মূল : কৃষণ চন্দর
অনুবাদ: জাফর আলম
রাত ছিল পূর্ণিমার। প্রচন্ড শীত। ঠান্ডায় রাস্তা-ঘাট সড়ক পর্যন্ত শক্ত হয়ে গেছে। আর জ্যাকসনের ভারী জুতার পদক্ষেপ ছিল শক্ত আর সড়কের ধারে গাছগুলো পুলিশের প্রহরীর মতো শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তেমনি এই আকাশের তলে সড়কে দু'পাশে সব বস্তু যেন শক্তভাবে মোতায়ন আছে। উদাহরণ স্বরুপ বলা যায়, জ্যাকশন জানে, সে লাহোর শহরের ডেপুটি পুলিশ সুপার ছিল। যে সড়ক দিয়ে সে যাচ্ছে, তাকে ইম্প্রেস রোড বলা হয়। তাকে পেছন থেকে আমি অনুসরণ করছি যেন কেউ তার উপর হামলা করতে না পারে। তার পকেটে একটি পিস্তলও ছিল। এদেশে সে বিশ বছর চাকরি করেছে। পনের আগস্ট ১৯৪৭ এর আগমনে মাত্র চারদিন বাকি। ভারত ঐ তারিখে স্বাধীন হবে এবং জ্যাকসনের রাজত্ব সেদিন থেকে শেষ।
জ্যাকসন অ্যাংলো ইন্ডিয়ান। তারপরও সে নিজেকে ইংরেজ মনে করে। ইংরেজদের রাজত্বের অবসান ঘটেছে, তাই তার মনে অনেক দুঃখ। ভারতে বিশ বছর সে দাপটের সাথে শাসন করেছে। বৃটিশদের দু'শ বছরের রাজত্বে বিশ বছর তার জীবনের একটি মূল্যবান অংশ। সে পাঞ্জাবের সব জেলায় কাজ করেছে এবং প্রত্যেক জেলায় তার থাকার জন্য বাংলো, আটজন চাকর, বিশটি থানা, হাবিলদার ইনসপেক্টর, সিপাহী আর হাজার-লাখো লোক তার শাসনাধীন ছিল। বিশ বছর পর্যন্ত সে এদেশে রাজত্ব করেছে বলা চলে।
এখন ১৫ই আগস্ট তার রাজত্ব খতম হবে। বিষয়টি মনে এমনভাবে গেঁথে আছে যেন পায়ের জুতার নীচে পেরেক অথবা রাতের কালো চাদরে ঢাকা আকাশের তারা। আজ প্রত্যেক জিনিষ তার কাছে শক্ত এবং স্থির মনে হচ্ছে। ভারত তার দেশ নয়। তার মনে একথাটি বারবার স্মরণ হচ্ছে যে, সে ভারতীয় নয়। সে একজন ইংরেজ এবং ইংল্যান্ড ফিরে যেতে হবে। তাই সে ইংল্যান্ডের ইয়র্কশায়ারে একটি কটেজ এবং একটা ডেইরী ফার্ম কিনে নিয়েছে। এখন দু'বছর পর পেনসানের টাকা পয়সা নিয়ে ইয়র্কশায়ার চলে যাচ্ছে, সাথে চলে যাচ্ছে তার স্ত্রী ও কন্যারা। কোনো ঝুট ঝামেলা নেই, বিপদ-আপদ নেই। তার বড় মেয়ের নাম সিনথিয়া আর ছোট মেয়ের নাম রোজী। দু'জনেই যেন জলসা-ঘরের অলঙ্কার সমতুল্য। কয়েকজন অ্যাংলো ইন্ডিয়ান যুবক বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছে কিন্তু মেয়েরা তাদের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে। ওরা শুধু খাঁটি ইংরেজকে বিয়ে করতে চায়, তাও অভিজাত বংশের সন্তানকে। ওদের কাছে টমী রামী পছন্দ নয় যারা অ্যাংলো ইন্ডিয়ান মেয়েদের মতো সারাক্ষন ছেলেদের সাথে ঘুরাঘুরি করে। তাদের চিন্তাধারা ছিল বাবার মতো মজবুত ও শক্ত, একথা পুলিশ সুপার সাহেব ভালভাবে জানতেন। জ্যাকসন মেয়েদেরকে তার রাজত্বের চেয়ে অধিক ভালবাসতো। বিশেষতঃ ছোট মেয়ে রোজীকে প্রাণাধিক ভালবাসতো।
রোজী ছিল অপূর্ব সুন্দরী ইংল্যান্ডের; যে কোনো লর্ডকে বিয়ে করার যোগ্য। নৃত্য প্রতিযোগিতায় সে সর্বদা প্রথম স্থান অধিকার করতো। সুন্দরী প্রতিযোগিতায়ও রোজী শ্রেষ্ঠ সুন্দরী মনোনীত হতো। ক্লাসে পড়াশুনায় ও সে ছিল মেধাবী। ক্লাসে সর্বদা প্রথম স্থান অধিকার করতো। সঙ্গীতে, পিয়ানো বাজনায়, ছবি আকাঁয়, মোটরগাড়ি চালনায়ও সে দক্ষ। সিনথিয়াও ব্যক্তিগত গুণে ছোট বোন রোজীর চেয়ে কোনো অংশে কম ছিলনা। তবে তার গায়ের রং ছিল বাদামী। তবে আর একটা বিষয়ে সিনথিয়াও পিছিয়ে ছিলনা - তাহলো ভারতীয়দের প্রতি ঘৃণা। রোজী ভারতীয়দের দারুণ ঘৃণা করতো, যেমন সে মাছ খেতে ঘৃণা করতো। বাইবেলে শয়তানের যেমন কাহিনীর বর্ণনা আছে, তেমনি তাদের বাবা-মায়ের কাছে ভারতীয়দের সর্ম্পকে গল্প শুনেছে। এসব গল্প তাদের কাছে আলেফ-লায়লার কাহিনীর মতো রহস্যময় মনে হয়েছে। ভারতীয় ডাকাতের কাহিনী, জাঠদের রক্তপাত ও মারামারি, মেয়েদের অপহরণ করে পালিয়ে যাওয়া, পকেটমার, চুরি আর অবৈধ মদ্য পানের গল্প। ভারতীয় অফিসাররা উৎকোচ গ্রহণ করে এবং ভারতীয় মুনাফাখোর ব্যবসায়ী শেঠরা চোরাকারবারীতে নিয়োজিত, এসব কিছু রোজীর কাছে আশ্চর্য মনে হয়। এইসব কাহিনী শুনার পর রোজীর তৎপরতা টেনিস খেলার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। এসব স্থানে সুন্দরী ছেলে-মেয়েরা আড্ডা দেয়।
চাঁদনী রাত; সারি-সারি গাছের ছায়ায় যেন শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থায় কোমরে হাত দিয়ে বান্ধবীদের মুখে যুবকরা চুমো দিচ্ছে। মনে হয় সুন্দরীরা স্বর্গ থেকে এসেছিল আর তাদের হাসি মধুর মিষ্টি। পরমুহূর্তে যেন ওরা তিতির জাতীয় পাখীর মতো শূণ্যে উড়ে গেছে আর তাদের সুবাস আকাশে বাতাসে এখনও সজীব আছে। আর সেই সুবাস মস্তিষ্কের শূণ্য বলয়ে সাঁতার কাটে। এ জীবন ভারতীয়দের জীবন থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। অনেক সময় ঘৃণা করা সত্বেও রোজীর মন চায়, যেন সে কোনো ভারতীয় লোকের সাথে আলাপ জমায়। অবশ্য কয়েকজন ভারতীয় লোকের সাথে আলাপ হয়েছে কিন্তু সেনগুলো এংলো ইন্ডিয়ান কালচারের নকল এবং রোজী নকল জিনিষ পছন্দ করেনা। বরং ভারতীয়দের সাথে দেখা সাক্ষাত ও আলাপচারিতার পর রোজীর আরও খারাপ লাগছে। কারণ ভারতীয়রা কেউ আজ পর্যন্ত হ্যালো বলা পর্যন্ত ঠিকভাবে শিখেনি। আর সিনথিয়া তো এ -পর্যন্ত কোনো ভারতীয় পুরুষের সাথে নৃত্য পর্যন্ত করেনি। সে এতই সর্তক ছিল যে, কোনো ভারতীয় বন্ধুর বন্ধুও তার সাথে সর্ম্পক রাখতে পারে না। সে যে এলো ইন্ডিয়ান সে সর্ম্পকে সে ছিল সর্ম্পূণ সচেতন। তার চেহারা ছুরত ছিল শ্যামলা কিন্তু ইউরোপীয়রা তাদেরকে অ্যাংলো ইন্ডিয়ান মনে করে।

তখন সে নিজের পবিত্র অ্যাংলো স্যাক্সন রক্তে ভারতীয় রক্ত মিশ্রিত হওয়ার জন্য নিজেকে গালমন্দ করে আর বলে, "এই অসভ্য হিন্দুস্তানীরা সব জিনিষে ভেজাল করে - দুধে, চিনিতে, ঘিয়ে, কাপড়ে, আর ফসলে সবকিছুতেই ভেজাল করে। এমনকি সিনথিয়ার রক্তেও ওরা বাজে রক্ত মিশিয়ে দিয়েছে। শালার শূকর কোথাকার !" জ্যাকশন তার মেয়েদেরকে উচ্চতর শিক্ষা দিয়েছে এবং বাজে পরিবেশ থেকে রক্ষা করে বাঁচিয়ে রেখেছে যেন তারা ইংল্যান্ডের জন্য নিরাপদ থাকে। তার ব্রেইনের সাইনবোর্ডে মোটা অক্ষরে দুই মেয়ের ব্যাপারে লিখা ছিল "রিজার্ভড ফর ইংল্যান্ড"। জ্যাকসন যখনই মেয়েদের ব্যাপারে কথা বলে অথবা তাদের ব্যাপারে চিন্তা ভাবনা করে, তখন সাইনবোর্ডের এই লেখাগুলো তার কল্পনায় ভেসে উঠে, যেমন করে রাতের অন্ধকারে পেট্রোল পাম্পের ক্যালটেক্স এর বিজ্ঞাপন বিদ্যুতের থামে ঝুলানো অবস্থায় একবার জ্বলে উঠে আবার নিভে - "রিজার্ভড ফর ইংল্যান্ড, রিজার্ভড ফর ইংল্যান্ড !" তখন পর্যন্ত জ্যাকশন তার মেয়ে দু'জন আর ইয়র্কশায়ারের সুন্দর বাড়ির ব্যাপারে পাকা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিল, সে ইম্প্রেস রোড থেকে ইংল্যান্ডে চলে যাচ্ছে। বাতাসে ছিল কনকনে শীত। সড়ক জন-মানবশূণ্য। পেটে ছয় পেগ মদ ঢেলেছে; জ্যাকসনের ভারী পায়ের চাপ আর ওর চোখে-মুখে হৃদয়ে চোখের চাহনিতে মদের নেশা অনুভূত হয়। হাঁটতে-হাঁটতে তার পা থেমে যায়।
এখানে মেয়েদের কলেজ; একজন খৃষ্টান শিক্ষিকার সাথে তার ঘনিষ্ঠতা ছিল। সে ভাবলো, সিপাহীদের নিয়ে সে কলেজের আশেপাশে চলে যাবে আর উক্ত শিক্ষিকার বাসার কড়া নাড়বে আর তাকে জাগিয়ে তুলবে। তারপর মুচকি হেসে ভাবলো, ভুল হয়ে গেছে তাকে বাড়ি ফিরতে হবে। সে এগিয়ে যায়, সামনের মোড় পাড় হয়ে, অল ইন্ডিয়া রেডিও ভবন অতিক্রম করে তার কুঠিতে গিয়ে প্রবেশ করে। গেইটে ডিউটিরত সিপাহীরা তাকে অভিবাদন জানিয়ে বাড়ির দরজা পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে গেইটে ফিরে যায়। ইতিমধ্যে জ্যাকশন বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করেছে। জ্যাকসন কুঠিতে ঢোকার পর বেয়ারা চুপি চুপি বলল, "উনি এসেছেন হুজুর।"
"কোথায় বসেছে উনি?" বেয়ারা ইশারা করে বলল, নেহাল চন্দ্র খোকরকে সরকারী অফিসে বসানো হয়েছে আর মওলানা আল্লাদাদ পীরজাদাকে ড্রইংরুমে। হুজুর ওদেরকে পানীয় পান করতে দেব? জ্যাকসন বলল, "পীরজাদা সাহেবকে এক দু'পেগ পান করতে দাও। আমি আগে নেহাল চন্দ্রের সাথে আলাপ সেরে নিই।" নেহাল চন্দ্র খোকর লাহোরের হিন্দুদের বিশিষ্ট প্রভাবশালী নেতা। গরীব হিন্দুদের কল্যাণ করাই তার ধর্ম। তিনটি দৈনিক পত্রিকা, চারটি কুঠি আর গুজরানওয়ালায় দশ হাজার একর জমির মালিক। তার বড় ছেলে কংগ্রেস দলের এমএলএ। তার জামাতা হিন্দু মহাসভার সেক্রেটারী। তিনি নিজে ছিলেন সমাজতন্ত্রের বিরোধী। তাই তিনি নিজের স্বার্থে চারটি কুঠি নিজ দখলে রেখেছিলন। কিন্তু হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গায় সে বিপদে পড়েছে কারণ কোনো মুসলমান তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলনা। তাছাড়া কোনো অজুহাতে সে মুসলমান ধর্মে দীক্ষা নিতে পারছে না। কিন্তু তার চিন্তা ভাবনায় ছিলোনা যে, স্বাধীনতা লাভের ভিত্তিতে পাঞ্জাব দ্বি-খন্ডিত হতে পারে আর লাহোর শহর ভারতের দখল থেকে পাকিস্তানে চলে যাবে। অন্যথায় সে আগে-ভাগে খাজা হাসান নিজামীর মুরিদ হতো নতুবা আজমীর শরীফ গিয়ে আধা মুসলমান হয়ে পড়ে থাকতো।
এখন সে উপায় নেই। চারিদিকে দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়েছে। চারিদিকে মারাত্মক বোমা বর্ষণ আর হত্যা লুটপাট চলছে। এখন কোথাও আশ্রয় নেয়ার কোনো উপায় নেই। জ্যাকসনের সাথে তার পুরনো পরিচয়, তাই আলাপ করতে এসেছে। নেহাল চন্দ্র সাহেব এসেছেন? "আমার চিঠি নিশ্চয় আপনি পেয়েছেন?" নেপালচন্দ্র বলল, "হ্যাঁ পেয়েছি। এখন বলুন, হিন্দুদের জীবন বিপন্ন, তাদের জন্য কি করা যায়।"
শাহ আলমী দরওয়াজা পুড়িয়ে ফেলা হয়েছে। কৃষ্ণ নগর, সন্ত নগর, আর্য নগরের হিন্দুরা যদি লাহোর থেকে নিরাপদে বের হয়ে যেতে না পারে, তাহলে এক সপ্তাহের মধ্যে সব হিন্দু নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। ডিএভি কলেজে তিন হাজার হিন্দু শরণার্থী আছে। ওরা সরকারি রেশনের ওপর নির্ভরশীল। জ্যাকসন বলল, "ভারত সরকার এদের জন্য কি করেছে?" সরকার একদিন বিমান থেকে ডিএভি কলেজ প্রাঙ্গনে রুটি নিক্ষেপ করেছিল। রুটির সাথে চিরকুট ছিল, "আমরা আপনাদেরকে এখান থেকে দ্রুত উদ্ধারের চেষ্টা করছি।" কিন্তু পরিস্থিতি এখন খারাপ। জানা গেছে এদেরকে উদ্ধার করতে পনের'শ ট্রাকের ব্যবস্থা করতে হবে। আমরা অপেক্ষা করতে-করতে সকলেই মারা পড়বে, নেহাল চন্দ্র বলল। জ্যাকসন মুচকি হাসে। সরকার ঘুমিয়ে আছে, জানেনা কলকাতা ডিপোতে হাজারো ট্রাক পড়ে আছে। দিল্লী ফিরোজপুর, লুধিয়ানা যে কোনো একটি শহরের ট্রাকগুলো রিকুজিশান করলে প্রয়োজনীয় ট্রাকের বন্দোবস্ত হয়ে যাবে। ওরা কিছু করবেনা।
"তাহলে আমরা কোথায় যাব? এখানে আশ্রয় কেন্দ্রে দোজখের যন্ত্রনা। ভগবানের দোহাই জ্যাকসন সাহেব এখন আমাদের সাহায্য করুন। সকলের জন্য সাহায্যের ব্যবস্থা না হলে অন্ততঃ আমার পরিবারকে এই ক্যাম্প থেকে উদ্ধার করে অন্যত্র সরানোর ব্যবস্থা করুন। আমার পরিবারে আমি, আমার স্ত্রী, দুই ছেলে, একজন জামাতা, মেয়ে এবং একটি কুকুর রয়েছে। বিমানে অথবা সামরিক ট্রাকে চলে যাব। বাকী লোকজনকে ট্রেনে, গাড়িতে অথবা পদব্রজে যেভাবে হোক অন্যত্র পাঠিয়ে দিন। সর্বপ্রথম আমাদের পাঠানোর ব্যবস্থা করুন।" নেহাল চন্দ্র বলল।
জ্যাকসন হঠাৎ বলল, "আপনি কত টাকা ব্যয় করতে পারেন।" অনেকক্ষণ চিন্তাক-ভাবনার পর নেহাল চন্দ্রকে জ্যাকসন বলল, "আপনি আপাততঃ আমার কাছে বিশ হাজার রূপী রেখে যান। মুসলিম স্বেচ্ছাসেবক নেতার সাথে আমার পরিচয় আছে, তার সাথে আলাপ করলে একটা সমাধান বের হবেই। কিন্তু আমার জিজ্ঞাসা, আপনারা পালাচ্ছেন কেন? হারামজাদা মুসলিমদের সাহসের সাথে প্রতিরোধ করতে পারেন না?" কি বলেন আপনি? মোকাবিলা হাত দিয়ে করা যায় নাকি। ওদের কাছে মেশিনগান, রাইফেল আর ছুরি আছে। জ্যাকসন তার চেয়ার নেহাল চন্দ্রের দিকে এগিয়ে নিয়ে বলল, "আপনাদেরকে যদি এইসব অস্ত্র সরবরাহ করা যায়?" তারপর নেহাল চন্দ্রের দিকে মদের গ্লাস এগিয়ে দেয়। এবার জ্যাকসন তার চেয়ার নেহালজীর আরও কাছে এগিয়ে আনে। একথা শুনে নেহাল চন্দ্রের চেহারা রক্তিম আকার ধারণ করে বলল, "সত্যিই বলছেন?" জ্যাকসন বলল, আমরা পুরোনো বন্ধু। আপনাকে বিপদে অবশ্যই সাহায্য করবো। প্রকৃতপক্ষে লাহোরের উপর হিন্দুদের অধিকার রয়েছে। লাহোর হিন্দুরা নির্মান করেছে। লাহোরের বাগান, সুরম্য প্রাসাদ, কলেজ, সিনেমা হল সবই হিন্দুদের হাতে গড়া। ওরাই লাহোরের মালিক। ওদেরই এখানে বসবাস করা উচিত। পুরুষের মতো সাহসের সাথে লড়াই করুন নেহাল চন্দ্রজী। আমি আপনাকে সাহায্য করবো। আপনার ওখানে কতজন পুরুষ আছে?" নেহাল চন্দ্র মদের গ্লাস থেকে এক পেগ গলাধরণ করে জবাব দিল, "লাহোরে একজন মাত্র নেতা আছে, যার উপর সকলের ভরসা আছে, তিনি হলে নেহাল চন্দ্র খোকর।"
"জিন্দাবাদ!" জ্যাকসন বলল, তারপর ঘণ্টা বাজায়। বেয়ারা হাজির হলে তার কানে চুপিচুপি কি জানি বলল। কিছুক্ষণ পর বেয়ারা ফিরে এলে জ্যাকসন তার কানে-কানে কি জানি বললে সে বেরিয়ে যায়। জ্যাকসন বলল,"আপনি এখানে বসুন। এক-আধ ঘন্টার মধ্যে, সব ব্যবস্থা হয়ে যাবে। আমি টেলিফোন করে দিয়েছি। এখনই অস্ত্র-শস্ত্রে ভর্তি একটি মিলিটারী ট্রাক আপনার সাথে পাঠাচ্ছি। সঙ্গে একশ সৈন্য যাবে, সে আপনার লোকজনকে ট্রেনিং দেবে। ঠিক আছে না?" নেহাল চন্দ্র উঠে দাঁড়ায় বলল, "ঈশ্বর আপনাকে এর প্রতিদান দেবে জ্যাকসন সাহেব।" জ্যাকসন সাহেব ও উঠে দাঁড়ায় বলল, "আমার এখুনি এক সাহেবের সাথে দেখা করতে হবে। আপনি এখানে বসুন। আর এক পেগ পান করুন। আজকে বেশ ঠান্ডা পড়েছে। এখানকার অস্ত্রশস্ত্রের দাম আর ড্রাইভারের মজুরী সব আপনার কাছে থেকে আদায় করা হবে।" নেহাল চন্দ্র আশ্বস্ত হয়ে বলল, "ধন্যবাদ। তবে আমার পরিবারকে অবশ্যই অমৃতসর যাওয়ার ব্যবস্থা করে দেবেন। এখানে বাকি আমি নিজেই ব্যবস্থা করবো।"
"আচ্ছা ঠিক আছে!" জ্যাকসন জবাব দিল।
ড্রইংরুমে মওলানা আল্লাদাদ পীরজাদা এসেছেন, তার জন্য অপেক্ষায় আছেন। "বলুন, মওলানা সাহেব মনে হয় আরামেই আছেন।" মওলানা বলল, "এসব কথা বাদ দিন জ্যাকসন সাহেব। ইদানিং পুলিশ নাকি বেশ মওজে আছে। লাহোরে প্রত্যেক পুলিশ নাকি প্রচুর স্বর্ণ লুট করে নিয়েছে, এতে তাদের সাত-পুরুষ আরাম আয়াসে কাটাতে পারবে । পুলিশ সিপাইদের যদি এই অবস্থা হয় তাহলে আপনার বাংলো তো স্বর্ণের ইটের তৈরী হওয়া উচিত।" মওলানা আল্লাদাদ বলল। জ্যাকসন মওলানার পিঠে চড় দিয়ে বলল, "এত হৈচৈ কেন?"
আসলে আমি তো সি আই ডি তে কাজ করি হুজুর, মওলানার জবাব।
তাহলে বলুন, খবর কি?
শুনুন, মডেল টাউনে সবচেয়ে ধনী শিখ ও হিন্দুরা থাকে। ওরা সৈন্যদের কাছে ঘেঁষতেই দেয়নি। তাছাড়া ওদের পিস্তল আছে। কয়েকদিন আগে সার্কুলার রোডের মুসলমানদের একটি দল সেখানে হামলা কবার উদ্দেশ্য গিয়েছিলো। চল্লিশ জন লোক মারা গেছে। আমাদের কাছে অস্ত্র নেই। জানিনা হিন্দুরা বোমা, মেশিনগান, রাইফেল, পিস্তল সবকিছু কোথা থেকে পায়। বেচারী গরীব মুসলমানদের শুধু মাত্র ছুরি আর চাকু দিয়ে আক্রমণ করতে হয়। মওলানা জানাল।
আমি অস্ত্র কোথা থেকে দেব? আপনি ও কেমন কথা বলেন, আল্লাদাদ, টাকা ছাড়া অস্ত্রশস্ত্র পাওয়া মুস্কিল। আমার কাছে থাকলে অবশ্যই দিয়ে দিতাম। আমাকে হিন্দুস্তানে নয় পাকিস্তানে থাকতে হবে। হিন্দু বেনিয়াদের প্রতি আমার কোনো আকর্ষণ নেই। তাছাড়া ইসলামী শিক্ষাতে তো আমাদের সাথে খৃষ্টান ধর্মের সাথে মিল আছে। খৃষ্টানদের সাথে মুসলমানদের মিলন হতে পারে কিন্তু হিন্দুদের সাথে কোনো দিন একত্রে বসবাস হতে পারেনা। মওলানা মুচকি হেসে বলল, টাকা সঙ্গে নিয়ে এসেছি।
কোথায় ?
দু'টি ট্রাক যখন একটার পর একটা দু'দিকে বিশ মিনিট অন্তর যাত্রা শুরু করে, তখন জ্যাকসন পায়ের বুট না খুলেই ড্রইং রুমে বসে পড়ে আর দেয়ালে টাঙানো চার্টের দিকে তাকিয়ে জীবনের ভবিষ্যত পরিকল্পনা নিয়ে ভাবতে থাকে। তার স্ত্রীর বয়স বেড়েছে, তাকে ইংল্যান্ড নেবেনা বরং তাকে তালাক দিয়ে মোটা অংকের অর্থ ধরিয়ে দিয়ে ভারতেই রেখে যাবে। তার স্ত্রীর চেহারা-ছুরত তার মেয়েদের মতো ফর্সা নয় কিন্তু তার দেহে ও চেহারায় একটি বিশেষ আকর্ষণ ছিলো। তবুও জ্যাকসন স্ত্রীকে ইউরোপীয় অভিজাত লোকজনের পার্টিতে কখনও নিয়ে যেতোনা। অবশ্য সে তার মেয়েদের দারুণ ভালবাসে। তাদেরকে বিলাত নিয়ে যাবে আর সেখানে ভদ্র খাঁটি ইংরেজদের সাথে বিয়ে দেবে। তার কাছে এখন প্রচুর টাকা। এই টাকা দিয়ে সে মেয়েদের জন্য অভিজাত ইংরেজ পরিবারের গরীব ছেলেদের কিনে নিতে সক্ষম। সে নিজেও একটি বিয়ে করবে কোনো ইংরেজ সুন্দরী প্রিন্সেসকে। সে তো উঁচু বংশের সন্তান। নিশ্চয় তার পারিবারিক বংশের পূর্বসূরী দু'একজনের ছবি ফেয়ার হলে ঝুলানো আছে তার তাদের মাথায় আছে মুক্তার মুকুট। তার বিয়ের ছবি ছাপা হবে লন্ডন টাইমসে। জ্যাকসন এসব ভেবে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে আর বেয়ারাকে জিজ্ঞাসা করে ছোট মেম সাহেব বাসায় ফিরেছে কি ?
বেয়ারা জবাব দিল, "বড় মেম সাহেবা আর সিনথিয়া ফিরেছেন। ছোট মেম সাহেবা সকালে ফিরবেন, নৃত্যের প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে গেছে। এই চিরকুট ছোট মেমে সাহেবা রোজী আপনার জন্য দিয়েছেন।"
জ্যাকসন দ্বিতীয় মদের পেগ গলাধরণ করে সোফায় বসে পড়ে আর তার আদরের কন্যার পত্র পড়তে শুরু করে। পত্রে রোজী লিখেছে,
সুপ্রিয় ডালিং পাপা,
এটা তোমার প্রিয়তমা মেয়ে রোজীর চিঠি; বার্ট ভবন থেকে লিখছি। এখানে আজ নৃত্য প্রতিযোগিতা চলছে। কিন্তু সিনথিয়া তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে যাচ্ছে আর আমি এখানে থেকে যাচ্ছি। কারণ তুমি জানো, আমি প্রথম স্থান অধিকার করবো। তাই পুরস্কার কেন হাতছাড়া করবো ? কিন্তু পাপা এই বিষয়ে আমি তোমাকে পত্র লিখছিনা। এখন আমার সামনে সুন্দর পোশাকে সজ্জিত অপূর্ব চিত্তাকর্ষক দম্পতি রাজহংসের মতো নাচ ঘরের মেঝেতে সাঁতার কাটার মতো চক্কর দিতে ব্যস্ত। সু-সজ্জিত বাতির আলোতে অর্কেষ্ট্রার সুর বাজছে আর মনমোহন পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে, যেন চন্দ্র সূর্য একত্র হয়েছে এবং আমাদের হৃদয়ের অন্দরে প্রবেশ করছে। আমি সামান্য পরিমাণ শেরী পান করেছি তাই কবির মতো কাব্য চর্চা করছি। তবে আমি এই চিঠি শেরী পান করা অথবা নৃত্য সম্পর্কে লিখছিনা। আমি আমার সঙ্গী সম্বন্ধে তোমাকে জানানোর জন্য লিখছি, সে এখন আমার সামনে চেয়ারে বসে আছে আর আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসছে। তার নাম আনন্দ। সে একজন ভারতীয়, দু'বছর যাবত তাকে আমি চিনি। পাপা তুমি হয়তো চমকে উঠেছ, সম্ভবত: রেগেও গেছ। কিন্তু আনন্দ আজেবাজে ছেলে নয়, যার উপর তুমি রাগ করতে পার। সে নৃত্যশালায় এত ভাল নাচতে পারে, তার সাথে কোনো অ্যাংলো ইন্ডিয়ান অথবা ইংরেজ যুবকের তুলনা চলে না। আনন্দের গায়ের রং শ্যামলা। আর তুমি জান, আমার কাছে শ্যামলা রং পছন্দ নয় বরং ঘৃণা করি।
প্রথম দিন যখন নৃত্যশালায় আনন্দের সাথে দেখা হয়, আমার সাথে পরিচিত হয়, তখন আমি অত্যন্ত খারাপ ব্যবহার করেছিলাম। কিন্তু অন্যান্য ভারতীয় ছেলেদের মতো সে ভীত হয়নি। সে খারাপ মনে করেনি বরং হাসিমুখে এগিয়ে আসে। তুমি জান, পাপা, আমি হিন্দুস্তানি ছেলেদের সাথে মেলা মেশা পছন্দ করিনা। কিন্তু আনন্দের মুচকি হাসির ভাষা ছিল ভিন্ন রকমের। যখন সে আমাকে দেখে মুচকি হাসে আমার মনে হয়, আমার হৃদয়ের রঙিন মহলের ভিত্তি স্থাপন করেছে। আনন্দের মুচকি হাসি মারাত্মক, তার উচ্চতা ছয় ফুট। তার কোমর চিতার বাঘের মতো চিকন। তার চোখের রং কালো ও উজ্জ্বল। আর যখন সে কোমরে হাত রেখে নাচতে শুরু করে তখন নৃত্যশালায় যেন অন্ধকার ছেয়ে আসে। কল্পনায় বাংলার জঙ্গলের চিত্র ভেসে উঠে, হাজারো গাছের চারা নৃত্য করতে থাকে আর সবুজ তৈলাক্ত পাতাগুলো চোখের উপর ঝুলতে থাকে। আর চিতা বাঘ, ব্যাঘ্র, ভেড়া আর জঙ্গলি জানোয়ারের আওয়াজ শুনা যেতে থাকে। আর আমার তখন মনে হয়, আমার বাড়ি বাংলা দেশের কোনো জঙ্গলে অবস্থিত, আমি একজন শিকারীর স্ত্রী আর গাছের ছাল গায়ে পরিধান করে জঙ্গলী নৃত্য করছি।
পাপা তুমি আমার কথা সত্য মনে করো, আনন্দের সাথে প্রথম নৃত্যে অংশ গ্রহণ করে আমার এমনিই অনুভূতি হয়েছে।
একবছর আগে আমার সাথে তার পরিচয় হয়েছে। কিন্তু নিয়মিত আমার সাথে দেখা করার জন্য সে উদগ্রীব ছিল। কিন্তু আমি একজন খাঁটি অ্যাংলো ইন্ডিয়ান মেয়ের মতো তাকে বারবার প্রত্যাখ্যান করেছি। আনন্দ লেখাপড়া জানা শিক্ষিত। তার বাবা ধনী, গুজরানওয়ালার একজন প্রতিপত্তিশালী ব্যক্তি। আনন্দ দীর্ঘদিন বিলাতে ছিল। তার কাছে একটি পিকার্ড মোটর আছে। কয়েকজন ইংরেজ মেয়ে তার প্রেমে মশগুল, তাকে বিয়ে করতে আগ্রহী। কিন্তু এসব খবরে আমি কান দিইনি বরং তার সাথে এক বছর কোনো কথা বলিনি। সে এক বছর যাবৎ নৃত্যশালায় আসতে থাকে আর বাজে এংলো ইন্ডিয়ান ও ক্রীশ্চিয়ান মেয়েদের নাচের সঙ্গী হয়। প্রথম-প্রথম সে ভাল নাচতে জানতোনা। মাঝখানে তিন-চার মাস গায়েব ছিলো। তারপরে ফিরে আসলে দেখলাম, যে অপূর্ব নৃত্য করতে জানে। একদিন বাধ্য হয়ে তার সাথে আমি নৃত্যে অংশ গ্রহণ করি। প্রথম নৃত্যের প্রতিক্রিয়া তোমাকে একটু আগে জানিয়েছি। নৃত্য শেষে এখন টেবিলে একত্রে বসে থাকি, তখন মনে হয় যেন আমাকে কেউ যাদু করেছে।

আনন্দ আমার কাছে জিজ্ঞাসা করে, আমি কেনো হিন্দুস্তানীদের ঘৃনা করি।
উত্তরে আমি বলেছি, হিন্দুস্তানীদের শরীর থেকে দুর্গন্ধ বের হয়।
আনন্দ বলল, আমাকে শুঁকে দেখো, দুর্গন্ধ বের হয় কিনা ?
আমি তার দেহ শুঁকে দেখে বললাম, গন্ধ বের হয় ঠিকই কিন্তু বিচিত্র ধরনের চিত্তাকর্ষক গন্ধ। আমাকে স্বীকার করতেই হল।
আনন্দ আবার বলল, তুমি টমী ও অন্যান্য ইংরেজ ছেলেদের শরীর শুঁকে দেখো। একশ ভারতীয় ছেলের মধ্যে দশ জনের দেহে দুর্গন্ধ পাবে। আর একশ জন ইংরেজ যুবকের মধ্যে ৫০ জনের শরীরে দুর্গন্ধ পাবে। আমি উত্তরে বললাম, তোমাদের মতো কালো আদমীদের দেহের দুর্গন্ধ এডিকোলন সেন্ট দিয়ে কি চাপা রাখা যায় ? আনন্দ হাসতে থাকে। বাদামী রং এর চেহারায় তার সাদা দাঁত চমক দিচ্ছিল; যেন বিদ্যুত চমক। আর আমি ঘাবড়ে যাই। সে বলল, "কেন ?"
আমি জবাব দিলাম, "তোমার দাঁতগুলো সুন্দর।"
আনন্দ উত্তর দিল, ভারতীয় দাঁত বাদামী রং এর মুখে চমক দেয় ভালো। সৌন্দর্যের একটি নয় অনেকগুলো রং আছে। কয়েকটি রং মিশিয়ে রূপ লাবণ্যের সৃষ্টি হয়।
আমি আবার বললাম, আমার পাপা বলেছে, তোমরা দারূণ ধোঁকাবাজ, জালিয়াত আর অবিশ্বস্ত। তোমাদের মাঝে শৃংখলাবোধ নেই।
আনন্দ উত্তর দিল, তোমার বাবা পুলিশ অফিসার। নিয়ত যে সব হিন্দুস্তানীদের থানায় আনা-নেয়া করা হয়, তিনি তাদের দেখে আমাদেরকে যাচাই করেন। আমি যদি স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের অফিসার হতাম তাহলে ইংরেজদের সম্পর্কে এমনই মন্তব্য করতাম। এবার শৃংখলার প্রশ্নে আসা যাক। তুমি কি জাননা, দু'একবছরের মধ্যে তোমরা ভারত ত্যাগ করবে। কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের শৃংখলাও কঠোর নিয়ন্ত্রণ তোমরা দেখেছ।
রেগে আমি জবাব দিলাম, "আমি জানি না।" তারপর বললাম, "তোমরা হিন্দুস্তানী শূয়রের সন্তান।" একথা বলার পর আমি টেবিল থেকে উঠে চলে আসছিলাম। আনন্দের মুখে হাসি। তখন সে বলল, "আমি পাঁচ হাজার বছরের পুরনো। অনেক কৌশল জানি। তোমাকে কাবু করবোই।"
তার এই চ্যালেঞ্জ আমার পছন্দ হয়নি। কিন্তু সম্ভবত: হৃদয়ের একটি টুকরো তাকে পছন্দ করেছে। এর পর থেকে আমি তার সাথে নিজের অজান্তে ভাল ব্যবহার করতে থাকি। বাইরে না মনে-মনে তাকে নিজের সম্পর্কে ভাবতে থাকি। যখনই আমাদের চার চোখের মিলন হয়, আমার দৃষ্টি প্রথমেই সরিয়ে নিতে হয়। আগেই বলেছি তার হাসি মারাত্মক। বুকে যেন কাঁটা বিঁধে দেয়। শরীর অবশ হয়ে আসে আর গলায় যেন ফাঁদ লাগে। তারপর তিন চার মাস কেটে গেছে তার সাথে কখন ও নাচে অংশ নিইনি। এরপর এল নৃত্য প্রতিযোগিতা। বাধ্য হয়ে পুরুষ সঙ্গী হিসেবে তাকে নির্বাচিত করতে হ'ল। কারণ তার মতো ভালো নৃত্য করতে পারে এমন সঙ্গী কাউকে পাওয়া গেলনা। পুরস্কার প্রাপ্তির আনন্দে আমরা দু'জনে মদ পান করি একই গ্লাস থেকে। সে আমাকে চুম্বন দিতে পারতো কিন্তু তা করেনি; হেসে এড়িয়ে যায়। তাতে আমি মনে শান্তি পাই। আমার মনে হয়েছে সে আমাকে চুমো খাচ্ছে, আমাকে আদর করছে। তার শক্ত বাহুর কবল থেকে যেন নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে পারছিনা। আমি ভীত হয়ে তার টেবিল থেকে উঠে পড়ি। সে বুঝেনা আমি কেন তার কাছ থেকে পালিয়ে যাচ্ছি আবার সান্নিধ্যে আসছি।
আমাদের দু'জনার জাত আলাদা, দেশ আলাদা। ধর্ম, তাহজীব সবই ভিন্ন। কথাবার্তা, আহার-বিহার, চলাফেরা, উঠা-বসা সবই আলাদা। কিন্তু তার সান্নিধ্য কেনো আমার মাঝে যন্ত্রনাদায়ক অনুভূতির সৃষ্টি করে? অনেক রাত একথা ভেবে-ভেবে আমার বিনিদ্র রজনী কেটেছে। তুমি তোমার প্রিয়তমা রোজীর সিদ্ধান্ত এবং তার ভবিষ্যতের পরিকল্পনা সম্পর্কে যাতে জানতে পার, আর এ-সম্পর্কে গভীরভাবে চিন্তা ভাবনা করতে পার, তাই বিস্তারিত লিখছি।
এখন আমি চুপিচুপি গোপনে তার সাথে দেখা করি। কারণ নৃত্যশালায় লোকজন তাকে রোজীর ভারতীয় সঙ্গী বলে থাকে আর সিনথিয়ার কাছে বিষয়টি খুবই অপছন্দ। আমি যদি আনন্দের সাথে ভদ্র ব্যবহার করি আর মেলামেশা করি তাহলে তোমার দুর্নাম হতো। লোকে বলতো, ডেপুটি সুপারিন্টেন্ডেন্ট জ্যাকসনের মেয়ে একজন কালা হিন্দুস্তানীর সাথে প্রেম করছে। একথা আমার অসহ্য। তাই আমি গোপনে তার সাথে দেখা করতাম। আমরা দু'জনে মেট্রোতে নাচতে যেতাম। সেখানে সমবেত সকলে ভারতীয়; অর্কেষ্ট্রাও খুবই ভাল। সেখানে আমার অনেক ভারতীয় যুবকের সাথে সাক্ষাতের সুযোগ হয়েছে। শিল্পী, লেখক, রাজনীতিবিদ, স্যোশালিষ্ট, কম্যুনিস্ট, আকালী সমর্থক, খদ্দর পোশাকধারী - যারা হিন্দী, মজদুর-কিষাণ, জাতি ও রাষ্ট্রকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার বিষয়ে, ইংরেজ রাজত্ব উল্টে দেয়া আর সারা বিশ্বকে ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ করে নতুন মানবতার জন্ম দেয়ার কথা আলাপ করে থাকে। অথচ বার্ট ইনস্টিটিউটে এ-ধরনের আলোচনা হয়না। এসব আলোচনা আমি কখনও স্কুলে অথবা বাড়িতে শুনিনি যা এ-জগতে সুখ-দুঃখ আর খুশির সৃষ্টি করে। এমন কথা যা শুনে আমাদের মন কাজ করতে চায়। পাপা এখন জেনেছি, তুমি ও তোমার জগৎ কতখানি পিছিয়ে আছে। আমি এ-জাতি, তুমি, মা ও সিনথিয়াকে ভালবাসি কিন্তু তুমি এখন মিশরের মমির মতো পুরনো হয়ে গ্যাছো। প্রিয় অথচ পুরনো, ঠিক রোমান মূর্তির মতো সেগুলো যাদুঘরে শোভা পায়।
গত দুই বছরে আমি কি কি করেছি, তা তোমাকে জানিয়ে দিতে চাই। কারণ এসব কাজ আমি-তুমি, মা ও সিনথিয়ার কাছ থেকে লুকিয়ে করেছি। আমি এই দুই বছরে ভারতকে ভালবাসতে শিখেছি। আমি তাদের ভাষা শিখেছি, তাদের পোশাক পরেছি, তাদের খাবার খেয়েছি। আর ভারতীয় গান গেয়েছি, নৃত্যে অংশ নিয়েছি। আমার পরনে শাড়ি অপূর্ব লাগে যেন সারাদিন গায়ে পরে থাকি। আমি কথাকলি আর ভরত নাট্যম নৃত্যের স্থায়ী আবেদনের প্রেমে পড়েছি। দু'শ বছর পর্যন্ত আমাদের বিবেকে যে মরিচা ধরেছিল তা পরিষ্কার হয়েছে। পাপা আমি ভারতীয় মেয়ে। ভালভাবে চেয়ে দেখো, আমার চেহারা পুরোপুরি ইংরেজদের মতো নয়। এতে পাঁচ হাজার বছরের পুরনো ছাপ-চিত্র তোমার দৃষ্টি-গোচর হবে, যেখানে আছ তুমি, সিনথিয়া এবং মা। ভালভাবে চেয়ে দেখো আমরা ভারতীয়।

আমি এই দুই বছরে ভারতকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেছি। ভালো-মন্দে মিশিয়ে এরা মানুষ, যেমন আমরা। পাপা, আমার কাছে জিলাপী, অমৃত আর মোতিচুরের মিষ্টি খেতে ভাল লাগে। আর সালোয়ার-কামিজ আমার খুবই পছন্দ। আর মোগলাই খাবারের কাছে আমাদের খাবার জংলী মনে হয়। কুর্মা, শাম্মী কাবাব, মুরগ মুসল্লম আর জর্দা পোলাও আর কতো কি। পাপা তুমি ষোল বছর যাবত বিশ্রী সুপ খাইয়ে-খাইয়ে আমাদের হত্যা করেছ। এখনও বাসায় সুপ পান করি। কিন্তু আনন্দের বাড়িতে সুপ পান করবোনা। তুমি মেঘদূতের তর্জমা পড়নি নচেৎ হিন্দুদের বন্য আখ্যা দিতে না। আনন্দ আমাকে মেঘদূতের কবিতা আবৃত্তি করে শুনিয়েছে, সেক্সপিয়ারের শ্রেষ্ঠত্ব, গ্যেটের দর্শন আর শেলীর প্রেম সব কিছু মেঘদূতে আছে। যে জাতি এমন কাব্য চর্চা করতে পারে, কবিতা লিখতে পারে, তাদেরকে অসভ্য বলা বোকামী ছাড়া আর কিছু নয়।
পাপা তুমি আমাকে ষোল বছর পর্যন্ত ধোঁকা দিয়েছ। তুমি সারাজীবন নিজেকে ধোঁকা দিয়েছ। তুমি নিজের রক্ত থেকে ভারতীয় হিন্দীপনাকে পৃথক করতে চেষ্টা করেছ। তুমি এই জাতির উপর রাজত্ব করেছ। অথচ তোমাদেরকে এদের সেবা করা উচিত ছিল। তুমি হিন্দু আর মুসলমানদের পরস্পরের মাঝে ঝগড়া ও লড়াই উসকে দিয়েছ, এখন এদেরকে অস্ত্র দিয়ে লড়াইয়ে উৎসাহিত করছ; অথচ এদের ক্ষত স্থানে পট্টি লাগানো আর ঔষধ দেয়া উচিত ছিলো। আজ আমার চোখ খুলে গেছে, আমি তোমাদের জীবন ত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।
আমি আনন্দের সাথে চলে যাচ্ছি। আনন্দের কাছে কিছুই নেই। তার বাড়িঘর লুট হয়েছে। তার পিকার্ড গাড়ি পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। তার পিতা-মাতাকে হত্যা করা হয়েছে। তার পরনের শার্ট আর প্যান্ট ছাড়া কিছুই নেই। কিন্তু তার হৃদয় আছে। তার আত্মা তার কাছে আছে। আর সে প্রতিশোধ নেয়ার আবেগে আপ্লুত নয়। আমরা দু'জনে একটি নতুন মানবতার বাণী শুনতে পেয়েছি, যেটা হ'ল ধরার বুকে স্বর্গ। যেখানে হিন্দু, মুসলমান, খৃষ্টান, ইহুদী, রুশ আর আমেরিকান সকলে একই ক্যাম্পে একত্রিত হয়েছে। তোমার ক্রীড়ানুরাগী মেয়ে সুতির শাড়ি পরে মোহাজির ক্যাম্পে যাচ্ছে। আমরা হিন্দুদের কাছে যাচ্ছি, মুসলমানদের কাছে যাব। সম্ভবত আমাদের কথা কেউ শুনবেনা।
এভাবে আমাদের মৃত্যুও হতে পারে। হয়তো আমাদের জন্য এটা বোকামী, দারুণ ভুল হবে - অ্যাংলো ইন্ডিয়ান সমাজের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা। কিন্তু জানিনা, কে জানি বারবার একটি কথাই আমাকে বলছে, "এটাই তোমার কর্তব্য। এভাবে তুমি বাবার পাপের প্রায়শ্চিত করতে পার। এমনিভাবে তুমি দু'শত বছরের লজ্জার দাগ ধুইয়ে ফেলতে পারবে আর তোমার আত্মার প্রকৃত সৌন্দর্য অর্জিত হবে। তুমি ভারতীয় মেয়ে, নাচঘরে নয় মানব সেবাই তোমার কাজ।"
ইতি
রোজী
জ্যাকসন টলমল অবস্থায় উঠে দাঁড়ায়। তার নেশা ছুটে গেছে। সে তাড়াতাড়ি আর ও দু'পেগ মদ গলাধরণ করে দ্রুত আয়নার সামনে হাজির হয়। সে নিজের চেহারার দিকে হতবাক হয়ে দেখতে থাকে। ভাবছে, "আমি জ্যাকসন, রোজী আমার মেয়ে। এটা রোজীর চিঠি। তার চোখের নীচে কালি পড়েছে।" হঠাৎ মনে হ'ল, তার চেহারায় ভারতীয় ছাপ ফুটে উঠেছে। নাক, চোখ, ঠোঁট, মাথা, কান, সবকিছু ইংরেজদের নয় হিন্দুস্তানী। আমি ভারতীয়, না না আমি ইংরেজ। আমার বাড়ী ইয়র্কশায়ার। আমার স্ত্রী একজন ইংরেজ প্রিন্সেস। তার মাথায় রোমান মুকুট। সে আমার জন্য ফেয়ার হলে অপেক্ষা করছে। সে দু'হাতে মাথা চেপে ধরে কারণ তার চেহারায় অবিকল ভারতীয় নকশা ফুটে উঠেছে, সেই ভারতীয় মস্তক, কালো চুল, ঠোঁট, কান, হিন্দী চোখ, ভ্রু সবকিছু ভারতীয়।
জ্যাকসন চিৎকার করে উঠে, আমি ভারতীয় নই আমি ইংরেজ। খাঁটি ইংরেজ। ইয়র্কশায়ার, ডার্বি, নর্মান, নান্ট শাহ আর্থার।
আয়নার চারিদিক থেকে ভারতীয় লোকজনের অট্টহাসি শুনা যাচ্ছে, হিন্দুস্তানী হিন্দুস্তানী অর্থাৎ ভারতীয়। চারিদিকে হিন্দুস্তানী চেহারা অট্টহাসি দিতে দিতে নিকটে আসছে আর নিকটতর হচ্ছে --------।
জ্যাকসন পিস্তল হাতে নিয়ে গুলি চালায়। পর-মুহূর্ত্তে সে মেঝেতে লুটে পড়ে। তার কানের গোড়া দিয়ে রক্ত ঝরে পড়ছে।
আপলৌডঃ ১৪ সেপ্টেম্বর

