মোহাম্মদ আলী সিদ্দিকী
বৃষ্টির ওপর ভীষণ খাপ্পা হয়ে গেলো সে। মরার বৃষ্টির কোন আক্কেল নাই! তিন-তিনটি দিন এমনভাবে ঝরলে হাভাগা মানুষগুলোর কী হাল হবে, সেটা-তো একবার ভেবে দেখবে? তা না, মনের সুখে গান গেয়ে গেয়ে ধরণীকে উচ্ছল করে দেবে, ভরিয়ে দেবে! অই দেখো উপজেলা ঘাটের টংয়ে বসে বইদ্দা বাউল একতারা বাজাচ্ছে, ঢং আর কি ! মানুষ বাঁচেনা মানুষের জ্বালায় বইদ্দা এসেছে একতারা বাজাতে! ইচ্ছে করে একেবারে জুতিয়ে দিতে-। গজ গজ করতে করতে সে জিনিসপত্র দুদ্দাড় করে আছড়ে ফেলে। চালের ফুটো বেয়ে দরদরিয়ে নামা পানি থেকে মালপত্র সামাল দিতে দিতে একেবারে নাকাল। একদিক সামলায় তো আরেক দিকে উৎপাত। শোবার জায়গাটা বাঁচানোর জন্যে সে খাটটা অন্ততঃ চারবার সরিয়েছে। তাতেও রক্ষে নেই। যেদিকে রাখে সেদিকেই পিছির পিছির, থই থই। রান্নাঘরটা কাদা জবজবে। ভেজা বেড়ায় এর মধ্যেই ওল পড়ে গেছে। শিকেয় রাখা হাঁিড়র গায়ে জড়ো হয়েছে কয়েকটা বৃষ্টি ত্রাসিত টিকটিকি। লাল পিঁপড়ের দল সারি বেঁধে যুদ্ধযাত্রা করছে বেড়া বেয়ে বেয়ে। মাটির চুলোটার দুটো খুঁটি গলে গেছে। ডেকচিগুলোতে কাদা ছিটকে পড়ে বিতিকিচ্ছিরি অবস্থা। চাউলের ভান্ডটা ঢাকনা থাকায় রক্ষে পেয়েছে। এদিকে আলনায় রাখা কাপড়চোপড়গুলো ভিজে চপচপে। এগুলো শুকোতে কয়েকদিন লেগে যাবে। ভাগ্যিস ট্র্যাংকের মধ্যে কিছু কাপড় তোলা ছিলো, নইলে তো একেবারে বেহাল অবস্থা হতো। কাঁথা-কম্বলগুলো পলিথিনের ব্যাগে ভরে না রাখলে কি যে অবস্থা হতো ভেবে সে আঁতকে ওঠে। আলনাটাকে আপাততঃ নিরাপদ জায়গায় টেনে এনে হাঁপিয়ে ওঠে সে ।
রণে ক্ষান্ত দিয়ে খাটের শুকনো জায়গাটায় সে পা টান টান করে বসে। কাহাঁতক আর লড়াই করা যায়। শুধু জেরবার হওয়া। পানদানীটা টেনে নিয়ে দেখে কালচে হয়ে ওঠা দুটি পান নিরালম্ব পড়ে আছে। সে পচন ধরা জায়গাটুকু ছিঁড়ে ফেলে চুন সুপারি আর নুরানী জর্দা দিয়ে পান বানিয়ে মুখে পোরে। বালিশের নিচে হাতড়িয়ে স্টার সিগারেটের প্যাকেট আর ম্যাচ বের করে। সিগারেটগুলো কেমন ভেজা ভেজা। সে একটা ধরিয়ে আয়েসে ধোঁয়া ছাড়ে। পানের সাথে সিগারেট শরীর মনে চনমনে আমেজ আনে। স্যাঁতস্যাঁতে বাতাসে নাচে কি নাচে না, দোলে কি দোলে না, ধোঁয়ারা ঝিম মেরে থাকে ঘরের ভেতর।
বুজি, ও বুজি -।
কিরে শিরি ? শিরির আওয়াজ শুনে উঠে বসে সে।
তোমার জন্য কি আনছি দেখো-।
দরোজা খুলে সে দেখলো শিরির চোখজোড়া আনন্দে চকচক করছে। তার হাতে ধরা পলিথিন ব্যাগে কয়েকটি পুঁটি আর মলা মাছ। মেয়েটি ভিজে একেবারে ফ্যাকাসে হয়ে গেছে। মাথায় একটা পলিথিন জড়িয়ে বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে মাছ ধরে তার জন্যে নিয়ে এসেছে ছোট্ট মেয়েটি। নয় কি দশ বছরের শিরি তার জন্যে এতো মমতা কোত্থেকে পেলো ? কি করে পেলো ? ভেবে বুকের ভেতরটা হু হু করে উঠলো তার। ওর শ্যামলা আদুরে মুখটা তুলে ধরে সে কপালে একটা চুমু দিলো। পলিথিনটা মাথা থেকে খুলে হাত ধরে ভেতরে নিয়ে এলো।
মাছ কোথায় পেলিরে শিরি ? গামছা দিয়ে মাথা মুখ মুছে দিয়ে গুড় মুড়ি বের করতে করতে সে জিজ্ঞেস করলো।
মন্দিরের পিছনের নালায়, ভেজা চটে সাদাটে হয়ে যাওয়া পা মুছতে মুছতে বলে শিরি, অনেক মাছ, সবাই ধরছে।
দিনভর কিছু খেয়েছিস্ ?
পান্তা খেয়েছি। শিরি ভাঙা মোড়াটা টেনে নিয়ে দরোজার মুখে বসে।
নে গুড় মুড়ি খা, দরোজায় বসলি যে ?
রেশমি, পারুরা আসবে, আবার যাবো- উচ্ছ্বাস নিয়ে বলে সে।
মা বকবে না ?
মাছ নিয়ে গেলে বকবে না।
মা কেমন আছেরে শিরি ? মাছ কটি ছাই মেখে কুটতে বসে সে।
মরা ভাইটা হবার পর থেকে মা খালি কুঁই কুঁই করে বুজি, বিষন্ন গলায় বলে শিরি, মা’র জানি কি অসুখ হইছে-।
রাতদিন গুঁতিয়ে গুঁতিয়ে বাচ্চা বের করলে তো অসুখ হবেই, আপনমনে বিড় বিড় করে সে, আমারও কি কম অসুখ ?
কিছু বললে বুজি ? পানিটা গলায় ঢেলে উঠে দাঁড়ায় শিরি।
নারে। পলিথিনটা মাথায় বেঁধে দিয়ে শিরির ঢুঁ মারা বুকজোড়ার দিকে ঈষৎ তাকিয়ে বলে সে, একলা কোথাও যাবি না, ছেলেদেরকে গায়ে হাত দিতে দিবি না, বুঝলি ?
কেন বুজি ?
তুই যে মেয়ে পাগলী, সে শিরির মুখটা উঁচু করে ধরে, ছেলেরা শুধু মেয়েদের শরীর চায়। শরীর মেয়েদের শত্রু, বুঝলি ?
কি বুঝলো বোঝা গেলো না, ঘাড় নাড়িয়ে শিরি ঝমঝমিয়ে নামা বৃষ্টি মাথায় চলে গেলো।
আচ্ছা, আমার মাথা-টাথা খারাপ হয়ে যায়নি তো ? তা না হলে আমি কেন শিরিকে এ সব কথা বলতে গেলাম ? ওর কচি মনটা কথাগুলো কিভাবে নেবে কে জানে। শিরির চলে যাওয়া পথের দিকে উদাস ভঙ্গীতে তাকিয়ে সে ভাবতে লাগলো। একটু পরে শিরির সাথে রেশমি আর পারু এসে যোগ দিলো। ওদের দলটা ননাইদের বাড়ীর আড়ালে যাওয়া পর্যন্ত একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলো সে। তিড়িং বিড়িং লাফিয়ে লাফিয়ে ওরা চলে গেলো। ঠিকমতো দেখা যায় না। অঝোর বৃষ্টির ধোঁয়াশায় ওদের ছোট্ট শরীরগুলো অস্পষ্ট হয়ে মিলিয়ে যায়। অমনি মনটা লাফিয়ে আয়না হয়ে বেণী দুলানো বয়েসের ছবি হতে চায়। ছুটতে চায় বাশঁঝাড়ে, পুকুর পাড়ে, সুপুরি বাগানে, সর্ষে ক্ষেতের হলুদ সাগরে, নিকানো উঠোনের ছায়াঘেরা এক বাড়ীর আঙ্গিনায়। না, না, না! সে তীব্রভাবে গা ঝাড়া দেয়। ভেঙে চুরমার করে দিতে চায় আয়না। পা দিয়ে আঘাত করে মাটির মেঝেতে। আপন মনে খঁকিয়ে ওঠে সে, আমি দেখতে চাই না, ভাবতে চাই না। আমার অতীত আর ভবিষ্যত নেই, আছে শুধু আজকের দিন, বর্তমান। চিবুক বুকে ঠেকিয়ে সে দাঁতে দাঁত চেপে বসে থাকে কিছুক্ষণ। নিজেকে আত্মস্থ করে নিতে সময় নেয়। ফিরে আসে বর্তমানে এক ঝটকায়।
দরোজাটা লাগিয়ে দিয়ে শিরির মাছগুলো রান্নার আয়োজন করতে লাগলো। আর অমনি পেটের খিদে বুঝি হামলে পড়লো। সেই সাত সকালে অল্প পান্তা আর চা খেয়েছে। বৃষ্টি আক্রান্ত ঘরটা সামাল দিতে গিয়ে বেহাল অবস্থা হয়েছে। ঘরটা মেরামত করার জন্য শন বাঁশ কিছু জোগাড় হয়েছে। নুরু ঘরামী গেল সপ্তাহে কাজে হাত দেবার কথাও ছিলো। সে পাকা কথার মানুষ।
তুমি কিছু ভাইবো না গো বইন, আমি কইরা দিমু।
কথা যেন ঠিক থাকে নুরু ভাই, সে আবদার করেছিলো, নইলে বর্ষাকালে নাকাল হতে হবে।
নুরু যা কয় তা করে বইন, জোর দিয়ে বলেছিলো নুরু ঘরামী।
জানি বলেই ভরসা করছি।
আল্লার উপর ভরসা রাইখো বইন, মৌলবীর ভঙ্গীতে বলে নুরু, আমি ঘরামী মাত্তর।
সেই নুরু ঘরামী বাজারে কাজ করতে গিয়ে চালের ওপর থেকে পড়ে পা ভেঙে ফেলে এখন ঘর বসা। ছেলে মারফত দুঃখ প্রকাশ করেছে। বলেছে, আমারে মাফ করে দিও বইন।
সে নুরুকে ক্ষমা করে দিয়েছে। এমন মানুষের ওপর রাগ করা যায় না। বরং ওর কষ্টের জন্যে আফসোস হয়েছে। আহারে, লোকটার না জানি কতো কষ্ট হচ্ছে। সে নুরু ঘরামীর শুভ কামনা করেছে। কিন্তু ভাগ্য তাকে দিয়েছে দুর্ভোগ। তিনদিন ধরে বৃষ্টির মচ্ছবে পুরো ঘরটাই তছনছ হয়ে গেছে। কিন্তু কি আর করা ! এর মধ্যেই জীবনটাকে টেনে নিতে হবে।
এ সব ভাবতে ভাবতে সে স্টোভ জ্বালিয়ে রান্নার আয়োজন করতে লাগলো।
ও কাজল ঘরে আছস নাকি, দরোজাটা খোল- বাইরে জানু খালার গলা শোনা গেলো।
কাজল ? সে মুখ টিপে হাসলো। আমি কি কাজল ? কার কাজল, কিসের কাজল ? আমার নাম কি কাজল ? মানুষ আমাকে হরেক নামে ডাকে। কেউ বলে শান্তি, কেউ বলে মহিমা, কেউবা ডাকে সুরলা, কেউ ডাকে মাগী, খানকী, ভাতারী, নচ্ছার, হারামজাদী, কেউ কেউ খনখনে গলায় ডাকে রাক্ষুসী, ডাইনী, কেউবা আদুরে গলায় ডাকে সুমি। যার যা ডাকতে ভালো লাগে ডাকুক। নাম দিয়ে কি হয় ? আমার যে কি নাম ছিলো তা এখন অসংখ্য নামের ভিড়ে হারিয়ে গেছে। তাই এখন যে আমাকে যে নামেই ডাকুক না কেন সাড়া দিতে কুন্ঠা করি না।
যাই খালা, মাছের লবণটা দেখে দরোজা খুলে দিলাম, বৃষ্টি মাথায় নিয়ে কেন এলে খালা ?
আমার মুখপুড়িকে দেখতে, ফোকলা দাঁতে মধুর করে হাসলো খালা, নে এগুলান ধর, সুরেশগো বাগানের ধারে পইড়াছিলো-।
একহালি চাঁপা কলা আঁচলের নিচ থেকে বের করে হাতে তুলে দিতেই কাজল যেন কেমন হয়ে গেলো। ঝপাৎ করে সে জানু খালার বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ে হু হু করে কেঁদে উঠলো। কিছু কিছু মানুষ কেন যে তাকে ভালোবাসে সে বুঝে উঠতে পারে না। ওদের ভালোবাসা তাকে আউল বাউল করে দেয়। বেতস পাতার মতো উড়িয়ে দেয় মনের রুদ্ধ ডানা। নিজেকে সে সামাল দিতে পারে না।
আরে পাগল করিসটা কি, এ্যা ! জানু খালা আদর করে পিঠে হাত বোলায়, ভিজে গেলি যে ! তার চোখও অশ্রুসজল হয়ে ওঠে। সেটাকে চাপা দেবার জন্যে সে কাজলকে বুক থেকে সরিয়ে আনে। মজা করার ভঙ্গীতে বললো, আইজ কি অইছে জানস্ ?
না বললে জানবো কেমনে ? নিজেকে ধাতস্থ করে নেয় কাজল। খালাকে টেনে ঘরে এনে খাটের একপাশে বসায়।
শোন তাহলে, জানুখালা বুঝি গল্পের ঝুড়ি খুলে বসে, গেইছি হারুদের বাড়ী। ভিখেরী দেখলে ওগো বিষ ওঠে। দূর দূর করে, একটু থামে খালা।
কাজল খেয়াল করলো খালার মুখের ভাষা পাঁচমিশেলী হয়ে যাচ্ছে। যাবে না ? খালারও তো এঘাট ওঘাট কম ঘোরা হলো না। মুখের ভাষাটাই গেছে পাল্টে। অবশ্য তা নিয়ে খালার কোন মাথাব্যথা আছে বলে মনে হয় না। নিজের মতো করে কথা বলতেই তার আনন্দ।
আইজ অইলো এক কান্ড, জানুখালা আবার শুরু করে, মাগো ভিক্ষা দাওগো কইতে ঘর থাইকা নতুন বউ বের অইয়া আইলো ভিক্ষা হাতে। অমনি হারুর মা আইসা ওর হাত থাইকা কাইড়া নিতে চাইলো। বউ ধমক দিয়া কইলো, খবরদার আমার কামে হাত দিবেন না। হারুর মা তো জল্লাদ মহিলা। ও লাফ দিয়া একডা লাঠি নিয়া বউরে মারতে আইলো। আর বউ তা কাইড়া নিয়া হগলের সামনে হারুর মারে পটাপট লাগাইয়া দিলো। নিমিষেই লঙ্কাকান্ড অইয়া গেলো। আমি পলাইয়া আইছি।
বউটার কি হলো খালা ? কাজল শক্তমুখে বললো।
জানি নারে কাজল, খালা একটু ভেবে বললো, হারু তো থাকে শহরে, বউটাও শহুইরা, সাহস আছে বুকে।
নইলে মারা পড়বে, কাজল উঠে দাঁড়ায়, আসো আমার সাথে ভাত খাও।
নারে কাজল, আমি এখন যাই- জানুখালা উঠে দাঁড়ায়।
তাহলে আর কখনো আমাকে কিছু দেবে না- গম্ভীর গলায় বলে কাজল।
আচ্ছা দে, কাজলের মুখের দিকে তাকিয়ে খালা পিঁড়িটা টেনে নিয়ে বসে। মনে মনে বলে, পাগল একটা।
কাজ কেমন লাগছেরে ? খেতে খেতে খালা জানতে চাইলো।
ভালোই, একটু বাঁকা হাসে কাজল, ছাই ফেলতে ভাঙা কুলো আর কি ! তবে মম বম মেয়েটা খুব ভালো। ব্যবহার খুব সুন্দর। আর এমন ভালো বাংলা বলে না, নিজেকে অনেক ছোট মনে হয়।
ভাঙা কুলোটা আবার কি ? খালা চোখ চোখা করে তাকায়।
মানে এখন ফায়ফরমাস খাটতে হবে, পরে তাঁতে বসাবে বললো আর কি ! কাজল খুশীর হাসি ছড়ায়, তবে টাকাটা মন্দ নয় খালা। শুরুতেই বারো শো টাকা। তাঁতে বসলে কমিশন পাওয়া যাবে।
অরুমা হাইস্কুলের পাশে একটা তাঁত ফ্যাক্টরী হয়েছে। পাহাড়ী মেয়েরা সেখানে দলবেঁধে কাজ করতে আসে। তাঁত চালিয়ে তারা রং বেরংয়ের কাপড় বানায়। সে সব কাপড়গুলো এই পাহাড়ঘেরা ছোট জনপদ পেরিয়ে চলে যায় দূর দূরান্তে, দেশ-বিদেশে।
অমিত মাস্টার একদিন পথ পেয়ে বললেন, সুরলা, চাইলে তুমিও তাঁতে কাজ করতে পারো। তোমার নক্সীকাঁথার সবাই প্রশংসা করে। আমার বিছানার চাদরটাতো জেলার বড়বাবু একপ্রকার জোর করেই নিয়ে গেলেন।
আমি ? অবিশ্বাস ফোটে সুরলা তথা কাজলের গলায়, আমি তো লেখাপড়া জানি না। সব বাঙালী মেয়েরাই কাঁথা সেলাই করতে পারে মাস্টারবাবু।
তাঁত চালাতে লেখাপড়া লাগে না, অমিত বাবু দৃঢ় গলায় বলেন, বললে আমি ব্যবস্থা করতে পারি। ছুটা কাজ করে তোমার ক’টাকা আর রোজগার হয়।
তাতো সত্যি। আমি কিভাবে জীবন কাটাই তাতো কেউ জানে না, আপন মনে ভাবে সুরলা। সবাই ভাবে ভাতাররাই আমার খোরাক জোগায়। ভাতাররাতো কাজ শেষে ক’টাকা ছুঁড়ে দিয়ে পগার পার। অমিত বাবু মানুষটি ভালো। একা মেস করে থাকেন। কখনো কোথাও যান না। কেমন যেন চুপচাপ সারাক্ষণ। চেহারা দেখলে মনে হয় নিজের সাথে যুদ্ধ করছেন। অনেকদিন ধরে অরুমাতে আছেন। স্কুল, বাজার, ঘর, উপজেলা ক্লাব নিয়েই থাকেন সবসময়। সুরলা বুঝতে পারে সমর্থ মানুষটার নজর তার দিকে পড়েছে অনেক দিন আগেই। কিন্তু লোকটা মুখ ফুটে কিছু বলেন না। বরং চোখাচোখির হবার ভয়ে কেমন যেন মুখ নিচু করে, নয়তো এদিক ওদিক তাকিয়ে কথা বলেন। সুরলা ঠোঁট টিপে হাসে। একদিন বলেই ফেলেছিলো, কি মাস্টারবাবু, আমার দিকে তাকাতে আপনার কি ঘৃণা হয় ? আঁতকে উঠেছিলেন তিনি, ছি! ছি ! তুমি কি যে বলো না সুরলা। তোমাকে আমার ভালো লাগে। সেজন্যেই কথা বলি। আবার মুখ টিপে হাসে সুরলা। ঠোঁটে এসে গেলেও বললো না। পুরুষের ভালো লাগার মর্ম আমি বুঝি মাস্টার বাবু। ভালো লোকটাকে কষ্ট দিয়ে লাভ নেই। এই অরুমা এলাকায় একমাত্র অমিতবাবু তার বাড়ীর দোরগোড়া থেকে ফিরে এসেছে। ভেতরে আসতে বললেও নানা অজুহাতে এড়িয়ে গেছেন। এসব ভাবতে ভাবতে সুরলা অমিতবাবুর দিকে ভালোভাবে তাকালো। হালকা পাতলা গড়নের j¤^v‡U মানুষটির ঈষৎ শ্যামলা মুখায়বে কেমন এক দিপ্তি খেলা করছে। খাড়া নাকটার খাঁজে বসা তিলটি ঘামে ভিজে কেমন চিকচিক করছে। মাথাভর্তি এলোচুলগুলোকে ধাপ্পা দিয়ে কিছু সাদাচুল এদিক ওদিক উঁকি দিচ্ছে। অমিতবাবু ঘড়ির দিকে তাকালে সুরলা যেন mw¤^r পায়।
আমি করবো মাষ্টারবাবু, সুরলা সম্মতি দিয়ে দেয়, কিভাবে কি করতে জানাবেন আমাকে।
ঠিক আছে, ঠিক আছে।
দু’দিন পরেই মম বম এসে ঘরের কড়া নাড়ে।
আমার সাথে যেতে পারবে এখন ? নিজের পরিচয় দিয়ে বললো মম।
এখুনি, এই অবস্থায় ? অপ্রসত্তত কাজল তটস্থ হয়।
তুমি তৈরী হয়ে নাও, আমি বসছি- মম হেসে বললো, অসুবিধা হবে না তো ?
না না, কাজল আলনা থেকে শাড়ী নিয়ে রান্নাঘরের আলতো আড়ালে চলে যায়, দশ মিনিট মম।
সেদিনই ম্যানেজার থানকোয়াল ইন্টারভিউ নিলো এবং পরদিন থেকেই জয়েন করতে বলে দিলো। দেখতে দেখতে এক সপ্তাহ চলে গেলো। কাজলের কাজটা সত্যিই ভালো লেগে গেছে। ভয় হচ্ছে ওর সম্পর্কে সমাজে যে দুর্নাম আছে তা শুনলে ওরা কাজে রাখবে কি না।
তুই খুশী হলে আমিও খুশী, অবশিষ্ট পানটা থেকে একটু ছিঁড়ে মাড়ির দিকে ঠেলে দিতে দিতে বলে জানুখালা, মরবার আগে তোরে একটু সুখী দেখে যেতে পারলে শান্তি পাবোরে।
আবার সেই মরার কথা ! কাজল কপট রাগ দেখায়, একটাই জীবন একটাই মরণ। জীবন-মরণ দুই ভাইবোন। ও নিয়ে দুর্ভাবনার কিছু নেই।
বড্ড দামী কথা কইছসরে পাগলী, জানুখালা কাজলের হাত পাকড়ায়, তোর কথা শুইনা মনে তাগত পাইলামরে। আল্লা তোরে যে কেন এত্ত দুঃখু দিলো আমি বুইঝতে পারি না।
যাকে সে বেশি ভালোবাসে তাকে নাকি কষ্ট বেশি দেয়, কাজল ঠাট্টামাখা গলায় বলে।
এটা বাজে কথা, বিশ্বাস করিস না, বলে জানুখালা উঠে দাঁড়ায়, শোন বেলা পইড়া আইলো, আমি অখন উঠি।
বাঁকা কোমরে সামনের দিকে একটু ঝুঁকে ঝুঁকে জানুখালা রাস্তায় নেমে গেলো। বৃষ্টি থেমে গেছে। সন্ধের আঁধার এগিয়ে আসছে রাতকে নিয়ে। রাতের রহস্যময়তা ঘনিয়ে আসছে। কাজল কুপি ধরায়। আঁধারের সাথে নাচে আলোর দ্যুতি।
শঙ্খ নদীর ওপারে ঘনঅন্ধকারময় পাহাড়গুলো বুঝি হামাগুড়ি দিয়ে পাদদেশের বসতিগুলোর ওপর চেপে বসে। গহীন অন্ধকারে তলিয়ে যায় চরাচর। অন্ধকার যত ঘন হয়ে আসে মানুষগুলো ততোই যেন চুপচাপ হয়ে যায়। দূরাগত কুকুরের ঘেউ, রাতজাগা পাখীর পাখা ঝাপটানি, ভাটি থেকে দেরীতে ফেরা মাঝির ভয় তাড়ানো গান কিংবা অহেতুক ডাকাডাকির শব্দ, নয়তো রাস্তা দিয়ে দ্রুত পায়ে যাওয়া বাজার ফেরতা দলের উচ্চকন্ঠের খিস্তিকেউড় নয়তো শিশুদের হঠাৎ কান্নার শব্দ ছাড়া অন্ধকার সবকিছুকে চেপে ধরে। তবে অনেক রাত অবদি হাতিমাথা পাড়ার মদের আড্ডাটা চলতে থাকে। সেখানে অরুমার বৃদ্ধযুবা সকলে একসাথে মাতাল হয়। হইহল্লোড় করে নৈঃশব্দের অবগুন্ঠনে ঢাকা পাহাড়ের গায়ে আচানক তরঙ্গ তোলে। ব্যস্ অইটুকুই। এরপর চৌপর রাত পৃথিবীটা একেবারে নিথর হয়ে যায়।
সেটা প্রকৃতি, ঘরটাকে ধাতস্থ করে রাতের ভাতটা খেয়ে রান্নাঘরের জানালার কপাটে শেকল তুলতে গিয়ে ভাবলো কাজল, প্রকৃতির সন্তান মানুষ কিন্তু জেগে ওঠে, কখনো সশব্দে, কখনো শব্দহীন ভয়ঙ্করতা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে মানুষের ওপর ।
ঝপাৎ ঝপাৎ শব্দে পাড় ভাঙছে। নদীর পাড়। সোঁ সোঁ শব্দ তুলে বাতাস হুমড়ি খেয়ে পড়ছে ঘরের চালে। গাছের ডালে। ঝুপ ঝুপ করে গাছগুলো চলে যাচ্ছে জলের তীব্র স্রোতে। ছলাৎ ছলাৎ শব্দ তুলে বন্য জলের তোড় ধেয়ে আসছে বসতভিটের দিকে। মানুষ ছুটছে দিকবিদিক। আর্তচিৎকার করছে। হুড়োহুড়ি করছে। বাচ্চারা কাঁদছে চিৎকার করে। গোয়ালের গরু, খোঁয়াড়ের হাঁস-মুরগিগুলো ডাকছে তারস্বরে। দেখতে না দেখতে বর্গীদের মতো প্রবল বান হানা দিলো বসতঘরে। হুড়মুড়িয়ে পড়ে যাচ্ছে ঘরটা। ভেসে যাচ্ছে ছেলে বুড়ো সকলে। একটা মেয়ে কোন যাদুবলে উঠে পড়েছে গাছের মগডালে। দেখছে সবাই ভেসে যাচ্ছে, সবকিছু চলে যাচ্ছে নদীর গ্রাসে। সে কাঁদছে, চিৎকার করে, ডাকছে প্রাণপণে, মাগো, বাবাগো, খোকনরে-।
ঘুমটা ছুটে গেলো। আঁতকে উঠে বসে পড়লো কাজল। সেই `yt¯^cœ, নোয়াখালীর সুবর্ণচরে প্রকৃতির সেই ভয়াবহ ছোবল। কেন যে মুছে যায় না স্মৃতি থেকে ! এমন কোন যন্ত্র কি নেই যা দিয়ে `yt¯^cœ¸‡jv‡K স্মৃতির এ্যালবাম থেকে শেকড়শুদ্ধ উপড়ে ফেলা যায় ? এমন অষুধ কি নেই যা খেলে ভয়াবহ দৃশ্যপটগুলো আপনা থেকেই বিলীন হয়ে যাবে ? ভীষণ তেষ্টা পায় তার। ঘামে জবজবে শরীর। চোখ মেলে দেখে কুপিটা প্রায় নিবু নিবু। শাড়ীর আঁচল দিয়ে গলা-মুখ মোছে সে। একগ্লাস পানি সে ডগ ডগ শব্দ তুলে পান করে আহ্ ধ্বনি তোলে।
ঠুক! ঠুক! ঠুক!
দরোজায় কে যেন আঙুল ঠুকলো। তড়াক করে তার ইন্দ্রিয় সজাগ হয়ে গেলো। ঝটপট শাড়ীটা পেছিয়ে নিলো কোমরে। চোখের পলকে সিতানে রাখা দা-টা হাতে তুলে নিলো। এই উৎপাত নতুন কিছু নয়। রাতের পর রাত, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর এমন উৎপাতের সাথে তার বসবাস। শীত গ্রীষ্ম বর্ষা চলেছে, চলছে এই উৎপাত। বুদ্ধি হবার পর থেকে দু’ পেয়ে জানোয়ারের হাত থেকে বাঁচার জন্যে যুদ্ধ করতে হয়েছে, এখনো হচ্ছে। সব সময় ঠেকাতে পেরেছে এমন তো নয়। কতবার পরাস্ত হতে হয়েছে, শিকার হতে হয়েছে উন্মত্ত দানবীয়তার। হতে হয়েছে রক্তাক্ত, ক্ষতবিক্ষত। এখন তার মিত্রনীতি। আপসে, সখ্যতার সাথে, সমঝোতার ভিত্তিতে নিজেকে উজাড় করার, উপভোগ করার নীতি। দিনক্ষণ, সময় পূর্বে নির্ধারণের মাধ্যমে সাক্ষাত এবং সমর্পন। আজ এই ঝড়ো রাতের শ্রান্ত দ্বিপ্রহরে তো কারো আসার কথা নয়। কে এলো এমন বেবুঝের মতো ?
কে ? দরোজায় কান পাতে সে।
আমি সাদু মহিমা, ওপাশ থেকে ফিসফিসিয়ে আওয়াজ আসে।
সাদু ? মানে ছোট বাজার চৌধুরী সাদাতউল্লা ?
হাঁরে, হাঁ দরোজা খোল- অস্থির গলায় বলে সাদু।
না বলে আসলেন যে ?
সময় পাইনি।
রাগতে গিয়েও রাগলো না মহিমা। নিজেকে সংযত করলো। কারণ ওকে রাগালে এ তল্লাটে থাকা যাবে না। উপজেলা থেকে বাড়ী করার জন্যে শঙ্খ পারের এই জমিটুকু সাদুই ব্যবস্থাপত্র করিয়ে দিয়েছে। পেছনে থেকে ঘর তোলার টাকা-পয়সারও জোগান দিয়েছে। তার কৃপাতেই এই ঠাঁইটুকু। আর যাযাবর হবার সাহস হয় না। যদিও ইদানীং সাদুর বউ ভেউ লাগিয়েছে পেছনে। সে হাতে নাতে সাদুকে ধরার পায়তারা করছে। ওর বউ জুহারা এখন মহিলা †g¤^vi| সাদুকে শায়েস্তা করতে চায়।
বউ কোথায় ?
চট্টগ্রাম গেছে, সাদুর কন্ঠে সতর্কতা।
ও ভেউ লাগিয়েছে-।
সামলে এসেছি।
একটু দাঁড়ান।
ত্রস্ত হাতে বিছানাটা ঠিক করে চুলে চিরুনী চালায় মহিমা। যদিও সাদুর ওর চেহারা দেখার সময় থাকে না। শুধু দেহটা নিয়ে মাতামাতি। পনের থেকে বিশ মিনিট খাবলা খাবলি করে চোরের মতো পালিয়ে যাওয়া। অনেকদিন ধরেই তো সাদু এভাবে করে চলেছে।
বড্ড্ দেরী করলি মহিমা, সুরুৎ করে ঘরে ঢুকে বলে সাদু।
একটা প্রসত্ততি লাগে না বুঝি ? মহিমা বাঁকা হেসে তাকায়। কুপির আলোয় তার মুখে ছড়ায় রহস্যময়তা। তাছাড়া আপনি তো খবর দেন নি।
আসলে সময় পাই নি।
আমার কথা ভাবার সময় কি আপনার কখনো ছিলো ? অনুযোগের গলায় বলে সে, ঘরটা পড়ো পড়ো, বললাম চারটা দেয়াল তুলে টিন লাগানোর ব্যবস্থা করে দিন। দেবো দেবো করে কয়েক বছর পার করে দিলেন। সাদুকে কথার জালে আটকে রেখে খেলায় মেতে ওঠে মহিমা।
ওয়াদা করলাম, সাদু টেকো মাথায় হাত বুলালো, বর্ষা পার হলেই তোর দাবী পুরণ করে দেবো-।
পাক্কা ?
পাক্কা। সাদু হাত বাড়িয়ে মহিমার মাথায় রাখে, তোকে ছুঁয়ে ওয়াদা-
খবরদার, হঠাৎ ক্ষেপে ওঠে মহিমা, আমাকে ছুঁয়ে কোন ওয়াদা নয়।
ঠিক আছে, ঠিক আছে, সাদু পাঞ্জাবীর পকেট থেকে মুঠো ভরে টাকা বের করে, এগুলো তুলে রাখ।
মহিমা নেয়। ভাবে, টাকার গায়ে তো কলঙ্কের কিংবা পাপের কোন দাগ নেই। টাকাই মানুষের ঈশ্বর, খোদা। টাকা নির্দোষ। ট্র্যাংকে টাকাটা রেখে ফিরে দাঁড়াতেই কুপি নিবিয়ে দিলো সাদু। ঝুপ করে অন্ধকার সচরাচরকে গ্রাস করে নিলো। সাদু গ্রাস করলো ওকে। কিন্তু অল্পক্ষণেই নেতিয়ে পড়ে হাঁপাতে থাকে সাদু। বয়েস ওকে গ্রাস করেছে। মহিমা তার উন্মুক্ত বুকে সাদুর মুখটা চেপে ধরে রইলো কিছুক্ষণ। সাদুর শ্বাস-প্রশ্বাস স্বাভাবিক হয়ে আসে। সে সিগারেট ধরিয়ে মহিমার মাথাটি বাহুতে নিয়ে শুয়ে থাকে। নিঝুম রাত অরুমার ওপর চেপে বসে ঝিঁ ঝিঁ শব্দে নিমগ্ন হয়ে আছে, শঙ্খের ভাটির দিক থেকে ভেসে আসছে বিলম্বে ফেরত আসার নৌকার মাঝির গলার ক্লান্ত গানের সুর, বাজার ফেরতা একদল পাহাড়ীর কলবল করা আওয়াজ এলো ভেসে, রাস্তার ওপার থেকে উড়ে এলো বর্মাদের কুকুরের ঘেউ ঘেউ।
মহিমা ? সাদু শেষ হওয়া সিগারেটটা ছুঁড়ে দেয় ঘরের কোণে।
উঁ!
তুই কি ঘুমিয়ে গেছিস?
না।
শোন একটা দরকারী কথা বলি-।
বলেন, মহিমা অক্টোপাসের মতো সাদুর গলা জড়িয়ে ধরে।
তোকে আমি মুক্ত করে দিলাম-। সাদুর গলা কেঁপে যায়।
চকিতে মহিমা তথা কাজল উঠে বসে। অন্ধকার হাতড়ে সে ব্লাউজটা গায়ে ছড়িয়ে নেয়, শাড়ীটা পেঁিছয়ে নেয় শরীরে, আলুথালু চুলগুলোকে শাসন করে কুপীটা জ্বালিয়ে খাটের পাশে রেখে সোজা হয়ে দাঁড়ায়। হঠাৎ আলোর ঝলকানিতে সাদুর চোখ ঝাপসা হয়ে যায়। সে চোখ রগড়ে দেখে মহিমা একটি প্রশ্নবোধক চিহৃ হয়ে তাকিয়ে আছে তার দিকে।
মেয়ের বিয়ের সম্বন্ধ এসেছে, সাদু বিষন্ন গলায় বলে, আমার জন্যে ওর জীবন নষ্ট হোক সেটি আমি চাই না মহিমা। তুই কি চাস্?
না, চাই না। মহিমা পরিষ্কার গলায় বলে, আপনার সাথে তো আমার দেহ ছাড়া মনের কোন সম্পর্ক নেই, নেই কোন সামাজিক সম্পর্ক। আপনি আমাকে দেহের সম্পর্ক থেকেই তো মুক্তি দিতে চাইছেন, তাই না সাদু?
হ্যাঁ তাই, সাদু উঠে বসে জামা গায়ে দেয়, তবে তোকে দেয়া ওয়াদা অনুযায়ী বর্ষা শেষ হলেই ঘরটা হয়ে যাবে। তুই আমাকে অনেক দিয়েছিস। অন্ততঃ অতৃপ্তি নিয়ে আমি মরবো না। ভালো থাকিস।
দরোজা খুলে সাদু অন্ধকারে আড়াল হয়ে গেলে মহিমা বুকের ভেতর একরাশ শূন্যতা অনুভব করে। এই সাদু তাকে গত পাঁচ বছর এই অরুমাতে সবকিছু থেকে আগলে রেখেছে। কতো শকুনীর দল তাকে খাবলে খেতে চেয়েছে, করতে চেয়েছে ভিটে ছাড়া, পারে নি সাদুর কারণে। রাতের পর রাত, মাসের পর মাস সাদু তার শরীরটা নিয়ে পাগলের মতো মেতেছে। কখনো আঘাত করে নি, কষ্ট দেয় নি, কৃপণতা দেখায় নি। একটি ছাতার মতো তাকে ছায়া দিয়ে গেছে অবিরত। আজ থেকে সেই আশ্রয় থাকবে না তার, থাকবে না নির্ভয়ে বেঁচে থাকার অবলম্বন এসব ভেবে নিঃস্বতায় ভরে গেলো কাজলের বুক। একা হাহাকার তার বুকের ভেতর উথাল-পাথাল করতে লাগলো। সে মেঝেতে বসে পা টান টান করে অঝোরে কান্না শুর করলো। তার মনে হলো শুধু দেহ নয় সাদু তার মনটাকেও অজান্তে বন্দী করে ফেলেছিলো। সেই মনটা হঠাৎ শূন্যতার এক নিঃসীম গহবরে পড়ে হাহাকার করে উঠেছে।
কেন কাঁদছো কাজল? অমিত মাষ্টারের কন্ঠস্বরে তটস্থ হয়ে ওঠে কাজল। সে তাড়াতাড়ি চোখ মুছে উঠে দাঁড়িয়ে দেখে দরোজার চৌকাঠ ধরে দাঁড়িয়ে আছেন মাস্টার।
আপনি? এতো রাতে? কাজল উৎকন্ঠিত হয়।
এখনো নিশি রাত হয় নি কাজল, মাস্টার হাসে, তুমি ভয় পেয়ো না।
কিন্তু আপনি হঠাৎ? কথা হারিয়ে ফেলে কাজল, খুঁজে পেতে প্যাকেট বের করে সিগারেট ধরায় ত্রস্ত হাতে।
আমি সাদুর সব কথা শুনেছি, অমিত মাস্টার ভেতরে পা বাড়ায়, ওর শুভবুদ্ধির উদয় হয়েছে।
কিন্তু আমি---। কাজল বাক্য শেষ করতে পারে না।
জীবন তো একটা কাজল, ওটা নিয়ে এতো বেশি দুর্ভাবনার কিছু নেই, মাস্টার এসে খাটের কিনারে বসে, আমরা নতুন ভাবে শুরু করবো।
সব জেনেশুনে, আমার অতীত-বর্তমান- কাজল কেমন দিশেহারা বোধ করে।
আমরা বর্তমানটাকে বদলে নেবো ভবিষ্যতের জন্যে কাজল, অমিত মাষ্টার হাত বাড়িয়ে কাজলকে খাটে বসায়, আমার অতীতও তোমার মতো-বহু নারী হয়ে তোমার কাছে আসা।
তার মানে সোনায়-সোহাগা? কাজল হেসে ওঠে।
কাল থেকে সবাই তা-ই দেখবে, অমিত পরম যত্নে কাজলের মাথাকে কাঁধে ধারণ করে, মনে রেখো কাজল, অতীত নয় বর্তমানকে দিয়েই আমরা ভবিষ্যত রচনা করবো। আজ রাতই হোক আমাদের বাঁকবদলের রাত।
কাজল মুখ ফুটে কিছু বলে না। এক নির্ভার অনুভূতি তার দেহমনকে সম্পূর্ণ গ্রাস করে নেয়। তার ভীষণ ঘুম পেতে থাকে। সে অমিতের বাহুবন্ধনে ঘুমিয়ে পড়ে।
লেখক লেখাটি পাঠিয়েছেন পেনসেলভেনিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, থেকে
আপলৌডঃ ১০ জুলাই ২০০৯


কাল থেকে
কাল থেকে সবাই তা-ই দেখবে, অমিত পরম যত্নে কাজলের মাথাকে কাঁধে ধারণ করে, মনে রেখো কাজল, অতীত নয় বর্তমানকে দিয়েই আমরা ভবিষ্যত রচনা করবো। আজ রাতই হোক আমাদের বাঁকবদলের রাত।
PR: wait...
I: wait...
L: wait...
LD: wait...
I: wait...
wait...
Rank: wait...
Traffic: wait...
Price: wait...
C: wait...