১. বিব্রত রাজনীতি আর কেটে ফেলা প্লাস্টার
গত সপ্তাহে তেল গ্যাস বন্দর রক্ষা আন্দোলনের মিছিলে হামলা হয়েছিলো। অন্য অনেকের সাথে আহত হয়েছিলেন ঐ আন্দোলনের নিবেদিত-প্রাণ কর্মী, আমাদের আদর্শ, সমকালীন প্রগতিশীল রাজনীতির গর্ব এবং জন-মানুষের কন্ঠস্বর আনু মুহাম্মদ। বিভিন্ন দফায় সরকারের উচ্চ-পর্যায়ের মানুষ-জন, যারা আনু মুহাম্মদকে দেখতে গেছেন তারা আনুর আবেগাপ্লুত সহকর্মী, কী স্রেফ শুভাকাঙ্খী দর্শনার্থীদের তোপের মুখে পড়েছেন। তারা অতীব বিব্রত হয়েছেন। গিয়েছিলেন স্বয়ং স্বাস্থ্যমন্ত্রী যিনি একাধারে প্রথিতযশা অর্থোপেডিক চিকিৎসকও বটে। তার কি মনে হয়েছে কে জানে, তিনি গিয়ে আনু মুহাম্মদের দু'পায়ের প্লাস্টার কেটে ফেলতে বলেছেন। কর্তার ইচ্ছায় কর্ম; প্লাস্টার কেটে ফেলা হলো। অথচ আনু মুহাম্মদ আহত হবার পরপরই তাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হলে, সেখানকার কর্তব্যরত চিকিৎসকরা পায়ে প্লাস্টার করে দেন; যদিও বলেন গুরুতর কিছু নয়, বিশ্রাম নিন, সেরে যাবে। পরে স্কয়ার হাসপাতালেও প্লাস্টার বহাল রাখেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক।
এখন কথা হ'ল প্লাস্টার থাকাতে কী দর্শনার্থী কী প্রেস বা মিডিয়া, প্রচার করছিল যে, আনু মুহাম্মদের দু'টো পা-ই ভেঙ্গে গেছে। সেটা নিশ্চয়ই সরকারকে বিব্রত করেছে। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক স্বাস্থ্যমন্ত্রী কি সে-কারণেই প্লাস্টার কেটে দিয়ে বলতে চাইলেন যে, বিষয় তেমন গুরুতর কিছু নয়? তার কি মনে হয়েছে যে তুচ্ছ বিষয়কে প্লাস্টার করে বড় বানানো হচ্ছে? মিডিয়ার নজর কাড়া হচ্ছে? কথা হ'ল তাহলে একাধিক ক্ষেত্রে প্লাস্টার করতে/রাখতে মত দেয়া হ'ল কেন? ধরে নিচ্ছি মন্ত্রী মহোদয় আরও অভিজ্ঞ একজন, কিন্তু অভিজ্ঞ চিকিৎসকেরও ভুল হতে পারে। আমার এক আত্মীয় বেশ অনেক বছর আগে হাড়ের ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। মারা যাবার আগে দীর্ঘদিন তিনি অধ্যাপক রুহুল হকের কাছে কোমরে ব্যাথার চিকিৎসা নিয়েছিলেন। অধ্যাপক হক তখন ধরতে পারেননি যে ভদ্রলোকের ক্যান্সার হয়েছে। বরং মৃত্যুর কিছুদিন আগ পর্যন্তও ক্যান্সার আক্রান্ত শরীরে ভদ্রলোককে কষ্টসাধ্য ফিজিওথেরাপী/ব্যায়াম করিয়েছিলেন। এই উদাহরণ দেবার উদ্দেশ্য অধ্যাপক রুহুল হকের চিকিৎসা-জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা নয়; কিংবা তাকে একটি মৃত্যুর জন্য দায়ী করাও এর উদ্দেশ্য নয়। কেবল এটুকু বলা যে, এমনকি একজন অভিজ্ঞ চিকিৎসকও গুরুতর ভুল করতে পারেন।
সেকারণেই এবার প্লাস্টার কাটবার ঘটনাটা শুনে আমার মনে হ'ল এমন একটা স্পর্শকাতর ঘটনায় অত্যুৎসাহী হয়ে মন্ত্রী মহোদয় এমন একটা কাজ না করলেও পারতেন। আজ আমার আনু স্যারের সাথে কথা হয়েছে, তার পায়ে আবারও ব্যান্ডেজ করা হয়েছে। ইদানীং তার ব্যাথাটা বেড়েছে। আমার কিংবা আনু মুহাম্মদের শুভাকাঙ্খীদের ভয় যে, একটা বিব্রতকর ইমেজকে আড়াল করতে গিয়ে এমন কিছু.যেন করা না হয় যাতে করে আনু মুহাম্মদের একটা স্থায়ী ক্ষতি হয়ে যায়। হয়তো নিছকই অমূলক এই শঙ্কা। তবুও আশা করি সংশ্লিষ্ট সকলে বিষয়টা আমলে আনবেন।
২. সাফাই, আশার বাণী অতঃপর পিএসসি অনুমোদন
আমরা পত্রিকায় দেখেছি আনু মুহাম্মদকে রাস্তায় শুইয়ে ফেলে উপুর্যপরি লাঠি আর লাথির আঘাতে জর্জরিত করা হয়েছিল। তবে তিনি একা নন; আনু মুহাম্মদ এবং তার যোগ্য সহকর্মীরা, যারা দেশের সম্পদ অবিবেচকের মতো বিদেশীদের হাতে তুলে দেবার বিরুদ্ধে জোর আওয়াজ তুলেছেন, তাদের সকলের ওপরই পুলিশী হামলা হয়েছে। যারা বর্তমান সরকারের সমর্থক/অংশীদার, তারা আরা বলতে চান এই আক্রমণ স্যাবোটাজ, সরকারকে ভেতর থেকে নাজেহাল করবার জন্য এমনটা করা হয়েছে। তারা বলতে চান সরকার এমনটা চাননি, এমন হুকুম দেননি। কেউ-কেউ পুলিশের লাঠি আর লাথির পেছনে বিগত জোট সরকারের হাত দেখেছেন। এসব তত্ত্ব আবার টক শো গুলোর মাধ্যমে বৃহত্তর শ্রোতাকূলের কাছে পৌঁছেছে। হতে পারে, আমরা অবাক হইনা। আবার এও হতে পারে যে, বিদেশীদের কাছে যারা কাছা খুলে দিতে চায়, তারাই এমন একটা হামলা সাজিয়েছে; সেকথা কিন্তু সরকার বাহাদুরের নিজের লোকেরা কেউ বলছেন না। তারা মোটের ওপর ঘটনাটাকে একটা ষড়যন্ত্র তত্ত্ব দিয়ে ব্যাখ্যা করে যাচ্ছেন।
এ-নিয়ে সরকার অবশ্য দুঃখ প্রকাশ করেছেন বারংবার। শেখ হাসিনার অবর্তমানে সরকারের শীর্ষ নেতৃত্ব, সর্বজন শ্রদ্ধেয় উনসত্তুর-একাত্তুরের অগ্নিকন্যা, সৎ রাজনীতির প্রতিভূ মতিয়া চৌধুরী আনু মুহাম্মদকে হাসপাতালে গিয়ে দেখে এসেছেন। আমাদের আনু মুহাম্মদ কিন্তু মতিয়া চৌধুরী এবং তার সঙ্গীদের তৎক্ষণাৎ মনে করিয়ে দিয়েছেন, যে দাবীর কারণে তার আজ এই হাল, সরকার যেন সেটার ব্যাপারে ব্যবস্থা নেন। জবাবে তারা বলেছিলেন পুরো বিষয়টা পুণর্বার খতিয়ে দেখা দরকার। মতিয়া চৌধুরী আনু মুহাম্মদকে পরামর্শ দিয়েছেন তারা (মানে, তেল, গ্যাস নিয়ে যারা লড়ছেন) যাতে প্রধানমন্ত্রীর সাথে বিষয়টা নিয়ে একবার বসেন। শুনে আমরা আশাবাদী হয়েছিলাম। সরকার তাহলে সত্যি-সত্যি জন-মানুষের নাড়ীর স্পন্দন অনুভব করছেন! অথচ আজ খবর পেলাম প্রধানমন্ত্রী বিতর্কিত উৎপাদন-বন্টন চুক্তিটি (পিএসসি) অনুমোদন দিয়ে দিয়েছেন। এক্ষণে আমরা সরকারের ভূমিকাকে কি করে ব্যাখ্যা করব? স্থানীয় সরকার মন্ত্রী এবং সরকারি দলের সম্পাদক সৈয়দ আশরাফ বিদেশী কোম্পানী কর্তৃক আশি ভাগ রপ্তানির সম্ভাবনা চেপে গিয়ে বলছেন তেল-গ্যাস তুলে সরকার দেশের জন্য ব্যবহার করতে চায়। তেল-গ্যাস রক্ষা করা মানে মাটির নিচে রেখে দেয়া নয়। জনস্বার্থ বিরোধী এই স্বর আমাদের খুব চেনা; অতীতেও এমন স্বর আমরা বহুবার শুনেছি। এই তাহলে সরকারের অবস্থান? তাহলে সরকারের তেল-গ্যাস নীতিমালা নিয়ে পুনর্ভাবনা দেবার কথাটা ছিল কেবলই পরিস্থিতি সামাল দেবার জন্য বলা কিংবা বলার জন্য বলা? তাহলে সরকার সত্যি-সত্যি ঠান্ডা মাথায় নিষ্কম্প হাতে তেল-গ্যাস বহিঃশক্তির কাছে তুলে দিতে চায়, এমনকি ফুলবাড়ীর জনগনের রক্ত কী আনু মুহাম্মদের রাস্তায় পড়ে থাকা আহত শরীর মাড়িয়ে হলেও?
যারা আনু মুহাম্মদের সাথে মার খেয়েছেন, যারা মার খেয়ে দমে না যাওয়া আনু মুহাম্মদের পাশে থাকছেন, তারা কিন্তু কেবল ষড়যন্ত্র তত্ত্বের একটা পিঠ দেখতে রাজী নয়। আমরা বহিঃশক্তির কাছে নতজানু বেড়াল অথচ নিজ জনগণের ওপর হামলে পড়া বাঘ ভূমিকায় সরকারকে দেখতে-দেখতে এতোই অভ্যস্ত যে, আমাদের তিতা মনে কেবলই মনে হয় যে সংঘটিত হামলাটি রাষ্ট্রের মদতেই ঘটেছে। রাষ্ট্রের নীতির সমালোচনাকারী কণ্ঠকে রোধ করবার জন্য এই দমন-পীড়ন। সরকার যেন আমাদের আশঙ্কাকে মিথ্যে প্রমাণ করেন।
১৬ সেপ্টেমর ২০০৯


From a historical
From a historical perspective, societies in need of government have moved from the primitive to the patriarchal state and finally to the military, the real politics of modern times. The origin and development of government institutions is the most visible subject for the study of Politics and its history.