• দুই পাহাড়ির ভেতরে সামরিক সম্পর্ক বলতে কি বুঝায়?
    উদিসা ইসলাম

    বাংলাদেশের  পার্বত্যঅঞ্চলের  দ্বন্দ্বগুলো আমাদের  কম-বেশি জানা ; অন্তত দূর থেকে দেখে-দেখে যতোটা জানা যায়। শান্তিচুক্তি (যেটাকে পাহাড়িদের একাংশ শান্তি চুক্তি বলতে নারাজ) হওয়ার পর পাহাড়ি রাজনীতিতে বিভক্তি আসে। শান্তিচুক্তির পক্ষের দল জনসংহতি সংস্থা (জেএসএস) আর চুক্তির বিপক্ষ দল ইউনাইটেড পিপলস ডেমৌক্রাটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ)। সাদামাটা ভাষায় এটাই দাড়ায়।  এই দুইদলের সমর্থিত আবার ছাত্রসংগঠন আছে।  পাহাড়িদের নিজেদের স্বার্থরক্ষার রাজনীতি বাইরে থেকে আমাদের কারোর বোঝার কথা না। এমনকি আমরা যারা তাদের কাছে-কাছে থাকি এবং অনেকটাই জানি দাবি করি তারাও হয়তো অনেকটাই জানেন না। জানার কথা না। ফলে তথ্য আকারে কিছু পরিস্থিতিকেই আমাদের জানার বহর বলে জ্ঞান করতে হয়।

    গত ৯ আগস্ট  ছিলো বিশ্ব আদিবাসী দিবস।  ঢাকা শহরের বিশ্ববিদ্যালয়  এলাকায় পাহাড়ের নারীদের  নিজ-পোশাকে ঘুরে বেড়াতে দেখে হয়তো আঁচ করেছেন অনেকে। বিশ্ব  আদিবাসী দিবস  উপলক্ষে  ২/৩দিন ব্যাপী অনুষ্ঠান চলেছে। ৮ আগষ্ট রাত্রে ইউপিডিএফ সমর্থিত পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের থুইকু মারমা অনুষ্ঠানস্থলের সামনের রাস্তা দিয়ে যাওয়ার পথে জেএসএস সমর্থিত পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের কর্মীদের ধাওয়া খায়। একবার  তাকে চাকমা ভাষায় গালাগালি করে আদিবাসী ফোরামে যোগ না দেওয়ায় দোষারোপ করা হয়। এক পর্যায়ে থুইকু মসজিদে পালিয়ে নিজেকে মসজিদের ভেতরে পালিয়ে আত্মরক্ষার চেষ্টা করে। ঠিক এর কিছুক্ষণ পর থুইকু সংস্কৃতির নয়া সেতু ও প্রগতির পরিব্রাজক দল (প্রপদ) নামক দুইটি সংগঠনের বন্ধুদের কাছে সহায়তা চেয়ে টেলিফোন করে।  উল্লেখ্য, গত জুন মাসে একবার থুইকুকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় লাইব্রেরীর সামনে মারধর করা হয়।

    থুইকুর বন্ধুরা  এসে ঘটনা-স্থলেউপস্থিত দীপায়ন খীসার কাছে  থুইকুকে ধাওয়া  করার কারণ জানতে চাইলে  তিনি বলেন, 'এদের ধাওয়া  করলে আপনাদের কি?' দীপায়ন খীসা মাওরুম পত্রিকার সম্পাদক। একদা  ইউপিডিএফ এর সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন, এখন জেএসএস এর কর্মী।  তিনি আদিবাসীদের নিয়ে কাজ করা একটি বেসরকারী সংস্থায় কাজ করেন। এ-সময় পাস থেকে জেএসএস সমর্থিত পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের আরেকজন বলে 'এদের সাথে আমাদের সামরিক সম্পর্ক, এটা এভাবেই চলবে।' আমাদের প্রশ্নটা এখানেই - 'সামরিক সম্পর্ক' বলতে তারা কি বুঝাতে চাইলেন আর সেটা ঠিক কিভাবে তারা চালাবেন?

    এক. হতে পারে তারা এভাবেই থুইকুদের রাজধানীর রাস্তায় তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াবেন;
    দুই. এভাবেই ৫জনে মিলে একজনের গায়ে আঘাত করবেন ;      
    তিন. এভাবেই তারা বুঝাবেন  তাদের সাথে ক্ষমতার সম্পর্ক  নিবিড়। পাহাড়ে যদি সামরিক বাহিনী তাড়া করবে আর রাজধানীতে আমরা তাড়া করবো।

    এই তিনের  বাইরেও অনেক পথ অবলম্বন করে  তারা সামরিক সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে পারেন। কিন্তু সেটা তো ঘোষণা করার পাশাপাশি স্পষ্ট করতে হবে। যারা আঘাত করলেন  বা যারা সামরিক সম্পর্কের  কথা বলছেন তারা সেটা অনুভব  করেন কিনা প্রশ্নটা সেখানেই। পরের দিন সবগুলো পত্রিকার কাছেই বিষয়টি জানিয়ে প্রেসবিজ্ঞপ্তি পাঠান ইউপিডিএফ সমর্থিত পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ। বিষয়টি অবহিত হওয়ার পর সাংবাদিকদের পক্ষে দীপায়ন খীসার কাছে প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে তিনি বলেন, 'কে কোথায় আমাদের নামে অভিযোগ করলো তা দেখার টাইম নেই আমার। আমি আদিবাসী দিবসের অনুষ্ঠান নিয়ে ব্যস্ত।' প্রশ্ন উঠতেই পারে এককভাবে দীপায়নের উপস্থিতি বা তার নাম উল্লেখ করে লেখা দাঁড় করানোর কারণ কি? আমি প্রশ্ন উত্থাপন করছি সবার সামনেই এবং 'সামরিক সম্পর্ক'কে বুঝার জন্যই। ঘটনাস্থলে উপস্থিত সকলের মধ্যে পরিচিত মুখ্য ও প্রাজ্ঞ-কর্মী হিসেবেই দায়টা দীপায়ন খীসার ওপর বর্তায়।

    যখন পাহাড়ীদেরএকটি  দলের কর্মী, ঢাকার রাস্তায়  আক্রান্ত হয় পাহাড়ীদেরই আরেকটি রাজনৈতিক দলের কর্মীর হাতে তখন আমরা মানে বাঙালিরা কি ভূমিকায় অবতীর্ণ হব? ঘটনাস্থলে  উপস্থিত বাঙালিদের মধ্যে  কয়েক ধরনের কথা শোনা গেলো। দীর্ঘদিন ছাত্র ইউনিয়ন এর নেতৃত্বদানকারী একজন থুইকুকে বুঝানোর চেষ্টা করে কেনো তাকে অনেক বেশি সতর্ক হয়ে চলাচল করতে হবে।  জেএসএস এর সহ-সাধারণ সম্পাদক কে এস মং এবং ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক নেতা বলে দাবি করা সালাউদ্দীন বেশ আন্তরিকভাবে প্রপদ, সংস্কৃতির নয়াসেতু কর্মীদের ও থুইকু মারমাকে এই বলে বুঝ দেয়ার চেষ্টা করেন যে তারা  বিষয়টা দেখবেন!  তাদের কথায় বা চোখে আমরা অস্বস্তি বা অবাক হওয়ার কোন সম্ভাবনা দেখিনি।

    আমরা যারা এই প্রশ্নগুলোর মুখোমুখি হবো তাদের উত্তর পাওয়ার সম্ভাবনা কম। কেনোনা, একদিকে পাহাড়ের রাজনীতি আমাদের সামনে অপরিষ্কার ও অস্পষ্ট। আরেকদিকে বাঙালি সহযোগিদের সরব উপস্থিতি। যখন  একজন পাহাড়ি আরেক-জন পাহাড়ির দিকে আঙুল উঁচিয়ে  বলেন, ' তোর সাথে আমার সামরিক সম্পর্ক' , তখন পাহাড়ির কাছে যে মেসেজ পৌঁছায়একজন শুভাকাঙ্খী বাঙালি হিসেবে আমার কাছে কি সেই একই মেসেজ পৌঁছায়?  জানি না । যেমন,  আমি এই 'সামরিক সম্পর্ক ' বলতে  বুঝি জেএসএস মনে করছে তারা সরকারের লাঠিয়াল; কারণ যে-সরকার শান্তি চুক্তি করেছিলো সে-সরকার এখন ক্ষমতায়। অতএব ভিন্নপক্ষ সে যেই হোক না কেনো তাকে দৌড়ের ওপর রাখা তাদের জন্য জায়েজ; এখানে অন্য কেউ মাথা ঢুকাতে পারবে না। অন্য কেউ মানে থুইকুদের মতো মানুষদের যারা সংহতি  জানাতে চান তারা মাথা ঢোকাতে পারবেন না।

    হয়তো তারা এমনও বুঝাতে চান যে পাহাড়ে যেমন সামরিক কায়দায় সমস্যা তৈরি বা সমাধান করা হয়, রাজধানীতে  ঠিক সেভাবেই প্রতিপক্ষে উপরে সামরিক কায়দা প্রয়োগ করা হবে; তবে পার্থক্য হচ্ছে যারা এই কায়দা অনুসরণ করবেন তাদের গায়ে জলপাই পোশাক থাকবে না । জেএসএস এর কোন পর্যায়ের কর্মীই'সামরিক সম্পর্ক' বলতে কি বুঝানো হচ্ছে তার কোন ব্যাখ্যা দিতে রাজি হননি। এটাও তাদের একটা সামরিক অবস্থানই বটে।

    ১৬ অগাস্ট ২০০৯

আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন