London Sunday 1 August 2010

মেঘ রহস্য বালিকা

তীর্থক আহসান রুবেল

শেষ দৃশ্য

গল্পের শেষ দৃশ্যটি পরিচিত। কোনো এক ঝড়-বৃষ্টির সন্ধ্যায় কাক-ভেজা অবস্থায় ছেলেটি আবারও দেখা পায় মেয়েটির। যতোটা ভেবেছিলো, তার চাইতেও অনেক বেশি ভাল লাগছে মেয়েটিকে দেখে। ছেলেটি অপলক চেয়ে থাকে, কতো-কতো দিন পর দেখা। ছোটো একটি কথা শুধু বলবে সে মেয়েটিকে। কিন্তু তার আগেই মেয়েটি তার সামনে এসে হাতটি ধরে ফেললো। চোখে-চোখ রাখলো; সে-ভয়ংকর দৃষ্টি। বললো, আমি জানি তোমার অনেক কষ্ট, অনেক দুঃখ পাথর হয়ে জমে আছে তোমার বুকে। সারাটা জীবন দূরে কিংবা খুব কাছে থেকে দিয়ে গেছো সব। অথচ পাওনি অতোটুকুও যতোটুকু না পেলে নয়। আজ আমি তোমার সব দুঃখ-কষ্ট দূর করে দেবো। তোমার যতো না পাওয়া, সব আজ তোমার হবে। বিনিময়ে আজ এ-সন্ধ্যা থেকে সকাল পর্যন্ত তুমি আমার সঙ্গে থাকবে।

ছেলেটা শুধু একটা কথা বলবে মেয়েটিকে। অথচ কি এক মায়াজালে আটকা পড়ে গেলো বুঝলো না। স্বপ্ন-ঘোরে ঘুরতে-ঘুরতে কখন যেনো মেয়েটির প্রাসাদে চলে এলো এবং খুব অল্প সময়ের মাঝেই মেয়েটি ঝাঁপিয়ে পড়লো ছেলেটির উপর। সকালে ছেলেটি যখন চোখ খুললো, খুব সহজেই বুঝতে পারলো মুমূর্ষু সে। ভালোমতো চোখ মেলে দেখলো তার সারা শরীর ক্ষত-বিক্ষত এবং রক্তাক্ত। আর পাশেই হাসি-মুখে বসে রক্তের মাঝে আঙ্গুল বুলাচ্ছে মেয়েটি। ছেলেটি অবাক চোখে তাকিয়ে থাকল মেয়েটির দিকে। মেয়েটি বললো, কি আমাকে এখনো চিনতে পারোনি তুমি? ছেলেটি অনেক চেষ্টা করেও কোনো শব্দ বের করতে পারলো না গলা দিয়ে। মেয়েটি আবার বললো, বুঝতেই যখন পারছো, আমি ডাইনি, তখন আর দুঃখ-কষ্টকে দূর করার আশায় কিংবা না পাওয়াকে পাবার আশায় এখনো বসে আছো কেনো? ছেলেটি উঠে বসলো, মেয়েটি হাত-দুটি ধরলো। ছেলেটির গলা থেকে গোঙগানোর মতো শব্দ হচ্ছে, কিন্তু কোনভাবেই বলতে পারছে না, যা সে বলবে। ছেলেটির চোখ ফেটে জল বেরুচ্ছে। হঠাৎ বের হলো .......

মেয়েটির শুরুঃ

মেয়েটি ছোটো থেকেই যে-কথাটি শুনে আসছে, তা হলো 'খুব মায়াবী মুখটি তোমার'। চোখ-দুটি বুকের খুব ভিতরে তুফান বইয়ে দেয়। তারপর যখন ক্লাস সেভেন কি এইট, তখন থেকেই আশেপাশের ছেলে-ছোকরা কিংবা সহপাঠী যারা, সবাই মায়াবী মুখ আর ভয়ঙ্কর জ্বালা ধরা চোখের প্রশংসা আর তার চাইতেও অধিক হারে ভাল-লাগা, ভালবাসার কথা বলতে লাগলো। মেয়েটি প্রথমে এড়িয়ে যেতে লাগলো; এক সময় সরাসরি না বলা শুরু করলো। কিন্তু যতোই না করুক বারবার একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটতে লাগলো। ছেলেদের দল ঘুরে-ফিরে আসতে লাগলো। আর সেও যথারীতি না বলতে লাগলো। এভাবে একদিন মেয়েটি বড়ো হয়ে উঠলো। ছেলেগুলো চলে গেলো, নতুন ছেলেরা আশেপাশে চলে এলো। মেয়েটির না বলা থামল না। আসলে মেয়েটি নানা প্রতিকূলতার মাঝে না শব্দটাকে একটা অবলম্বন হিসেবে বেছে নিয়েছিলো। আর এই না এর মাঝে কীভাবে যেনো বন্দী হয়ে গেলো সে। ঠিক এমনি সময় ছেলেটি মেয়েটির কাছের মানুষ না হলেও, পাশের মানুষ হিসেবে চলে আসলো। কিন্তু কীভাবে কী হলো, কেউই তা বুঝলো না। হঠাৎ একদিন মেয়েটি অন্য একজনের সাথে ভয়ঙ্কর এক প্রেমে জড়িয়ে গেলো।

ছেলেটির শুরুঃ

পরিবারে ঝামেলা থাকায় ছোট হতেই ছেলেটিকে ঘরে বন্দী জীবন কাটাতে হয়। সকালে স্কুল আর স্কুল থেকে ফিরে ঘরে বন্দী। বাইরে খেলতে যেতে পারতো না। সহপাঠী শুধু না, বাবা-চাচার বয়সীরাও একান্ত পারিবারিক সমস্যাগুলো নিয়ে ঠাট্টা করত। আর সহপাঠীরা এতো বেশি লজ্জা দিতো যে, মাঝে-মাঝেই মারামারি হয়ে যেতো। ফলে বন্দী জীবনটাই বেছে নিতে হলো, এমন একটা সময় যখন মন চাইতো খেলতে, ঘুড়ি উড়াতে কিংবা গায়ে কাদা-ধূলা মাখতে। তারপর একদিন কৈশোরের শেষ বেলাতে বাড়ী থেকে বের হলো। নতুন জায়গা, নতুন মানুষ। কেউ সেখানে তাকে চিনে না। ফলে আর দশ জনের সাথে মানুষ যেমন ব্যবহার করে, তার সাথেও তাই। ছেলেটি আবিষ্কার করে বহুদিনের না পাওয়াকে। যখন কেউ ছেলেটির মাথায় হাত দিয়ে কিংবা পিঠে হাত বুলিয়ে কথা বলত তখন অনেকেই অবাক হয়ে দেখত ছেলেটি মাথা নিচু করে চোখের জল ফেলছে। কিন্তু ছেলেটি কোনোদিনই বলতে পারেনি কারণটা। কিন্তু মানুষের সঙ্গে মেশা কিংবা মানুষের খুব কাছাকাছি থাকাটা তার নেশা হয়ে গেলো। মানুষের একটু স্নেহ কিংবা মমতার জন্য সে কাঙ্গাল হয়ে গেলো। কোন বাঁধাই তাকে মানুষের মিছিলে যাওয়া আটকাতে পারলো না। এরই মাঝে একদিন সে মেয়েটিকে আবিষ্কার করলো অন্যভাবে। এ এক অন্য বাঁধন। সে বুঝল, হঠাৎ করে যা কিছু অনেক পরিমাণে পাওয়া তা আসলে একেকটি পাওয়ার কাছে কিছুই নয়। ছেলেটির বুক জ্বলে গেলো। মেয়েটার একটা নাম দিলো সে, যা একান্ত নিজের।

ছেলেটি ও মেয়েটির একসাথের গল্প সঙ্গে আরো কেউঃ

ছেলেটি অবশেষে মেয়েটিকে বলেই ফেললো ভাল-লাগা আর ভালবাসার কথা। মেয়েটি স্বভাব-myjf না বললো। ছেলেটি মেনে নিলো কি নিতে পারলো না, সেটা গৌণ হয়ে গেলো। মেয়েটি অন্য একজনের সাথে ভয়ঙ্কর এক প্রেমে জড়িয়ে গেলো। ভয়ঙ্কর শব্দটার জন্য ভয় পেতে হবে না। কারণ ভয়টা শুধু মাত্র মেয়েটার জন্য। নব্য-প্রেমিকটির বহুদিনের প্রেমের সম্পর্ক ছিলো সহপাঠীর সাথে। মেয়েটি তা দেখেছে। কিন্তু দেখেনি যা, তা হলো ছেলেটি মৌবাইলে আরো কিছু সম্পর্ক তৈরী করেছিলো এবং তার একটা প্রাইভেট ডেইটিং কামরা ছিলো। যদিও পুরোটাই শোনা কথা। তবে এটা কোনো মুখ্য ব্যাপার না। মুখ্য ব্যাপার হলো, মেয়েটি খুব কাছ থেকে দেখলো প্রেমিক আর তার সহপাঠীর দূরন্ত প্রেম। তার ভেতর কেমন যেনো একটা না পাওয়ার বেদনা জেগে উঠলো। ধীরে-ধীরে তার ভেতর একটা হিংসা বাসা বাঁধলো। মেয়েটা স্বপ্ন দেখতে লাগল, প্রেমিকটি তাকে একদিন মেঘের দেশে বেড়াতে নিয়ে যাবে। মেঘের দেশের ঘাস-ফড়িং তার সাথে খেলবে। প্রেমিকটি বকুল ফুলের মালা গেঁথে দেবে তাকে। প্রেমিকটি অতীব ভালো খেলোয়াড়। বিগত দিনের মেয়েগুলো থেকে এই মেয়েটা একটু ভিন্ন। কাজেই নতুন একটা রহস্য উন্মোচনের সুযোগটা সে হারাতে চাইলো না। কাজেই সে আগের এক প্রেমিকাকে বললো, নতুন একটা রহস্য উন্মোচনের সুযোগ পেয়েছি, আমি আবিষ্কার আর রহস্য উন্মোচনের মাঝেই নিজেকে দেখতে ভালবাসি। আর এটাই আমি। ভালো লাগলে অপেক্ষায় থেকো, না লাগলে সরে যেও। এ-কথা বলে পুরোনো প্রেমিকাকে বিদায় জানিয়ে দিলো মেয়েটির সামনেই। মেয়েটি খুব উপভোগ করলো ঘটনাটা। তারই জন্য এতোদিনের একটা সম্পর্ক ভেঙ্গে গেলো ! তার মানে .....।

প্রেমিকটি কিন্তু মোবাইলটা ঠিক রাখলো যথারীতি। আর তারপর মেয়েটির দিকে তাকিয়ে বললো, সবচাইতে দূরের যে-মেঘ, সেটা তোমার। চলো আমরা সবচাইতে দূরের মেঘের সন্ধানে বেরিয়ে পড়ি। মেয়েটি সরল বিশ্বাসে সবটুকু প্রেম উজাড় করে ঢেলে দিল ছেলেটির সুধাপাত্রে। ছেলেটি সেই সুধা পান করে নিয়মিত। আর সবচাইতে দূরের মেঘটির সন্ধান করে। এরই মধ্যে কেটে গেলো কত পূর্ণিমা-অমাবস্যা, চলে গেলো কত গ্রীষ্ম-বসন্ত; কিন্তু কাঙ্খিত মেঘের সন্ধান আর পায়নি মেয়েটি। অতঃপর এক তীব্র শীতের সকালে মেয়েটি আবিষ্কার করে চারপাশে খোলা মাঠ। যতদূর চোখ যায় শূন্যতা আর শূন্যতা। প্রেমিকটি ওর জন্য রেখে গেছে ছোট একটি চিঠি। যেখানে লেখা, নতুন একটা রহস্য উন্মোচনের সুযোগ পেয়েছি , তাই নতুন কিছু আবিষ্কারের আশায় চলে গেলাম। আমি আবিষ্কার আর রহস্য উন্মোচন এর মাঝেই নিজেকে দেখতে ভালবাসি। আর এটাই আমি। ভাল লাগলে অপেক্ষায় থেকো, না লাগলে সরে যেও। মেয়েটির মনে পড়ে গেলো সব। আকাশের দিকে চেয়ে কি দেখল কেউই জানলো না কোনোদিন। মেঘের দেশে নিয়ে যাবে বলে প্রতারক প্রেমিকটি তাকে ফেলে রেখে গেছে রাস্তায়।

এরও বহুদিন পর মেয়েটি জানলো, একজন আজো অপেক্ষায় আছে। পথ চেয়ে বসে আছে তারই অপেক্ষায়, যে-রাজকুমার হতে পারেনি। পারেনি কোনোদিন পঙ্খীরাজ ঘোড়া নিয়ে সামনে এসে ময়ুরপঙ্খীর আসনে বসিয়ে ঘুরতে নিয়ে যেতে। না ছেলেটি রাজকুমার হতে পারেনি। হয়েছে কবি। আকন্ঠ বিষ পান করতে-করতে মেয়েটিকে নিয়ে লিখে গেছে একের পর এক ভালবাসার পংক্তি। আজ তাদের দেখা হবে; আজ সন্ধ্যায়।

শেষ দৃশ্য বাকীটুকুঃ

ছেলেটির গলা থেকে একটা শব্দ হচ্ছে, কিন্তু কোনোভাবেই বলতে পারছে না, যা সে বলবে। ছেলেটির চোখ ফেটে জল বেরুচ্ছে। হঠাৎ বের হলো, মেঘবালিকা তুমি ভাল আছো তো? মেয়েটি ডাইনীর মতো হাসতে গিয়েও হঠ্যাৎ থমকে গেলো। এ-নামটিই তো দিয়েছিলো ছেলেটি একদিন। ছেলেটির চোখের দিকে তাকাল খুব ভালো করে। না, প্রতারক কোনো ছায়া নেই সেখানে। খুব যেনো ঠান্ডা। হঠাৎ মেয়েটির চোখ ফেটে এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়লো ছেলেটির হাতে।

সমাপ্তি-১

অতঃপর তাহারা সুখে শান্তিতে বসবাস করিতে লাগিলেন।

সমাপ্তি-২

ছেলেটি প্রতিরাতেই এমন একটি স্বপ্ন দেখে ঘুম থেকে জেগে উঠে।

আপলৌড ০৯ জুলাই ২০০৯

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

The content of this field is kept private and will not be shown publicly.
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd>
  • Lines and paragraphs break automatically.

More information about formatting options