সংবাদ পরিক্রমা
সংবাদ প্রতিবেদন
- মিশরের গণ-আন্দোলনে নতুন মাত্রাঃ উন্নত জীবনের দাবীতে শ্রমিক শ্রেণীর অংশগ্রহণ

ইউকেবেঙ্গলি, বুধবার, ৯ ফেব্রুয়ারী ২০১১ - দু’সপ্তাহ আগে শুরু হওয়া মিশরী গণ-অভ্যূত্থান আজ তৃতীয় সপ্তাহের প্রথম দিন অতিক্রম করে দ্বিতীয় দিনে পড়লো। গতকাল মঙ্গলবার রাজধানী কায়রোর তাহরির স্কোয়ারে বিগত দিনগুলোর চেয়েও অংশগ্রহণ বেড়েছে। তাহরির স্কোয়ার থেকে বিক্ষোভ মিছিল প্রসারতি হয়েছে পার্লামেন্টের দিকে। সরকারের পক্ষ থেকে একদিকে হুমকি এবং অন্যদিকে সংস্কারের প্রতিশ্রুতি ও বেতন বৃদ্ধি প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও অব্যাহত আন্দোলনের সাথে যুক্ত হয়েছে শ্রমিক-ধর্মঘট।
‘উই অল আর খালেদ সাইদ’ নামের ফেইসবুক থেকে মিশরের গণ-আন্দোলন সংগঠিত করার নেপথ্য নায়ক ওয়ালে ঘনিমের মুক্তি লাভ করার পর বিপুল সংখ্যক নতুন মানুষ অংশ নিয়েছে তাহরির স্কোয়ারের বিক্ষোভে।
আন্দোলনের সংগঠকের সবাই আমেরিকাতে প্রশিক্ষিত মর্মে করা প্রচারের কারণে যারা আগে যোগ দেবার কথা ভাবেনি, অতি সাধারণ মিশরীয় তথ্য-প্রযুক্তিবিদ ওয়ালে ঘনিমের মুক্তি-পরবর্তী টেলিভিশন আবেগ-ঘন সাক্ষাতকার সম্প্রচারিত হবার পর জনতার অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পায়।
ঘনিমকে ‘বীর’ বলে সম্বোধন করলে তিনি বলেন, আমি বীর নই। বীর তারা, যারা তাহরির স্কোয়ারের মাটি ধরে রেখেছে। তিনি বলেন, ‘আমাদেরকে আবর্জন পরিষ্কার করতে হবে, দেশে প্রচুর আবর্জনা।’ প্রেসিডেন্ট হোসনি মুবারকের বিদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন থামবে না বলে ঘনিম প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন। তিনি রাজনৈতিক শক্তি-সমূহকে সতর্ক করে দিয়ে বলেন, ‘দয়া করে এখনই পিঠা ভাগ করতে ব্যস্ত হয়ে পড়বেন না।’
আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক শক্তি-সমূহের মধ্যে সর্বাধিক পরিচিত ইসলামবাদী ‘ইখওয়ান আল-মুসলিমু’ বা মুসলিম ব্রাদারহুড-সহ বিভিন্ন দল ও গুচ্ছের সাথে সরকারের পক্ষ থেকে ভাইস প্রেসিডেন্ট ওমর সুলেইমানের আলোচনা কোনো ঐক্যমতে উন্নীত হয়নি। ব্রাদারহুড বলেছে, তার আলোচনায় গিয়েছিলো সরকারের মনোভাব বুঝার জন্য, কিন্তু প্রেসিডেন্টের পদত্যাগ ছাড়া কোনো পরবর্তী আলোচনায় বসবেন না। উল্লেখ্য, গত সপ্তাহ’র প্রথম দিকে আন্দোলনকারী দল ও গুচ্ছ-সমূহের সম্মিলিত সিদ্ধান্ত ছিলো তাদের দাবীকৃত প্রেসিডেন্টের পদত্যাগ ছাড়া তারা সরকারের সাথে আলোচনা যাবেন না।
গতকাল মঙ্গলবার ভাইস প্রেসিডেন্ট সুলেইমান দুটি শক্তিশালী কমিটী গঠনের প্রতিশ্রুতি ঘোষণা করেন। তিনি জানান, মিশরের রাজনীতিতে গঠনতান্ত্রিক পরিবর্তন আনার জন্য একটি কমিটী এবং এ-কমিটীর সুপারিশ ঠিকভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে কি-না তা দেখার জন্যে আরও একটি কমিটী গঠন করা। এছাড়াও তিনি বলেন, বিক্ষোভকারীদের ওপর যে হামলা ও হতাহতের ঘটনা ঘটেছে, তার তদন্তের ও উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য আরও একটি কমিটীর ঘোষণা দেন। তবে চলমান বিক্ষোভ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘এমন করে আমরা আর চলতে দিতে পারি না।’ বিক্ষোভকারীদের ঘরে ফিরে যেতে হবে বলে তিনি প্রচ্ছন্ন হুমকি উচ্চারণ করেন।
গতকাল তাহরির স্কোয়ারে প্রথম দিকে সেনাবাহিনীর লোকেরা বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারীদের পরিচয়পত্র দেখে ভিতরে প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ করতে চাইলেও, লোক-সংখ্যার চাপে তার হাল ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়।
তাহরির স্কোয়ারে চলমানের বিক্ষোভেরও বাইরে গতকাল থেকে বিক্ষোভকারীরা মিশরের পার্লামেন্টের সামনে অবস্থান নিয়েছে। সেখানে প্রধান ফটকে তারা ‘শাসক পরিবর্তন না হওয়া অবধি বন্ধ’ লেখা সাইনবৌর্ড ঝুলিয়ে দিয়েছে।
সর্বশেষ প্রাপ্ত খবরে জানা যায়, সুয়েজ খাল কর্তৃপক্ষের মালিকানাধীন ৫টি পরিষেবার শ্রমিক-কর্মচারীরা গতকাল মঙ্গলবার থেকে সুয়েজ, পৌর্ট-সাঈদ ও ইসমাইলিয়া - এই তিনটি নগরীতে অনির্দিষ্ট কালের জন্য অবস্থান ধর্মঘট শুরু করেছে।
ছয় হাজারেরও বেশি শ্রমিক তাদের দাবী পূরণ না হওয়া পর্যন্ত কর্তৃপক্ষের সদর দপ্তরের সামনে অবস্থা ধর্মঘট চালিয়ে যাবে। স্বল্প বেতন, অবনতিশীল স্বাস্থ্য, কর্মস্থলের নিম্নমানের অবস্থানের বিরুদ্ধে তারা ধর্মঘটে নেমেছেন।
পরিষেবা-সমূহের শ্রমিক-কর্মচারীরা সুয়েজ ক্যানাল অথোরিটীর কর্মীদের সম-পর্যায়ের বেতন ও ভাতা দাবী করছেন। বিশ্লেষকদের মতে, শ্রমিক-কর্মচারীদের এ-ধর্মঘট আন্দোলন দৃশ্যতঃ অর্থনৈতিক দাবী-দাওয়ার জন্য হলেও তার একটি রাজনৈতিক মাত্রা রয়েছে। স্পষ্টতঃ গণ-অভ্যূত্থানের অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতি থেকে সদ্য গঠিত মিশরীয় শ্রমিক কর্মচারীদের ইউনিয়নই এ-আন্দোলনের নেতৃত্বে রয়েছে।