• প্রীতিলতার জন্মশতবর্ষ উদযাপন শুরু ঢাকায়


    বীরকন্যা প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের জন্মশতবর্ষের সূচনায় সমাজতান্ত্রিক মহিলা ফোরাম ঢাকা নগর শাখা ও সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট ইডেন কলেজ শাখার আয়োজনে দুটি আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে ঢাকায়। ব্রিটিশ উপনিবেশিক শাসন-বিরোধী লড়াইয়ে প্রানদানকারী প্রীতিলতার জন্মশতবর্ষ পূর্তি উদযাপনের লক্ষ্যে বছর-ব্যাপী কর্মসুচির অংশ হিসাবে আলোচনা-সভাগুলোর আয়োজন করা হয়।

    ৫ মে, মঙ্গলবার বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে টিএসসি’র মুনীর চৌধুরী মিলনায়তনে সমাজতান্ত্রিক মহিলা ফোরাম ঢাকা নগর শাখা আয়োজিত আলোচনা সভায় বক্তব্য দানকালে প্রীতিলতার সংগ্রামী চেতনায় সমৃদ্ধ হয়ে নারীর মর্যাদা এবং দেশের সম্পদ রক্ষায় এগিয়ে আসার জন্য সকলের প্রতি আহবান জানান আলোচকরা। বক্তারা উল্লেখ করেন যে ব্রিটিশ ও পাকিস্তানী ঔপনিবেশিক শাসক-গোষ্ঠীর শোষণ-জুলুম থেকে আমরা মুক্তি পেলেও এখন পর্যন্ত দেশের মানুষ স্বাধীনতার স্বাদ পায় নি। স্বাধীন দেশে নারীর মর্যাদা যেমন প্রতিষ্ঠিত হয় নি তেমনি অবসান হয়নি শোষণ ও বৈষম্যের। মানুষের জীবন থেকে দুঃখ, দারিদ্র্য, গঞ্জনার অবসান হয়নি। দেশের সম্পদের ওপর জনগণের মালিকানা ও অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়নি। এক কথায় প্রীতিলতাসহ শত-সহস্র স্বাধীনতা সংগ্রামীর স্বপ্ন ও আকাঙ্খা পূরণ হয়নি। তারা উল্লেখ করেন যে জন্মের শত-বর্ষ এবং আত্মাহুতির ৭৮ বছর পরও প্রীতিলতার এই সংগ্রামী চেতনার প্রয়োজন বাংলাদেশে গভীরভাবে অনুভূত হচ্ছে।

    সমাজতান্ত্রিক মহিলা ফোরাম ঢাকা নগর শাখা আয়োজিত আলোচনা সভাতে বক্তব্য রাখেন বাসদ কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য শুভ্রাংশু চক্রবর্ত্তী, সাংবাদিক সৈয়দ আবুল মকসুদ, শিক্ষাবিদ কাজী মদিনা, মহিলা ফোরামের সংগঠক তাহেরা বেগম জলি, মর্জিনা খাতুন, তাসলিমা নাজনীন সুরভী, শম্পা বসু প্রমুখ। সভায় সভাপতিত্ব করবেন মহিলা ফোরাম ঢাকা নগর শাখার আহবায়ক সুলতানা আক্তার রুবি।

    শুভ্রাংশু চক্রবর্ত্তী তার ভাষণে বলেন, আজ দেশের কিশোরীরা অপমানের জ্বালায় আত্মহত্যা করছে, নারীরা আত্মহত্যা করছে। প্রীতিলতাও আত্মহত্যা করেছিলেন। কিন্তু এই দুইয়ের প্রভেদ কত গভীর। একটা হচ্ছে আত্মসমর্পণ, আরেকটা হচ্ছে প্রতিরোধের সংগ্রাম। আজকের নারীদের, কিশোরী-তরুণীদের মধ্যে প্রীতিলতা জীবন থেকে এ-শিক্ষাটা নিতে হবে; বুঝতে হবে অসহায় আত্মসমর্পণ কোনো সমাধান নয়, চাই প্রতিরোধ, চাই সংগ্রাম।

    সৈয়দ আবুল মকসুদ বলেন, যে শিক্ষা মানুষের মনে প্রতিবাদের স্ফূরণ ঘটায়, সমাজকে বদলাতে সংগ্রামে অনুপ্রানিত করে আমাদের দেশের স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে সে শিক্ষার স্থান নেই। সকল অন্যায়-অবিচার মেনে নেয়াটাই শেখানো হয়, আত্মসমর্পণটাই শেখানো হয়। ফলে জনগণের মাঝে বিপ্লবী চেতনাকে ছড়িয়ে দিতে হলে আমাদের বিকল্প পন্থা অবলম্বন করতে হবে। প্রীতিলতা, সূর্যসেন প্রমুখ বিপ্লবীদের জীবনীকে মানুষের মধ্যে নিয়ে যেতে হবে।

    বক্তারা ইভটিজিং, বখাটেদের উৎপাতসহ নারী নির্যাতন প্রতিরোধ এবং বিদ্যুৎ-গ্যাস-দ্রব্যমূল্যসহ জন-জীবনের বিভিন্ন সংকট মোকাবেলায় গণ-আন্দোলন গড়ে তোলার জন্য দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানান। উল্লেখ্য, সমাজতান্ত্রিক মহিলা ফোরামের পক্ষ থেকে এ বছর ৫ মে থেকে আগামী বছর ৫ মে পর্যন্ত বছর-ব্যাপী নানা আয়োজনে বীরকন্যা প্রীতিলতার জন্মশত বার্ষিকী উদ্যাপিত হবে।

    এদিকে, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের প্রতিকৃতিতে পুষ্পার্ঘ অর্পণের মাধ্যমে বর্ষ-ব্যাপী কর্মসূচির উদ্বোধন করে সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট ইডেন কলেজ শাখা। এরপর বর্ষ-ব্যাপী কর্মসূচির অংশ হিসেবে তিন দফা দাবিতে মিছিল সমাবেশ শেষে অধ্যক্ষ বরাবর স্মারক-লিপি পেশ করা হয়। সমাবেশে বক্তব্য রাখেন ইডেন কলেজ শাখার সহ-সভাপতি আফসানা সুমী, সাধারণ সম্পাদক রুখশানা আফরোজ আশা, সাংগঠনিক সম্পাদক সংগীতা বাড়ৈ, দপ্তর সম্পাদক তানিয়া আলমসহ প্রমুখ।

    সমাবেশে বক্তারা উল্লেখ করেন যে ইডেন কলেজের ছাত্রী হিসেবে সারা বাংলায় মেয়েদের মধ্যে প্রথম স্থান অধিকার করে আইএ পাশ করেন প্রীতিলতা। মাস্টার দা সূর্যসেনের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে ভারতীয় রিপাবলিকান আর্মিতে যোগ দেন। ১৯৩২ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রামের পাহাড়তলীর ইউরোপীয়ান ক্লাবে এক দুঃসাহসিক অভিযানে আত্মাহূতি দিয়েছিলেন। প্রীতিলতা ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে প্রথম নারী শহীদ।

    নেতৃবৃন্দ বলেন, তাঁর স্বপ্ন ছিল বিদেশী শাসনের হাত থেকে দেশের মুক্তির সাথে-সাথে সকল প্রকার শোষণ বৈষম্যের অবসান হবে। দেশ স্বাধীন হয়েছে কিন্তু তার স্বপ্ন এখনও পূরণ হয় নাই। ব্রিটিশ শাসকরা স্বাধীনতা সংগ্রামের গৌরবজ্জ্বল অধ্যায়কে যেমন কালিমা লিপ্ত করেছে, সংগ্রামী চরিত্রগুলোকে তেমন আড়াল করে রেখেছে। পরবর্তী শাসক গোষ্ঠীও সে ধারা অব্যাহত রেখেছে। তাই যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রীতিলতা পড়াশোনা করেছেন সেখানে তাঁর কোন স্মৃতি-চিহ্ন নেই।

    ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের গৌরবজ্জ্বল ইতিহাস, বীরকন্যা প্রীতিলতার সংগ্রামী আত্মত্যাগ এবং ইডেন কলেজে তার স্মৃতিময় শিক্ষাজীবনকে স্মরণ করে বছরব্যাপী এ-কর্মসূচির সূচনাতে সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট নিম্নোক্ত তিন দফা দাবী উপস্থাপন করছে - এগুলো হচ্ছে ইডেন কলেজকে ‘প্রীতিলতা বিশ্ববিদ্যালয়ে’ রূপান্তর; কলেজে প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার এর আবক্ষ-মূর্তি স্থাপন। এছাড়াও কলেজের সামনের সড়কের নাম ‘প্রীতিলতা স্মরণী’ করার দাবী জানিয়েছে ছাত্রফ্রন্ট।

    বার্তাপ্রেরক তাসলিমা নাজনীন সুরভী, মর্জিনা খাতুন ও তানিয়া আলম
    ০৬/০৫/১০

আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd>
  • Lines and paragraphs break automatically.

লেখা ফরম্যাট করার বিষয়ে আরো তথ্য

আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন