• নারীবাদ এবং ভাবনা ও আত্মার মুক্তির পাঠ
    প্রিসিলা রাজ

    "পল্লী এলাকায় কাজ করার সময় এক পুলিশ কর্মকর্তা আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, 'আপনারা করেন কী? মহিলাদের জন্য কাজ করছেন বলে দাবি করছেন, এদিকে মহিলাদের ওপর ভায়োলেন্স তো বেড়েই চলেছে।' আমি উত্তর দিয়েছিলাম, 'আপনি ভুল করছেন। মহিলাদের ওপর একই-রকম ভায়োলেন্স বা তার থেকেও বেশি আগেও ছিল। এখন আমরা কাজ করছি বলেই মেয়েরা তাদের ওপর অত্যাচারের কথা বলছে, থানায় গিয়ে রিপোর্ট করছে। আগে করতো না।" বাংলাদেশে নারী অধিকার নিয়ে কাজ করেন এমন ব্যক্তির কাছে এই কথোকথন ভীষণ পরিচিত লাগছে নিশ্চয়ই? কিন্তু এ- কথাগুলো নেপালের সামাজিক ও নারী অধিকার কর্মী গীতা বিদারির। গত আগষ্ট-সেপ্টেম্বরে নেপালে নারীবাদের ওপর এক কর্মশালায় গীতা নিজের অভিজ্ঞতার ঝুলি থেকে শুনিয়েছিলেন এই গল্প।

    গত বছর মধ্য-অগাস্টে কাঠমুন্ডু লাগোয়া ললিতপুর এলাকায় দক্ষিন এশিয়ার আফগানিস্তান, পাকিস্তান, ভারত, নেপাল, শ্রীলংকা, বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের ৩৭ জন নারী মিলেছিলেন এক মাসের এই কর্মশালায়। বাংলাদেশ থেকে ছিলেন এই লেখকসহ পাঁচ জন। পেশাগতভাবে অংশগ্রহণকারীদের বেশির ভাগই উন্নয়নকর্মী; বাকিরা উকিল, গবেষক, সাংবাদিক, শান্তি আন্দোলন কর্মী এবং রাজনীতিবিদ।

    কর্মশালাটি আয়োজন করেছিলো 'সঙ্গত' নামে দক্ষিন এশিয়া ভিত্তিক নারী সংস্থা; স্থানীয় ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে ছিলো নেপালে নারী অধিকারের জন্য কাজ করে চলা সবচেয়ে বড় সংগঠন 'স্ত্রীশক্তি'। সঙ্গত-এর দুই কর্ণধার বিখ্যাত মানবাধিকার, নারী অধিকার কর্মী ও লেখক কমলা ভাসিন এবং আভা ভাইয়া কর্মশালাটি সঞ্চালনা করেন। অসাধারণ এই কর্মশালাটির শুরু এই বাংলাদেশেই, মানিকগঞ্জের কোইট্টাতে আজ থেকে প্রায় ২৫ বছর আগে। প্রথমদিকে অনিয়মিতভাবে করা হলেও সাম্প্রতিককালে প্রায় প্রতি বছর এটি অনুষ্ঠিত হচ্ছে। গত বছর ছিলো ১৩তম আয়োজন।

    এই কর্মশালায় সবচেয়ে বড় পাওয়া ছিলো একই ভৌগোলিক অঞ্চলের এতজন বিভিন্ন বয়সের পেশাজীবী নারীর সম্মিলন। অভিজ্ঞতা আর মত বিনিময়ে দেখা গেল দক্ষিন এশিয়ার বেশির ভাগ জাতি ও জনগোষ্ঠীতেই নারীর অভিজ্ঞতা প্রায় একই-রকম; পিতৃতান্ত্রিক নিপীড়নের ধরন-ধারণ প্রায় একই।  অবশ্য কোনো-কোনো জায়গায় বা সমাজে নিপীড়নের ধরন অকল্পনীয় রকমের বীভৎস। রাজস্থানের একটি গ্রামের কথা শুনেছি;  সে-গ্রামের কোন পুরুষ নিজ-গ্রামের কোন মানুষের শ্যালক হবেন না বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন সমাজপতিরা। আর তার ফল ছিল এই, গ্রামের পুরুষরা অন্য গ্রাম থেকে বৌ নিয়ে আসতেন; আর মেরে ফেলা হতো সে গ্রামে যত কন্যা-শিশুর জন্ম হতো তাদের সবাইকে। বিবমিষা জাগানো এই ব্যবস্থার কথা জানাজানি হওয়ার পর আইন করে তা বন্ধ করা হয়েছে।

    গ্রামের বা বংশের সম্মান রক্ষার নামে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানে প্রতিপক্ষের নারীদের গণ-ধর্ষণ করার 'ঐতিহ্য' সম্পর্কে আমরা সকলেই কম-বেশি জানি। এমনই এক গণ-ধর্ষণের শিকার পাকিস্তানের মুখতার বাঈয়ের প্রসঙ্গ এবং তাঁর রুখে দাঁড়ানোর কাহিনী বারবারই এসেছে কর্মশালায়।

    আলোচনা হয়েছে মানুষের ইতিহাসের বিভিন্ন পর্বে নারীর নিপীড়নের সঙ্গে সমাজের ও রাষ্ট্রের আর সব উপাদান ও প্রক্রিয়ার সম্পর্ক। উঠে এসেছে আজকের পৃথিবীতে পুঁজিবাদ কীভাবে নারী নিপীড়নের সঙ্গে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে জড়িত সে-প্রসঙ্গ।  আসলে সৌন্দর্যের নামে বর্ণবাদ ছড়িয়ে পড়ছে সারা পৃথিবীতে। গণ-মাধ্যমগুলোতে চলছে ফেয়ার এন্ড লাভলির মতো পণ্যের নির্লজ্জ বিজ্ঞাপন। পরিবারে যে মেয়েটি কালো তার যে কোনো মূল্য নেই, ফরসা না হওয়া পর্যন্ত তার যে কোনো মূল্য থাকতে পারে না উপমহাদেশীয় সমাজ-ব্যবস্থার শত-শত বছরের পুরানো সেই ভয়ঙ্কর বোধকে ক্রমশ আরো উস্কে দেওয়া হচ্ছে এসব বিজ্ঞাপনের মধ্য দিয়ে। আর এসবই করছে পুঁজি; আরো বেশি মুনাফার লোভে। অংশগ্রহনকারীদের আলোচনায় এটাও আলোচিত হয় যে এমনকি প্রযুক্তির উন্নতিও নারীর প্রাণহরণে কাজেও ব্যবহৃত হয়। এ-প্রসঙ্গে আলট্রাসনোগ্রাফী প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে গভর্স্থ শিশু নারী না পুরুষ হবে তা জেনে নিয়ে ভারতে যে-ভাবে নারী-ভ্রুন হত্যা করা হয় তা আলোচনায় আসে।

    নারীর মুক্তির সঙ্গে সারা মানব সম্প্রদায়ের মুক্তির সম্পর্ক নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা ছিলো কর্মশালার এক মূল্যবান দিক। নারী আন্দোলনের বহুবিধ ইস্যুর সঙ্গে শ্রেণী সংগ্রাম, শান্তি আন্দোলন, ধর্মীয় জঙ্গীবাদ ও রক্ষনশীলতা বিরোধী আন্দোলন, হিজড়া-সহ তৃতীয় লিঙ্গের অধিকার আন্দোলন, পরিবেশ আন্দোলন, স্বাস্থ্য আন্দোলন, কৃষকের বীজ-রক্ষা আন্দোলন কিংবা পরিবেশ-বান্ধব প্রযুক্তির প্রয়োগের দিকগুলো নিয়ে আলোচনা করেছেন বিশেষজ্ঞরা। আলোচকদের মধ্যে ছিলেন পাকিস্তানের সুপরিচিত মার্কসবাদী আজরা তালাত সৈয়দ; যিনি জন্মসূত্রে একজন আহমদিয়া মুসলিম, ভারতের পরিবেশ বিজ্ঞানী রুক্সিনি রাও ও মানবাধিকার কর্মী মনীষা গুপ্তে, নেপালের আইনজীবি স্বপ্না প্রধান মল্ল, শ্রীলংকার মানবাধিকার কর্মী সুনীলা আবেসেকারা প্রমুখ।

    এঙ্গেলস বলেছিলেন, মাতৃতন্ত্রের অবসান নারীর জন্য সবচেয়ে বড় ঐতিহাসিক পরাজয়। এইসব কর্মশালা ও উদ্যোগ নারীর শুধু নিজের অবস্থান ফিরে পাওয়া নয়, লিঙ্গ-শ্রেণী-বর্ণ-বয়স-জাতী নির্বিশেষে প্রত্যেক মানুষের অধিকার আদায়ের ভাবনা উস্কে দেয়। কমলা ভাসিন ও আভা ভাইয়া সহ আরো অনেক নারীবাদী গত চার দশকেরও বেশি সময় ধরে একদিকে নারীর অধিকার আদায়ের আন্দোলন করে চলেছেন, অন্যদিকে পৃথিবীতে প্রকৃত মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে নারীবাদকে অনিবার্য পাঠ হিসাবে গড়ে তোলার কাজে ব্যাপৃত আছেন। এই মানুষগুলোর মুখোমুখি হয়ে তাঁদের মুখ থেকে এই দীর্ঘ মানবিক সংগ্রামের কথা জানতে পারা অংশগ্রহণকারীদের জন্য নিঃসন্দেহে এক অমূল্য অভিজ্ঞতা হয়েই থাকবে।

    প্রিসিলা রাজঃ লেখক ও মানবাধিকার কর্মী

    আপলৌডঃ ০৪ অগাস্ট ২০০৯

    Pictures

আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন