• মৃত-বিবেচিত নিখোঁজ বাঙালীর ঘরে ফেরাঃ পাকিস্তানী জেইল থেকে উদ্ধার করলো রেডক্রস
    Bangadeshi-freed-from-Pak-Jail.jpg

    ইউকেবেঙ্গলি - ১ অগাস্ট ২০১২, বুধবারঃ  আজ ঢাকা থেকে এসৌসিয়েটেড প্রেসের বরাত দিয়ে ব্রিটেইনের দৈনিক গার্ডিয়ান জানাচ্ছে, ২৩ বছর যাবত নিখোঁজ ও এক পর্যায়ে মৃত-বিবেচিত বাংলাদেশের এক নাগরিককে আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটী পাকিস্তানের করাচি কারাগার থেকে উদ্ধার করে স্বদেশে পাঠিয়েছে। মুসলেমুদ্দিন সরকার (৫৩) নামের এই বাংলাদেশী নাগরিক তাঁর পরিবারের সাথে আনন্দাশ্রুতে মিলিত হয়েছেন, তবে তাঁর অন্তর্ধানের পুরো কাহিনী তিনি এখনও বলেননি।

    বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের বিষ্ণুরামপুর গ্রামের মুসলেমুদ্দিন সরকার ১৯৮৯ সালে বাড়ীতে কিছুদিন ছুটি কাটানোর পর তাঁর কর্মস্থল চট্টগ্রাম বন্দরে ফিরে যাচ্ছেন বলে বাড়ী ছাড়ার পর গত ২৩ বছর যাবত নিখোঁজ ছিলেন। দীর্ঘদিন খবর না পেয়ে তাঁর ভাই চট্টগ্রাম বন্দরে যেয়ে জানতে পান যে তিনি কাজে ফেরেননি। তাঁর খোঁজ না পেয়ে পরিবারের সবাই ধরে নিয়েছিলেন যে তিনি আর বেঁচে নেই।

    এএফপি-কে মুসলেমুদ্দিনের ছোটভাই জুলহাসুদ্দিন বলেন, ‘বছরের পর বছর ধরে সন্ধান করে না পেয়ে আমরা শেষ পর্যন্ত তাঁর আশা এই মনে ছেড়ে দিয়েছিলাম যে, তিনি হয়তো সমুদ্রে ডুবে মারা গিয়েছেন। কিন্তু আমাদের মা সব সময়ই বিশ্বাস করতেন যে, তাঁর ছেলে একদিন ঘরে ফিরে আসবে।’

    এপি ও এএফপি জানাচ্ছে, কিছু দিন আগে একটি অজ্ঞাত টেলিফৌন থেকে মুসলেমুদ্দিনের পরিবার জানতে পারে যে, তিনি পাকিস্তানের কারাগারে বন্দী। এই টেলিফৌনের সূত্র ধরে মুসলেমুদ্দিনের পরিবার রেড ক্রসের আন্তর্জাতিক কমিটীর ঢাকা শাখার সাথে যোগযোগ করে। রেডক্রস তাদের পাকিস্তান শাখার মাধ্যমে মুসলেমুদ্দিনকে করাচির কারাগারে খুঁজে পায় এবং তাঁর মুক্তির ব্যবস্থা করে বাংলাদেশে পাঠায়।

    গার্ডিয়ানের রিপৌর্টে মুসলেমুদ্দিনকে ‘শ্মশ্রুমণ্ডিত তীক্ষ্ণ-চোখের কিন্তু ক্লান্তিতে বিধ্বস্ত’ বলে বর্ণনা করা হয়। ঢাকার বিমানবন্দরে মুসলেমুদ্দিনের ভাই সিকান্দর আলি হারানো ভাইকে ২৩ বছর পেয়ে জড়িয়ে ধরলে বাকরুদ্ধ মুসলেমুদ্দিনের চোখ থেকে অনবরত অশ্রুপাত হতে থাকে।

    সংবাদ-মাধ্যমকে মুসলেমুদ্দিন জানান, তিনি ১৯৮৯ সালে ভারতীয় সীমান্ত অতিক্রম করে কয়েক মাস ধরে আসাম ও মেঘালয় প্রদেশ কাটানোর পর দিল্লি পৌঁছেন। তিনি জানান, সেখানে তিনি বিয়ে করেন এবং এক পর্যায়ে ভালো চাকুরীর আশায় পাকিস্তানের সীমান্ত অতিক্রম করা কালে পাকিস্তানী সীমান্ত-রক্ষীদের হাত ধৃত হন।
    বলেন, ‘আমি ১৯৮৯ সালে সীমান্ত অতিক্রম করি এবং কয়েক মাস ভারতের আসাম ও মেঘালয় রাজ্যে থাকার পর দিল্লিতে যাই। পরবর্তীতে আমি দিল্লিতে বিয়ে করি’। তিনি বলেন, ‘কিন্তু ১৯৯৭ সালে আমি ভারত-পাকিস্তান সীমান্ত অতিক্রম করে পাকিস্তানে প্রবেশ-কালে আমি ধরা পড়ি। কারণ ‘আমার কাছে ভ্রমণের কোনো কাগজপত্র ছিলো না’, বলেন মুসলেমুদ্দিন।

    তিনি আরও বলেন, ‘আমি ১৫ বছর জেইল খেটেছি’। মুসলেমুদ্দিন জানান, পাকিস্তানীরা তাকে প্রহার ও নির্যতন করে গত ১৫ বছর যাবত জেলে পুরে রাখে। পাক-কারাগারে থাকা-কালে তিনি বহুবার বাড়ীর ঠিকানায় চিঠি লিখেছেন, কিন্তু নিশ্চিত ছিলেন না তাঁর সেই চিঠিগুলো আদৌ পৌস্ট করা হয়েছিলো কি-না। মুসলেমুদ্দিন জানান, এক পর্যায়ে তিনি পাকিস্তানের বন্দীদশা থেকে মুক্তির আশা ছেড়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু দেশে ফিরে এখনও তাঁর জননী বেঁচে আছেন জেনে দারুন খুশি হয়েছেন মুসলেমুদ্দিন।

    এ-সময় সাংবাদিকেরা তাঁর কাছে ঘটনার বৃত্তান্ত জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমাকে আগে আমার মায়ের সাথে মিলিত হতে দিন। পরে আমি আপনাদের সবকিছু বলবো।’

    ছোট ভাই জুলহাসুদ্দিন জানান, বাড়ীতে গিয়ে মুসলেমুদ্দিন তাঁর মাকে জড়িয়ে ধরলে মা ২৩ বছর পর তাঁর হারানো সন্তানকে ফিরে পেয়ে আবেগের আতিশয্যে অজ্ঞান হয়ে পড়েন। জুলহাস এই দৃশ্যটি ‘হৃদয় বিদারক’ বলে বর্ণনা করেন।

    উল্লেখ্য, বাংলাদেশের অজ্ঞাত সংখ্যক নাগরিক ভালো উপার্জনের আশায় তাঁদের নাগরিক পরিচয় গোপন করে প্রতিবেশী ভারত ও তস্য প্রতিবেশী পাকিস্তানে গিয়ে স্থিত হওয়ার চেষ্টা করেন, কিন্তু তাঁদের মধ্যে একটি বড়ো অংশ বিভিন্ন পর্যায়ে ধরা পরে বিভিন্ন মেয়াদের কারাদণ্ড ভোগ করেন।

    ভারত ও পাকিস্তান কিংবা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ভাগ্যান্বষণে যেয়ে কতো সংখ্যক বাংলাদেশী নাগরিক শেষ পর্যন্ত কারাগারে নিক্ষিপ্ত হয়ে মুক্তির প্রহর গুনছেন, তার কোনো নির্দিষ্ট পরিসংখ্যান নেই।

আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন