সংবাদ পরিক্রমা
সংবাদ প্রতিবেদন
- পরিবেশ-বিধ্বংসী চিংড়ী রপ্তানী বন্ধ করা হোকসাক্ষাতকার দিয়েছেন:ফজলুল কাদের চৌধুরী

ফজলুল কাদের চৌধুরী কক্সবাজার-ভিত্তিক পরিবেশবাদী প্রতিষ্ঠান গ্রীন কক্সবাজার এর নির্বাহী পরিচালক। তিনি দীর্ঘ-দিন ধরে কক্সবাজার জেলায় বাণিজ্যিক চিংড়ি-চাষ পর্যবেক্ষণ করছেন, বিভিন্ন সময়ে এর ক্ষতিকর দিকগুলো নিয়ে আন্দোলন করেছেন। চিংড়ি-চাষের ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে তিনি বইও লিখেছেন। ফজলুল কাদের চৌধুরীর সাক্ষাতকারটি নিয়েছেন প্রিসিলা রাজ।
আপনার প্রতিষ্ঠান গ্রীন কক্সবাজার সম্পর্কে কিছু বলুন।
গ্রীন কক্সবাজার একটি সরকার নিবন্ধিত সংস্থা। আমরা স্বাস্থ্য, পরিবেশ ও শিক্ষা নিয়ে কাজ করছি। কক্সবাজারে যে-সবুজ পাতাগুলো এখনও দেখা যাচ্ছে, যে-প্যারাবন দেখা যাচ্ছে তার পেছনে আমাদের কিছুটা অবদান আছে বলে আমরা বলে মনে করি।কিন্তু অনেক কিছুইতো ধ্বংস হয়েছে ইতিমধ্যে
ধ্বংস হয়েছে কিন্তু যেগুলো আছে সেগুলোও আপনারা দেখতে পেতেন না। আমাদের সোনাদিয়া বলে একটা দ্বীপ আছে। সোনাদিয়াতে একটা গভীর প্যারাবন ছিলো...সোনাদিয়া প্রাকৃতিক নাকি ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের লাগানো গাছ দিয়ে তৈরি?
ফরেস্টের লাগানো আছে প্রাকৃতিকও আছে। সব মিলিয়ে এটা খুব সমৃদ্ধ একটা প্যারাবন ছিলো। জীব-বৈচিত্র্য খুব সমৃদ্ধ ছিলো। বিরল প্রজাতির কাঁকড়া, কচ্ছপ, ব্যাঙ, মাছ ছিলো। এক-সময় বিএনপি দলীয় সংসদ-সদস্য আলমগীর মোহাম্মদ মাহফুজউল্লাহ ফরিদ কেরোসিন দিয়ে সেখানে কাঁচা-গাছ জ্বালিয়ে দিয়ে চিংড়ি প্রকল্প করেছেন। বিএনপি আমলের মাঝামাঝি সময়ের ঘটনা এটা। এর বিরুদ্ধে গ্রীন কক্সবাজার আন্দোলন করে; তখন আমার বিরুদ্ধে ২৫ কোটি টাকার একটা মামলা হয়েছিল। তবে এই মামলা উনি তুলে নিতে বাধ্য হয়েছেন গ্রীন কক্সবাজার ও সাংবাদিকদের যৌথ আন্দোলনের মুখে।আপনারা কোনো মামলা করেছিলেন?
আমরা করি নাই, ঢাকা-ভিত্তিক পরিবেশ আইনজীবি সংস্থা বেলা-কে দিয়ে মামলা করিয়েছিলাম।
সোনাদিয়া ছাড়া আছে কুতুবদিয়ায় বিএনপি ঘোনা। ঘোনা মানে চিংড়ি-প্রকল্প। এটা একটা বিশাল এলাকা। বেড়ি-বাঁধের বাইরে বাঁধ দিয়ে প্যারাবন কেটে চিংড়ি চাষ করা হয়েছে। এটা করেছেন জেলা বিএনপি সাধারণ সম্পাদক এটিএম নুরুল বশর চৌধুরী। তাঁর ভাই ওসমান গণি। এখন ইনি আবার উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন। ওনার আত্মীয়-স্বজনও আছে এটার মধ্যে। এটা যাতে ভাঙা না হয় সেজন্য এটার নাম দেওয়া হয়েছে বিএনপি ঘোনা।কিন্তু ওটা কি বিএনপির?
বিএনপির লোকজনের।কিন্তু বিএনপির তো না। এটা ওনাদের ব্যক্তিগত।
হ্যাঁ, ব্যক্তিগত। এটাও বিএনপি আমলের মাঝামাঝি সময়ের কথা। তখন কক্সবাজারের দায়িত্বে ছিলেন যোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী সালাহউদ্দীন আহমদ । ওনার নেতৃত্বে জাহাজ চলাচল করার কথা বলে সিগাল পয়েন্টে ঝাউগাছ কেটে একটা বিশাল জেটি নির্মিত হয়েছিল। আন্দোলন করে এটা আমরা বন্ধ করে দিতে পেরেছি। তারপর দ্বিতীয় আরেকটা জেটি ডায়াবেটিক হাসপাতাল পয়েন্টে, ওখানে প্রায় ৫০০ মিটার এলাকার ঝাউগাছ কেটে এটা করা হয়েছিল। বেলাকে দিয়ে মামলা করিয়ে এটাও বন্ধ করেছি।এই যে বিভিন্ন জায়গায় জেটি নির্মিত হয়েছে সেটা কি সরকারি জায়গা না ব্যক্তি মালিকানাধীন?
এগুলো সরকারি জায়গা।তারা লিজ নিয়েছেন?
না, কোনো লিজ নেয় নাই। কেন জেটিটা হচ্ছিল? জাহাজগুলো চলে টেকনাফ থেকে সেইন্ট মার্টিন। টেকনাফে একটা বিশাল জেটি করা হয়েছে। সেই জেটি থেকে আধা ঘণ্টার মধ্যে সেন্ট মার্টিনস পৌঁছানো যায়। ঐ জেটি ব্যবহার না করে বন্দরের ঐখানে কতগুলো কাঠের জেটি তৈরি করে ঐখান থেকে জাহাজগুলো চলাচল করছে।কেনো?
এটা করা হচ্ছে সরাসরি কক্সবাজার থেকে সেইন্ট মার্টিনস যাওয়ার জন্য।কাঠের জেটিগুলো অবৈধ নিশ্চয়ই?
সবগুলো অবৈধ। প্রাকৃতিক পরিবেশ বিরোধী এসব কাজ-কারবারের বিরুদ্ধে আমরা, মুক্তি নামের আরেকটা সহযোগী প্রতিষ্ঠান, সাংবাদিক ও এলাকাবাসী মিলে একসাথে কাজ করেছি; এভাবে আমরা জেটিগুলো বন্ধ করতে পেরেছি।কাঠের জেটিগুলো তো বন্ধ হয়নি
টেকনাফেরগুলো আছে। এখানেরগুলো বন্ধ হয়েছে। আমরা মামলা করেছি এবং আন্দোলন করেছি। এই যে কক্সবাজারকে দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত বলা হচ্ছে তা কিন্তু বলা যেতে না; জেটিগুলোর নিচে দিয়ে আপনাকে হেঁটে যেতে হতো মাথা নিচু করে।আপনি যতগুলো ঘটনা বললেন সবগুলোই বিএনপির আমলে ঘটেছে।
বিএনপির আমলে ঘটেছে। আওয়ামী লীগ আমলে এখনও ঘটে নাই তবে ঘটবে। টেকনাফ থেকে মারধোর শুরু হয়েছে, দখলবাজি শুরু হয়েছে; ওখানে মামলা-হামলা শুরু হয়ে গেছে। এগুলো যদি সরকার কন্ট্রোল না করে তাহলে বিএনপির চাইতে আরো ভয়াবহ ঘটনা ঘটতে থাকবে।আমরা যা-যা শুনলাম সবগুলোর মধ্যেই বিএনপি... পলিটিক্যাল লোকজন জড়িত?
জামায়াত, আওয়ামী লীগের লোকও আছে। বিএনপি, জামায়াত, আওয়ামী লীগ সব দলের লোক মিলেই আগের কাজগুলো হয়েছিল। নেতৃত্ব ছিল বিএনপির; যেহেতু বিএনপি ক্ষমতায় ছিলো। তো এখন আওয়ামী লীগ নেতৃত্বে থাকবে, অন্যরা সাথে থাকবে।সাক্ষাতকারের এ-পর্যায়ে ফজলুল কাদের চৌধুরী জানান ৪৭ টি জাহাজ-যোগে এখন চিংড়ির পোনা ধরার কাজ চলছে। এরা যে শুধু চিংড়ি পোনা ধরে তাই না, অন্যান্য মাছও মারছে। তিনি বলেন, দুবলার চর এবং খুলনা বেল্টে চিংড়ির মাদারের একটা বসবাসযোগ্য জায়গা আছে। আর বাংলাদেশের মানচিত্রে হাতির শুঁড়ের মতো যে-জায়গাটা সেটা টেকনাফে; এই জায়গাকে বলে এলিফ্যান্ট পয়েন্ট। এখানে চিংড়ির বিশাল একটা আবাসন আছে। এই দুইটি পয়েন্ট হচ্ছে বাংলাদেশে। থাইল্যান্ডের দিকে এরকম ১১টা পয়েন্ট আছে। এই দুইটা পয়েন্টে ৪৭টা জাহাজ প্রতিদিন মাদার ধরার নামে বিভিন্ন মাছ ধরছে। প্রতিদিন চষে বেড়ানোর কারণে ও জালের "ছিদ্রি" ছোট হওয়ার কারণে মাদার চিংড়ি ও অন্যান্য মাছ আটকা পড়ে যাচ্ছে। যে-মাছগুলোর বাজার-দাম নেই সেগুলো ফেলা দেয়া হচ্ছে। এভাবে সামুদ্রিক পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে, মাদার বিনষ্ট হচ্ছে। দুইটি চিংড়ি-আবাস ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। মাদারের ক্রাইসিস সৃষ্টি হয়েছে এবং সমগ্র এলাকায় এই মাদার ধরার নামে বিরূপ পরিবেশ সৃষ্টি হচ্ছে।
তিনি বলেন, অনেক সময় দেখা যাচ্ছে যে সমুদ্রের পানি বিভিন্ন রং ধারণ করছে। আমাদের সমুদ্রের পানি নীল, কোনো সময় এটা কালো হয়ে যাচ্ছে, কোনো সময় অন্য রং ধারণ করছে; এসবই পরিবেশ দূষণের কারণে হয়েছে।
এটা ঠিক কীসের দূষণ?
জাহাজের তেলের দূষণ এবং যে মরা মাছগুলো ফেলা হচ্ছে তার দূষণ। ১৯৯৭ সালে আমাদের মৎস্য বিভাগ ব্রিডিং মৌসুমে অর্থাৎ ডিম পাড়া মৌসুমে মাদার চিংড়ি যাতে ধরা না হয় সেজন্য নিষেধাজ্ঞা জারি করে প্রজ্ঞাপন দেয়। এটার বিরুদ্ধে জাহাজ কোম্পানিগুলো একজোট হয়ে হাইকোর্টে মামলা করে। পরে এই প্রজ্ঞাপন বাতিল করে সব-সময় মাদার ধরার অনুমতি দেয় হাইকোর্ট। হাইকোর্টে ইনজাংশনটা দিয়ে প্রজ্ঞাপন বাতিল হলো; এটা ডিফিট করার জন্য কেউ কোনো আন্দোলন করে নাই। জাহাজগুলো হরদম এখানে চলাচল করছে।হাইকোর্টের ইনজাংশন বাতিলের জন্য কোনো উদ্যোগ নেয় নাই সরকার?
না। প্রতি-নিয়ত টাকা-পয়সা পাচ্ছে; ওরা তো ঘুষ খায়।মাদার চিংড়ী ধরার পরের দূষণ-প্রক্রিয়া নিয়েও তথ্য দিয়েছেন ফজলুল কাদের চৌধুরী। তিনি জানান মাদার ধরে হ্যাচারিতে নিয়ে আসার পরে বেশ কিছু মাদার মারা পড়ে। এছাড়াও এ-প্রক্রিয়াতে অনেক দুর্বল ডিম ও দুর্বল পোনা উৎপাদিত হয়। ঐ পোনা তৈরি করার জন্য যে টেকনিশিয়ানদের নিয়োগ দেয়া হয় তারা আসে থাইল্যান্ড, ভারত, ভিয়েতনামসহ কয়েকটি দেশ থেকে? পোনাগুলো ৪০ দিন পর্যন্ত বাঁচিয়ে রাখার ব্যাপারে এই টেকনিশিয়ানদের সঙ্গে হ্যাচারি মালিকদের একটা কন্ট্রাক্ট হয়। এই পোনা বাঁচিয়ে রাখার জন্য কতগুলো এন্টিবায়ৌটিক ব্যবহার করা হয় যে-গুলো বিশ্ব-ব্যাপী নিষিদ্ধ হয়ে গেছে। এসব এন্টিবায়োটিক অসুস্থ পোনার মধ্যে দিলে পোনাগুলো কিছুদিন বাঁচে। এই বিষগুলো যে ব্যবহার হচ্ছে সেগুলো আবার সমুদ্রে যাচ্ছে আউটলেটের মাধ্যমে। সমুদ্রের বাটা মাছ টাটা মাছ এগুলো খাচ্ছে; তারপর ওগুলো খেয়ে মানুষ বিষের শিকার হচ্ছে। এছাড়াও নিষিদ্ধ এন্টিবায়ৌটিক ব্যবহার করা চিংড়ি যখন বিদেশে যায় তখন দেশের ভাবমূর্তিও নষ্ট করে।
এসব প্রকল্পে গরিব মানুষ ও নারীদের কর্ম-সংস্থানের কথা বলা হয়। মাসে ৫০০ টাকা বেতন। ডাল এবং আলু ভর্তা তাদের নিত্য-সঙ্গী। গ্লৌভসের অভাবে চিংড়ির মাথা ছিঁড়তে-ছিঁড়তে হাতে ঘা হয়ে গেছে। আরও আছে আন-হাইজিনিক বাথরুম-টাথরুমসহ নানান সমস্যা - এই হচ্ছে কর্মসংস্থান! ফজলুল কাদের চৌধুরী আরও বলেন, আমাদের এক সংগঠন হিসাব করে দেখেছে এক লক্ষ মানুষের মধ্যে মাত্র ২৩ জন মানুষের কর্ম-সংস্থান হচ্ছে এভাবে।
গভর্নমেন্ট কী বলছে? গভর্নমেন্ট বলছে চিংড়ি ১০০ পার্সেন্ট বৈদেশিক মুদ্রা আহরণকারী। সরকারী প্রশ্রয় ব্যবহার করে অনেকেই এখন আসছে হ্যাচারি করার জন্য। সুবিধাটা কেমন? সুবিধা হচ্ছে এক লাখ পোনা উৎপাদন করে পাঁচ কোটি লেখা যায়। একটা পোনার দাম এক-টাকা ধরলে পাঁচ-কোটি টাকা। এ-টাকা ট্যাক্স-ফ্রি। একটা টাকাও ট্যাক্স দিতে হয় না। এই পাঁচ কোটি টাকা দিয়ে ঢাকা শহরে বাড়ী কেনা যাচ্ছে। আরেকটা ইন্ডাস্ট্রি দেয়া যাচ্ছে; সরকার কোনো ট্যাক্স পাচ্ছে না।
বিদ্যমান পরিস্থিতি সম্পর্কে ফজলুল কাদের চৌধুরী জানান কক্সবাজারের নাজিরহাট থেকে টেকনাফের বদরমোকাম পর্যন্ত তিন লাখ পঁচাত্তর হাজার মশারি জাল আছে। একশ'টা চিংড়ি ধরার জন্য সাড়ে এগারো কেজি অন্যান্য পোনা নষ্ট হচ্ছে। তিনি বলেন, সাড়ে তিন লাখ মশারি জাল কী করছে হিসাব করে দেখেন। আমাদের সমুদ্র নষ্ট হচ্ছে; সে-সাথে আমাদের প্যারাবন যেগুলো নিয়ে ভূমি রক্ষা পাচ্ছে ভাঙনের হাত থেকে সেগুলো কেটে ফেলে চিংড়ি ঘের করা হয়েছে। জামাতের জেলা সেক্রেটারী শাহজালাল চৌধুরী বিশাল একটা এলাকা মাদ্রাসার নামে নিয়ে চিংড়ি প্রকল্প করেছেন। ঐখানে প্রায় দেড় হাজার একরের মতো প্যারাবন কেটে চিংড়ি প্রকল্প করা হয়েছে।
ফজলুল কাদের চৌধুরী বলেন, আমাদের বাড়ির পাশে প্রায় বিশ হাজারের মতো জেলে ছিলো, ওরা জাল ফেলে মাছ ধরতো; ওখান থেকে আমরা চার টাকার, পাঁচ টাকার, দশ টাকার মাছ কিনতাম। এই জেলে সম্প্রদায় এখন রিকশা চালাচ্ছে, এদের জীবিকা ধ্বংস হয়ে গেছে। এই চিংড়ি প্রকল্প এখন প্রভাবশালীদের হাতে। ছাব্বিশ প্রকারের মাছ ছিল আমাদের চকোরিয়া সুন্দরবনে; ছাব্বিশ প্রকারের মাছ নষ্ট হয়ে একটা মাত্র প্রজাতি আছে এখন।
চৌধুরী মনে করেন চিংড়ি রপ্তানী বন্ধ হলে আবার প্যারাবন জেগে উঠবে, সমুদ্র সমৃদ্ধ হবে। এছাড়াও চিংড়ীর সুবাদে বৈদেশিক মুদ্রাগুলো কার পকেটে যাচ্ছে তা তদন্তের দাবী জানান পরিবেশবাদী। তিনি চান কক্সবাজার থেকে সাতক্ষীরা পর্যন্ত মানুষ একজোট হয়ে চিংড়ি-সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে জেগে উঠুক।
[সাক্ষাতকারটি গ্রহন করা হয়েছে জানুয়ারী মাসের শেষ ও ফেব্রুয়ারী মাসের প্রথম সপ্তাহে।]
আপলৌড ২৭ জুলাই ২০০৯