• বাংলাদেশে ঘুষ-কেলেঙ্কারিঃ পদত্যাগে বাধ্য হলেন রেইল-মন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত
    Suranjit-Sengupta-resigns.jpg

    ইউকেবেঙ্গলি - ১৬ এপ্রিল ২০১২, সোমবারঃ  সন্দেহিত এক ঘুষ-কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে পড়া বাংলাদেশী রেইল-মন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত অগণিত মানুষের দাবী উপেক্ষা করে মন্ত্রীত্বে অনড় থাকার পর, আজ সকালে আদিষ্ট হয়ে দুই ঘন্টা অপেক্ষার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে মাত্র ২৫ মিনিটের এক সাক্ষাতকার শেষে পদত্যাগের ঘোষণা দেন।

    আজ দুপুরে রেইল মন্ত্রণালয়ে ডাকা এক সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠের মধ্য দিয়ে পদত্যাগ করেন রেইল-মন্ত্রী সেনগুপ্ত, কিন্তু তিনি বলেন সন্দেহিত ঘুষের কোনো ঘটনার সাথে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ - কোনো ভাবেই জড়িত নন। নিজে নির্দোষ হওয়া সত্ত্বেও কেবল মাত্র ‘গণতন্ত্রের স্বার্থে’ তিনি পদত্যাগ করেছে বলে দাবী করেন।

    মন্ত্রীত্ব ছাড়ার সাথে-সাথে তিনি রাজনীতিও ছাড়ছেন কি-না তা সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ না করে, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বলেন, সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে নিজেক নির্দোষ প্রমাণিত করার পর তিনি ‘আবার রাজনীতিতে ফিরে’ আসবেন।

    পদত্যাগী রেইল-মন্ত্রী গত বছরের নভেম্বর মাসে বিভক্তির মাধ্যমে নবগঠিত রেইল মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ দায়িত্ব পাবার পর অনেক ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছেন বলে নিজের ও নিজ-দলের প্রশংসা করেন।

    বাংলাদেশী দৈনিক প্রথম আলো জানায়, ‘১০০ বছরের ইতিহাসে এই সরকারই প্রথম হাজার হাজার অর্থ দিয়ে এই রেলকে প্রসারিত করার চেষ্টা করেছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।’ তবে তিনি প্রথাগত বিনয়-ভাষণ দিয়ে বলেন, ‘সকল ব্যর্থতার জন্য একমাত্র আমিই দায়ী।’
     
    উল্লেখ্য, ঠিক এক সপ্তাহ আগে গত সোমবার গভীর রাতে মন্ত্রীর ব্যক্তিগত সচিব, রেইল বিভাগের পূর্বাঞ্চলীয় মহাব্যবস্থাপক ও রেইলের নিরাপত্তা বাহিনীর ঢাকা অঞ্চলীয় নির্দেশক একটি গাড়ীতে চড়ে ৭ মিলিয়ন টাকা নিয়ে মন্ত্রীর কাছে যাচ্ছিলেন। কিন্তু যাবার পথে হঠাৎ গাড়ীর চালক বাংলাদেশের সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর সদর দপ্তরের দিকে গাড়ী চালিয়ে যাত্রী ও গাড়ী-সহ নিজেকে সমর্পণ করে। সীমান্ত রক্ষী বাহিনী অর্থ ও গাড়ী সমেত চালক ও আরোহীদের তাদের তত্ত্ববধানে বাকী রাতটুকু রেখে সকালে গাড়ী-চালক ব্যতীত অন্য সবাইকে পরিচয় রেখে ছেড়ে দেয়।

    বিষয়টি সংবাদ-মাধ্যমে জানা-জানি হয়ে গেলে প্রায় সকল মহলের সন্দেহ নির্দেশিত হয় রেইল-মন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের দিকে। সন্দেহ করা হয়, নতুন মন্ত্রণালয়ে ঘুষের বিনিময়ে চাকুরী দেবার প্রক্রিয়া যে অর্থ ‘উপার্জিত’ হয়েছে, তার ভাগ দেবার জন্যই এই টাকা মন্ত্রীর বাড়ীতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিলো।

    প্রাথমিকভাবে মন্ত্রী সেনগুপ্ত বলেন, তিনি রাত ১০টায় নিদ্রা যান, তাই গভীর রাতে তাঁর বাড়ীতে কারো দেখা করতে যাবার কোনো প্রশ্নই উঠতে পারে না। গাড়ী-বাহিত টাকা সম্পর্কে মন্ত্রী বলেন, টাকাগুলো বাহকের ব্যক্তিগত। পেশায় আইনজীবী সেনগুপ্ত বলেন, ব্যক্তিগত টাকা বহন করা কোনো অপরাধ নয়।

    কিন্ত পরবর্তীতে বিষয়টি নিয়ে সংবাদ-মাধ্যমে তীর্যক সংবাদ ও বিপুল সংখ্যক মানুষের সমালোচনা ও আক্রমণাত্মক মন্তব্য ব্যাপকতা নিয়ে প্রকাশিত হতে শুরু করলে, মন্ত্রী বলেন এর পেছনে সংঘবদ্ধ ষড়যন্ত্র আছে। তিনি ঘটনাটিকে গণতন্ত্রের জন্য বিপদ বলে অভিহিত করেন।

    গতকাল পর্যন্ত তিনি অন্যান্যদের সম্ভাব্য দুর্নীতির বিরুদ্ধে গৃহীত ও আসন্ন পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করলেও নিজে পদত্যাগ করবেন না বলে ঘোষণা করেন। কিন্তু আজ সকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁকে ডেকে পাঠিয়ে সাক্ষাতকারের জন্য দীর্ঘ ২ ঘন্টা অপেক্ষায় রাখেন, যা রেইল-মন্ত্রীর প্রতি প্রধানমন্ত্রী বিরাগের ইঙ্গিত।

    প্রধানমন্ত্রীর সাথে রেইল-মন্ত্রীর বৈঠক হয় খুব অল্প কালের - মাত্র ২৫ মিনিটের। এই ২৫ মিনিটে কী আলোচনা হয়েছে, তার কোনো খবর পায়নি কেউ। তবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রেইল মন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্তকে কী বলে থাকতে পারেন, তা বুঝা যায় সোজা মন্ত্রণালয়ে এসে পদত্যাগের ঘোষণার ঘটনা থেকে।

    ইউকেবেঙ্গলি ধারণা, সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের উপর পূর্ব থেকে অসন্তুষ্ঠ প্রধানমন্ত্রী তাঁকে বাড়তি ঝামেলা না করে সোজা পদত্যাগের নির্দেশ নিয়েছেন।

    উল্লেখ্য, ২০০৮ সালে সামরিক বাহিনী বাংলাদেশের রাজনৈতিক ক্ষমতা কার্যতঃ নিজেদের হাতে নিয়ে দুই প্রধান দলের বংশানুক্রমিক শীর্ষ নেত্রী খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনাকে কারারুদ্ধ করে তথাকথিত ‘মাইনাস টু ফর্মুলা’ বাস্তবায়িত করার উদ্যোগ নিলে আওয়ামী লীগের প্রথসারির নেতারা তা গোপেন সমর্থন করে সংস্কারপন্থী বলে চিহ্নিত হোন।

    আওয়ামী লীগের সংস্কারপন্থীদের প্রধান চারজনের একজন ছিলেন সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত এবং তাদের নামের ইংরেজি আদ্যাক্ষর নিয়ে র‍্যাটস অর্থাৎ ইঁদুর আখ্যা দিয়ে এঁদেরকে গুরুত্বপূর্ণ পদ থেকে দূরে রাখা হয়।

    সর্বশেষ নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলেও শেখ হাসিনা তাঁর মন্ত্রী সভায় তাঁদের স্থান দেননি। কিন্তু কয়েক মাস আগে সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত যে নতুন গঠিত রেইল মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব লাভ করেছেন, তা শেখ হাসিনা খুব খুশি হয়ে দেননি বলে ধারণা করা হয়।

    বিশ্লেষকগণ মনে করেন, ঘুষ কেলেঙ্কারিতে সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের নাম জড়ানোতে শেখ হাসিনার জন্য তাঁকে ‘ঝেড়ে ফেলার’ একটি সুযোগ তৈরী হয়েছে। ষড়যন্ত্র তাত্ত্বিকদের কারও কারও মতে, সুরঞ্জিতের রেল-মন্ত্রণালয় থেকে ‘সরিয়ে দেবার’ কারণ বাহ্যিক নয়, বরং অভ্যন্তরীণ ষড়যন্ত্র।

আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন