• ফুলবাড়ীর কয়লা-উত্তোলক জিসিএমের বিরুদ্ধে লন্ডনে বিক্ষোভঃ শেয়ার-মূল্যে পতন
    BD-Oil-Gas-Demo.jpg

    ইউকেবেঙ্গলি - ১৫ ডিসেম্বর ২০১১, বৃহস্পতিবারঃ  গ্লৌবাল কৌল ম্যানেইজমেন্ট (জিসিএম) নামে রূপান্তরিত ব্রিটিশ কোম্পানী এশিয়া এনার্জি আজ কেন্দ্রীয় লন্ডনের টাওয়ার হিলের স্কেপচার কৌর্টে তাদের বার্ষিক সাধারণ সভা পরিচালন-কালে ব্যাপক বিক্ষোভের সম্মুখীন হয়। ‘বাংলাদেশ তেল-গ্যাস, খনিজ-সম্পদ, বিদ্যুত ও বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি, যুক্তরাজ্য শাখা’ নামে দুটি পৃথক সংগঠনের উদ্যোগে আয়োজিত এ-বিক্ষোভের মুখে আজ কোম্পানীটির শেয়ার মূল্য উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পায়।

    বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারীরা ব্যানার, পৌস্টার, ফেস্টুন প্রদর্শন করে এবং মেগাফৌনে স্লৌগান ও বক্তৃতা দিয়ে স্কেপচার কৌর্টের ভিতরে সমাবেশিত শেয়ার হৌল্ডার ও বাইরের অনুসন্ধানী মানুষের উদ্দেশ্যে এশিয়া এনার্জি তথা গ্লৌবাল কৌল ম্যানেইজমেন্টের ‘লুন্ঠনমূলক’ ও ‘ধ্বংসাত্মক’ নীতি-মালার চিত্র তুলে ধরেন।

    মাহমুদুর রহমান বেণু ও ইসহাক কাজলের নেতৃত্বাধীন পৃথক-পৃথক শাখা-সংগঠন জিসিএমের বার্ষিক সাধারণ-সভার স্থান ও সময়-তারিখ সম্বন্ধে পূর্ব থেকেই জেনে আজকের বিক্ষোভের কর্মসূচি ঘোষণা করে। সংগঠন দুটোর মধ্যে পরস্পরকে স্বীকৃতি-দানে অনড় অসম্মতি থাকলেও জিসিএম-এর বার্ষিক সাধারণ সভার বাইরে বিক্ষোভ-কালে তারা দৃশ্যতঃ ঐক্য প্রদর্শন করে। উল্লেখ্য, এ-রকম ঐক্যের প্রথম প্রকাশ ঘটে গত বছরের ডিসেম্বরে যখন উভয় কমিটির নেতৃস্থানীয়দের বাইরে তরুণ প্রজন্মের নন-পার্টিজান কয়েকজন এ্যাক্টিভিস্ট প্রধানতঃ ইন্টারনেট যোগাযোগের মাধ্যমে প্রথম বারের মতো একটি বিক্ষোভের আয়োজন করেন, যা সে-সময় ব্রিটেইনে বাংলাদেশে উল্লেখযোগ্য মিডিয়া-আকর্ষণ তৈরী করতে সক্ষম হয়। আজকের বিক্ষোভ গত বছরেরই অনিবার্য অনুসরণ।

    আজকের বিক্ষোভ-স্থলে এশিয়া এনার্জি তথা জিসিএম-বিরোধী ফুলবাড়ী আন্দোলনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরে বক্তৃতা করেন জাতীয় কমিটির একটি শাখার আহবায়ক মাহমুদুর রহমান বেণু, অপর শাখার সদস্য-সচিব গোলাম মোস্তাফা, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ এনামুল ইসলাম, বাসদ সমর্থক ফোরমের মোস্তাফা ফারুক, চারণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের আরিফ রহমান, যুব ইউনিয়নের শাহরিয়ার বিন আলি, কমিউনিস্ট পার্টি অফ ব্রিটেইনের স্টিফেন জনসন, সৌশ্যালিস্ট পার্টির ম্যানি থাইন, সাউথ এসিয়্যান সলিডারিটির সার্বজিৎ জোহাল ও কল্পনা জনসন এবং তামিল সলিডারিটির টি ইউ সেনান। বক্তৃতা-পর্বটি পরিচালনা করেন মাসুদ রানা।

    বিক্ষোভের পক্ষ থেকে এশিয়া এনার্জি তথা গ্লৌবাল কৌল ম্যানেইজমেন্ট পাবলিক লিমিটেড কোম্পানীকে বাংলাদেশ থেকে বহিষ্কারের প্রস্তাবনা দিয়ে একটি ‘ইভিকশন নৌটিস’ পাঠ করে শোনান চারণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের আশফাক চৌধুরী রনি। সমাপনী ভাষণে মাহমুদুর রহমান বেণু বলেন, জিসিএম ফুলবাড়ীতে যেভাবে কয়লা উত্তোলন করতে চায়, তা গ্লৌবাল ওয়ার্মিংকে ত্বরান্বিত করবে। তিনি বলেন, গ্লৌবাল ওয়ার্মিং যে-পর্যায়ে আছে এবং তাতে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা যে-ভাবে বাড়ছে, তাতে আগামী ৩০/৪০ বছরের মধ্য পানির নীচে চলে যাবার হুমকি তৈরী হয়েছে বাংলাদেশের। কোনো পরিস্থিতিতেই ফুলবাড়ির কয়লা উত্তোলন করা যাবে না বলে রায় দেন তিনি।

    ডিসেম্বরের প্রচণ্ড শীতের মধ্যে বৃহস্পতিবারের বিরল রোদেলা সকালে বিক্ষোভকারীরা যখন বাইরে বিক্ষোভ করছিলেন, স্কেপচার কৌর্টের ভিতর বার্ষিক-সভাস্থলে তখন জিসিএম-এর পরিচালনা পর্ষদকে প্রশ্ন-বাণে বিদ্ধ করেন বিক্ষোভকারীদের প্রতি সহানুভূতিশীল কয়েকজন শেয়ার-হৌল্ডার। জানা যায়, বাইরে বিক্ষোভ প্রদর্শনের পাশাপাশি জিসিএম-এর বার্ষিক-সভায় প্রতিবন্ধকতা তৈরীর উদ্দেশ্যে নাম-মাত্র শেয়ার কিনে আন্দোলনকারীদের মধ্য থেকে কয়েক জন শেয়ার-হৌল্ডারকে ভিতরে পাঠানো হয়।

    এরকমই একজন শেয়ার হৌল্ডারের প্রক্সি হিসেবে অংশগ্রহণকারী সামিনা লুৎফা ইউকেবেঙ্গলিকে জানান, কৌম্পানীর শেয়ারের মূল্য গত এক বছরে ব্যাপক হারে হ্রাস পেয়েছে বলে আজকের সভায় জিসিএম-এর চীফ এক্সিকিউটিভ অফিসার স্টিফেন বাইওয়াটার উদ্বেগ প্রকাশ করেন। উল্লেখ্য, গত বছর একই স্থানে জিসিএম-এর এজিএম চলা-কালে জাতীয় কমিটির যুক্তরাজ্য শাখা যখন বিক্ষোভ করার পর-পর কোম্পানীর শেয়ার ১৬৬ পেন্স থেকে ১৩০ পেন্স নেমে এসেছিলো। তখন থেকে গত এক বছরে হ্রাস পেতে-পেতে কোম্পানীটির শেয়ার-মূল্য আজকের বাজারে ৫৫.৬০ পেন্সে দাঁড়িয়েছে।

    অক্সফৌর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি-গবেষক সামিনা লুৎফা আরও জানান, কোম্পানীর অধিকর্তা হিসেবে স্টিফেন বাইওয়াটার বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সাথে দেখা করে ফুলবাড়ী প্রকল্পের নিশ্চয়তা অর্জন করতে পেরেছেন কি-না জানতে চাওয়া হলে, উত্তরে বলা হয়, প্রধানমন্ত্রীর সাথে এ-বিষয়ে কোম্পানীর কোনো সাক্ষাত বা আলোচনা হয়নি। তবে বাইওয়াটার নিশ্চিত করেন যে, স্থানীয় সাংসদ ও ভূমি-প্রতিমন্ত্রী মুস্তাফিজুর রহমান তাঁকে ফুলবাড়ীতে উন্মুক্ত-পদ্ধতিতে কয়লা-উত্তোলন বিষয়ে ইতিবাচক আশ্বাস দিয়েছেন।

    জিসিএম-এর বার্ষিক সভায় যোগদানকারী যুক্তরাষ্ট্র-ভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল এ্যাকাউন্টেবিলিটি প্রজেক্টের ডঃ কেইট হোশাওয়ার বলেন, বাইরের বিক্ষোভের আওয়াজ ভিতরের সভায় যথেষ্ট অপ্রস্তুতি ও উদ্বেগের সৃষ্টি করে। তিনি বিক্ষোভ কর্মসূচিকে ‘কার্যকর’ ও ‘সফল’ বলে মন্তব্য করেন।

    বাংলাদশের উত্তরাঞ্চলীয় দিনাজপুর জেলার ফুলবাড়ীতে অস্ট্রেলীয় কোম্পানী বিএইচপি বিলিটন ১৯৯৪ সালে উন্নত মানের কয়লার সন্ধান পায় কিন্তু স্বল্প খরচে উন্মুক্ত-পদ্ধতিতে উত্তোলন করতে গেলে স্থানীয় প্রতিরোধের সম্ভাবনা উপলব্ধি করে তারা বে-আইনীভাবে উত্তোলনের লাইসেন্স নতুন-গঠিত ব্রিটিশ কোম্পানী এশিয়া এনার্জির কাছে হস্তান্তর করে বলে অভিযোগ রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের অভিমত হচ্ছে, উন্মুক্ত-পদ্ধতিতে ফুলবাড়ীতে কয়লা উত্তোলন করলে প্রায় দু-লক্ষ অধিবাসী গৃহহারা হবেন, ১৩ হাজার হেক্টরের তিন-ফসলী জমি ধ্বংস হবে, স্থানীয় নদী-নালা ও পুকুর-জলাশয়ে বিষাক্ততা ছড়িয়ে পড়বে এবং প্রাণ ও পরিবেশের ব্যাপক ক্ষতি হবে।

    ২০০৬ সালে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের প্রস্তুতি নিতে শুরু করলে এশিয়া এনার্জির বিরুদ্ধে স্থানীয় অধিবাসীরা ব্যাপক প্রতিরোধ গড়ে তোলে। প্রতিরোধ-আন্দোলনের এক পর্যায়ে সে-বছর ২৬ অগাস্ট সরকারী নির্দেশে আধাসামরিক বাহিনী বিক্ষোভ সমাবেশে গুলি চালায়। এর ফলে তিন ব্যক্তি নিহত ও দু-শতাধিক লোক আহত হন। এ-ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় দেশ-ব্যাপী আন্দোলন ছড়িয়ে পড়লে তৎকালীন জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি ও ইসলামবাদী দল জামাতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন চার-দলীয় জোট-সরকার ফুলবাড়ী আন্দোলনের নেতাদের সাথে এক চুক্তি সাক্ষর করেন। এতে সরকার এ-মর্মে প্রতিশ্রুতি দেয় যে, এশিয়া এনার্জিকে বাংলাদেশ থেকে বহিষ্কার করা হবে এবং দেশের কোথাও উন্মুক্ত পদ্ধতিতে খনিজ উত্তোলনের অনুমোদন দেয়া হবে না।

    আন্দোলনের মুখে এশিয়া এনার্জি ফুলবাড়ী থেকে নিজেদেরকে প্রত্যাহার করে নিলেও পরবর্তীতে তারা নাম পরিবর্তন করে গ্লৌবাল কৌল ম্যানেইজমেন্ট নাম ধারণ করে কয়লা উত্তোলন প্রয়াস অব্যাহত রাখে। আজকের বার্ষিক সধারণ সভা জিসিএম-এর এ-প্রচেষ্টারই অংশ, যার বিরুদ্ধে প্রথাগত সভা-সমিতির বিপরীতে পাশ্চাত্যে-শিক্ষিত বাঙালী বংশোদ্ভূত তরুণ প্রজন্মের তথ্যপ্রযুক্তি-ভিত্তিক প্রচেষ্টা অধিক কার্যকরিতা প্রকাশ করেছে।

পাঠকের প্রতিক্রিয়া

Raise voice through all type of media, we stand under the umbrella of unity to save our beloved country.

আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd>
  • Lines and paragraphs break automatically.

লেখা ফরম্যাট করার বিষয়ে আরো তথ্য

আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন