে। যুদ্ধ-নীতির এ-পরিবর্তনের পেছনে সে-ব্যাপারটিও রয়েছে।

    শিন্‌জো এ্যাবে বলেছেন, এই পরিবর্তন জাপানকে এমন দেশে পরিণত করছে না, যে-দেশ যুদ্ধ চায়। জাপান-যুক্তরাষ্ট্রের শক্তিশালী জোট হলো শত্রুকে ব্যহতকারী শক্তি যা জাপান এবং এই অঞ্চলের শান্তির ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখবে।

    চীনের রাষ্ট্রায়ত্ব সংবাদ সংস্থা সিনহুয়া এক মন্তব্য প্রতিবেদনে শিনজো এ্যাবেকে সতর্ক করে দিয়ে বলেছে, ‘যুদ্ধের ভূত নিয়ে এ্যাবে ছেলেখেলা খেলছেন’।

    চেস্টারটাউনের ওয়াশিংটন কলেজের ইণ্টারন্যাশনাল স্টাডিজ বিভাগের পরিচালক অ্যান্ডু এল. ঔরোস বলেছেন, জাপানে এখন নিরাপত্তা রেনেসাঁ বা নবজাগরণ ঘটছে।

    ১ জুলাই ২০১৪ নিউ ইয়র্ক টাইম্‌সে প্রকাশিত মার্টিন ফ্যাক্লার ও ডেইভিড সেঞ্জারের প্রতিবেদনের সংক্ষেপিত ও ঈষৎ পরিবর্তিত ভাষান্তর

আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন