সংবাদ পরিক্রমা
সংবাদ প্রতিবেদন
- পার্বত্য চট্টগ্রামে সহিংসার প্রতিবাদে প্রাঙ্গণ ও মহাবিশ্ব
৪ঠা মার্চ বৃহস্পতিবার বিকেলে পূর্ব লন্ডনের ৪৬/এ গ্রেটরেক্স স্ট্রীটে মহাবিশ্ব ও প্রাঙ্গণ এর যৌথ উদ্যোগে পার্বত্য চট্টগ্রামে সাম্প্রতিক সহিংসা প্রসঙ্গে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক শান্তনু মজুমদারের সঞ্চালনে সভার সূচনাতে বক্তব্য রাখেন জুম্ম নেটওয়ার্ক ইউকে এর নেতা লাল আমলাই। এছাড়াও আলোচক হিসাবে উপস্থিত ছিলেন সিএইচটি কমিশনের সাবেক কো-অর্ডিনেটর লীরা শিরিন ও ইস্ট লন্ডন ইউনিভার্সিটিতে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে গবেষণারত রুমানা হাশিম।
পার্বত্য অঞ্চলের সমস্যার ইতিহাস বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীরা ব্রিটিশ আমল থেকেই বঞ্চিত। পাকিস্তান শাসনকালে কাপ্তাই বাঁধ নির্মানের ফলে প্রায় ৫৪ হাজার একর জমি পানির নিচে চলে যায়। যার পরিনতিতে সে-সময় লক্ষ মানুষ ভূমিহীন হয়ে পড়েন। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ এর এপ্রিল মাসে এম আর লারমা আদিবাসীদের দাবী পেশ করেন শেখ মুজিবর রহমানের কাছে। লাল আমলাই জানান তখনকার সরকার আদিবাসীদের খালি হাতে ফিরিয়ে দেন। ১৯৭৫ এর পর সমস্যা আরো প্রকট হতে থাকে। জেনারেল জিয়ার শাসন আমলে পার্বত্য অঞ্চলে পরিকল্পিতভাবে নিয়ে যাওয়া হয় ভূমিহীন বাঙালীদের। এর পরিনতিতে কাপ্তাই বাঁধের কারনে ভূমি সংকটে ভূগতে থাকা পাহাড়ীদের সাথে সেটেলারদের ভূমি নিয়ে সংঘাতের বিষয়টি অনিবার্য হয়ে ওঠে। জেনারেল এরশাদের আমলেও সমতল থেকে মানুষ পাঠানোর প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকে।
পার্বত্য চট্টগ্রামের সাম্প্রতিক সংঘাত প্রসঙ্গে লাল আমলাই বলেন, গত ১৯-২৩ ফেব্রুয়ারী পার্বত্য চট্টগ্রামের খাগড়াছড়ি ও রাঙ্গামাটির একাধিক স্থানে আদিবাসীদের উপর যে আক্রমনের ঘটনা ঘটেছে তা পূর্ব-পরিকল্পিত। আমলাইয়ের অভিযোগ সেনাবাহিনীর ইন্ধনে আদিবাসীদের উপর আক্রমন চালানো হয়েছে। হত্যাকান্ডের ঘটনা ছাড়াও আদিবাসীদের তিনটি বৌদ্ধ মন্দির, একটি চার্চ, কয়েক শতাধিক বাড়ী-ঘর পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। হামলাকারীদের ভয়ে হাজার-হাজার আদিবাসী ঘর ছেড়ে জঙ্গলে দিন কাটাতে বাধ্য হচ্ছেন।
লীরা শিরিন তার বক্তব্যে বলেন, সাম্প্রতিক সময়ের সহিংস দুঃখজনক। ১৯ এবং ২০ শে ফেব্রুয়ারীর সহিংসায় কমপক্ষে ৬ জন নিহত হয়েছেন বলে আদিবাসীরা দাবী করছেন, কিন্তু সরকারী ভাবে জানানো হয় ২ জন নিহত হয়েছেন। তিনি আরো জানান, এবারের ঘটনায় প্রায় ৪০০ বাড়ী পুড়িয়ে দেয়া হয়, যার সবকটি আদিবাসীদের। তিনি প্রশ্ন রাখেন "একটি স্বাধীন দেশে এ-রকম হবে কেন?" অতীত অভিজ্ঞতার কথা বর্ননা করে শিরিন বলেন,অতীতে ধর্ষন, লুট, দখলের মতো অনেক অমানবিক ঘটনা ঘটেছে। ২০০৮ সালে প্রায় ৮০ টি আদিবাসীদের ঘর পুড়িয়ে দেয়া হয়েছিলো। সেনা বাহিনীর উপস্থিতিতে এধরনের ঘটনা অনাকাংখিত। শিরিনের মতে সেনাবাহিনীর কারনের পার্বত্য চট্টগ্রামে স্বাভাবিক জীবন ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটছে।
রুমানা হাশিম গবেষণার কাজে পার্বত্য এলাকাতে অবস্থানকালে সেনাবাহিনীর বিরুপ আচরণের শিকার হবার ঘটনা সবিস্তারে বর্ণনা করেন। এছাড়াও তিনি এবারের সহিংসার ঘটনার তীব্র নিন্দা জানান ও হামলার সাথে সংশ্লিষ্টদের বিচার দাবী করেন।
প্রশ্নোত্তর পর্বের শুরুতে নিঝুম মজুমদার প্রশ্ন করেন, পার্বত্য অঞ্চলের বসবাসরত বাংগালী সেটেলারদের অবৈধ বলাটা সঙ্গত কিনা? সদ্য-স্বাধীন দেশে এম এন লারমা যেসব দাবী শেখ মুজিবর রহমানের সামনে হাজির করেছিলেন তা পূরণ করা সম্ভব ছিলো কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন আশফাক চৌধুরী। চোরাচালান রোধে পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাক্যাম্পের প্রয়োজনীয় তুলে ধরেন একজন অংশগ্রহনকারী। এর উত্তরে আলোচকরা জানান চোরাচালান প্রতিরোধ বিডিআরএর কাজ। এ-প্রসঙ্গে মহল-বিশেষের অসত্য-প্রচারণার বিষয়টিও আলোচিত হয়। আলোচকরা সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে সেনা প্রত্যাহার বলতে পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে সেনানিবাসগুলো গুটিয়ে নেয়া নয় বরং বেসামরিক জীবন-যাপন স্বাভাবিক করার লক্ষ্যে সেনাছাউনিগুলো বন্ধ করার কথা বলা হচ্ছে। এ প্রসঙ্গে সেমং প্রু বলেন, আমি আমার জন্মস্থানে মুক্তভাবে চলাচল করতে পারি না, সন্ধ্যার পর আমাদের চলাচলে বাধা দেয়া হয়। একটি স্বাধীন দেশে এধরনের বৈষম্যমূলক আচরণ সহ্য করা যায় না। আদিবাসী শব্দটিকে আক্ষরিক অর্থে না ধরে সামগ্রিক জীবন-পদ্ধতির আলোকে দেখার আহবান জানান আরিফ রহমান।
প্রাঙ্গন ও মহাবিশ্বের বৃহস্পতিবারের আয়োজিত সংহতি সমাবেশ ও আলোচনা সভায় অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন রাশেদুল হাসান, মং সিং মার্মা, আরিফুর রহমান, তাউহিদুল ইসলাম, আশফাক আলম , কাউসার আহমেদ, মোঃ আরিফ, অনন্ত কাশেম, নিজাম উদ্দিন শরীফ, মং রাখাইন, আনিরাজ সিদ্দিক, রাজীব হায়দার, আদনান সাকিব প্রমুখ।
সভায় সর্ব-সম্মতি-ক্রমে ৭ টি প্রস্তাবনা গৃহীত হয়ঃ
১. সাম্প্রতিক সহিংস ঘটনার জন্য দায়ীদের চিহ্নিত করে বিচারের আওতায় আনতে হবে।
২. ঘটনা তদন্তের কাজ সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ এবং প্রকাশ্যে হতে হবে।
৩. নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তদন্ত রিপোর্ট প্রকাশ করতে হবে।
৪. বন জঙ্গলের পালিয়ে থাকা লোকজনদের ত্রান, চিকিৎসা ও পুণর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে।
৫. গ্রেফতারকৃতদের আইনী সহায়তা দিতে হবে এবং তাদের পরিবারকে তাদের সম্পর্কে তথ্য দিতে হবে।
৬. নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে সমস্যার স্থায়ী নিষ্পত্তি এবং ১৯৯৭ সালের শান্তি চুক্তি বাস্তবায়ন করতে হবে।
৭. নতুন করে সেনা সংখ্যা বৃদ্ধি করা যাবেনা।
অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে প্রাঙ্গণের আরিফ রহমান এবং মহাবিশ্বের রাশেদুল হাসান সভায় যোগ দেয়ার জন্য উপস্থিত সকলকে ধন্যবাদ জানান।
০৮/০৩/১০
Thanks to Prangon and Mohabishyo! We all must stand up in solidarity with the indigenous people. We must not forget that we fought similar discriminations and oppressions imposed by the West Pakistani ruling class, as our current Bangladesh ruling class is imposing on these people.