• জাতীয় কমিটির উপরে হামলাঃ দিন বদল নাকি ক্ষমতার হাত বদল
    জোবাইদা নাসরীন

    দুই বছর সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পর বহু-কাঙ্খিত নির্বাচনে আওয়ামীলীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে যে সরকার গঠন করেছে তার বয়স এক বছরও হয়নি। বেশ কিছু জাতীয় সংকট এই সরকারকে মোকাবেলা করতে হয়েছে। এর সঙ্গে যোগ ছিলো নিজেদের তৈরি করা কৃত্রিম সংকটও। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে দলের অভ্যন্তরীন কোন্দল, সংস্কারপন্থীদের নানা ধরনের বক্তব্য, মন্ত্রীদের কাজের সমন্বয়হীনতা এবং বিভিন্ন মন্ত্রীর অতি-কথা সহ নানাদিক। তার উপর গোদের উপর বিষ ফোঁড়ার মতো সব-সময় এই সরকারকে সবচেয়ে বেশি চাপে রেখেছে আওয়ামীলীগেরই ‘স্নেহধন্য' সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগ। অব্যাহত সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, টেণ্ডারবাজির জন্য এক পায়ে খাড়া থাকা সংগঠনটি আওয়ামীলীগের জন্য গত মেয়াদেও যথেষ্ঠ ভোগান্তি তৈরী করেছিলো; এবারও প্রথম থেকেই সর্বনাশ ডেকে আনার জন্য যথেষ্ট ছিলো এবং আছে। কিন্তু ছাত্রলীগের এ-সমস্ত কর্মকান্ডে আমাদের সরকারী বাহিনী নিশ্চুপ থাকে এবং নিশ্চুপ থাকাই তাদের এক ধরনের অলিখিত দায়িত্ব।

    কিন্তু পুলিশ বাহিনী সব-সময় নিশ্চুপ হয়ে বসে থাকেনা। তারা সময়ে-সময়ে জেগে ওঠে; পশু হয়ে ওঠে। সরকার এবং পুলিশ বাহিনী নিয়ে এসব কথা পাড়ার কারণ সাম্প্রতিক সময়ে একটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনে বাংলাদেশে সরকারের পুলিশ বাহিনীর বর্বরোচিত হামলার বিষয়টি নিয়ে বাতচিত করা। ঘটনার সূত্রপাত একটি আন্দোলনের ঘেরাও কর্মসূচীকে ঘিরে। গত ২ সেপ্টেম্বর দুপুরে তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির পেট্টোবাংলা ঘেরাও কর্মসূচীর মিছিলে পুলিশ বেধড়ক লাঠিপেটা করে। ৮০ শতাংশ রপ্তানীর সুযোগ রেখে দেশের সমুদ্র-সীমায় তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য বিদেশী কোম্পানীর সঙ্গে উৎপাদন অংশীদারী চুক্তি ( পিএসসি) না করার দাবীতে এই ঘেরাও কর্মসূচী ঘোষণা করেছিলো কমিটি। এদেশে পুলিশের লাঠিপেটার ঘটনার চিত্র প্রাচীন। তবে দিন বদলের ডাক দেয়া সরকারের সময়ে পুলিশের এই অপারেশন আমাদের দিন বদলের পরিবর্তে হাত বদলের কথাই যেন মনে করায়।

    আন্দোলনের যৌক্তিকতা বিষয়ে যে তথ্য তা হলো, সরকার গত ২৪ আগস্ট সমুদ্র-বক্ষে তিনটি তেল গ্যাস ক্ষেত্র অনুসন্ধানের জন্য মার্কিন কোম্পানী কনোকো ফিলিপস ও আইরিশ কোম্পানী তাল্লোর সঙ্গে পিএসসি স্বাক্ষরের সিদ্ধান্ত নেয়। এর প্রতিবাদে এবং চুক্তি স্বাক্ষর না করার দাবীতে তেল-গ্যাস রক্ষা জাতীয় কমিটি পেট্রোবাংলা ঘেরাও কর্মসূচি ঘোষণা করে। কমিটির মতে, বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে এই ক্ষেত্রগুলোর জন্য প্রণীত মডেল পিএসসিতে শতকরা ৮০ ভাগ গ্যাস রপ্তানী সুযোগ রাখা হয়েছে। আর বাকী ২০ শতাংশ গ্যাস গভীর সমুদ্র এলাকা থেকে দেশের স্থল-ভাগে এনে ব্যবহার করাও অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক হবেনা; শেষ পর্যন্ত ২০ শতাংশ গ্যাসও রপ্তানীই করা হবে। উল্লেখ্য, সেনা-নিয়ন্ত্রিত সরকারের আমল থেকেই জাতীয় কমিটি এই যুক্তিগুলো প্রদর্শন করছে।

    এখানে স্পষ্টতই একটি কথা বলে রাখা প্রয়োজন এই হামলায় আক্রান্তরা সকলেই কম-বেশি পরীক্ষিত মানুষ। এদের দাবীটি এদের মতোই স্বচ্ছ। এই দাবী নতুন কোন দাবী নয়। বরং নতুন হচ্ছে একদা এই দাবীর প্রতি একমত থাকা আওয়ামী লীগের এই দাবীর বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহন। কেনোনা ইতিহাস বলে বাংলাদেশের অন্য দাপটশালী দলটির তুলনায় আওয়ামী লীগ খনিজ এবং প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষায় বেশি সোচ্চার। রাজনীতির কারনেই হোক আর যে-কারণেই হোক বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পূর্বে এ-বিষয়ে জনতার সাথে হাত মিলিয়েছেন; ব্যতিক্রম ঘটলো এবার।

    আরও অবাক করা ব্যাপার হামলার ঘটনা ঘটে যাবার অনতিবিলম্বে সরকারের পক্ষ থেকে কোন ধরনের বিবৃতি আসেনি। এসেছে অনেক পরে, অর্থাৎ দ্বিতীয় দিন। সরকারের অবস্থা ছিলো কিছুটা ক্ষমা চাওয়ার মতো। সরকার বলেছে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কোন-কোন সদস্য যদি বাড়াবাড়ি করে থাকে তাহলে সরকার তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।? আমরা স্বরাষ্ট্র প্রতি-মন্ত্রীর কথা বিশ্বাস করতে চাই। কিন্তু প্রশ্ন হলো যেখানে প্রায় প্রতিটি পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠা জুড়ে ছিলো জাতীয় কমিটির সদস্য সচিব অধ্যাপক আনু মুহাম্মদসহ জাতীয় কমিটির নেতা-কর্মীদের দলিত-মথিত করার ছবি, সেখানে খতিয়ে দেখা কিংবা ‘বাড়াবাড়ি'র তদন্তের কী আছে? বিষয়টি বোধগম্য নয়। এর বাইরে আরও প্রমাণ আছে বিভিন্ন টিভি চ্যানেলের রিপোর্টে। স্বরাষ্ট্র প্রতি-মন্ত্রী আসলে কী ধরনের প্রমান চান? এই মানুষগুলো উপরে হামলা সচেতন বিবেকবান মানুষকে আহত করেছে, পীড়িত করেছে। এ-ধরনের কর্মকান্ড নিঃসন্দেহে সরকারের প্রতি জনগনের আস্থাহীনতার জায়গা তৈরি করবে। আমরা দেখতে চাই সরকার সত্যি-সত্যি কোন পদক্ষেপ নেয় কীনা। সরকারকে বুঝতে হবে জাতীয় সম্পদ রক্ষার আন্দোলনকারীদের পিটিয়ে ‘দিন বদল' এর শ্লৌগান জনগনকে বিশ্বাস করানো যাবেনা।

    জোবাইদা নাসরীনঃ লেখক ও গবেষক

    আপলৌডঃ ০৫ সেপ্টেম্বর ২০০৯

     

     

পাঠকের প্রতিক্রিয়া

chenel 4 যে ডকুমেন্টারী প্রকাশ করেছে এটার সাথে আমি পুরোপুরি
একমত এই অর্থে যে, তারা দাবী করে এটা একটা ইউরোপ ভিত্তিক
ইসলামীক সংস্থা আনার মনে হয় এটা বাংলাদেশের জামায়াতে ইসলামীর একটা
লেজুড় ভিত্তিক রাজনীতিক দল। তাদের সথে সংস্কতি মনা মানুষের কোন সম্পর্ক
নাই, সংস্কতি মনা মানুষ তাদের কে মানে নিতে পারে না, তারা একটি বিচ্ছিন্ন
সংস্থা, আমার মত অনেকেই মনে করেন।

আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন