• মায়ানমারে রোহিঙ্গা-রাখাইন দাঙ্গাঃ শরণার্থীদের ফিরিয়ে দিচ্ছে বাংলাদেশ
    mayanmar_riot_12.jpg

    ইউকেবেঙ্গলি - ১২ জুন ২০১২, মঙ্গলবারঃ  মায়ানমারের রাখাইন প্রদেশে সংখ্যালঘু মুসলিম রোহিঙ্গা ও সংখ্যাগুরু বৌদ্ধ রাখাইন জনগোষ্ঠীর মধ্যকার দাঙ্গায় অন্ততঃ ৫০ ব্যাক্তি প্রাণ হারিয়েছেন বলে খবর পাওয়া গেছে। চারদিন ধরে চলা এ-দাঙ্গায় আহত কিংবা বাস্তুচ্যুত হয়েছে কয়েক হাজার মানুষ। নিরাপত্তার খোঁজে বাংলাদেশে আশ্রয় চাওয়া শরণার্থীদেরকে ঢুকতে দিচ্ছে না বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষ। প্রদেশটিতে জরুরী অবস্থা জারি করা হয়েছে।

    গতমাসে এক বৌদ্ধ রাখাইন নারী ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হন, যার জন্য ৩জন মুসলিম রোহিঙ্গা দায়ী বলে সন্দেহ করে স্থানীয় রাখাইনরা। এ-ঘটনার পর থেকে উত্তেজনা বাড়তে থাকে এবং গত শুক্রবার ১০জন মুসলিম পুরুষকে নির্যাতন ও হত্যার মধ্য দিয়ে তা পূর্ণ দাঙ্গায় রূপ নেয়। উভয় পক্ষই প্রতিপক্ষের বাসস্থান ও ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান অগ্নিসংযোগ করে এবং লুঠতরাজ চালায় বলে সংবাদ পাওয়া গেছে।

    ব্যাপক মাত্রায় অগ্নিসংযোগ ও ধারালো অস্ত্রের আক্রমণের মতো সহিংসতায় আতঙ্কিত অন্ততঃ কয়েক হাজার মানুষ বাড়ি-ঘড় ছেড়ে পালিয়ে গেছে। সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়ায় রাখাইন শরণার্থীদের বেশিরভাগ দেশের মধ্যেই আশ্রয় যোগাড় করতে পারলেও রোহিঙ্গাদের সে-সুযোগ নেই বললেই চলে। ফলে আক্রান্ত মুসলিম রোহিঙ্গারা আশ্রয় প্রার্থনা করছে মুসলিম-প্রধান প্রতিবেশী বাংলাদেশে।

    কিন্তু 'নতুন করে আর শরণার্থী না ঢুকতে দেয়ার' কঠোর নীতির কারণে আশ্রয়প্রার্থীদের নৌকোগুলো ভিড়তে দিচ্ছে না বাংলাদেশের নিরাপত্তারক্ষীরা। এপি জানাচ্ছে, গত কয়েক দিনে নারী, শিশু ও আহত ব্যাক্তি-সহ প্রায় ১৫০০ জন আশ্রয়প্রার্থী রোহিঙ্গা বহনকারী ১৪টি নৌকো ভিড়তে না দিয়ে মায়ানমারের জলসীমায় ঠেলে দিয়েছে বাংলাদেশের কৌস্টগার্ড।

    বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিজিবি)-র মেজর শফিক বলেন, 'নৌকোগুলোতে থাকা নারীরা জানিয়েছেন যে, তাঁদের স্বামীরা দাঙ্গায় নিহত হয়েছে আর তাঁদের বাড়ী-ঘরও পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে'। কৌস্টগার্ডের লেফটেন্যান্ট বদরুদ্দোজা জানান যে, ১৪৪ জন আশ্রয়পার্থী নিয়ে ৩টি নৌকো সেইন্ট মার্টিন দ্বীপে নামতে চেষ্টা করেছিল, কিন্তু তাঁদের বাধার মুখে নৌকোগুলো আবার মায়ানমারেই ফিরে গেছে।

    অবশ্য কর্তৃপক্ষের নজর এড়িয়ে কেউ-কেউ বাংলাদেশে প্রবেশ করতে সক্ষম হয়েছেন। এমন একজন কালা হুসেন, পেটে গুলিবিদ্ধ হয়ে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল হসপিটালে মৃত্যুবরণ করেছেন। আরও তিন জন বুলেট-বিদ্ধ রোহিঙ্গাকে ঐ হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে এ্যাসোসিয়েটেড প্রেস।

    এদিকে, মানবিক কারণে পলায়নপর সংখ্যালঘু রোহিঙ্গাদের জন্য বাংলাদেশের সীমান্ত খুলে দেয়ার অনুরোধ করেছে জাতিসঙ্ঘ। বাংলাদেশে সংস্থাটির একজন প্রতিনিধি ক্রেইজ স্যাণ্ডার্স বলেন, 'আমরা বাংলাদেশের সরকারের কাছে আবেদন করছি যেন সীমান্ত খুলে রাখা হয় এবং আশ্রয়প্রার্থীদেরকে প্রয়োজনীয় মানবিক সহায়তা প্রদান করা হয়'।

    জবাবে এক সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রী ডাঃ দীপুমণি বলেন, 'নতুন করে রোহিঙ্গা শরণার্থী আসাতে আমাদের কোন স্বার্থ নেই'। তিনি আরও বলেন যে, 'মায়ানমারের শরণার্থী ও অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের কারণে ইতোমধ্যেই আমাদের দেশের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও আইন-শৃঙ্খলার ওপর প্রভাব পড়েছে'। এ-পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের অবস্থান প্রসঙ্গে তিনি মন্তব্য করেন, 'উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই'।

    প্রধানতঃ মায়ানমারে বসবাসরত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর - যার লোকসংখ্যা প্রায় ৮লাখ - কোন রাষ্ট্র নেই। যদিও শতাব্দীর-পর-শতাব্দী ধরে তারা প্রাক্তন আরাকান অঞ্চলে বসবাস করে আসছে তবুও মায়ানমারের সরকার তাদেরকে বৈধ নাগরিকত্ব দিতে রাজী নয়; বরং তাদেরকে অবৈধ অনুপ্রবেশকারী হিসেবে চিহ্নিত করে থাকে। বাংলাদেশও রোহিঙ্গাদেরকে অনুপ্রবেশকারী হিসেবেই বিবেচনা করে। বর্তমানে, বাংলাদেশের শরণার্থী আশ্রয়-শিবিরে সরকারী হিসেবে অন্ততঃ ২৫,০০০ রোহিঙ্গা বসবাস করছে। জাতিসঙ্ঘের মতে রোহিঙ্গারা পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি নির্যাতিত সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী।

     

আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন