• জাতীয় সম্পদ রক্ষায় ‘জাতীয় কমিটি’র বাস-যাত্রাঃ ঢাকা থেকে কক্সবাজার
    মেহেদী হাসান

     

     

     

     

     

     

     

     

     

     

     

     

     

     

     

     

     

     

     

    বাংলাদেশে সমুদ্রের গ্যাস ব্লক-গুলো বিদেশী বহুজাতিক কৌম্পানীগুলোর হাতে ইজারা দেওয়ার সরকারী-সিদ্ধান্ত ঘোষণার প্রতিবাদে চলতি মাসের ১১ থেকে ১৪ তারিখ পর্যন্ত ঢাকা থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত বাস-যাত্রা সম্পাদন করেছে তেল-গ্যাস, খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি । উল্লেখ্য, প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানী উপদেষ্টা ড. তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী প্রচার-মাধ্যমে দেয়া বক্তব্যে জুলাই মাসের মধ্যেই বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের জল-সীমাতে অবস্থিত গ্যাস-ব্লকগুলো বহুজাতিক কৌম্পানীদের হাতে তুলে দেয়ার সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে দিয়েছিলেন।

    জাতীয়-সম্পদ বিদেশীদের হাতে তুলে দেয়ার সরকারী তৎপরতার প্রতিবাদে আয়োজিত বাস-যাত্রাতে অংশ নেন জাতীয় কমিটির নেতা-কর্মীসহ বিভিন্ন সংগঠনের লোকজন। ঢাকা থেকে যাত্রা শুরু করে কক্সবাজার পৌঁছা পর্যন্ত পথে-পথে বেশ কিছু পথ-সমাবেশে বৃক্ততা দেন কমিটির নেতারা।  ঢাকা থেকে কক্সবাজারের পথে শনির আখড়া, কাঁচপুর, সোনার গাঁ, কুমিল্লা, ফেনী, মীরসরাই, চট্টগ্রাম, পটিয়া, চিরিংগা বাজারে পথ-সমাবেশের আয়োজন করা হয়। পথ-সমাবেশগুলোতে বক্তব্য রাখেন জাতীয় কমিটির আহ্বায়ক প্রকৌশলী শেখ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ ও সদস্য সচিব আনু মুহাম্মদ। এছাড়াও জাতীয় কমিটির সাথে সম্পৃক্ত রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ, বিশেষজ্ঞ এবং সংগঠকরাও বক্তব্য রাখেন সমাবেশগুলোতে। কক্সবাজার-এর সমাবেশে গণসংস্কৃতি ফ্রন্টের নেতা শিল্পী কামরুদ্দিন আবসারের নেতৃত্বে গণসঙ্গীত পরিবেশিত হয়।

    যাত্রা-পথের সমাবেশগুলোতে বক্তারা প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানি উপদেষ্টার বক্তব্যকে অসাংবিধানিক এবং জনগণের স্বার্থ-বিরোধী আখ্যা দেন। জাতীয় কমিটি জানায় দেশের অ-নবায়নযোগ্য সম্পদের মালিক দেশের জনগণ; তা কারও ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। বক্তারা বলেন, সরকার জনগনের সম্পদের ব্যবস্থাপক বৈ কিছু নন। সরকারের দায়িত্ব জনগণের সম্পদকে হেফাজত করা। শিল্প-কারখানার ভিত্তি স্থাপন করার মাধ্যমে বেকারত্ব দূর করা। জাতীয় কমিটি জানিয়েছে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের শতকরা ৯৪ ভাগ মানুষ গ্যাসের সুবিধা থেকে বঞ্চিত; এই বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে সুবিধা-বঞ্চিত রেখে কোন দেশের পক্ষে ‘উন্নয়ন’ ঘটানো সম্ভব নয়। বক্তারা উল্লেখ করেন বাংলাদেশের সম্পদ সীমিত; এই সীমিত সম্পদকে যথাযথভাবে কাজে লাগানোর মাধ্যমেই প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব। জাতীয় কমিটির দাবীঃ সীমিত-সম্পদ বহুজাতিক কোম্পানির কাছে শতকরা ৮০ ভাগ রপ্তানির শর্তে ইজারা দেওয়ার যে-প্রক্রিয়া সরকার চূড়ান্ত করতে যাচ্ছে তা অবিলম্বে বাতিল করতে হবে। এছাড়াও সমুদ্রের ১০টি ব্লক কনোকো ফিলিপস (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র) এবং টাল্লোর (আয়ারল্যান্ড) হাতে তড়িঘড়ি করে তুলে দেওয়ার তৎপরতার জন্য জ্বালানী সচিব ড. তৌফিক-ই-ইলাহীকে অবিলম্বে দায়িত্ব থেকে অপসারণের দাবী জানায় জাতীয় কমিটি।

    গন-সংযোগের লক্ষ্যে আয়োজিত বাস-যাত্রাতে প্রকৌশলী শেখ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ বলেন, ‘‘শতকরা ৮০ ভাগ গ্যাস বহুজাতিক কৌম্পানীকে রপ্তানির শর্তে পিএসসি চুক্তি করা হলে তা হবে দেশের জনগণের স্বার্থের সাথে বেঈমানী। তিনি উল্লেখ করেন অতীতে এ-ধরনের অসম চুক্তির ফলে বাংলাদেশের ভয়াবহ সর্বনাশ হয়েছে। মাগুড়ছড়া এবং টেংরাটিলার ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞের জন্য দায়ী অক্সিডেন্টাল এবং নাইকোর কাছ থেকে এখন পর্যন্ত কোন ক্ষতিপূরণ আদায় করতে পারেনি বাংলাদেশের সরকার। শেখ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ জানান এখন যদি আবার এ-ধরনের চুক্তি হয় তাহলে বাংলাদেশের পুরো সম্পদ জনগণের হাতছাড়া হয়ে যাবে। তিনি উল্লেখ করেন উত্তোলিত ৮০ ভাগ গ্যাস তরলায়িত করে ভারতে রপ্তানি করা হবে বলে জানানো হলেও এ-তথ্যটি ঠিক নয়; কারণ শতকরা ৮০ ভাগ নিয়ে যাবার পর বাকী যে ২০ ভাগ থাকবে সে-অংশ গভীর সমুদ্র থেকে দেশের অভ্যন্তরে আনতে যে-খরচ হবে তা খরচ অনুপাতে লাভজনক হবে না। প্রকৌশলী শহীদুল্লাহ উল্লেখ করেন এ-ধরনের একটি পরিস্থিতি তৈরী হয়ে গেলে বাকী ২০ ভাগ গ্যাসও বহুজাতিকগুলোর কাছে দেশীয় দরে বিক্রি করে দেবার বাস্তবতা তৈরী করা হবে। এভাবে চলতে থাকলে শেষ-পর্যন্ত বাংলাদেশের পুরো গ্যাসই রপ্তানি হয়ে যাবে।

    জাতীয় কমিটি জানায় বাংলাদেশের জনগণ কখনো এ-ধরনের শর্ত মেনে নেবে না। অতীতে যেভাবে জীবন দিয়ে কয়লা ও গ্যাস রপ্তানী ঠেকানো হয়েছে প্রয়োজন পড়লে ঠিক সে-রকমভাবেই সামনের দিনগুলোতে জাতীয় সম্পদ রক্ষার লড়াইয়ে নামবে বলে জানিয়েছে জাতীয় কমিটি।

    জাতীয় কমিটির সদস্য সচিব অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ তার বক্তব্যে জানান সম্পদ জনগণের কাজে লাগবে নাকি তা বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়াবে তা নির্ভর করে সে-দেশের সরকারের দৃষ্টিভঙ্গীর উপর। এ-প্রসঙ্গে তিনি জানান নাইজেরিয়ার মূল্যবান সম্পদ সে-দেশের জনগণের বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সে-দেশের সরকার অ-নবায়নযোগ্য প্রাকৃতিক সম্পদ বহুজাতিক কৌম্পানীর মুনাফার স্বার্থে বিকিয়ে দিয়েছে; ফলে সম্পদে সমৃদ্ধ হয়েও নাইজেরিয়ার মানুষ চরম দরিদ্রতার মধ্যে দিনাতিপাত করছে। ভিন্ন-নজীর উল্লেখ করে অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ জানান কিউবা, বলিভিয়া, ভেনেজুয়েলা, ইকুয়েডর, আল-সালভাদরের মতো দেশগুলো সীমিত-সম্পদ জনগণের স্বার্থে ব্যবহার করে শিল্প-কৃষি-শিক্ষা-স্বাস্থ্য ব্যবস্থার প্রভূত উন্নতি সাধন করেছে।

    সরকারের বরাবরে উত্থাপিত দাবীতে বাংলাদেশের অ-নবায়নযোগ্য প্রাকৃতিক সম্পদের উপর জনগণের কর্তৃত্ব এবং নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করাসহ জনগণের চাহিদা না মিটিয়ে গ্যাস রফতানি সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করার কথা বলা হয়েছে। এছাড়াও জনগণের সর্বোত্তম ভোগ-ব্যবহারের স্বার্থে দেশের প্রাকৃতিক-খনিজ সম্পদকে কাজে লাগানোর সাথে-সাথে অসম পিএসসি (উৎপাদন অংশীদারিত্ব চুক্তি) বাতিল করা ও দেশীয় প্রতিষ্ঠান বাপেক্স এবং পেট্রোবাংলাকে পঙ্গু করে দেয়ার সরকারী-নীতি থেকে বেরিয়ে আসার দাবী করেছে জাতীয় কমিটি।

    ২৫ জুলাই ২০০৯

আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন