• 'প্রথম বীরশ্রেষ্ঠ' শহীদ জগৎজ্যোতির স্মৃতিতে লণ্ডন শহীদ মিনারে পুষ্প-শ্রদ্ধা
    DSC05738.JPG

    ইউকেবেঙ্গলি - ১৬ নভেম্বর ২০১৩, শনিবারঃ  ভাটি-বাংলার দুর্ধর্ষ গেরিলা বাহিনী 'দাস পার্টি'র কমাণ্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা জগৎজ্যোতি দাসের ৪২তম মৃত্যুবার্ষিকীতে আজ লণ্ডন শহীদ মিনারে পুষ্প-শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করা হয়েছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধকালে অস্থায়ী সরকারের বরাতে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে জগৎজ্যোতিকে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় খেতাব প্রদানের ঘোষণা দেয়া হলেও পরবর্তীতে তাঁকে বীরশ্রেষ্ঠ'র বদলে বীরবিক্রম খেতাব দেয়া হয়।

    যুক্তরাজ্যের চারণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্র'র উদ্যোগে আয়োজিত এ-অনুষ্ঠানে যোগদানকারীরা ফুলের স্তবক হাতে নিয়ে পূর্ব-লণ্ডনস্থ শহীদ মিনারে প্রবেশ করেন। পরে সেখানে শহীদ জগৎজ্যোতির স্মৃতি স্মরণে ১ মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।

    মুক্তিযুদ্ধে দাস পার্টি সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা ও হবিগঞ্জ অঞ্চলে পাকিস্তানী দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে ব্যাপক প্রতিরোধ গড়ে তোলে। এ-গেরিলা দলটির অকস্মাৎ ও দুঃসাহসী আক্রমণে খান-সেনা ও তাদের বাঙালি সহযোগী রাজাকাররা একসময় স্থলপথের বদলে জলপথে বেশি চলাচল করতে শুরু করে। 

    কিন্তু জলপথে দাস পার্টি আরও পরোয়াহীনভাবে আক্রমণ করে চলে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর উপরে। পাক বাহিনীর বার্জ আক্রমণ, কার্গো-জাহাজ ডুবিয়ে দেয়া ইত্যাদি সফল অপারেশনে নেতৃত্ব দেন শহীদ জগৎজ্যোতি। এছাড়া জামালগঞ্জ থানা ভবন দখল, শ্রীপুর মুক্তি অপারেশন ইত্যাদি যুদ্ধে অসামান্য সাফল্য দেখায় তাঁর দাস পার্টি।

    ১৬ নভেম্বর ১৯৭১ ভোর ৮টার দিকে দাস পার্টির সাথে পাকসেনা ও রাজাকারদের যৌথ বাহিনীর সাথে সম্মুখ-যুদ্ধ শুরু হয় বদলপুরে। সারাদিন ধরে চলা সে-যুদ্ধে পাক বাহিনী বাড়তি সৈন্য এনে শক্তি-বৃদ্ধি ঘটায় এবং আধুনিক অস্ত্রের জোরে এক সময় কোণঠাসা করে ফেলে দাস পার্টিকে।

    শত্রুসেনাদের ক্যাম্প থেকে মাত্র কয়েকশো গজ দূরে অবস্থান নেয়া সহযোদ্ধাদেরকে বিকেলের দিকে পিছু হটতে নির্দেশ দেন কমাণ্ডার জগৎজ্যোতি। তাদের পশ্চাদপসরণ নিরাপদ করতে শুধুমাত্র ইলিয়াস চৌধুরীকে নিয়ে থেকে যান শত্রু-সম্মুখে। এক পর্যায়ে শুত্রুর গুলিতে আহত হন ইলিয়াস। তাঁর জখম খুব গুরুতর ছিলো না, তাই কমাণ্ডারের পরিচর্যা-শেষে পুনরায় অস্ত্র হাতে নেন তিনি।

    কিন্তু শেষ বিকেলের দিকে একটি বুলেট বিদ্ধ হয় জগতজ্যোতির চোখে। 'আমি যাচ্ছি' বলে চিরতরে বিদায় নেন ২২ বছরের এ-অকুতোভয় মুক্তিযোদ্ধা। আহত ইলিয়াস প্রাণ নিয়ে ঘাঁটিতে ফিরতে পারলেও কমাণ্ডারের লাশ বহন করে আনতে পারেননি, যা রাজাকাররা পরে সংগ্রহ করে আজমিরীগঞ্জ বাজারে নিয়ে যায়। সেখানে জগৎজ্যোতির মৃতদেহকে অর্ধনগ্ন করে একটি খুঁটির সাথে বেঁধে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ আঘাতের মাধ্যমে অপমান করা হয়। পরে রাজাকাররা নদীতে ভাসিয়ে দেয় সে-দেহ।

    স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র এবং অল ইণ্ডিয়া রেডিও বিস্তারিতভাবে প্রচার করে জগৎজ্যোতি দাসের বীরোচিত প্রাণদানের কথা। অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকার 'প্রতিশ্রুতি দেয়' তাঁকে মরণোত্তর সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পদকে ভূষিত করার। এটি ছিলো কোনো মুক্তিযোদ্ধাকে সর্বোচ্চ খেতাব দেয়ার প্রথম প্রতিশ্রুতি, যা ফলাও করে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে প্রচারিত হয় বলে দাবি করেছেন জগৎজ্যোতির সহযোদ্ধারা।

    মুক্তিযুদ্ধের পূর্বে সুনামগঞ্জ কলেজের ছাত্র ইউনিয়নের নেতা জগৎজ্যোতি রাজনৈতিক প্রয়োজনে কিছুদিন ভারতে বসবাস করেছিলেন। সেখানে তিনি হিন্দি ও আঞ্চলিক অসমীয়া-সহ কয়েকটি ভাষা আয়ত্ব করেন। এছাড়াও তিনি অনর্গল ইংরেজি বলতে পারতেন বলে তাঁর সহযোদ্ধা ইলিয়াস চৌধুরী  ইউকেবেঙ্গলিকে জানিয়েছেন। ভাষা-দক্ষতা ব্যবহার করে জগৎজ্যোতি ভারতীয় মিত্রবাহিনীর কাছ থেকে তুলনামূলকভাবে আধুনিকতর অস্ত্র ও অধিকতর গোলাবারুদ অর্জনে সক্ষম হয়েছিলেন।

    লণ্ডনে চারণের দুই দিনব্যাপী কর্মসূচির ধারাবাহিকতায় আগামীকাল একটি আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে। এতে জগৎজ্যোতির জীবন ও গৌরবময় যুদ্ধের স্মৃতি এবং তা সংরক্ষায় কার্যকর উদ্যোগের ব্যাপারে আলোচনা করা হবে।

আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন